Skip to content

দশম শ্রেণী ভৌত বিজ্ঞান – জৈব রসায়ন (গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা)

joibo-rosayon_1_Sahaj Shiksha
joibo-rosayon_2_Sahaj Shiksha
YouTube player
YouTube player

জৈব রসায়ন: একটি বিশদ আলোচনা

১.০ ভূমিকা: জৈব যৌগের জগৎ

কার্বনের ক্যাটিনেশন ধর্ম, অর্থাৎ কার্বন পরমাণুগুলির নিজেদের মধ্যে শৃঙ্খল গঠনের বিশেষ ক্ষমতার কারণে জৈব রসায়নের ক্ষেত্রটি বিশাল ও বৈচিত্র্যময়। কার্বনের এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের ফলেই লক্ষ লক্ষ জৈব যৌগ তৈরি করা সম্ভব হয়েছে, যা আমাদের আধুনিক জীবনের প্রায় প্রতিটি দিককে প্রভাবিত করে। এই প্রাথমিক বিভাগের উদ্দেশ্য হল জৈব রসায়নের ভিত্তি স্থাপনকারী মৌলিক সংজ্ঞাগুলি প্রতিষ্ঠা করা, যা পরবর্তী বিশদ আলোচনার জন্য একটি সুস্পষ্ট পরিকাঠামো প্রদান করবে।

১.১ জৈব যৌগ (Organic Compounds)

কার্বনের বিভিন্ন অক্সাইড, কার্বনেট ও বাইকার্বনেট, হাইড্রোজেন সায়ানাইড, ধাতব সায়ানাইড, সায়ানেট, থায়োসায়ানেট, কার্বন ডাইসালফাইড ইত্যাদি যৌগগুলি ছাড়া, কার্বনের সেই বিশাল সংখ্যক যৌগ যাদের মধ্যে ক্যাটিনেশন ধর্ম এবং সমাবয়বতার মতো বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, তাদের জৈব যৌগ বলা হয়। এই যৌগগুলিই জৈব রসায়নের মূল আলোচ্য বিষয়।

১.২ সম্পৃক্ত ও অসম্পৃক্ত যৌগ (Saturated and Unsaturated Compounds)

জৈব যৌগগুলিকে তাদের কার্বন-কার্বন বন্ধনের প্রকৃতির উপর ভিত্তি করে দুটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা হয়:

  • সম্পৃক্ত যৌগ: যে সমস্ত জৈব যৌগের অণুর গঠনে পাশাপাশি থাকা সবগুলি কার্বন পরমাণু শুধুমাত্র এক-বন্ধন দ্বারা যুক্ত থাকে, তাদের সম্পৃক্ত যৌগ বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, মিথেন (CH₄), ইথেন (C₂H₆) এবং প্রোপেন (C₃H₈) হল সম্পৃক্ত যৌগ।
  • অসম্পৃক্ত যৌগ: যে সমস্ত জৈব যৌগের অণুতে অন্তত দুটি কার্বন পরমাণু দ্বি-বন্ধন বা ত্রি-বন্ধন দ্বারা যুক্ত থাকে, তাদের অসম্পৃক্ত যৌগ বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ইথিলিন (C₂H₄) (দ্বি-বন্ধনযুক্ত) এবং অ্যাসিটিলিন (C₂H₂) (ত্রি-বন্ধনযুক্ত) হল অসম্পৃক্ত যৌগ।

১.৩ হাইড্রোকার্বন (Hydrocarbons)

শুধুমাত্র কার্বন এবং হাইড্রোজেন পরমাণুর সমন্বয়ে গঠিত দ্বি-মৌল যৌগগুলিকে হাইড্রোকার্বন বলা হয়। বন্ধনের প্রকৃতি এবং রাসায়নিক সক্রিয়তার উপর ভিত্তি করে এদের শ্রেণিবিভাগ করা হয়:

  • অ্যালকেন (Alkane): এগুলি হল সম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন, যাদের রাসায়নিক সক্রিয়তা তুলনামূলকভাবে খুব কম।
  • অ্যালকিন (Alkene): এগুলি দ্বি-বন্ধনযুক্ত অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন এবং রাসায়নিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয়।
  • অ্যালকাইন (Alkyne): এগুলি ত্রি-বন্ধনযুক্ত অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন এবং অ্যালকিনের মতোই রাসায়নিকভাবে খুব সক্রিয়।

এই যৌগগুলির বৈশিষ্ট্য মূলত তাদের মধ্যে উপস্থিত নির্দিষ্ট পারমাণবিক গোষ্ঠী দ্বারা নির্ধারিত হয়, যা কার্যকরী মূলক নামে পরিচিত।

২.০ জৈব যৌগের গঠনগত বৈচিত্র্য ও শ্রেণিবিভাগ

জৈব রসায়নে লক্ষ লক্ষ যৌগের অস্তিত্ব থাকায় একটি সুসংবদ্ধ শ্রেণিবিভাগ পদ্ধতি অপরিহার্য। কার্যকরী মূলক, সমাবয়বতা এবং সমগণীয় শ্রেণির মতো ধারণাগুলি এই বিশাল সংখ্যক যৌগের গঠন, ধর্ম এবং আচরণকে একটি যৌক্তিক কাঠামোর মধ্যে সংগঠিত করতে এবং তাদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পূর্বাভাস দিতে সহায়তা করে। এই পদ্ধতিগত শ্রেণিবিভাগ জৈব রসায়নকে নিয়মানুবর্তী এবং সুগ্রাহ্য করে তোলে।

২.১ কার্যকরী মূলক (Functional Groups)

কার্যকরী মূলক হল কোনো পরমাণু বা মূলক যা জৈব যৌগের অণুতে উপস্থিত থেকে সেই যৌগের প্রকৃতি, ধর্ম এবং বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে। এটিই যৌগের রাসায়নিক বিক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দু। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কার্যকরী মূলক নিচে সারণিতে উল্লেখ করা হলো:

যৌগের শ্রেণি

কার্যকরী মূলক (নাম ও সংকেত)

অ্যালকোহল

হাইড্রক্সিল (–OH)

অ্যালডিহাইড

অ্যালডিহাইড (–CHO)

কিটোন

কিটো (>C=O) (যেখানে কার্বন শৃঙ্খলের মাঝে থাকে)

কার্বক্সিলিক অ্যাসিড

কার্বক্সিল (–COOH)

অ্যামিন

অ্যামিনো (–NH₂)

ইথার

ইথার (–O–)

২.২ সমাবয়বতা (Isomerism)

একই আণবিক সংকেতবিশিষ্ট কিন্তু ভিন্ন ধর্মসম্পন্ন একাধিক যৌগ গঠনের ঘটনাকে সমাবয়বতা বা আইসোমেরিজম বলা হয়। এই ভিন্ন ধর্মী যৌগগুলিকে একে অপরের সমাবয়ব বা আইসোমার বলা হয়।

অবস্থানঘটিত সমাবয়বতা (Positional Isomerism)

যখন সমাবয়বী যৌগগুলির কার্বন শৃঙ্খল এবং কার্যকরী মূলক একই থাকে, কিন্তু কার্বন শৃঙ্খলে কার্যকরী মূলকের অবস্থানের ভিন্নতার কারণে সমাবয়বতার সৃষ্টি হয়, তখন তাকে অবস্থানঘটিত সমাবয়বতা বলে। উদাহরণস্বরূপ, প্রোপান-১-অল (CH₃CH₂CH₂OH) এবং প্রোপান-২-অল (CH₃CH(OH)CH₃) একে অপরের অবস্থানঘটিত সমাবয়ব।

কার্যকরী মূলকঘটিত সমাবয়বতা (Functional Group Isomerism)

যখন যৌগগুলির আণবিক সংকেত একই হওয়া সত্ত্বেও ভিন্ন ভিন্ন কার্যকরী মূলক উপস্থিত থাকার ফলে সমাবয়বতার উদ্ভব হয়, তখন তাকে কার্যকরী মূলকঘটিত সমাবয়বতা বলে। উদাহরণস্বরূপ, ডাইমিথাইল ইথার (CH₃–O–CH₃) এবং ইথাইল অ্যালকোহল (CH₃CH₂OH) উভয়েরই আণবিক সংকেত C₂H₆O, কিন্তু তাদের কার্যকরী মূলক যথাক্রমে ইথার এবং অ্যালকোহল হওয়ায় তারা কার্যকরী মূলকঘটিত সমাবয়ব।

২.৩ সমগণীয় শ্রেণি (Homologous Series)

সমগণীয় শ্রেণি হল এমন এক শ্রেণির জৈব যৌগ যাদের মধ্যে একই প্রকার মৌল থাকে, একই সাধারণ সংকেত দ্বারা তাদের প্রকাশ করা যায়, তাদের মধ্যে একই কার্যকরী মূলক থাকে এবং ক্রমবর্ধমান আণবিক ভর অনুযায়ী সাজালে পরপর দুটি সদস্যের আণবিক সংকেতের মধ্যে একটি CH₂ গ্রুপের পার্থক্য থাকে।

  • অ্যালকেন শ্রেণি: এর সাধারণ সংকেত CₙH₂ₙ₊₂। উদাহরণ: মিথেন (CH₄), ইথেন (C₂H₆)।
  • অ্যালকিন শ্রেণি: এর সাধারণ সংকেত CₙH₂ₙ। উদাহরণ: ইথিলিন (C₂H₄), প্রোপিলিন (C₃H₆)।
  • অ্যালকাইন শ্রেণি: এর সাধারণ সংকেত CₙH₂ₙ₋₂। উদাহরণ: অ্যাসিটিলিন (C₂H₂), প্রোপাইন (C₃H₄)।

এই সুশৃঙ্খল শ্রেণিবিভাগ একটি সার্বজনীন নামকরণ পদ্ধতির ভিত্তি স্থাপন করে, যা পরবর্তী বিভাগে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

৩.০ জৈব যৌগের নামকরণ: IUPAC পদ্ধতি

বিজ্ঞান ও শিল্পে বিশ্বব্যাপী সুস্পষ্ট যোগাযোগের জন্য জৈব যৌগের একটি দ্ব্যর্থহীন এবং যৌক্তিক নামকরণ পদ্ধতির প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সংস্থা IUPAC (International Union of Pure and Applied Chemistry) দ্বারা প্রবর্তিত এই পদ্ধতিটি প্রতিটি জৈব যৌগের জন্য একটি অনন্য নাম প্রদান করে, যা তার গঠনকে নির্ভুলভাবে বর্ণনা করে। এই কৌশলগত নামকরণের নিয়মকানুন জৈব রসায়নের অধ্যয়ন এবং প্রয়োগকে সহজতর করে।

বিভিন্ন সমগণীয় শ্রেণির যৌগসমূহের IUPAC নামকরণ পদ্ধতিটি নিচের সারণিতে বিস্তারিতভাবে দেখানো হলো:

সমগণীয় শ্রেণি

যৌগ

শব্দমূল

শ্রেণি প্রত্যয়

IUPAC নাম

অ্যালকেন

CH₄

meth (মিথ)

ane (এন)

methane (মিথেন)

C₂H₆

eth (ইথ)

ane (এন)

ethane (ইথেন)

C₃H₈

prop (প্রোপ্)

ane (এন)

propane (প্রোপেন)

অ্যালকিন

C₂H₄

eth (ইথ)

ene (ইন)

ethene (ইথিন)

C₃H₆

prop (প্রোপ্)

ene (ইন)

propene (প্রোপিন)

অ্যালকাইন

C₂H₂

eth (ইথ)

yne (আইন)

ethyne (ইথাইন)

C₃H₄

prop (প্রোপ্)

yne (আইন)

propyne (প্রোপাইন)

অ্যালকোহল

CH₃OH

meth (মিথ)

ol (অল)

methanol (মিথানল)

CH₃CH₂OH

eth (ইথ)

ol (অল)

ethanol (ইথানল)

CH₃CH₂CH₂OH

prop (প্রোপ্)

ol (অল)

propanol (প্রোপানল)

অ্যালডিহাইড

HCHO

meth (মিথ)

al (অ্যাল)

methanal (মিথান্যাল)

CH₃CHO

eth (ইথ)

al (অ্যাল)

ethanal (ইথান্যাল)

CH₃CH₂CHO

prop (প্রোপ্)

al (অ্যাল)

propanal (প্রোপান্যাল)

কিটোন

CH₃COCH₃

prop (প্রোপ্)

one (ওন)

propanone (প্রোপানোণ)

কার্বক্সিলিক অ্যাসিড

HCOOH

meth (মিথ)

oic acid (ওয়িক অ্যাসিড)

methanoic acid (মিথানোয়িক অ্যাসিড)

CH₃COOH

eth (ইথ)

oic acid (ওয়িক অ্যাসিড)

ethanoic acid (ইথানোয়িক অ্যাসিড)

CH₃CH₂COOH

prop (প্রোপ্)

oic acid (ওয়িক অ্যাসিড)

propanoic acid (প্রোপানোয়িক অ্যাসিড)

নামকরণের এই সুস্পষ্ট ধারণা অর্জনের পর, আমরা এখন শিল্পক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ নির্দিষ্ট জৈব যৌগগুলির ধর্ম এবং প্রয়োগ বিশ্লেষণ করতে প্রস্তুত।

৪.০ গুরুত্বপূর্ণ হাইড্রোকার্বনসমূহের বিশদ বিশ্লেষণ

মিথেন, ইথিলিন এবং অ্যাসিটিলিন শুধুমাত্র সরল অণু নয়, বরং এগুলি হলো ভিত্তিপ্রস্তরস্বরূপ হাইড্রোকার্বন যা প্রধান শক্তি উৎস এবং রাসায়নিক শিল্পের মৌলিক উপাদান হিসেবে কাজ করে। এদের ধর্ম এবং বিক্রিয়া বোঝা আধুনিক শিল্প রসায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

৪.১ মিথেন (Methane – CH₄)

উৎস (Sources)

মিথেনের প্রধান শিল্প উৎস হলো প্রাকৃতিক গ্যাস, যেখানে এর পরিমাণ ৪০-৯০% পর্যন্ত থাকে। এছাড়া কোলগ্যাসেও আয়তন হিসেবে প্রায় ৪০% মিথেন পাওয়া যায়।

ব্যবহার (Uses)

মিথেনের প্রধান প্রয়োগগুলি নিম্নরূপ:

  1. জ্বালানি হিসেবে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
  2. হাইড্রোজেন, মিথানল এবং ফরম্যালডিহাইডের শিল্পোৎপাদনে এটি একটি অপরিহার্য কাঁচামাল।
  3. কার্বন ব্ল্যাক প্রস্তুতিতে মিথেন ব্যবহৃত হয়।

রাসায়নিক বিক্রিয়া (Chemical Reactions)

দহন (Combustion): বায়ু বা অক্সিজেনের উপস্থিতিতে মিথেন একটি অদীপ্ত ফিকে নীলাভ শিখায় জ্বলে এবং কার্বন ডাইঅক্সাইড, জল ও প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে। CH₄ + 2O₂ → CO₂ + 2H₂O + তাপ (213 kcal/mol)

প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া (Substitution Reaction): বিক্ষিপ্ত সূর্যালোকের উপস্থিতিতে, মিথেনের হাইড্রোজেন পরমাণুগুলি ক্লোরিন পরমাণু দ্বারা ধাপে ধাপে প্রতিস্থাপিত হয়। CH₄ + Cl₂ → CH₃Cl (মিথাইল ক্লোরাইড) + HCl CH₃Cl + Cl₂ → CH₂Cl₂ (মিথিলিন ক্লোরাইড) + HCl CH₂Cl₂ + Cl₂ → CHCl₃ (ক্লোরোফর্ম) + HCl CHCl₃ + Cl₂ → CCl₄ (কার্বন টেট্রাক্লোরাইড) + HCl

৪.২ ইথিলিন (Ethylene – C₂H₄)

উৎস (Sources)

পেট্রোলিয়াম খনি থেকে নির্গত প্রাকৃতিক গ্যাসে ২০% পর্যন্ত ইথিলিন পাওয়া যায়। এছাড়া, কোক ওভেন গ্যাসেও প্রচুর পরিমাণে ইথিলিন উপস্থিত থাকে।

ব্যবহার (Uses)

ইথিলিনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারগুলি হলো:

  1. কাঁচা ফল পাকাতে এবং পাকা ফলের সংরক্ষণে ইথিলিন ব্যবহৃত হয়।
  2. শল্য চিকিৎসায় চেতনা-নাশক হিসেবে ৮০% ইথিলিন এবং ২০% অক্সিজেনের মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়।
  3. মাস্টার্ড গ্যাস এবং পলিথিন প্রস্তুতিতে ইথিলিন একটি মূল উপাদান।

রাসায়নিক বিক্রিয়া (Chemical Reactions)

যুত বিক্রিয়া (Addition Reactions): ব্রোমিনকে কার্বন টেট্রাক্লোরাইড বা ক্লোরোফর্মে দ্রবীভূত করে সেই দ্রবণের মধ্য দিয়ে ইথিলিন গ্যাস চালনা করলে, ইথিলিন ডাইব্রোমাইড নামক একটি বর্ণহীন যুত যৌগ উৎপন্ন হয়। এই বিক্রিয়ায় ব্রোমিন দ্রবণের লাল বর্ণ বিলুপ্ত হয়, যা প্রমাণ করে যে ইথিলিন একটি অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন। এছাড়াও, প্ল্যাটিনাম (Pt), প্যালাডিয়াম (Pd) বা র‍্যানি নিকেল অনুঘটকের উপস্থিতিতে সাধারণ উষ্ণতায় হাইড্রোজেনের সাথে যুত বিক্রিয়ার মাধ্যমে এটি ইথেন উৎপন্ন করে।

পলিমারাইজেশন বিক্রিয়া (Polymerization Reaction): উচ্চ চাপ ও তাপমাত্রায় ইথিলিন অণুগুলি পরস্পর যুক্ত হয়ে একটি উচ্চ আণবিক ভরবিশিষ্ট পলিমার, পলিথিন, গঠন করে।

৪.৩ অ্যাসিটিলিন (Acetylene – C₂H₂)

উৎস (Source)

উচ্চ তাপমাত্রায় প্রাকৃতিক গ্যাস (প্রধানত মিথেন)-কে বিয়োজিত করে শিল্পক্ষেত্রে অ্যাসিটিলিন প্রস্তুত করা হয়।

ব্যবহার (Uses)

অ্যাসিটিলিনের বিভিন্ন প্রয়োগ রয়েছে:

  1. অক্সি-অ্যাসিটিলিন শিখা (প্রায় ৩০০০°C) সৃষ্টি করতে, যা ধাতু ঝালাই ও কাটার কাজে ব্যবহৃত হয়।
  2. কার্বাইড ল্যাম্পে আলো জ্বালাতে।
  3. কৃত্রিম রবার, কৃত্রিম তন্তু এবং প্লাস্টিক (যেমন PVC) উৎপাদনে।

রাসায়নিক বিক্রিয়া (Chemical Reactions)

হাইড্রোজেন সংযোজন (Hydrogenation): ২০০°C উষ্ণতায় নিকেল (Ni) অনুঘটকের উপস্থিতিতে অথবা সাধারণ উষ্ণতায় প্ল্যাটিনাম (Pt), প্যালাডিয়াম (Pd) বা র‍্যানি নিকেল অনুঘটকের উপস্থিতিতে অ্যাসিটিলিন দুই ধাপে হাইড্রোজেনের সাথে যুক্ত হয়। প্রথম ধাপে এটি ইথিলিন এবং দ্বিতীয় ধাপে ইথেন উৎপন্ন করে।

ব্রোমিন সংযোজন (Bromination): অ্যাসিটিলিন লাল বর্ণের ব্রোমিন জলের সাথে এবং তরল ব্রোমিনের সাথে যুত বিক্রিয়া করে।

এই প্রাথমিক হাইড্রোকার্বনগুলি থেকে প্রক্রিয়াজাত জ্বালানি মিশ্রণ, যেমন LPG এবং CNG, তৈরি হয়, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অপরিহার্য।

৫.০ প্রচলিত জৈব জ্বালানি: LPG ও CNG

তরলীকৃত এবং সংকুচিত হাইড্রোকার্বন গ্যাসগুলি আধুনিক শক্তি ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এগুলি দক্ষ, বহনযোগ্য জ্বালানি হিসেবে গার্হস্থ্য শক্তি খরচ এবং আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থায় একটি অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।

৫.১ LPG (Liquefied Petroleum Gas)

উপাদান (Composition)

LPG-এর প্রধান উপাদান হলো বিউটেন। এর সাথে কিছু পরিমাণে ইথেন এবং প্রোপেনও মিশ্রিত থাকে।

উৎস ও প্রস্তুতি (Source and Preparation)

পেট্রোলিয়ামের আংশিক পাতন প্রক্রিয়ার সময় প্রাপ্ত গ্যাসীয় অংশকে উচ্চ চাপে তরলে পরিণত করে স্টিলের সিলিন্ডারে সংরক্ষণ করা হয়। এটিই তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা LPG।

ব্যবহার (Uses)

LPG প্রধানত রান্নার কাজে এবং বিভিন্ন শিল্পে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

নিরাপত্তা (Safety)

LPG সিলিন্ডার থেকে গ্যাস নির্গত হলে তা সহজে বোঝার জন্য এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এর সাথে তীব্র গন্ধযুক্ত যৌগ ইথাইল মারক্যাপটান (C₂H₅SH) মেশানো হয়।

৫.২ CNG (Compressed Natural Gas)

উপাদান (Composition)

CNG-এর মূল উপাদান মিথেন (৯০%)। এর সাথে ইথেন, ইথিন, প্রোপেন, বিউটেন এবং সামান্য পরিমাণে কম স্ফুটনাঙ্কের পেন্টেনও মিশ্রিত থাকে।

উৎস ও প্রস্তুতি (Source and Preparation)

পেট্রোলিয়াম খনিতে তেলের উপরে বা কয়লা খনিতে যে গ্যাসীয় পদার্থ আবদ্ধ থাকে, তাকে চাপ প্রয়োগে তরলে পরিণত করে CNG প্রস্তুত করা হয়।

ব্যবহার (Uses)

CNG প্রধানত যানবাহন, যেমন বাস, ট্যাক্সি এবং অটোরিকশার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

অণুগুলিকে শক্তি উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করার পাশাপাশি, এগুলিকে যুক্ত করে নতুন ধরনের বৃহৎ অণু বা পলিমার তৈরি করা যায়, যা পরবর্তী আলোচনার বিষয়।

৬.০ পলিমার: বৃহৎ অণুর রসায়ন

পলিমারাইজেশন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে বহুসংখ্যক সরল অণু (মনোমার) রাসায়নিকভাবে যুক্ত হয়ে একটি বৃহৎ আণবিক ভরবিশিষ্ট অণু (পলিমার) গঠন করে। সাধারণ প্যাকেজিং সামগ্রী থেকে শুরু করে উন্নত ইঞ্জিনিয়ারিং উপকরণ পর্যন্ত, কৃত্রিম পলিমারগুলি আধুনিক জীবনে এক যুগান্তকারী প্রভাব ফেলেছে।

৬.১ মনোমার ও পলিমার (Monomer and Polymer)

  • পলিমার: পলিমারাইজেশন বিক্রিয়ায় বহুসংখ্যক সরল অণু পরস্পর সংযুক্ত হয়ে যে উচ্চ আণবিক ভরবিশিষ্ট এবং জটিল আণবিক গঠনবিশিষ্ট যৌগ উৎপন্ন করে, তাকে পলিমার বলে।
  • মনোমার: যে সমস্ত সরল অণুর সংযোগের ফলে পলিমার গঠিত হয়, সেই সরল অণুগুলিকে মনোমার বলা হয়।

৬.২ পলিমারের শ্রেণিবিভাগ (Classification of Polymers)

পরিবেশের সাথে প্রতিক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে পলিমারগুলিকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়:

জৈববিয়োয্য বা জৈবভঙ্গুর পলিমার (Biodegradable Polymers)

এই ধরনের পলিমার প্রকৃতিতে উপস্থিত বিভিন্ন অণুজীব (যেমন ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক) দ্বারা বিয়োজিত হয়ে সরল অণু (যেমন CO₂, H₂O) -তে রূপান্তরিত হতে পারে। উদাহরণ: সেলুলোজ, প্রোটিন, নিউক্লিক অ্যাসিড ইত্যাদি।

জৈব অবিশ্লেষ্য পলিমার (Non-biodegradable Polymers)

এই ধরনের পলিমার প্রকৃতিতে উপস্থিত অণুজীব দ্বারা সরল অণুতে বিয়োজিত হয় না, যার ফলে পরিবেশে দীর্ঘকাল অপরিবর্তিত অবস্থায় থেকে যায়। উদাহরণ: পলিথিন, PVC, টেফলন ইত্যাদি।

৬.৩ কিছু গুরুত্বপূর্ণ संश्্লেষিত পলিমার (Some Important Synthetic Polymers)

কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৃত্রিম পলিমার, তাদের মনোমার এবং ব্যবহার নিচে সারণিবদ্ধ করা হলো:

পলিমার

মনোমারের নাম ও সংকেত

পলিমারের ব্যবহার

পলিথিন বা পলিইথিলিন (PE)

ইথিন বা ইথিলিন (CH₂ = CH₂)

1. প্যাকিং দ্রব্য, ক্যারিব্যাগ তৈরিতে। <br> 2. জলের পাইপ, জলের ট্যাংক, বোতল, বালতি, মগ, কাপ, জানলার নেট প্রভৃতিতে। <br> 3. তড়িৎ পরিবাহী তারের আচ্ছাদন প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়।

পলিভিনাইল ক্লোরাইড (PVC)

ভিনাইল ক্লোরাইড (CH₂ = CHCl)

1. তারের আচ্ছাদন। <br> 2. পাইপ, ট্যাংক, ব্যাগ, রেফ্রিজারেটরের ভেতরের অংশ। <br> 3. কৃত্রিম মেঝে তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

পলিটেট্রাফ্লুরোইথিলিন (PTFE) বা টেফলন

টেট্রাফ্লুরোইথিলিন (F₂C=CF₂)

1. নন-স্টিক বাসন তৈরিতে। <br> 2. বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের অন্তরক পদার্থ হিসেবে। <br> 3. রাসায়নিক পদার্থ বহনকারী পাইপ ও ট্যাংক। <br> 4. রসায়নাগারের বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।

হাইড্রোকার্বন এবং তাদের পলিমার ছাড়াও, অন্যান্য কার্যকরী মূলক যেমন অ্যালকোহল এবং অ্যাসিডযুক্ত জৈব যৌগগুলিরও অনন্য এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ রয়েছে।

৭.০ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জৈব যৌগ

জৈব যৌগের গঠনে হাইড্রক্সিল (–OH) এবং কার্বক্সিল (–COOH) এর মতো কার্যকরী মূলক যুক্ত হলে যৌগগুলির রাসায়নিক ধর্মে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে এবং দ্রাবক থেকে শুরু করে খাদ্য সংরক্ষক পর্যন্ত নতুন ধরনের প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হয়।

৭.১ ইথাইল অ্যালকোহল (Ethyl Alcohol)

ব্যবহার (Uses)

  1. সুগন্ধি, কৃত্রিম রবার ও ওষুধ প্রস্তুতিতে দ্রাবক হিসেবে।
  2. রেকটিফায়েড স্পিরিট (৯৫.৬% ইথানল + ৪.৪% জলের মিশ্রণ) রূপে জীবাণুনাশক হিসেবে।
  3. পেট্রোলের সাথে মিশিয়ে পাওয়ার অ্যালকোহল (মোটরগাড়ির জ্বালানি) প্রস্তুতিতে।
  4. মেথিলেটেড স্পিরিট, টিংচার অফ আয়োডিন, টনিক ইত্যাদি প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়।

রাসায়নিক বিক্রিয়া (Chemical Reactions)

  • সাধারণ উষ্ণতায় ধাতব সোডিয়ামের সাথে ইথাইল অ্যালকোহলের বিক্রিয়ায় সোডিয়াম ইথক্সাইড (CH₃CH₂ONa) ও হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন হয়। 2CH₃CH₂OH + 2Na → 2CH₃CH₂ONa + H₂↑
  • নির্জল ইথানলকে গাঢ় H₂SO₄-সহ ১৭০°C উষ্ণতায় উত্তপ্ত করলে এটি নিরুদিত হয়ে ইথিন (বা ইথিলিন) উৎপন্ন করে।

৭.২ অ্যাসিটিক অ্যাসিড (Acetic Acid)

ব্যবহার (Uses)

  1. হোয়াইট লেড (রং) এবং অ্যাসিটোন প্রস্তুতিতে এটি ব্যবহৃত হয়।
  2. অ্যাসিটিক অ্যাসিডের ৫-৮% জলীয় দ্রবণ (ভিনিগার) মাছ, মাংস সংরক্ষণে এবং আচার, চাটনি প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়।

রাসায়নিক বিক্রিয়া (Chemical Reactions)

  • অ্যাসিটিক অ্যাসিড, সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড (NaOH) বা সোডিয়াম বাইকার্বনেটের সাথে বিক্রিয়া করে সোডিয়াম অ্যাসিটেট নামক লবণ ও জল উৎপন্ন করে। CH₃COOH + NaOH → CH₃COONa + H₂O
  • গাঢ় H₂SO₄-এর উপস্থিতিতে অ্যাসিটিক অ্যাসিড ও ইথাইল অ্যালকোহলের মিশ্রণকে জলগাহে উত্তপ্ত করলে ইথাইল অ্যাসিটেট নামক এস্টার ও জল উৎপন্ন হয়। এই বিক্রিয়াকে এস্টারিফিকেশন বলে।

৭.৩ মেথিলেটেড স্পিরিট বা ডিনেচার্ড স্পিরিট (Methylated Spirit or Denatured Spirit)

সংজ্ঞা (Definition)

ইথাইল অ্যালকোহলের মধ্যে বিষাক্ত মিথাইল অ্যালকোহল (প্রায় ১০%) এবং সামান্য পিরিডিন, ন্যাপথা, কপার সালফেট ইত্যাদি মিশিয়ে যে পানের অযোগ্য মিশ্রণ তৈরি করা হয়, তাকে মেথিলেটেড স্পিরিট বা ডিনেচার্ড স্পিরিট বলে।

ব্যবহার (Uses)

এটি পেইন্ট বা বার্নিশের দ্রাবক রূপে এবং স্টোভ ও স্পিরিট ল্যাম্পের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

৮.০ উপসংহার

এই আলোচনায় আমরা জৈব রসায়নের মূল ভিত্তিগুলি পর্যালোচনা করেছি। সাধারণ হাইড্রোকার্বন মিথেন থেকে শুরু করে শিল্পক্ষেত্রে অপরিহার্য পলিমার যেমন PVC ও টেফলন এবং ইথানল ও অ্যাসিটিক অ্যাসিডের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যকরী মূলকযুক্ত যৌগ পর্যন্ত— প্রতিটি যৌগের গঠন, ধর্ম এবং প্রয়োগের এক বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। জৈব যৌগগুলি যে কেবল একটি অ্যাকাডেমিক বিষয় নয়, বরং শিল্প, প্রযুক্তি এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, তা এই বিশদ বিশ্লেষণ থেকে সুস্পষ্ট হয়। জৈব রসায়নের গভীর উপলব্ধি আধুনিক বিশ্বের চালিকাশক্তিকে বুঝতে সহায়তা করে।

YouTube player

মাধ্যমিক জৈব রসায়ন: পরীক্ষার সেরা প্রস্তুতির জন্য যে ৫টি বিষয় জানতেই হবে

সূচনা

মাধ্যমিকের ছাত্রছাত্রীদের কাছে রসায়নের সবচেয়ে কঠিন অংশগুলোর মধ্যে একটি হলো জৈব রসায়ন। অনেকেই এই অধ্যায়টি নিয়ে বেশ চিন্তায় থাকো। কিন্তু আসল সত্যিটা হলো, যদি কয়েকটা মূল বিষয় বা ধারণা পরিষ্কার করে নেওয়া যায়, তাহলে জৈব রসায়ন শুধু সহজই নয়, বরং ভীষণ যুক্তিসঙ্গত ও আকর্ষণীয় একটি বিষয় হয়ে ওঠে। এই পোস্টে আমরা মাধ্যমিক সিলেবাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি বিষয় ভেঙে আলোচনা করব, যা তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতিকে সহজ করে তুলবে এবং জৈব রসায়নের একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি করবে।

——————————————————————————–

১. একই ফর্মুলা, কিন্তু চরিত্র আলাদা: জৈব রসায়নের বিস্ময় – সমাবয়বতা (Isomerism)

জৈব রসায়নের বৈচিত্র্যের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো সমাবয়বতা। এর সংজ্ঞাটি বেশ সহজ: “একই আণবিক সংকেতবিশিষ্ট কিন্তু ভিন্ন ধর্মসম্পন্ন একাধিক যৌগ গঠনের ঘটনাকে সমাবয়বতা বা আইসোমেরিজম বলে।” অর্থাৎ, যৌগের আণবিক সংকেত এক হলেও তাদের গঠন এবং ধর্মের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। মাধ্যমিকের জন্য দুটি প্রধান প্রকারভেদ বোঝা খুব জরুরি:

  • অবস্থানঘটিত সমাবয়বতা: যখন একই কার্বন শৃঙ্খলে একই কার্যকরী মূলকের অবস্থানের পার্থক্যের জন্য ভিন্ন ভিন্ন যৌগ তৈরি হয়, তখন তাকে অবস্থানঘটিত সমাবয়বতা বলে। যেমন, প্রোপান-1-অল (CH3CH2CH2OH) বা n-প্রোপাইল অ্যালকোহল এবং প্রোপান-2-অল (CH3CH(OH)CH3) বা আইসো-প্রোপাইল অ্যালকোহল—দুটি যৌগেরই আণবিক সংকেত এক, কিন্তু কার্যকরী মূলক (-OH) এর অবস্থান ভিন্ন হওয়ায় এরা দুটি আলাদা যৌগ।
  • কার্যকরী মূলকঘটিত সমাবয়বতা: যখন একই আণবিক সংকেত থাকা সত্ত্বেও দুটি যৌগে সম্পূর্ণ ভিন্ন কার্যকরী মূলক উপস্থিত থাকে, তখন তাকে কার্যকরী মূলকঘটিত সমাবয়বতা বলে। একটি চমৎকার উদাহরণ হলো ডাইমিথাইল ইথার (CH3–O—CH3) এবং ইথাইল অ্যালকোহল (CH3CH2OH)। দুজনেরই আণবিক সংকেত C2H6O, কিন্তু একজন হলো ইথার এবং অন্যজন অ্যালকোহল, যার ফলে তাদের রাসায়নিক ধর্ম সম্পূর্ণ আলাদা।

এই ধারণাটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কেন প্রকৃতিতে এত বিপুল সংখ্যক জৈব যৌগ পাওয়া যায়।

——————————————————————————–

২. জৈব যৌগের পরিচয়পত্র: কার্যকরী মূলক (Functional Group)

একটি জৈব যৌগের চরিত্র কেমন হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে তার মধ্যে উপস্থিত বিশেষ কোনো পরমাণু বা মূলকের ওপর। একেই বলা হয় কার্যকরী মূলক বা Functional Group। সহজ কথায়, এটি হলো একটি যৌগের “পরিচয়পত্র”। এর সংজ্ঞাটি হলো: “যেসব পরমাণু বা মূলক জৈব যৌগের অণুতে উপস্থিত থেকে তাদের প্রকৃতি, ধর্ম ও বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে তাদের কার্যকরী মূলক বা ক্রিয়াশীল মূলক বলে।”

নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যকরী মূলকের তালিকা দেওয়া হলো:

যৌগের শ্রেণি

কার্যকরী মূলকের সংকেত

অ্যালকোহল

–OH

অ্যালডিহাইড

–CHO

কিটোন

>C=O

কার্বক্সিলিক অ্যাসিড

–COOH

অ্যামিন

–NH2

ইথার

–O–

কার্যকরী মূলক চিনতে পারাটা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এর সাহায্যেই আমরা কোনো যৌগের নামকরণ করতে পারি এবং তার সম্ভাব্য রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলো সম্পর্কে ধারণা করতে পারি।

——————————————————————————–

৩. সম্পৃক্ত বনাম অসম্পৃক্ত: বন্ধনের পার্থক্যে রাসায়নিক সক্রিয়তার বিশাল ফারাক

কার্বন-কার্বন বন্ধনের প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে হাইড্রোকার্বনকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়: সম্পৃক্ত এবং অসম্পৃক্ত।

  • সম্পৃক্ত যৌগ (অ্যালকেন): এই যৌগগুলিতে কার্বন পরমাণুগুলো শুধুমাত্র এক-বন্ধন (single bond) দ্বারা একে অপরের সাথে যুক্ত থাকে। এই বন্ধনগুলো খুব স্থিতিশীল হওয়ায় অ্যালকেনগুলি রাসায়নিকভাবে তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয় হয়।
  • অসম্পৃক্ত যৌগ (অ্যালকিন ও অ্যালকাইন): এই যৌগগুলিতে অন্তত দুটি কার্বন পরমাণুর মধ্যে দ্বি-বন্ধন (double bond) বা ত্রি-বন্ধন (triple bond) থাকে। এই অতিরিক্ত বন্ধনগুলি (পাই-বন্ধন) সিগমা-বন্ধনের তুলনায় দুর্বল হওয়ায় অসম্পৃক্ত যৌগগুলি রাসায়নিকভাবে অনেক বেশি সক্রিয় হয় এবং সহজেই যুত বিক্রিয়ায় (addition reaction) অংশ নেয়।

এই সক্রিয়তার একটি ক্লাসিক উদাহরণ হলো ইথিলিনের (C2H4) সাথে ব্রোমিনের বিক্রিয়া। কার্বন টেট্রাক্লোরাইডে দ্রবীভূত ব্রোমিনের লাল দ্রবণের মধ্যে দিয়ে ইথিলিন গ্যাস চালনা করলে, ইথিলিন ব্রোমিনের সাথে যুত বিক্রিয়া করে বর্ণহীন ইথিলিন ডাইব্রোমাইড তৈরি করে এবং দ্রবণের লাল বর্ণ চলে যায়। এই বিক্রিয়াটি প্রমাণ করে যে ইথিলিন একটি অসম্পৃক্ত যৌগ।

——————————————————————————–

৪. আমাদের দৈনন্দিন জীবনের পলিমার: ছোট অণুর বিশাল জগৎ

আমরা প্রতিদিন যে সমস্ত জিনিস ব্যবহার করি, তার অধিকাংশই হলো পলিমার। পলিমারাইজেশন প্রক্রিয়ায় অসংখ্য ছোট ও সরল অণু (মনোমার) পরস্পর যুক্ত হয়ে যে বিশাল ও জটিল অণু তৈরি করে, তাকেই পলিমার বলে। আর যে সরল অণুগুলো থেকে পলিমার তৈরি হয়, তাদের বলা হয় মনোমার।

আমাদের জীবনে ব্যবহৃত কয়েকটি পরিচিত পলিমার হলো:

  • পলিথিন (PE): এর মনোমার হলো ইথিন (CH2 = CH2)। এটি মূলত ক্যারিব্যাগ, জলের পাইপ, বোতল, বালতি ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
  • পিভিসি (PVC): এর মনোমার হলো ভিনাইল ক্লোরাইড (CH2 = CHCl)। এটি বৈদ্যুতিক তারের আচ্ছাদন, পাইপ, ব্যাগ ইত্যাদি তৈরিতে কাজে লাগে।
  • টেফলন (PTFE): এর মনোমার হলো টেট্রাফ্লুরোইথিলিন (F2C=CF2)। এটি নন-স্টিক বাসনপত্র এবং বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির অন্তরক পদার্থ হিসেবে বহুল ব্যবহৃত।

পরিবেশের ওপর প্রভাবের ভিত্তিতে পলিমার দুই প্রকার: জৈববিশ্লেষ্য (Biodegradable) যা অণুজীব দ্বারা বিয়োজিত হয় (যেমন- সেলুলোজ) এবং জৈব অবিশ্লেষ্য (Non-biodegradable) যা সহজে বিয়োজিত হয় না (যেমন- পলিথিন, পিভিসি)।

——————————————————————————–

৫. রান্নাঘরের LPG থেকে গাড়ির CNG: জ্বালানির পেছনের রসায়ন

জৈব রসায়ন শুধুমাত্র বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই, আমাদের রান্নাঘর থেকে শুরু করে যানবাহন—সব জায়গাতেই এর প্রয়োগ রয়েছে। দুটি প্রধান জ্বালানি হলো LPG এবং CNG।

  • LPG (Liquefied Petroleum Gas): এর প্রধান উপাদান হলো বিউটেন। এছাড়া এতে কিছু পরিমাণ ইথেন ও প্রোপেনও থাকে। উচ্চ চাপে একে তরলে পরিণত করে সিলিন্ডারে ভরা হয় এবং মূলত রান্নার কাজে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সুরক্ষার জন্য, এর সাথে তীব্র গন্ধযুক্ত পদার্থ ইথাইল মারক্যাপটান (C2H5SH) মেশানো থাকে, যাতে গ্যাস লিক করলে সহজেই গন্ধ পাওয়া যায়।
  • CNG (Compressed Natural Gas): এর মূল উপাদান হলো মিথেন (প্রায় 90%), তবে এর সাথে ইথেন, ইথিন, প্রোপেন, বিউটেন ও সামান্য পরিমাণে কম স্ফুটনাঙ্কের পেন্টেনও মিশে থাকে। একেও উচ্চ চাপে সংকুচিত করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়, বিশেষ করে বাস, ট্যাক্সি এবং অন্যান্য গণপরিবহণ ব্যবস্থায়।

এই উদাহরণগুলি দেখায় যে কীভাবে দুটি ভিন্ন হাইড্রোকার্বন আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অপরিহার্য জ্বালানির উৎস হিসেবে কাজ করে, যা শ্রেণিকক্ষের পড়াকে বাস্তব জগতের সাথে যুক্ত করে।

——————————————————————————–

উপসংহার

আশা করি, এই আলোচনার পর জৈব রসায়ন সম্পর্কে তোমাদের ভয় কিছুটা হলেও কেটেছে। সমাবয়বতার মতো আণবিক গঠনের ধারণা থেকে শুরু করে পলিমার বা জ্বালানির মতো বাস্তব জীবনের প্রয়োগ—জৈব রসায়ন আসলে মুখস্থ করার বিষয় নয়, বরং কিছু নিয়ম ও প্যাটার্ন বোঝার বিষয়। একটু মনোযোগ দিয়ে পড়লে এই অধ্যায়টি তোমার জন্য সবচেয়ে পছন্দের হয়ে উঠতে পারে।

এই আলোচনার পর, তুমি কি তোমার চারপাশের আর কোনো জিনিসের মধ্যে জৈব রসায়নের সূত্র খুঁজে পাচ্ছো?

YouTube player

মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য জৈব রসায়ন: একটি সম্পূর্ণ পর্যালোচনা

১.০ ভূমিকা: জৈব রসায়নের জগৎ

জৈব রসায়ন হলো রসায়নের সেই শাখা যেখানে কার্বন দ্বারা গঠিত যৌগগুলির গঠন, ধর্ম, এবং বিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করা হয়। মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যক্রমে জৈব রসায়ন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, কারণ এটি আমাদের চারপাশের জগতের অণুজীব থেকে শুরু করে খাদ্য, বস্ত্র, এবং ঔষধের মতো অপরিহার্য উপাদানগুলির রাসায়নিক ভিত্তি বুঝতে সাহায্য করে। কার্বনের অনন্য ধর্ম, বিশেষ করে ক্যাটিনেশন (পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে দীর্ঘ শৃঙ্খল বা বলয় গঠন করার ক্ষমতা), লক্ষ লক্ষ বৈচিত্র্যময় জৈব যৌগ তৈরির সুযোগ করে দিয়েছে, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

সহজ ভাষায়, জৈব যৌগ হলো কার্বনের সেইসব যৌগ যেখানে ক্যাটিনেশন এবং সমাবয়বতার মতো বৈশিষ্ট্যগুলি দেখা যায়। তবে কার্বনের কিছু নির্দিষ্ট যৌগ, যেমন—কার্বনের বিভিন্ন অক্সাইড, কার্বনেট ও বাইকার্বনেট, হাইড্রোজেন সায়ানাইড, ধাতব সায়ানাইড, সায়ানেট, থায়োসায়ানেট এবং কার্বন ডাইসালফাইডকে সাধারণত জৈব যৌগ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।

এই পর্যালোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের জন্য জৈব রসায়নের প্রধান ধারণাগুলিকে একটি সুসংহত এবং সহজবোধ্য উপায়ে উপস্থাপন করা, যাতে তারা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বিশেষভাবে উপকৃত হয়। আমরা প্রথমে হাইড্রোকার্বনের মৌলিক ধারণা দিয়ে আলোচনা শুরু করব, যা জৈব যৌগের ভিত্তি তৈরি করে।

২.০ হাইড্রোকার্বন: জৈব যৌগের ভিত্তি

হাইড্রোকার্বন হলো জৈব রসায়নের মূল ভিত্তি। শুধুমাত্র কার্বন (C) এবং হাইড্রোজেন (H) পরমাণুর সমন্বয়ে গঠিত এই দ্বি-মৌল যৌগগুলি অন্যান্য সমস্ত জটিল জৈব যৌগের কাঠামো তৈরি করে। হাইড্রোকার্বনের গঠন এবং বন্ধনের প্রকৃতির উপর ভিত্তি করে এদেরকে প্রধানত দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়: সম্পৃক্ত এবং অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন।

উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে, সম্পৃক্ত এবং অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বনের মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি নিচে একটি সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

বৈশিষ্ট্য

সম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন (অ্যালকেন)

অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন (অ্যালকিন ও অ্যালকাইন)

সংজ্ঞা

যেসব জৈব যৌগের অণুর গঠনে পাশাপাশি থাকা সবগুলি কার্বন পরমাণুই নিজেদের মধ্যে এক-বন্ধনে যুক্ত থাকে।

যেসব জৈব যৌগের অণুতে অন্তত দুটি কার্বন পরমাণু দ্বি-বন্ধন বা ত্রি-বন্ধন দ্বারা যুক্ত থাকে।

কার্বন-বন্ধন

কেবল এক-বন্ধন (C-C) থাকে।

অন্তত একটি দ্বি-বন্ধন (C=C) বা ত্রি-বন্ধন (C≡C) থাকে।

রাসায়নিক সক্রিয়তা

তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয়।

রাসায়নিকভাবে খুব সক্রিয়।

উদাহরণ

মিথেন (CH₄), ইথেন (C₂H₆)।

ইথিলিন (C₂H₄), অ্যাসিটিলিন (C₂H₂)।

অ্যালকেন হলো সম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন, যেখানে কার্বন পরমাণুগুলি কেবল এক-বন্ধন দ্বারা যুক্ত থাকে। অন্যদিকে, অ্যালকিন (দ্বি-বন্ধনযুক্ত) এবং অ্যালকাইন (ত্রি-বন্ধনযুক্ত) হলো অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন। এই দ্বি-বন্ধন বা ত্রি-বন্ধনের উপস্থিতির কারণে অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বনগুলি সম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বনের তুলনায় অনেক বেশি রাসায়নিকভাবে সক্রিয় হয়। এই সক্রিয়তার কারণেই জৈব রসায়নে এদের গুরুত্ব অপরিসীম।

হাইড্রোকার্বনের কাঠামোতে বিভিন্ন পরমাণু বা মূলক যুক্ত হয়ে নতুন নতুন যৌগ তৈরি করে, যাদের ধর্ম নির্ধারণ করে কার্যকরী মূলক।

৩.০ কার্যকরী মূলক এবং সমগণীয় শ্রেণি: যৌগের পরিচয় ও শ্রেণিবিভাগ

একটি জৈব যৌগের রাসায়নিক ধর্ম এবং পরিচয় অনেকাংশে নির্ভর করে তার মধ্যে উপস্থিত একটি নির্দিষ্ট পরমাণু বা মূলকের উপর, যাকে কার্যকরী মূলক বলা হয়। অন্যদিকে, সমগণীয় শ্রেণি এই যৌগগুলিকে তাদের গঠন এবং ধর্মের মিলের ভিত্তিতে একটি সুশৃঙ্খলভাবে সাজাতে সাহায্য করে, যা জৈব রসায়নের অধ্যয়নকে অনেক সহজ করে তোলে।

কার্যকরী মূলক (Functional Group) হলো সেইসব পরমাণু বা মূলক যা জৈব যৌগের অণুতে উপস্থিত থেকে তাদের প্রকৃতি, ধর্ম ও বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে। মাধ্যমিক স্তরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কার্যকরী মূলক নিচে উল্লেখ করা হলো:

যৌগের শ্রেণি

কার্যকরী মূলকের নাম

সংকেত

অ্যালকোহল

হাইড্রক্সিল

–OH

অ্যালডিহাইড

অ্যালডিহাইড

–CHO

কিটোন

কিটো

>C=O

কার্বক্সিলিক অ্যাসিড

কার্বক্সিল

–COOH

অ্যামিন

অ্যামিনো

–NH₂

ইথার

ইথার

–O–

সমগণীয় শ্রেণি (Homologous Series) হলো একই কার্যকরী মূলকযুক্ত এবং সমধর্মী জৈব যৌগগুলির একটি শ্রেণি, যাদেরকে ক্রমবর্ধমান আণবিক ভর অনুযায়ী সাজানো হয়। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:

  • শ্রেণীর সকল সদস্যকে একটি সাধারণ সংকেত দ্বারা প্রকাশ করা যায়।
  • সকল সদস্যের মধ্যে একই কার্যকরী মূলক উপস্থিত থাকে।
  • পরপর দুটি সদস্যের আণবিক সংকেতের মধ্যে একটি CH₂ গ্রুপের পার্থক্য থাকে।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমগণীয় শ্রেণির সাধারণ সংকেত ও উদাহরণ:

  • অ্যালকেন: CnH2n+2 (উদাহরণ: মিথেন-CH₄, ইথেন-C₂H₆)
  • অ্যালকিন: CnH2n ( উদাহরণ: ইথিলিন-C₂H₄, প্রোপিলিন-C₃H₆)
  • অ্যালকাইন: CnH2n–2 (উদাহরণ: অ্যাসিটিলিন-C₂H₂, প্রোপাইন-C₃H₄)

একই কার্যকরী মূলক থাকা সত্ত্বেও পরমাণুর সজ্জার ভিন্নতার কারণে জৈব যৌগের ধর্মে পার্থক্য দেখা যেতে পারে, যা আমাদের সমাবয়বতার ধারণার দিকে নিয়ে যায়।

৪.০ সমাবয়বতা (Isomerism): একই আণবিক সংকেত, ভিন্ন গঠন

জৈব রসায়নের একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় বিষয় হলো সমাবয়বতা। এই ঘটনার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়, কীভাবে একই আণবিক সংকেত (অর্থাৎ, একই সংখ্যক পরমাণু) থাকা সত্ত্বেও একাধিক ভিন্ন গঠন ও ধর্মবিশিষ্ট যৌগ তৈরি হতে পারে। এই ঘটনা জৈব যৌগের বৈচিত্র্যের অন্যতম প্রধান কারণ।

সমাবয়বতা বা আইসোমেরিজম হলো একই আণবিক সংকেতবিশিষ্ট কিন্তু ভিন্ন ধর্মসম্পন্ন একাধিক যৌগ গঠনের ঘটনা। এই ভিন্ন ধর্মী যৌগগুলিকে পরস্পরের আইসোমার বা সমাবয়ব বলা হয়।

মাধ্যমিক স্তরের জন্য দুটি প্রধান প্রকারের সমাবয়বতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ:

  1. অবস্থানঘটিত সমাবয়বতা (Positional Isomerism): যখন একই কার্বন শৃঙ্খলে একই কার্যকরী মূলকের অবস্থানের ভিন্নতার জন্য সমাবয়বতার সৃষ্টি হয়, তখন তাকে অবস্থানঘটিত সমাবয়বতা বলে।
    • উদাহরণ: প্রোপান-১-অল (CH₃CH₂CH₂OH) এবং প্রোপান-২-অল (CH₃CH(OH)CH₃)। উভয়েরই আণবিক সংকেত C₃H₈O, কিন্তু প্রথমটিতে -OH মূলকটি প্রান্তীয় কার্বনে এবং দ্বিতীয়টিতে মাঝের কার্বনে যুক্ত থাকায় এদের ধর্ম ভিন্ন হয়। কার্যকরী মূলকের অবস্থানের এই পরিবর্তনের কারণে ভৌত ধর্ম (যেমন স্ফুটনাঙ্ক) এবং রাসায়নিক সক্রিয়তায় পার্থক্য দেখা যায়।
  2. কার্যকরী মূলকঘটিত সমাবয়বতা (Functional Group Isomerism): যখন একই আণবিক সংকেতবিশিষ্ট যৌগগুলিতে ভিন্ন ভিন্ন কার্যকরী মূলক উপস্থিত থাকার ফলে সমাবয়বতার উদ্ভব হয়, তখন তাকে কার্যকরী মূলকঘটিত সমাবয়বতা বলে।
    • উদাহরণ: ডাইমিথাইল ইথার (CH₃–O–CH₃) এবং ইথাইল অ্যালকোহল (CH₃CH₂OH)। উভয়ের আণবিক সংকেত C₂H₆O, কিন্তু একটিতে ইথার (–O–) এবং অন্যটিতে অ্যালকোহল (–OH) কার্যকরী মূলক থাকায় এদের রাসায়নিক ধর্ম সম্পূর্ণ আলাদা।

যেহেতু একই আণবিক সংকেত থেকে একাধিক যৌগ তৈরি হতে পারে, তাই এদের প্রত্যেকের জন্য একটি স্বতন্ত্র ও সুস্পষ্ট নাম থাকা অপরিহার্য। এই সমস্যার সমাধান করে IUPAC নামকরণ পদ্ধতি।

৫.০ IUPAC নামকরণ: জৈব যৌগের আন্তর্জাতিক ভাষা

লক্ষ লক্ষ জৈব যৌগের ভিড়ে প্রত্যেকটিকে আলাদাভাবে চেনার জন্য এবং তাদের গঠন সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়ার জন্য একটি আন্তর্জাতিক ও সুসংহত নামকরণ পদ্ধতির প্রয়োজন। International Union of Pure and Applied Chemistry (IUPAC) প্রবর্তিত এই পদ্ধতিটি বিশ্বজুড়ে রসায়নবিদদের জন্য একটি সাধারণ ভাষা হিসেবে কাজ করে।

বিভিন্ন সমগণীয় শ্রেণির যৌগের IUPAC নামকরণের নিয়মাবলী নিচে একটি সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

সমগণীয় শ্রেণি

যৌগ

শব্দমূল (Word Root)

প্রত্যয় (Suffix)

IUPAC নাম

অ্যালকেন

CH₄

meth (মিথ)

ane (এন)

Methane (মিথেন)

C₂H₆

eth (ইথ)

ane (এন)

Ethane (ইথেন)

C₃H₈

prop (প্রোপ)

ane (এন)

Propane (প্রোপেন)

অ্যালকিন

C₂H₄

eth (ইথ)

ene (এন)

Ethene (ইথিন)

C₃H₆

prop (প্রোপ)

ene (এন)

Propene (প্রোপিন)

অ্যালকাইন

C₂H₂

eth (ইথ)

yne (আইন)

Ethyne (ইথাইন)

C₃H₄

prop (প্রোপ)

yne (আইন)

Propyne (প্রোপাইন)

অ্যালকোহল

CH₃OH

meth (মিথ)

ol (অল)

Methanol (মিথানল)

CH₃CH₂OH

eth (ইথ)

ol (অল)

Ethanol (ইথানল)

CH₃CH₂CH₂OH

prop (প্রোপ)

ol (অল)

Propanol (প্রোপানল)

অ্যালডিহাইড

HCHO

meth (মিথ)

al (অ্যাল)

Methanal (মিথান্যাল)

CH₃CHO

eth (ইথ)

al (অ্যাল)

Ethanal (ইথান্যাল)

কার্বক্সিলিক অ্যাসিড

HCOOH

meth (মিথ)

oic acid (ওয়িক অ্যাসিড)

Methanoic acid (মিথানোয়িক অ্যাসিড)

CH₃COOH

eth (ইথ)

oic acid (ওয়িক অ্যাসিড)

Ethanoic acid (ইথানোয়িক অ্যাসিড)

এই নিয়মাবলী ব্যবহার করে যেকোনো জৈব যৌগের গঠন থেকে তার নাম অথবা নাম থেকে তার গঠন নির্ধারণ করা সম্ভব হয়। এবার আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ হাইড্রোকার্বনের উৎস, ব্যবহার ও বিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করব।

৬.০ কিছু গুরুত্বপূর্ণ হাইড্রোকার্বন: উৎস, ব্যবহার ও বিক্রিয়া

মাধ্যমিক স্তরের জৈব রসায়ন পাঠ্যক্রমে মিথেন, ইথিলিন এবং অ্যাসিটিলিন এই তিনটি হাইড্রোকার্বনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এদের শিল্প উৎস, দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার এবং রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলি জানা পরীক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

৬.১ মিথেন (CH₄)

মিথেন হলো অ্যালকেন শ্রেণির সরলতম সদস্য এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান উপাদান।

  • শিল্প উৎস:
    • পেট্রোলিয়াম খনি থেকে নির্গত প্রাকৃতিক গ্যাসে প্রচুর পরিমাণে (৪০-৯০%) মিথেন থাকে।
    • কোলগ্যাসে আয়তন হিসেবে প্রায় ৪০% মিথেন থাকে।
  • প্রধান ব্যবহার:
    • জ্বালানিরূপে ব্যবহৃত হয়।
    • কার্বন ব্ল্যাক, হাইড্রোজেন, মিথানল ও ফর্মালডিহাইডের শিল্পোৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
  • গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক বিক্রিয়া:
    1. দহন: বায়ু বা অক্সিজেনের উপস্থিতিতে মিথেন একটি অদীপ্ত ফিকে নীলাভ শিখায় জ্বলে কার্বন ডাইঅক্সাইড ও জল উৎপন্ন করে। এটি একটি তাপ উৎপাদক বিক্রিয়া। CH₄ + 2O₂ → CO₂ + 2H₂O + তাপ (213 kcal/mol)
    2. প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া: বিক্ষিপ্ত সূর্যালোকের উপস্থিতিতে মিথেনের হাইড্রোজেন পরমাণুগুলি ক্লোরিন পরমাণু দ্বারা ধাপে ধাপে প্রতিস্থাপিত হয়।
      • CH₄ + Cl₂ → CH₃Cl (মিথাইল ক্লোরাইড) + HCl
      • CH₃Cl + Cl₂ → CH₂Cl₂ (মিথিলিন ক্লোরাইড) + HCl
      • CH₂Cl₂ + Cl₂ → CHCl₃ (ক্লোরোফর্ম) + HCl
      • CHCl₃ + Cl₂ → CCl₄ (কার্বন টেট্রাক্লোরাইড) + HCl

৬.২ ইথিলিন (C₂H₄)

ইথিলিন (IUPAC নাম: ইথিন) হলো অ্যালকিন শ্রেণির প্রথম সদস্য এবং শিল্পক্ষেত্রে এর ব্যাপক প্রয়োগ রয়েছে।

  • শিল্প উৎস:
    • পেট্রোলিয়াম খনি থেকে নির্গত প্রাকৃতিক গ্যাসে ২০% পর্যন্ত ইথিলিন পাওয়া যায়।
    • কোক ওভেন গ্যাসেও প্রচুর পরিমাণে ইথিলিন থাকে।
  • প্রধান ব্যবহার:
    • কাঁচা ফল পাকানোর জন্য ও পাকা ফলের সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়।
    • শল্য চিকিৎসায় চেতনানাশক রূপে (৮০% ইথিলিন ও ২০% O₂ এর মিশ্রণ) ব্যবহৃত হয়।
    • পলিথিন এবং মাস্টার্ড গ্যাস প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়।
  • গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক বিক্রিয়া (যুত বিক্রিয়া):
    • ব্রোমিন সংযোজন: ব্রোমিনকে কার্বন টেট্রাক্লোরাইডে দ্রবীভূত করে সেই দ্রবণের মধ্যে দিয়ে ইথিলিন গ্যাস চালনা করলে বর্ণহীন ইথিলিন ডাইব্রোমাইড উৎপন্ন হয়। ব্রোমিনের লাল বর্ণ অপসারিত হওয়ায় এই বিক্রিয়া দ্বারা প্রমাণ করা যায় যে ইথিলিন একটি অসম্পৃক্ত যৌগ।
    • হাইড্রোজেন সংযোজন: নিকেল (Ni) অনুঘটকের উপস্থিতিতে ইথিলিন ও হাইড্রোজেন গ্যাসের যুত বিক্রিয়ায় ইথেন উৎপন্ন হয়। C₂H₄ + H₂ --(Ni অনুঘটক)--> C₂H₆

৬.৩ অ্যাসিটিলিন (C₂H₂)

অ্যাসিটিলিন (IUPAC নাম: ইথাইন) হলো অ্যালকাইন শ্রেণির সরলতম সদস্য এবং এর ত্রি-বন্ধনের কারণে এটি অত্যন্ত সক্রিয়।

  • শিল্প উৎস:
    • উচ্চ উষ্ণতায় প্রাকৃতিক গ্যাস (প্রধানত মিথেন)-কে বিয়োজিত করে অ্যাসিটিলিন প্রস্তুত করা হয়।
  • প্রধান ব্যবহার:
    • অক্সি-অ্যাসিটিলিন শিখা (প্রায় ৩০০০°C) তৈরিতে, যা ধাতু ঝালাই এবং কাটার কাজে লাগে।
    • কার্বাইড আলো জ্বালাতে ব্যবহৃত হয়।
    • কৃত্রিম রবার, কৃত্রিম তন্তু এবং প্লাস্টিক (যেমন PVC) উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
  • গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক বিক্রিয়া (যুত বিক্রিয়া):
    • হাইড্রোজেন সংযোজন: নিকেল (Ni) অনুঘটকের উপস্থিতিতে অ্যাসিটিলিন অণুর সাথে প্রথমে ১ অণু হাইড্রোজেন যুক্ত হয়ে ইথিলিন এবং পরে আরও ১ অণু হাইড্রোজেন যুক্ত হয়ে ইথেন উৎপন্ন হয়।
      • C₂H₂ + H₂ --(Ni অনুঘটক)--> C₂H₄ (ইথিলিন)
      • C₂H₄ + H₂ --(Ni অনুঘটক)--> C₂H₆ (ইথেন)

ইথিলিনের মতো ক্ষুদ্র মোনোমার অণুগুলি জুড়ে গিয়ে যেভাবে পলিথিনের মতো বৃহৎ পলিমার তৈরি করে, সেই প্রক্রিয়াটি জৈব রসায়নের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শাখা।

৭.০ পলিমার: ক্ষুদ্র অণু থেকে বৃহৎ জগৎ

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত প্লাস্টিক, রবার, এবং বিভিন্ন সিন্থেটিক তন্তুর মূলে রয়েছে পলিমারাইজেশন নামক একটি রাসায়নিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় অসংখ্য ক্ষুদ্র অণু (মোনোমার) পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে একটি দীর্ঘ শৃঙ্খলযুক্ত বৃহৎ অণু (পলিমার) গঠন করে।

  • মোনোমার: যে সব সরল অণুর সংযোগে পলিমার গঠিত হয়, সেই সরল অণুগুলিকে মোনোমার বলে।
  • পলিমার: পলিমারাইজেশন বিক্রিয়ায় বহুসংখ্যক সরল অণু (মোনোমার) পরস্পরের সাথে সংযোজিত হয়ে যে উচ্চ আণবিক ভরবিশিষ্ট এবং জটিল আণবিক গঠনবিশিষ্ট যৌগ উৎপন্ন করে, তাকে পলিমার বলে।

নিচে কয়েকটি বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পলিমার, তাদের মোনোমার এবং প্রধান ব্যবহার একটি সারণির মাধ্যমে দেখানো হলো:

পলিমারের নাম

মোনোমারের নাম ও সংকেত

প্রধান ব্যবহার

পলিথিন (PE)

ইথিন (CH₂ = CH₂)

<ul><li>প্যাকিং দ্রব্যরূপে, ক্যারিব্যাগ তৈরিতে</li><li>জলের পাইপ, বোতল, বালতি, তারের আবরণ প্রভৃতিতে</li></ul>

পলিভিনাইল ক্লোরাইড (PVC)

ভিনাইল ক্লোরাইড (CH₂ = CHCl)

<ul><li>তারের আবরণ, পাইপ, ব্যাগ</li><li>রেফ্রিজারেটরের ভেতরের অংশ, কৃত্রিম মেঝে তৈরিতে</li></ul>

পলিটেট্রাফ্লুরোইথিলিন (PTFE) বা টেফলন

টেট্রাফ্লুরোইথিলিন (F₂C = CF₂)

<ul><li>নন-স্টিক বাসন তৈরিতে</li><li>বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের অন্তরক পদার্থ হিসেবে</li><li>রাসায়নিক পদার্থ বহনকারী পাইপ ও ট্যাংকে</li></ul>

পরিবেশের উপর প্রভাবের ভিত্তিতে পলিমারকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়:

  1. জৈব বিশ্লেষ্য (Biodegradable) পলিমার: এই ধরনের পলিমার প্রকৃতিতে উপস্থিত বিভিন্ন অণুজীব (যেমন ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক) দ্বারা বিয়োজিত হয়ে সরল অণুতে (যেমন CO₂, H₂O) রূপান্তরিত হয়। উদাহরণ: সেলুলোজ, প্রোটিন।
  2. জৈব অবিশ্লেষ্য (Non-biodegradable) পলিমার: এই ধরনের পলিমার অণুজীব দ্বারা বিয়োজিত হয় না এবং পরিবেশে দীর্ঘকাল অপরিবর্তিত অবস্থায় থেকে দূষণ ঘটায়। উদাহরণ: পলিথিন, PVC, টেফলন।

হাইড্রোকার্বন ছাড়াও আরও কিছু জৈব যৌগ আমাদের জীবনে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।

৮.০ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জৈব যৌগ

হাইড্রোকার্বন ছাড়াও অ্যালকোহল এবং কার্বক্সিলিক অ্যাসিডের মতো কার্যকরী মূলকযুক্ত যৌগগুলি শিল্পক্ষেত্রে এবং আমাদের গার্হস্থ্য জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইথাইল অ্যালকোহল এবং অ্যাসিটিক অ্যাসিড এদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

৮.১ ইথাইল অ্যালকোহল (ইথানল)

ইথানল একটি বহুল ব্যবহৃত জৈব দ্রাবক এবং শিল্পে এর নানা প্রয়োগ রয়েছে।

  • প্রধান ব্যবহার:
    • সুগন্ধি, কৃত্রিম রবার ও ওষুধ প্রস্তুতিতে দ্রাবক হিসেবে।
    • জীবাণুনাশক হিসেবে (রেকটিফায়েড স্পিরিট রূপে)।
    • পেট্রোলের সাথে মিশিয়ে ‘পাওয়ার অ্যালকোহল’ নামক মোটর গাড়ির জ্বালানি প্রস্তুতিতে।
    • টনিক, টিংচার আয়োডিন ইত্যাদি প্রস্তুতিতে।
  • রাসায়নিক বিক্রিয়া:
    1. সোডিয়াম ধাতুর সাথে বিক্রিয়া: সাধারণ উষ্ণতায় ইথানল সোডিয়ামের সাথে বিক্রিয়া করে সোডিয়াম ইথক্সাইড লবণ এবং হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন করে। 2CH₃CH₂OH + 2Na → 2CH₃CH₂ONa + H₂↑
    2. নিরুদন: গাঢ় সালফিউরিক অ্যাসিড (H₂SO₄)-এর উপস্থিতিতে ১৭০°C উষ্ণতায় উত্তপ্ত করলে ইথানল নিরুদিত হয়ে ইথিন গ্যাস উৎপন্ন করে। CH₃CH₂OH --(গাঢ় H₂SO₄, ১৭০°C)--> CH₂=CH₂ + H₂O

৮.২ অ্যাসিটিক অ্যাসিড (ইথানোয়িক অ্যাসিড)

অ্যাসিটিক অ্যাসিড একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্বক্সিলিক অ্যাসিড, যা ভিনিগারের প্রধান উপাদান।

  • প্রধান ব্যবহার:
    • হোয়াইট লেড (রং) এবং অ্যাসিটোন প্রস্তুতিতে।
    • এর ৫-৮% জলীয় দ্রবণ (ভিনিগার) মাছ, মাংস সংরক্ষণে এবং আচার, চাটনি প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়।
  • রাসায়নিক বিক্রিয়া:
    1. সোডিয়াম হাইড্রক্সাইডের সাথে বিক্রিয়া: এটি একটি অ্যাসিড হওয়ায় ক্ষার NaOH-এর সাথে বিক্রিয়া করে সোডিয়াম অ্যাসিটেট নামক লবণ ও জল উৎপন্ন করে। CH₃COOH + NaOH → CH₃COONa + H₂O
    2. এস্টারিফিকেশন: গাঢ় H₂SO₄-এর উপস্থিতিতে ইথাইল অ্যালকোহলের সাথে বিক্রিয়া করে মিষ্টি গন্ধযুক্ত ইথাইল অ্যাসিটেট নামক এস্টার এবং জল তৈরি করে। CH₃COOH + CH₃CH₂OH --(গাঢ় H₂SO₄)⇌ CH₃COOCH₂CH₃ + H₂O

এই যৌগগুলি ছাড়াও আমাদের দৈনন্দিন জীবনে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় কিছু বিশেষ জৈব যৌগের মিশ্রণ।

৯.০ প্রচলিত জ্বালানি: LPG এবং CNG

আধুনিক জীবনে LPG (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) এবং CNG (সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসীয় জ্বালানি। এগুলি প্রচলিত জ্বালানির তুলনায় কম দূষণ ঘটায় এবং এদের দহন ক্ষমতাও বেশি।

নিচে LPG এবং CNG-এর একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:

বৈশিষ্ট্য

LPG (Liquefied Petroleum Gas)

CNG (Compressed Natural Gas)

প্রধান উপাদান

বিউটেন (সঙ্গে কিছু ইথেন ও প্রোপেন)।

মিথেন (প্রায় ৯০%)।

শিল্প উৎস

পেট্রোলিয়ামের আংশিক পাতন প্রক্রিয়ার সময় প্রাপ্ত গ্যাসকে উচ্চ চাপে তরল করে প্রস্তুত করা হয়।

পেট্রোলিয়াম বা কয়লা খনি থেকে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক গ্যাসকে উচ্চ চাপে সংকুচিত (compressed) করে সিলিন্ডারে ভর্তি করা হয়।

প্রধান ব্যবহার

মূলত রান্নার কাজে এবং বিভিন্ন শিল্পে জ্বালানিরূপে ব্যবহৃত হয়।

যানবাহন (বাস, ট্যাক্সি, অটো) চালনায় জ্বালানিরূপে ব্যবহৃত হয়।

বিশেষ তথ্য

এটি গন্ধহীন হওয়ায় সিলিন্ডার থেকে গ্যাস লিক করলে বোঝার জন্য দুর্গন্ধযুক্ত ইথাইল মারক্যাপটান (C₂H₅SH) মেশানো থাকে।

এটি তুলনামূলকভাবে একটি পরিষ্কার জ্বালানি।

LPG সিলিন্ডারে ইথাইল মারক্যাপটান যোগ করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। যেহেতু LPG নিজে গন্ধহীন, তাই গ্যাস লিক করলে তা সহজে বোঝা যায় না, যা মারাত্মক দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। মারক্যাপটানের তীব্র দুর্গন্ধ সামান্য লিকেজকেও শনাক্ত করতে সাহায্য করে, ফলে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।

১০.০ উপসংহার: পরীক্ষার জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি

এই পর্যালোচনায় আমরা মাধ্যমিক স্তরের জৈব রসায়নের মূল ধারণাগুলি নিয়ে আলোচনা করেছি। কার্বনের অনন্য ধর্ম থেকে শুরু করে হাইড্রোকার্বনের শ্রেণিবিভাগ, কার্যকরী মূলক, সমগণীয় শ্রেণি, সমাবয়বতা এবং IUPAC নামকরণের মতো মৌলিক বিষয়গুলি পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, মিথেন, ইথিলিন, অ্যাসিটিলিন, ইথানল, অ্যাসিটিক অ্যাসিডের মতো যৌগগুলির বিক্রিয়া ও ব্যবহার এবং পলিমার ও প্রচলিত জ্বালানি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পরীক্ষার্থীদের ভালো ফল করতে সাহায্য করবে।

আশা করা যায়, এই আলোচনাটি জৈব রসায়নের জটিল বিষয়গুলিকে সহজভাবে বুঝতে এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে সহায়ক হবে। মূল বিষয়বস্তুগুলিকে ভালোভাবে মনে রাখলে এবং নিয়মিত অনুশীলন করলে জৈব রসায়ন একটি সহজ এবং আকর্ষণীয় অধ্যায়ে পরিণত হবে।

YouTube player

দশম শ্রেণীর জৈব রসায়ন: একটি বিশদ বিশ্লেষণ

কার্যনির্বাহী সারাংশ

এই নথিটি পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের দশম শ্রেণীর ভৌত বিজ্ঞানের অন্তর্গত জৈব রসায়ন অধ্যায়ের একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ প্রদান করে। এখানে জৈব যৌগের মৌলিক ধারণা, যেমন সম্পৃক্ত ও অসম্পৃক্ত যৌগ, হাইড্রোকার্বন, কার্যকরী মূলক এবং সমাবয়বতার সংজ্ঞা ও উদাহরণসহ আলোচনা করা হয়েছে। সমগণীয় শ্রেণী ও IUPAC নামকরণের নিয়মাবলী বিস্তারিতভাবে সারণি আকারে উপস্থাপন করা হয়েছে। মিথেন, ইথিলিন এবং অ্যাসিটিলিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ হাইড্রোকার্বনের শিল্প উৎস, ব্যবহার এবং রাসায়নিক বিক্রিয়া (যেমন – দহন, প্রতিস্থাপন এবং যুত বিক্রিয়া) গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে। এছাড়াও, LPG ও CNG-এর মতো জ্বালানির উপাদান ও ব্যবহার এবং পলিমার, মনোমার, ও পলিথিন, PVC, টেফলনের মতো বহুল ব্যবহৃত পলিমারের পরিচিতি ও প্রয়োগ তুলে ধরা হয়েছে। সবশেষে, ইথাইল অ্যালকোহল ও অ্যাসিটিক অ্যাসিডের ধর্ম, ব্যবহার এবং মিথিলেটেড স্পিরিটের মতো যৌগের বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং বিষয়বস্তু অনুধাবনে সহায়ক হবে।

——————————————————————————–

জৈব যৌগের মৌলিক ধারণা

জৈব রসায়নের ভিত্তি হলো কার্বনের যৌগ। কার্বনের ক্যাটিনেশন ধর্ম, সমাবয়বতা এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের কারণে গঠিত বিশাল সংখ্যক যৌগকে জৈব যৌগ বলা হয়। তবে কার্বনের কিছু নির্দিষ্ট যৌগ যেমন – অক্সাইড, কার্বনেট, বাইকার্বনেট, সায়ানাইড, সায়ানেট ইত্যাদিকে জৈব যৌগ হিসেবে গণ্য করা হয় না।

  • সম্পৃক্ত যৌগ (Saturated Compounds): যে সকল জৈব যৌগের অণুর গঠনে পাশাপাশি অবস্থিত কার্বন পরমাণুগুলি শুধুমাত্র এক-বন্ধন (single bond) দ্বারা যুক্ত থাকে, তাদের সম্পৃক্ত যৌগ বলে।
    • উদাহরণ: মিথেন (CH₄), ইথেন (C₂H₆), প্রোপেন (C₃H₈)।
  • অসম্পৃক্ত যৌগ (Unsaturated Compounds): যে সকল জৈব যৌগের অণুতে অন্তত দুটি কার্বন পরমাণু দ্বি-বন্ধন (double bond) বা ত্রি-বন্ধন (triple bond) দ্বারা যুক্ত থাকে, তাদের অসম্পৃক্ত যৌগ বলে।
    • উদাহরণ: ইথিলিন (C₂H₄), অ্যাসিটিলিন (C₂H₂)।
  • হাইড্রোকার্বন (Hydrocarbons): শুধুমাত্র কার্বন (C) এবং হাইড্রোজেন (H) পরমাণুর সমন্বয়ে গঠিত দ্বি-মৌল যৌগগুলিকে হাইড্রোকার্বন বলা হয়।
    • অ্যালকেন (Alkane): সম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বনগুলিকে অ্যালকেন বলা হয়। এগুলি রাসায়নিকভাবে কম সক্রিয়।
    • অ্যালকিন (Alkene): দ্বি-বন্ধনযুক্ত অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বনগুলিকে অ্যালকিন বলা হয়।
    • অ্যালকাইন (Alkyne): ত্রি-বন্ধনযুক্ত অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বনগুলিকে অ্যালকাইন বলা হয়।
    • অ্যালকিন ও অ্যালকাইন রাসায়নিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় হয়।

কার্যকরী মূলক, সমাবয়বতা ও সমগণীয় শ্রেণী

কার্যকরী মূলক (Functional Group)

যেসব পরমাণু বা মূলক কোনো জৈব যৌগের অণুতে উপস্থিত থেকে যৌগটির প্রকৃতি, ধর্ম এবং বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে, তাদের কার্যকরী মূলক বা ক্রিয়াশীল মূলক বলা হয়।

যৌগের শ্রেণী

কার্যকরী মূলকের নাম

সংকেত

অ্যালকোহল

হাইড্রক্সিল

–OH

অ্যালডিহাইড

অ্যালডিহাইড

–CHO

কিটোন

কিটো

>C=O

কার্বক্সিলিক অ্যাসিড

কার্বক্সিল

–COOH

অ্যামিন

অ্যামিনো

–NH₂

ইথার

ইথার

–O–

সমাবয়বতা (Isomerism)

একই আণবিক সংকেত কিন্তু ভিন্ন ধর্মবিশিষ্ট একাধিক যৌগ গঠনের ঘটনাকে সমাবয়বতা বা আইসোমেরিজম বলে। এই ভিন্ন ধর্মী যৌগগুলিকে পরস্পরের আইসোমার বা সমাবয়ব বলা হয়।

  • অবস্থানঘটিত সমাবয়বতা: একই কার্বন শৃঙ্খলযুক্ত সমাবয়বী যৌগগুলিতে একই কার্যকরী মূলকের অবস্থানের ভিন্নতার জন্য এই ধরনের সমাবয়বতার সৃষ্টি হয়।
    • উদাহরণ: প্রোপান-১-অল (CH₃CH₂CH₂OH) এবং প্রোপান-২-অল (CH₃CH(OH)CH₃)।
  • কার্যকরী মূলকঘটিত সমাবয়বতা: একই আণবিক সংকেতবিশিষ্ট যৌগগুলিতে ভিন্ন ভিন্ন কার্যকরী মূলক উপস্থিত থাকার ফলে যে সমাবয়বতার উদ্ভব হয়।
    • উদাহরণ: ডাইমিথাইল ইথার (CH₃–O–CH₃) এবং ইথাইল অ্যালকোহল (CH₃CH₂OH)।

সমগণীয় শ্রেণী (Homologous Series)

একই মৌল দ্বারা গঠিত, একই সাধারণ সংকেত দ্বারা প্রকাশযোগ্য এবং একই কার্যকরী মূলকযুক্ত সমধর্মী জৈব যৌগগুলিকে তাদের ক্রমবর্ধমান আণবিক ভর অনুযায়ী সাজালে একটি শ্রেণী পাওয়া যায়, যার পরপর দুটি সদস্যের আণবিক সংকেতের পার্থক্য CH₂ হয়। এই শ্রেণীকে সমগণীয় শ্রেণী বলে।

  • অ্যালকেন শ্রেণী: সাধারণ সংকেত CnH2n+2। উদাহরণ: মিথেন (CH₄), ইথেন (C₂H₆)।
  • অ্যালকিন শ্রেণী: সাধারণ সংকেত CnH2n। উদাহরণ: ইথিলিন (C₂H₄), প্রোপিলিন (C₃H₆)।
  • অ্যালকাইন শ্রেণী: সাধারণ সংকেত CnH2n-2। উদাহরণ: অ্যাসিটিলিন (C₂H₂), প্রোপাইন (C₃H₄)।

IUPAC নামকরণ

বিভিন্ন সমগণীয় শ্রেণীর যৌগের IUPAC (International Union of Pure and Applied Chemistry) নামকরণ পদ্ধতি নিচে সারণিতে দেখানো হলো:

সমগণীয় শ্রেণী

যৌগ

শব্দমূল

শ্রেণী প্রত্যয়

IUPAC নাম

অ্যালকেন

CH₄

meth (মিথ)

ane (এন)

Methane (মিথেন)

C₂H₆

eth (ইথ)

ane (এন)

Ethane (ইথেন)

C₃H₈

prop (প্রোপ)

ane (এন)

Propane (প্রোপেন)

অ্যালকিন

C₂H₄

eth (ইথ)

ene (ইন)

Ethene (ইথিন)

C₃H₆

prop (প্রোপ)

ene (ইন)

Propene (প্রোপিন)

অ্যালকাইন

C₂H₂

eth (ইথ)

yne (আইন)

Ethyne (ইথাইন)

C₃H₄

prop (প্রোপ)

yne (আইন)

Propyne (প্রোপাইন)

অ্যালকোহল

CH₃OH

meth (মিথ)

ol (অল)

Methanol (মিথানল)

CH₃CH₂OH

eth (ইথ)

ol (অল)

Ethanol (ইথানল)

অ্যালডিহাইড

HCHO

meth (মিথ)

al (অ্যাল)

Methanal (মিথান্যাল)

CH₃CHO

eth (ইথ)

al (অ্যাল)

Ethanal (ইথান্যাল)

কিটোন

CH₃COCH₃

prop (প্রোপ)

one (ওন)

Propanone (প্রোপানোন)

কার্বক্সিলিক অ্যাসিড

HCOOH

meth (মিথ)

oic acid (ওয়িক অ্যাসিড)

Methanoic acid (মিথানোয়িক অ্যাসিড)

CH₃COOH

eth (ইথ)

oic acid (ওয়িক অ্যাসিড)

Ethanoic acid (ইথানোয়িক অ্যাসিড)

গুরুত্বপূর্ণ হাইড্রোকার্বন

মিথেন (CH₄)

  • শিল্প উৎস: পেট্রোলিয়াম খনি থেকে নির্গত প্রাকৃতিক গ্যাসে প্রচুর পরিমাণে (৪০-৯০%) মিথেন থাকে। কোলগ্যাসেও আয়তন হিসেবে ৪০% মিথেন পাওয়া যায়।
  • ব্যবহার:
    1. জ্বালানিরূপে ব্যবহৃত হয়।
    2. হাইড্রোজেন, মিথানল ও ফর্মালডিহাইডের শিল্পোৎপাদনে প্রয়োজন হয়।
    3. কার্বন ব্ল্যাক প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়।
  • রাসায়নিক বিক্রিয়া:
    • দহন: বায়ু বা অক্সিজেনের উপস্থিতিতে মিথেন অদীপ্ত ফিকে নীলাভ শিখায় জ্বলে কার্বন ডাইঅক্সাইড, জল ও তাপ (213 kcal/mol) উৎপন্ন করে। CH₄ + 2O₂ → CO₂ + 2H₂O + তাপ
    • প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া: বিক্ষিপ্ত সূর্যালোকের উপস্থিতিতে মিথেনের হাইড্রোজেন পরমাণুগুলি ক্লোরিন পরমাণু দ্বারা ধাপে ধাপে প্রতিস্থাপিত হয় এবং যথাক্রমে মিথাইল ক্লোরাইড (CH₃Cl), মিথিলিন ক্লোরাইড (CH₂Cl₂), ক্লোরোফর্ম (CHCl₃) এবং কার্বন টেট্রাক্লোরাইড (CCl₄) উৎপন্ন করে।

ইথিলিন (C₂H₄)

  • শিল্প উৎস: প্রাকৃতিক গ্যাসে ২০% পর্যন্ত এবং কোক ওভেন গ্যাসে প্রচুর পরিমাণে ইথিলিন পাওয়া যায়।
  • ব্যবহার:
    1. কাঁচা ফল পাকাতে ও পাকা ফলের সংরক্ষণে।
    2. শল্য চিকিৎসায় চেতনা-নাশকরূপে (৮০% ইথিলিন ও ২০% O₂ মিশ্রণ)।
    3. মাস্টার্ড গ্যাস ও পলিথিন প্রস্তুতিতে।
  • রাসায়নিক বিক্রিয়া:
    • যুত বিক্রিয়া: ব্রোমিনকে কার্বন টেট্রাক্লোরাইডে দ্রবীভূত করে তার মধ্যে দিয়ে ইথিলিন গ্যাস চালনা করলে বর্ণহীন ইথিলিন ডাইব্রোমাইড (১, ২-ডাইব্রোমোইথেন) উৎপন্ন হয়। এই বিক্রিয়া প্রমাণ করে যে ইথিলিন একটি অসম্পৃক্ত যৌগ। নিকেল (Ni), প্ল্যাটিনাম (Pt) বা প্যালাডিয়াম (Pd) অনুঘটকের উপস্থিতিতে হাইড্রোজেনের সাথে যুত বিক্রিয়ায় ইথেন (C₂H₆) উৎপন্ন করে।
    • পলিমেরাইজেশন বিক্রিয়া: এই বিক্রিয়ার মাধ্যমে পলিথিন প্রস্তুত করা হয়।

অ্যাসিটিলিন (C₂H₂)

  • শিল্প উৎস: উচ্চ উষ্ণতায় প্রাকৃতিক গ্যাস (প্রধানত মিথেন) বিয়োজিত করে অ্যাসিটিলিন প্রস্তুত করা হয়।
  • ব্যবহার:
    1. ধাতু ঝালাই ও কাটার কাজে অক্সি-অ্যাসিটিলিন শিখা (৩০০০°C) তৈরিতে।
    2. কার্বাইড আলো জ্বালাতে।
    3. কৃত্রিম রবার, কৃত্রিম তন্তু ও প্লাস্টিক (PVC) উৎপাদনে।
  • রাসায়নিক বিক্রিয়া:
    • যুত বিক্রিয়া: Ni অনুঘটকের উপস্থিতিতে ২০০°C উষ্ণতায় বা সাধারণ উষ্ণতায় Pt/Pd অনুঘটকের উপস্থিতিতে অ্যাসিটিলিন প্রথমে ১ অণু হাইড্রোজেন (H₂) গ্রহণ করে ইথিলিন এবং পরে আরও ১ অণু H₂ গ্রহণ করে ইথেন উৎপন্ন করে। এটি লাল বর্ণের ব্রোমিন-জলের সঙ্গেও যুত বিক্রিয়া করে।

জ্বালানি গ্যাস: LPG ও CNG

বৈশিষ্ট্য

LPG (Liquefied Petroleum Gas)

CNG (Compressed Natural Gas)

প্রধান উপাদান

বিউটেন (এছাড়াও ইথেন ও প্রোপেন থাকে)

মিথেন (৯০%) (এছাড়াও ইথেন, ইথিন, প্রোপেন ইত্যাদি থাকে)

শিল্প উৎস

পেট্রোলিয়ামের আংশিক পাতনের সময় প্রাপ্ত গ্যাসীয় অংশকে উচ্চ চাপে তরলে পরিণত করা হয়।

পেট্রোলিয়াম বা কয়লা খনিতে প্রাপ্ত গ্যাসকে চাপ প্রয়োগে তরল করা হয়।

ব্যবহার

রান্না ও শিল্পের জ্বালানিরূপে।

বাস, ট্যাক্সি, অটোরিকশার মতো গণপরিবহণে জ্বালানিরূপে।

বিশেষ তথ্য

সিলিন্ডার থেকে গ্যাস লিক করলে বোঝার জন্য দুর্গন্ধযুক্ত ইথাইল মারক্যাপটান (C₂H₅SH) মেশানো থাকে।

এটি একটি পরিবেশবান্ধব জ্বালানি।

পলিমার এবং তাদের ব্যবহার

  • পলিমার ও মনোমার: পলিমেরাইজেশন বিক্রিয়ায় বহুসংখ্যক সরল অণু (মনোমার) পরস্পর যুক্ত হয়ে যে উচ্চ আণবিক ভরবিশিষ্ট জটিল যৌগ (পলিমার) গঠন করে।
  • জৈববিশ্লেষ্য পলিমার (Biodegradable): যে সব পলিমার অণুজীব (ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক) দ্বারা বিয়োজিত হয়ে সরল অণুতে (যেমন CO₂, H₂O) রূপান্তরিত হয়। উদাহরণ: সেলুলোজ, প্রোটিন।
  • জৈব অবিশ্লেষ্য পলিমার (Non-biodegradable): যে সব পলিমার অণুজীব দ্বারা বিয়োজিত হয় না এবং পরিবেশে দূষণ ঘটায়। উদাহরণ: পলিথিন, PVC, টেফলন।

কিছু কৃত্রিম পলিমারের ব্যবহার

পলিমার

মনোমারের নাম ও সংকেত

ব্যবহার

পলিথিন (PE)

ইথিন (CH₂=CH₂)

প্যাকিং সামগ্রী, ক্যারিব্যাগ, জলের পাইপ, বালতি, বোতল, তারের অন্তরক আবরণ।

পলিভিনাইল ক্লোরাইড (PVC)

ভিনাইল ক্লোরাইড (CH₂=CHCl)

তারের অন্তরক আবরণ, পাইপ, ব্যাগ, কৃত্রিম মেঝে, রেফ্রিজারেটরের ভিতরের অংশ।

টেফলন (PTFE)

টেট্রাফ্লুরোইথিলিন (F₂C=CF₂)

নন-স্টিক বাসন, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের অন্তরক, রাসায়নিক পদার্থ বহনকারী পাইপ।

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জৈব যৌগ

ইথাইল অ্যালকোহল (ইথানল, C₂H₅OH)

  • ব্যবহার:
    • সুগন্ধি, কৃত্রিম রবার ও ওষুধ প্রস্তুতিতে দ্রাবকরূপে।
    • রেকটিফায়েড স্পিরিট (৯৫.৬% ইথানল) জীবাণুনাশক হিসেবে।
    • পেট্রোলের সঙ্গে মিশিয়ে পাওয়ার অ্যালকোহল (মোটরগাড়ির জ্বালানি) প্রস্তুতিতে।
    • মিথিলেটেড স্পিরিট, টিংচার আয়োডিন ও টনিক প্রস্তুতিতে।
  • রাসায়নিক বিক্রিয়া:
    • ধাতব সোডিয়ামের (Na) সাথে বিক্রিয়ায় সোডিয়াম ইথক্সাইড (CH₃CH₂ONa) ও হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন করে।
    • গাড় H₂SO₄-এর উপস্থিতিতে ১৭০°C উষ্ণতায় নিরুদিত হয়ে ইথিন (C₂H₄) গ্যাস উৎপন্ন করে।

অ্যাসিটিক অ্যাসিড (ইথানোয়িক অ্যাসিড, CH₃COOH)

  • ব্যবহার:
    • হোয়াইট লেড (রং) ও অ্যাসিটোন প্রস্তুতিতে।
    • এর ৫-৮% জলীয় দ্রবণ (ভিনিগার) মাছ, মাংস, আচার, চাটনি সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়।
  • রাসায়নিক বিক্রিয়া:
    • সোডিয়াম হাইড্রক্সাইডের (NaOH) সাথে বিক্রিয়ায় সোডিয়াম অ্যাসিটেট (CH₃COONa) লবণ ও জল উৎপন্ন করে।
    • গাড় H₂SO₄-এর উপস্থিতিতে ইথাইল অ্যালকোহলের সাথে বিক্রিয়ায় সুগন্ধযুক্ত এস্টার (ইথাইল অ্যাসিটেট) ও জল উৎপন্ন করে। এই বিক্রিয়াকে এস্টারিফিকেশন বলে।

মিথিলেটেড স্পিরিট বা ডিনেচার্ড স্পিরিট

ইথাইল অ্যালকোহলকে পানের অযোগ্য করার জন্য এর সাথে বিষাক্ত মিথাইল অ্যালকোহল (প্রায় ১০%) এবং সামান্য পিরিডিন, ন্যাপথা ইত্যাদি মেশানো হয়। এই মিশ্রণকে মিথিলেটেড স্পিরিট বলে।

  • ব্যবহার:
    • পেন্ট বা বার্নিশের দ্রাবকরূপে।
    • স্টোভ ও স্পিরিট ল্যাম্পের জ্বালানি হিসেবে।
YouTube player

দশম শ্রেণীর জৈব রসায়ন: সম্পূর্ণ স্টাডি গাইড

জৈব রসায়নের মৌলিক ধারণা

জৈব যৌগ (Organic Compound)

কার্বনের বিভিন্ন অক্সাইড, কার্বনেট ও বাইকার্বনেট, হাইড্রোজেন সায়ানাইড, ধাতব সায়ানাইড, সায়ানেট, থায়োসায়ানেট, কার্বন ডাইসালফাইড ইত্যাদি যৌগগুলি ছাড়া কার্বনের যে বিশাল সংখ্যক যৌগের মধ্যে কার্বনের ক্যাটিনেশন ধর্ম, সমাবয়বতা প্রভৃতি বৈশিষ্ট্যগুলি দেখা যায় তাদের জৈব যৌগ বলে।

হাইড্রোকার্বন (Hydrocarbon)

শুধুমাত্র কার্বন ও হাইড্রোজেন পরমাণুর সমন্বয়ে গঠিত দ্বি-মৌল যৌগগুলিকে হাইড্রোকার্বন বলে। হাইড্রোকার্বনগুলিকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:

  • সম্পৃক্ত যৌগ (Saturated Compound): যেসব জৈব যৌগের অণুর গঠনে পাশাপাশি থাকা সবগুলি কার্বন (C) পরমাণুই নিজেদের মধ্যে এক-বন্ধনে যুক্ত থাকে, তাদের সম্পৃক্ত যৌগ বলে। সম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বনকে অ্যালকেন বলে। এগুলি রাসায়নিকভাবে কম সক্রিয়।
    • উদাহরণ: মিথেন (CH₄), ইথেন (C₂H₆), প্রোপেন (C₃H₈) ইত্যাদি।
  • অসম্পৃক্ত যৌগ (Unsaturated Compound): যেসব জৈব যৌগের অণুতে অন্তত দুটি কার্বন (C) পরমাণু দ্বি-বন্ধন বা ত্রি-বন্ধন দ্বারা যুক্ত থাকে, তাদের অসম্পৃক্ত যৌগ বলে। এগুলি রাসায়নিকভাবে খুব সক্রিয়।
    • দ্বি-বন্ধনযুক্ত অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বনকে অ্যালকিন বলে। উদাহরণ: ইথিলিন (C₂H₄)।
    • ত্রি-বন্ধনযুক্ত অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বনকে অ্যালকাইন বলে। উদাহরণ: অ্যাসিটিলিন (C₂H₂)।

কার্যকরী মূলক বা ক্রিয়াশীল মূলক (Functional Group)

যেসব পরমাণু বা মূলক জৈব যৌগের অণুতে উপস্থিত থেকে তাদের প্রকৃতি, ধর্ম ও বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে তাদের কার্যকরী মূলক বা ক্রিয়াশীল মূলক বলে।

যৌগের শ্রেণি

কার্যকরী মূলকের নাম

সংকেত

অ্যালকোহল

হাইড্রক্সিল

–OH

অ্যালডিহাইড

অ্যালডিহাইড

–CHO

কিটোন

কিটো

>C=O

কার্বক্সিলিক অ্যাসিড

কার্বক্সিল

–COOH

অ্যামিন

অ্যামিনো

–NH₂

ইথার

ইথার

–O–

সমাবয়বতা (Isomerism)

একই আণবিক সংকেতবিশিষ্ট কিন্তু ভিন্ন ধর্মসম্পন্ন একাধিক যৌগ গঠনের ঘটনাকে সমাবয়বতা বা আইসোমেরিজম বলে। এই ভিন্ন ধর্মী যৌগগুলিকে আইসোমার বা সমাবয়ব বলে।

  • অবস্থানঘটিত সমাবয়বতা: একই কার্বন শৃঙ্খলবিশিষ্ট সমাবয়বী যৌগসমূহে একই কার্যকরী মূলকের অবস্থানের বিভিন্নতার জন্য যে ধরনের সমাবয়বতার সৃষ্টি হয়, তাকে অবস্থানঘটিত সমাবয়বতা বলে।
    • উদাহরণ: প্রোপান-১-অল (CH₃CH₂CH₂OH) এবং প্রোপান-২-অল (CH₃CH(OH)CH₃)।
  • কার্যকরী মূলকঘটিত সমাবয়বতা: একই আণবিক সংকেতবিশিষ্ট যৌগে ভিন্ন ভিন্ন কার্যকরী মূলক উপস্থিত থাকার ফলে যে সমাবয়বতার উদ্ভব হয়, তাকে কার্যকরী মূলকঘটিত সমাবয়বতা বলে।
    • উদাহরণ: ডাইমিথাইল ইথার (CH₃–O–CH₃) এবং ইথাইল অ্যালকোহল (CH₃CH₂OH)।

সমগণীয় শ্রেণি (Homologous Series)

একই মৌলসমূহ দ্বারা গঠিত, একই সাধারণ সংকেত দ্বারা প্রকাশযোগ্য এবং একই কার্যকরী মূলকযুক্ত সমধর্মী জৈব যৌগসমূহকে ক্রমবর্ধমান আণবিক ভর অনুযায়ী সাজালে একটি শ্রেণি পাওয়া যায়, যার পরপর দুটি সদস্যের আণবিক সংকেতের পার্থক্য হয় CH₂। এরূপ শ্রেণিকে সমগণীয় শ্রেণি বলে।

  • অ্যালকেন শ্রেণি: সাধারণ সংকেত CₙH₂ₙ₊₂। উদাহরণ: মিথেন (CH₄), ইথেন (C₂H₆)।
  • অ্যালকিন শ্রেণি: সাধারণ সংকেত CₙH₂ₙ। উদাহরণ: ইথিলিন (C₂H₄), প্রোপিলিন (C₃H₆)।
  • অ্যালকাইন শ্রেণি: সাধারণ সংকেত CₙH₂ₙ₋₂। উদাহরণ: অ্যাসিটিলিন (C₂H₂), প্রোপাইন (C₃H₄)।

IUPAC নামকরণ

বিভিন্ন সমগণীয় শ্রেণির যৌগসমূহের IUPAC নাম নিচে দেওয়া হলো:

সমগণীয় শ্রেণি

যৌগ

শব্দমূল

শ্রেণি প্রত্যয়

IUPAC নাম

অ্যালকেন

CH₄

meth (মিথ)

ane (এন)

Methane (মিথেন)

C₂H₆

eth (ইথ)

ane (এন)

Ethane (ইথেন)

C₃H₈

prop (প্রোপ্)

ane (এন)

Propane (প্রোপেন)

অ্যালকিন

C₂H₄

eth (ইথ)

ene (ইন)

Ethene (ইথিন)

C₃H₆

prop (প্রোপ্)

ene (ইন)

Propene (প্রোপিন)

অ্যালকাইন

C₂H₂

eth (ইথ)

yne (আইন)

Ethyne (ইথাইন)

C₃H₄

prop (প্রোপ্)

yne (আইন)

Propyne (প্রোপাইন)

অ্যালকোহল

CH₃OH

meth (মিথ)

ol (অল)

Methanol (মিথানল)

CH₃CH₂OH

eth (ইথ)

ol (অল)

Ethanol (ইথানল)

CH₃CH₂CH₂OH

prop (প্রোপ্)

ol (অল)

Propanol (প্রোপানল)

অ্যালডিহাইড

HCHO

meth (মিথ)

al (অ্যাল)

Methanal (মিথান্যাল)

CH₃CHO

eth (ইথ)

al (অ্যাল)

Ethanal (ইথান্যাল)

কিটোন

CH₃COCH₃

prop (প্রোপ্)

one (ওন)

Propanone (প্রোপানোন)

কার্বক্সিলিক অ্যাসিড

HCOOH

meth (মিথ)

oic acid (ওয়িক অ্যাসিড)

Methanoic acid (মিথানোয়িক অ্যাসিড)

CH₃COOH

eth (ইথ)

oic acid (ওয়িক অ্যাসিড)

Ethanoic acid (ইথানোয়িক অ্যাসিড)

CH₃CH₂COOH

prop (প্রোপ্)

oic acid (ওয়িক অ্যাসিড)

Propanoic acid (প্রোপানোয়িক অ্যাসিড)

গুরুত্বপূর্ণ জৈব যৌগ

মিথেন (CH₄)

  • শিল্প উৎস: পেট্রোলিয়াম খনি থেকে নির্গত প্রাকৃতিক গ্যাসে প্রচুর পরিমাণে (৪০-৯০%) মিথেন থাকে। কোলগ্যাসে আয়তন হিসেবে ৪০% মিথেন থাকে।
  • ব্যবহার: (i) জ্বালানিরূপে, (ii) হাইড্রোজেন, মিথানল ও ফর্মালডিহাইডের শিল্পোৎপাদনে, (iii) কার্বন ব্ল্যাক প্রস্তুতিতে।
  • রাসায়নিক বিক্রিয়া:
    • দহন: বায়ু বা অক্সিজেনের উপস্থিতিতে মিথেন অদীপ্ত ফিকে নীলাভ শিখায় জ্বলে কার্বন ডাইঅক্সাইড ও জল উৎপন্ন করে। CH₄ + 2O₂ → CO₂ + 2H₂O + তাপ
    • প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া: বিক্ষিপ্ত সূর্যালোকের উপস্থিতিতে মিথেনের হাইড্রোজেন পরমাণুগুলি ক্লোরিন পরমাণু দ্বারা ধাপে ধাপে প্রতিস্থাপিত হয় এবং মিথাইল ক্লোরাইড (CH₃Cl), মিথিলিন ক্লোরাইড (CH₂Cl₂), ক্লোরোফর্ম (CHCl₃) ও কার্বন টেট্রাক্লোরাইড (CCl₄) উৎপন্ন করে।

ইথিলিন (C₂H₄)

  • শিল্প উৎস: পেট্রোলিয়াম খনি থেকে নির্গত প্রাকৃতিক গ্যাসে ২০% পর্যন্ত ইথিলিন পাওয়া যায়। কোক ওভেন গ্যাসেও প্রচুর ইথিলিন থাকে।
  • ব্যবহার: (i) কাঁচা ফল পাকাতে ও পাকা ফলের সংরক্ষণে, (ii) শল্য চিকিৎসায় চেতনানাশকরূপে (৮০% ইথিলিন ও ২০% O₂ এর মিশ্রণ), (iii) মাস্টার্ড গ্যাস ও পলিথিন প্রস্তুতিতে।
  • রাসায়নিক বিক্রিয়া:
    • যুত বিক্রিয়া: ব্রোমিনকে কার্বন টেট্রাক্লোরাইডে দ্রবীভূত করে তার মধ্যে ইথিলিন গ্যাস চালনা করলে বর্ণহীন ইথিলিন ডাইব্রোমাইড উৎপন্ন হয়। এই বিক্রিয়া প্রমাণ করে যে ইথিলিন একটি অসম্পৃক্ত যৌগ। Pt, Pd বা নিকেল অনুঘটকের উপস্থিতিতে এটি হাইড্রোজেনের সাথে যুক্ত হয়ে ইথেন (C₂H₆) উৎপন্ন করে।
    • পলিমেরাইজেশন বিক্রিয়া: এই বিক্রিয়ার মাধ্যমে পলিথিন প্রস্তুত করা হয়।

অ্যাসিটিলিন (C₂H₂)

  • শিল্প উৎস: উচ্চ উষ্ণতায় প্রাকৃতিক গ্যাস (প্রধানত মিথেন)-কে বিয়োজিত করে অ্যাসিটিলিন প্রস্তুত করা হয়।
  • ব্যবহার: (i) অক্সি-অ্যাসিটিলিন শিখা (৩০০০°C) সৃষ্টিতে, (ii) কার্বাইড আলো জ্বালাতে, (iii) কৃত্রিম রবার, কৃত্রিম তন্তু ও প্লাস্টিক (PVC) উৎপাদনে।
  • রাসায়নিক বিক্রিয়া (যুত বিক্রিয়া): নিকেল অনুঘটকের উপস্থিতিতে ২০০°C উষ্ণতায় অ্যাসিটিলিন প্রথমে ১ অণু হাইড্রোজেনের সাথে যুক্ত হয়ে ইথিলিন এবং পরে আরও ১ অণু হাইড্রোজেনের সাথে যুক্ত হয়ে ইথেন উৎপন্ন করে। এটি লাল বর্ণের ব্রোমিন-জলের সঙ্গেও বিক্রিয়া করে।

ইথাইল অ্যালকোহল বা ইথানল (CH₃CH₂OH)

  • ব্যবহার: (i) সুগন্ধি, কৃত্রিম রবার ও ওষুধ প্রস্তুতিতে দ্রাবকরূপে, (ii) রেকটিফায়েড স্পিরিট (৯৫.৬% ইথানল) রূপে জীবাণুনাশক হিসেবে, (iii) পেট্রোলের সাথে মিশিয়ে পাওয়ার অ্যালকোহল (মোটরগাড়ির জ্বালানি) প্রস্তুতিতে, (iv) মেথিলেটেড স্পিরিট, টিংচার আয়োডিন ইত্যাদি প্রস্তুতিতে।
  • রাসায়নিক বিক্রিয়া:
    • ধাতব সোডিয়ামের সাথে বিক্রিয়ায় সোডিয়াম ইথক্সাইড (CH₃CH₂ONa) ও হাইড্রোজেন উৎপন্ন করে।
    • গাঢ় H₂SO₄-সহ ১৭০°C উষ্ণতায় উত্তপ্ত করলে এটি নিরুদিত হয়ে ইথিন (ইথিলিন) উৎপন্ন করে।

অ্যাসিটিক অ্যাসিড (CH₃COOH)

  • ব্যবহার: (i) হোয়াইট লেড (রং), অ্যাসিটোন প্রস্তুতিতে, (ii) এর ৫-৮% জলীয় দ্রবণ (ভিনিগার) মাছ, মাংস সংরক্ষণে ও আচার, চাটনি প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়।
  • রাসায়নিক বিক্রিয়া:
    • সোডিয়াম হাইড্রক্সাইডের সাথে বিক্রিয়ায় সোডিয়াম অ্যাসিটেট লবণ ও জল উৎপন্ন করে। CH₃COOH + NaOH → CH₃COONa + H₂O
    • গাঢ় H₂SO₄-এর উপস্থিতিতে ইথাইল অ্যালকোহলের সাথে বিক্রিয়ায় ইথাইল অ্যাসিটেট নামক এস্টার ও জল উৎপন্ন করে। এই বিক্রিয়াকে এস্টারিফিকেশন বলে।

পলিমার ও জ্বালানি

পলিমার (Polymer) ও মনোমার (Monomer)

  • পলিমার: পলিমেরাইজেশন বিক্রিয়ায় বহুসংখ্যক সরল অণু পরস্পর সংযোজিত হয়ে যে উচ্চ আণবিক ভরবিশিষ্ট এবং জটিল আণবিক গঠনবিশিষ্ট যৌগ উৎপন্ন করে, তাকে পলিমার বলে।
  • মনোমার: যেসব সরল অণুর সংযোগে পলিমার গঠিত হয়, সেই সরল অণুগুলিকে মনোমার বলে।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ পলিমার

পলিমার

মনোমারের নাম ও সংকেত

ব্যবহার

পলিথিন (PE)

ইথিন বা ইথিলিন (CH₂ = CH₂)

প্যাকিং সামগ্রী, ক্যারিব্যাগ, জলের পাইপ, ট্যাঙ্ক, বোতল, বালতি, মগ, কাপ, জানলার নেট, তড়িৎ পরিবাহী তারের আচ্ছাদন।

পলিভিনাইল ক্লোরাইড (PVC)

ভিনাইল ক্লোরাইড (CH₂ = CHCl)

তারের আচ্ছাদন, পাইপ, ট্যাঙ্ক, ব্যাগ, রেফ্রিজারেটরের ভিতরের অংশ, কৃত্রিম মেঝে।

পলিটেট্রাফ্লুরোইথিলিন (PTFE) বা টেফলন

টেট্রাফ্লুরোইথিলিন (F₂C = CF₂)

নন-স্টিক বাসন, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের অন্তরক, রাসায়নিক পদার্থ বহনকারী পাইপ ও ট্যাঙ্ক, রসায়নাগারের সরঞ্জাম।

পলিমারের শ্রেণিবিভাগ

  • জৈববিশ্লেষ্য বা জৈবভঙ্গুর পলিমার: এই পলিমারগুলি প্রকৃতিতে উপস্থিত অণুজীব (ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক) দ্বারা বিয়োজিত হয়ে সরল অণুতে (যেমন— CO₂, H₂O) রূপান্তরিত হয়। উদাহরণ: সেলুলোজ, প্রোটিন, নিউক্লিক অ্যাসিড।
  • জৈব অবিশ্লেষ্য পলিমার: এই পলিমারগুলি অণুজীব দ্বারা সরল অণুতে বিয়োজিত হয় না। উদাহরণ: পলিথিন, PVC, টেফলন।

জ্বালানি

  • LPG (Liquefied Petroleum Gas): এর প্রধান উপাদান বিউটেন; সাথে ইথেন ও প্রোপেন থাকে। পেট্রোলিয়ামের আংশিক পাতন প্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত গ্যাসীয় অংশকে উচ্চ চাপে তরলে পরিণত করে এটি প্রস্তুত করা হয়। রান্নার কাজে ও শিল্পে জ্বালানিরূপে ব্যবহৃত হয়। সিলিন্ডার থেকে গ্যাস লিক করলে বোঝার জন্য এতে দুর্গন্ধযুক্ত ইথাইল মারক্যাপটান (C₂H₅SH) মেশানো থাকে।
  • CNG (Compressed Natural Gas): এর মূল উপাদান মিথেন (৯০%); সাথে ইথেন, ইথিন, প্রোপেন ইত্যাদি থাকে। পেট্রোলিয়াম বা কয়লা খনিতে আবদ্ধ গ্যাসীয় পদার্থকে চাপ প্রয়োগে তরলে পরিণত করে এটি তৈরি হয়। বাস, ট্যাক্সি, অটোরিকশাসহ বিভিন্ন গণপরিবহণ ব্যবস্থায় জ্বালানিরূপে ব্যবহৃত হয়।

মেথিলেটেড স্পিরিট বা ডিনেচার্ড স্পিরিট

ইথাইল অ্যালকোহলের মধ্যে বিষাক্ত মিথাইল অ্যালকোহল (প্রায় ১০%) ও সামান্য পিরিডিন, ন্যাপথা ইত্যাদি মিশিয়ে যে পানের অযোগ্য মিশ্রণ তৈরি করা হয়, তাকে মেথিলেটেড স্পিরিট বলে। এটি পেইন্ট বা বার্নিশের দ্রাবকরূপে এবং স্টোভ ও স্পিরিট ল্যাম্পের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

——————————————————————————–

অনুশীলন

সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (প্রতিটি উত্তর ২-৩ বাক্যে দিন)

১. কার্যকরী মূলক বলতে কী বোঝায়? একটি অ্যালকোহল ও একটি কার্বক্সিলিক অ্যাসিডের কার্যকরী মূলকের নাম ও সংকেত লিখুন।

২. সমগণীয় শ্রেণি কাকে বলে? অ্যালকেন শ্রেণির সাধারণ সংকেতটি কী?

৩. মিথেনের প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া বলতে কী বোঝায়? একটি উদাহরণ দিন।

৪. LPG-এর সম্পূর্ণ নাম কী এবং এর প্রধান উপাদানগুলি কী কী? সিলিন্ডারে দুর্গন্ধযুক্ত পদার্থ মেশানো হয় কেন?

৫. পলিমার ও মনোমার কী? পলিথিনের মনোমারের নাম ও সংকেত লিখুন।

৬. ইথিলিন যে একটি অসম্পৃক্ত যৌগ, তা একটি রাসায়নিক বিক্রিয়ার সাহায্যে কীভাবে প্রমাণ করা যায়?

৭. কার্যকরী মূলকঘটিত সমাবয়বতার একটি উদাহরণসহ সংজ্ঞা দিন।

৮. CNG-এর পুরো নাম ও মূল উপাদান কী? এর একটি প্রধান ব্যবহার উল্লেখ করুন।

৯. জৈববিশ্লেষ্য ও জৈব অবিশ্লেষ্য পলিমারের মধ্যে মূল পার্থক্য কী? প্রত্যেকটির একটি করে উদাহরণ দিন।

১০. অ্যাসিটিক অ্যাসিডের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার উল্লেখ করুন।

——————————————————————————–

উত্তরমালা

১. যেসব পরমাণু বা মূলক জৈব যৌগের অণুতে উপস্থিত থেকে তাদের ধর্ম ও প্রকৃতি নির্ধারণ করে, তাদের কার্যকরী মূলক বলে। অ্যালকোহলের কার্যকরী মূলক হলো হাইড্রক্সিল (–OH) এবং কার্বক্সিলিক অ্যাসিডের কার্যকরী মূলক হলো কার্বক্সিল (–COOH)।

২. একই কার্যকরী মূলকযুক্ত ও সমধর্মী জৈব যৌগদের আণবিক ভরের ক্রমানুসারে সাজালে যে শ্রেণি পাওয়া যায়, তাকে সমগণীয় শ্রেণি বলে। এই শ্রেণির পরপর দুটি সদস্যের মধ্যে আণবিক সংকেতের পার্থক্য CH₂ হয়। অ্যালকেন শ্রেণির সাধারণ সংকেত হলো CₙH₂ₙ₊₂।

৩. যে বিক্রিয়ায় কোনো যৌগের অণুর একটি পরমাণু অন্য কোনো পরমাণু দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়, তাকে প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া বলে। যেমন, বিক্ষিপ্ত সূর্যালোকের উপস্থিতিতে মিথেন (CH₄) ক্লোরিনের (Cl₂) সাথে বিক্রিয়া করে মিথাইল ক্লোরাইড (CH₃Cl) উৎপন্ন করে।

৪. LPG-এর সম্পূর্ণ নাম হলো Liquefied Petroleum Gas বা তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস। এর প্রধান উপাদান বিউটেন, তবে ইথেন ও প্রোপেনও থাকে। সিলিন্ডার থেকে গ্যাস নির্গত হলে তা বোঝার জন্য এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এতে দুর্গন্ধযুক্ত ইথাইল মারক্যাপটান মেশানো হয়।

৫. বহুসংখ্যক সরল অণু (মনোমার) যুক্ত হয়ে যে উচ্চ আণবিক ভরবিশিষ্ট যৌগ (পলিমার) গঠন করে, তাকে পলিমার বলে এবং ওই সরল অণুগুলিকে মনোমার বলে। পলিথিনের মনোমার হলো ইথিন বা ইথিলিন (CH₂ = CH₂)।

৬. কার্বন টেট্রাক্লোরাইডে দ্রবীভূত ব্রোমিনের লাল দ্রবণের মধ্যে ইথিলিন গ্যাস চালনা করলে যুত বিক্রিয়ার মাধ্যমে বর্ণহীন ইথিলিন ডাইব্রোমাইড উৎপন্ন হয়, ফলে দ্রবণের লাল বর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায়। এটি প্রমাণ করে ইথিলিন একটি অসম্পৃক্ত যৌগ।

৭. একই আণবিক সংকেতবিশিষ্ট যৌগে ভিন্ন কার্যকরী মূলক থাকার কারণে যে সমাবয়বতার সৃষ্টি হয়, তাকে কার্যকরী মূলকঘটিত সমাবয়বতা বলে। যেমন C₂H₆O আণবিক সংকেতযুক্ত দুটি সমাবয়ব হলো ডাইমিথাইল ইথার (CH₃–O–CH₃) ও ইথাইল অ্যালকোহল (CH₃CH₂OH)।

৮. CNG-এর পুরো নাম হলো Compressed Natural Gas বা সংনমিত প্রাকৃতিক গ্যাস। এর মূল উপাদান মিথেন (৯০%)। এটি বাস, ট্যাক্সি, অটোরিকশার মতো গণপরিবহণ ব্যবস্থায় জ্বালানিরূপে ব্যবহৃত হয়।

৯. জৈববিশ্লেষ্য পলিমার অণুজীব দ্বারা বিয়োজিত হয়ে সরল অণুতে পরিণত হয়, কিন্তু জৈব অবিশ্লেষ্য পলিমার হয় না। জৈববিশ্লেষ্য পলিমারের উদাহরণ হলো সেলুলোজ এবং জৈব অবিশ্লেষ্য পলিমারের উদাহরণ হলো পলিথিন।

১০. অ্যাসিটিক অ্যাসিডের দুটি ব্যবহার হলো: (i) এর ৫-৮% জলীয় দ্রবণ (ভিনিগার) আচার ও চাটনি তৈরিতে এবং খাদ্য সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়; (ii) এটি হোয়াইট লেড (রং) ও অ্যাসিটোন প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়।

——————————————————————————–

রচনাধর্মী প্রশ্ন (উত্তর সরবরাহ করা হয়নি)

১. সম্পৃক্ত ও অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বনের মধ্যে সংজ্ঞা, গঠন, রাসায়নিক সক্রিয়তা ও উদাহরণসহ পার্থক্য আলোচনা করুন। ২. IUPAC নামকরণ পদ্ধতির নিয়মাবলী উল্লেখ করে মিথানল, ইথান্যাল, প্রোপানোন এবং ইথানোয়িক অ্যাসিডের গঠন সংকেত লিখুন। ৩. ইথিলিনের পলিমেরাইজেশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে কীভাবে পলিথিন প্রস্তুত করা হয় তা বর্ণনা করুন। PVC ও টেফলনের মনোমার এবং একটি করে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার উল্লেখ করুন। ৪. পরীক্ষাগারে ইথানল থেকে কীভাবে ইথিন প্রস্তুত করা হয়? ইথানলের সঙ্গে সোডিয়াম ধাতুর বিক্রিয়ায় কী ঘটে সমীকরণসহ লিখুন। ৫. উদাহরণসহ বিভিন্ন প্রকার সমাবয়বতা (অবস্থানঘটিত ও কার্যকরী মূলকঘটিত) ব্যাখ্যা করুন।

——————————————————————————–

পরিভাষা (Glossary)

  • অসম্পৃক্ত যৌগ (Unsaturated Compound): যেসব জৈব যৌগের অণুতে অন্তত দুটি কার্বন পরমাণু দ্বি-বন্ধন বা ত্রি-বন্ধন দ্বারা যুক্ত থাকে।
  • অবস্থানঘটিত সমাবয়বতা (Positional Isomerism): একই কার্যকরী মূলকের অবস্থান ভিন্ন হওয়ার কারণে সৃষ্ট সমাবয়বতা।
  • ইথিলিন (Ethylene): C₂H₄ সংকেতবিশিষ্ট একটি অ্যালকিন, যা ফল পাকাতে ও পলিথিন তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
  • ইথাইল অ্যালকোহল (Ethyl Alcohol): CH₃CH₂OH সংকেতবিশিষ্ট অ্যালকোহল, যা বিভিন্ন শিল্পে দ্রাবক ও জ্বালানিরূপে ব্যবহৃত হয়।
  • কার্যকরী মূলক (Functional Group): পরমাণু বা মূলক যা জৈব যৌগের ধর্ম নির্ধারণ করে।
  • কার্যকরী মূলকঘটিত সমাবয়বতা (Functional Group Isomerism): একই আণবিক সংকেত কিন্তু ভিন্ন কার্যকরী মূলক থাকার কারণে সৃষ্ট সমাবয়বতা।
  • জৈব অবিশ্লেষ্য পলিমার (Non-biodegradable Polymer): যে পলিমার অণুজীব দ্বারা বিয়োজিত হয় না।
  • জৈব যৌগ (Organic Compound): কার্বনের ক্যাটিনেশন ও সমাবয়বতা ধর্ম প্রদর্শনকারী যৌগসমূহ।
  • জৈববিশ্লেষ্য পলিমার (Biodegradable Polymer): যে পলিমার অণুজীব দ্বারা বিয়োজিত হতে পারে।
  • ডিনেচার্ড স্পিরিট (Denatured Spirit): পানের অযোগ্য ইথাইল অ্যালকোহল, যাতে বিষাক্ত মিথাইল অ্যালকোহল মেশানো থাকে।
  • টেফলন (Teflon) / PTFE: পলিটেট্রাফ্লুরোইথিলিন; নন-স্টিক বাসনপত্র তৈরিতে ব্যবহৃত একটি পলিমার।
  • পলিমার (Polymer): অসংখ্য মনোমার অণুর সংযোগে গঠিত উচ্চ আণবিক ভরবিশিষ্ট যৌগ।
  • পিভিসি (PVC): পলিভিনাইল ক্লোরাইড; পাইপ, তারের আচ্ছাদন ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহৃত একটি পলিমার।
  • মিথেন (Methane): CH₄ সংকেতবিশিষ্ট সরলতম অ্যালকেন এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল উপাদান।
  • মনোমার (Monomer): পলিমার গঠনকারী সরলতম একক অণু।
  • সম্পৃক্ত যৌগ (Saturated Compound): যেসব জৈব যৌগে কার্বন পরমাণুগুলি কেবল এক-বন্ধন দ্বারা যুক্ত থাকে।
  • সমগণীয় শ্রেণি (Homologous Series): একই কার্যকরী মূলকযুক্ত ও সমধর্মী জৈব যৌগের শ্রেণি যাদের পরপর দুটি সদস্যের মধ্যে CH₂ গ্রুপের পার্থক্য থাকে।
  • সমাবয়বতা (Isomerism): একই আণবিক সংকেত কিন্তু ভিন্ন গঠন ও ধর্মের যৌগ তৈরির ঘটনা।
  • হাইড্রোকার্বন (Hydrocarbon): শুধুমাত্র কার্বন ও হাইড্রোজেন দ্বারা গঠিত যৌগ।
  • CNG (Compressed Natural Gas): সংনমিত প্রাকৃতিক গ্যাস, প্রধানত মিথেন, যা যানবাহনের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
  • LPG (Liquefied Petroleum Gas): তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস, প্রধানত বিউটেন, যা রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

জৈব যৌগের জগৎ: একটি সহজপাঠ

ভূমিকা: জৈব যৌগ কী?

“জৈব যৌগ” বলতে কার্বনের সেই বিশাল সংখ্যক যৌগগুলিকে বোঝায়, যেগুলির মধ্যে কার্বনের বিশেষ ধর্ম, যেমন—ক্যাটিনেশন (নিজেদের মধ্যে যুক্ত হয়ে লম্বা শৃঙ্খল গঠন) এবং সমাবয়বতা (একই আণবিক সংকেত কিন্তু ভিন্ন গঠন), দেখা যায়। তবে কার্বনের কিছু অক্সাইড, কার্বনেট, সায়ানাইড এবং কয়েকটি নির্দিষ্ট যৌগ এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত নয়। এই পাঠটির মূল উদ্দেশ্য হলো জৈব যৌগের বিশাল জগৎকে কয়েকটি সহজ ভাগে ভাগ করে তার মূল ধারণাগুলি বুঝতে সাহায্য করা।

——————————————————————————–

১. কার্বন-কার্বন বন্ধনের ভিত্তিতে শ্রেণীবিভাগ

জৈব যৌগগুলিকে চেনার একটি প্রাথমিক উপায় হলো তাদের কার্বন পরমাণুগুলি পরস্পরের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত আছে, তা দেখা। এই বন্ধনের প্রকৃতির উপর ভিত্তি করেই জৈব যৌগকে প্রধান দুটি ভাগে ভাগ করা হয়।

১.১ সম্পৃক্ত যৌগ (Saturated Compounds)

“সম্পৃক্ত যৌগ” হলো সেইসব জৈব যৌগ, যাদের অণুর গঠনে পাশাপাশি থাকা সমস্ত কার্বন পরমাণু শুধুমাত্র এক-বন্ধন (single bond) দ্বারা যুক্ত থাকে।

  • মিথেন (CH₄)
  • ইথেন (C₂H₆)

এই যৌগগুলিতে শুধুমাত্র এক-বন্ধন থাকার কারণে এগুলি রাসায়নিকভাবে তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয় হয়।

১.২ অসম্পৃক্ত যৌগ (Unsaturated Compounds)

“অসম্পৃক্ত যৌগ” হলো সেইসব জৈব যৌগ, যাদের অণুতে অন্তত দুটি কার্বন পরমাণু দ্বি-বন্ধন (double bond) বা ত্রি-বন্ধন (triple bond) দ্বারা যুক্ত থাকে।

  • ইথিলিন (C₂H₄)
  • অ্যাসিটিলিন (C₂H₂)

দ্বি-বন্ধন বা ত্রি-বন্ধনের উপস্থিতির কারণে এই যৌগগুলি রাসায়নিকভাবে খুব সক্রিয় হয় এবং সহজেই বিক্রিয়ায় অংশ নেয়।

১.৩ সম্পৃক্ত বনাম অসম্পৃক্ত: মূল পার্থক্য

নীচের সারণিতে এই দুই প্রকার যৌগের মূল পার্থক্যগুলি তুলে ধরা হলো:

বৈশিষ্ট্য

সম্পৃক্ত যৌগ

অসম্পৃক্ত যৌগ

কার্বন-কার্বন বন্ধন

কেবল এক-বন্ধন থাকে

অন্তত একটি দ্বি-বন্ধন বা ত্রি-বন্ধন থাকে

রাসায়নিক সক্রিয়তা

তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয়

রাসায়নিকভাবে খুব সক্রিয়

উদাহরণ

মিথেন (CH₄), ইথেন (C₂H₆)

ইথিলিন (C₂H₄), অ্যাসিটিলিন (C₂H₂)

এবার আমরা জৈব যৌগের সবচেয়ে সরল রূপ, হাইড্রোকার্বন, সম্পর্কে জানব, যা সম্পৃক্ত বা অসম্পৃক্ত দুই প্রকারই হতে পারে।

——————————————————————————–

২. হাইড্রোকার্বন: জৈব যৌগের ভিত্তি

হাইড্রোকার্বন হলো শুধুমাত্র কার্বন (C) এবং হাইড্রোজেন (H) পরমাণু দিয়ে গঠিত জৈব যৌগ। এদের গঠন সবচেয়ে সরল হওয়ায় এগুলিকে জৈব যৌগের ভিত্তি বলা হয়। পূর্ববর্তী আলোচনার মতোই হাইড্রোকার্বনকেও সম্পৃক্ত এবং অসম্পৃক্ত—এই দুই প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়, যা থেকে তিনটি প্রধান শ্রেণীর জন্ম হয়।

  • অ্যালকেন (Alkane): এগুলি হলো সম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন, অর্থাৎ এদের মধ্যে কার্বন-কার্বন এক-বন্ধন থাকে। এদের সাধারণ সংকেত হলো CₙH₂ₙ₊₂।
  • অ্যালকিন (Alkene): এগুলি দ্বি-বন্ধনযুক্ত অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন। এদের সাধারণ সংকেত হলো CₙH₂ₙ।
  • অ্যালকাইন (Alkyne): এগুলি ত্রি-বন্ধনযুক্ত অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন। এদের সাধারণ সংকেত হলো CₙH₂ₙ₋₂।

এই অ্যালকেন, অ্যালকিন বা অ্যালকাইনের মতো যৌগগুলিকে তাদের ধর্মের মিলের ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীতে সাজানো হয়, যাকে সমগণীয় শ্রেণী বলা হয়।

——————————————————————————–

৩. সমগণীয় শ্রেণী (Homologous Series): একই পরিবারের সদস্যরা

সমগণীয় শ্রেণী হলো একই কার্যকরী মূলকযুক্ত এবং সমধর্মী জৈব যৌগগুলির একটি শ্রেণী, যাদের একটি সাধারণ সংকেত দ্বারা প্রকাশ করা যায় এবং ক্রমবর্ধমান আণবিক ভর অনুসারে সাজালে পরপর দুটি সদস্যের মধ্যে CH₂ মূলকের পার্থক্য থাকে।

সংজ্ঞা অনুযায়ী, একটি সমগণীয় শ্রেণীর যৌগগুলির:

  • একই কার্যকরী মূলকযুক্ত হয়।
  • একটি একই সাধারণ সংকেত দ্বারা প্রকাশযোগ্য হয়।
  • পরপর দুটি সদস্যের মধ্যে আণবিক সংকেতের পার্থক্য CH₂ হয়।

উদাহরণস্বরূপ, অ্যালকেন সমগণীয় শ্রেণীর প্রথম সদস্য মিথেন (CH₄) এবং দ্বিতীয় সদস্য ইথেন (C₂H₆)। এদের মধ্যে আণবিক সংকেতের পার্থক্য হলো (C₂H₆ – CH₄) = CH₂।

এই ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি লক্ষ লক্ষ জৈব যৌগকে কয়েকটি নির্দিষ্ট পরিবারে ভাগ করে তাদের ধর্ম ও গঠন সম্পর্কে পড়াশোনাকে অনেক সহজ করে তোলে।

একটি সমগণীয় শ্রেণীর সমস্ত যৌগের ধর্মে যে মিল দেখা যায়, তার কারণ হলো তাদের মধ্যে উপস্থিত একটি বিশেষ পরমাণু বা মূলক, যা কার্যকরী মূলক নামে পরিচিত।

——————————————————————————–

৪. কার্যকরী মূলক (Functional Group): যৌগের ধর্ম ও পরিচয়

কার্যকরী মূলক হলো জৈব যৌগের অণুতে উপস্থিত নির্দিষ্ট কোনো পরমাণু বা মূলক, যা ওই যৌগটির রাসায়নিক ধর্ম, প্রকৃতি এবং বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে। এটিই যৌগের ‘পরিচয়’ তৈরি করে।

নীচের সারণিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যকরী মূলকের উদাহরণ দেওয়া হলো:

যৌগের শ্রেণী

কার্যকরী মূলকের নাম

সংকেত

অ্যালকোহল

হাইড্রক্সিল

–OH

অ্যালডিহাইড

অ্যালডিহাইড

–CHO

কিটোন

কিটো

>C=O

কার্বক্সিলিক অ্যাসিড

কার্বক্সিল

–COOH

কার্যকরী মূলকই নির্ধারণ করে একটি জৈব যৌগ কীভাবে বিক্রিয়া করবে, তাই জৈব যৌগের শ্রেণীবিভাগের ক্ষেত্রে এটি একটি অপরিহার্য অংশ।

——————————————————————————–

উপসংহার: মূল শিক্ষণীয় বিষয়

এই পাঠ থেকে আমরা জৈব যৌগের শ্রেণীবিভাগ সম্পর্কে যে প্রধান বিষয়গুলি শিখলাম, তা হলো:

  1. জৈব যৌগগুলিকে কার্বন-কার্বন বন্ধনের প্রকৃতির উপর ভিত্তি করে সম্পৃক্ত (এক-বন্ধন) এবং অসম্পৃক্ত (দ্বি-বন্ধন/ত্রি-বন্ধন)—এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়।
  2. হাইড্রোকার্বন হল সবচেয়ে সরল জৈব যৌগ এবং এদেরকে অ্যালকেন, অ্যালকিন ও অ্যালকাইন পরিবারে ভাগ করা হয়।
  3. সমগণীয় শ্রেণী হল একই রকম ধর্মের যৌগগুলির একটি পরিবার যাদের একটি সাধারণ সংকেত রয়েছে এবং পরপর দুটি সদস্যের মধ্যে CH₂-এর পার্থক্য থাকে।
  4. কার্যকরী মূলক হল একটি অণুর সক্রিয় অংশ যা যৌগটির রাসায়নিক পরিচয় এবং ধর্ম নির্ধারণ করে।

জৈব রসায়নের এই মূল ভিত্তিগুলি ভালোভাবে আয়ত্ত করতে পারলে তোমরা দেখবে, রসায়নের এই শাখাটি আসলে খুবই আকর্ষণীয় এবং যুক্তিনির্ভর। আশা করি, এই আলোচনা তোমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করবে।

জৈব যৌগের নামকরণ: দশম শ্রেণীর জন্য IUPAC পদ্ধতির সহজ পাঠ

ভূমিকা

নমস্কার ছাত্রছাত্রীরা! ঠিক যেমন প্রত্যেক মানুষের একটি নির্দিষ্ট নাম থাকে যা দিয়ে তাকে চেনা যায়, তেমনই রসায়নের বিশাল জগতে প্রতিটি যৌগেরও একটি সুনির্দিষ্ট নাম রয়েছে। এই নামগুলো কোনো এলোমেলো শব্দ নয়, বরং একটি নিয়ম মেনে তৈরি হয়। এর ফলে সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীরা সহজেই যৌগগুলোকে চিনতে এবং তাদের ধর্ম বুঝতে পারেন। এই আন্তর্জাতিক নামকরণ পদ্ধতিটির নাম হলো IUPAC (International Union of Pure and Applied Chemistry)।

আজকের এই পাঠের মূল উদ্দেশ্য হলো, দশম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের জন্য IUPAC নামকরণ পদ্ধতিকে অত্যন্ত সহজভাবে তুলে ধরা। আমরা মূলত সরল হাইড্রোকার্বন এবং অ্যালকোহলের নামকরণ শিখব। আমি আশা করি, এই টিউটোরিয়ালটি শেষ করার পর তোমরা খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে সাধারণ জৈব যৌগগুলির নামকরণ করতে পারবে।

1. নামকরণের মূল ভিত্তি: শব্দমূল ও প্রত্যয়

যেকোনো সরল জৈব যৌগের IUPAC নাম মূলত দুটি অংশ নিয়ে গঠিত: একটি হলো শব্দমূল (Word Root) এবং অন্যটি হলো প্রত্যয় (Suffix)। এই দুটি অংশকে সঠিকভাবে জুড়তে পারলেই যৌগের নামকরণ করা সম্ভব।

শব্দমূল (Word Root)

শব্দমূল জৈব যৌগের দীর্ঘতম কার্বন শৃঙ্খলে মোট কার্বন পরমাণুর সংখ্যা নির্দেশ করে। অর্থাৎ, যৌগে কতগুলো কার্বন আছে, তার ওপর ভিত্তি করে শব্দমূল নির্ধারিত হয়। নিচে প্রথম তিনটি কার্বনের জন্য ব্যবহৃত শব্দমূল দেওয়া হলো:

কার্বন পরমাণুর সংখ্যা

শব্দমূল (Word Root)

মিথ (meth)

ইথ (eth)

প্রোপ (prop)

প্রত্যয় (Suffix)

প্রত্যয় যৌগের শ্রেণি বা প্রকৃতি নির্দেশ করে। এটি মূলত কার্বন-কার্বন বন্ধনের ধরন (এক-বন্ধন, দ্বি-বন্ধন বা ত্রি-বন্ধন) অথবা যৌগে উপস্থিত প্রধান কার্যকরী মূলককে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এই টিউটোরিয়ালে আমরা অ্যালকেন (-ane), অ্যালকিন (-ene), অ্যালকাইন (-yne), এবং অ্যালকোহল (-ol) এর জন্য ব্যবহৃত প্রত্যয়গুলো সম্পর্কে জানব।

2. হাইড্রোকার্বনের নামকরণ

হাইড্রোকার্বন (Hydrocarbon) হলো সেইসব জৈব যৌগ যা শুধুমাত্র কার্বন (C) এবং হাইড্রোজেন (H) পরমাণু দিয়ে গঠিত। এদের নামকরণের আগে আমাদের সম্পৃক্ত ও অসম্পৃক্ত যৌগ সম্পর্কে জানতে হবে, কারণ এর ওপর ভিত্তি করেই হাইড্রোকার্বনের শ্রেণিবিভাগ ও নামকরণ করা হয়।

  • সম্পৃক্ত (Saturated) যৌগ: যে যৌগগুলিতে কার্বন পরমাণুগুলি পরস্পর কেবল এক-বন্ধন দ্বারা যুক্ত থাকে।
  • অসম্পৃক্ত (Unsaturated) যৌগ: যে যৌগগুলিতে অন্তত দুটি কার্বন পরমাণু পরস্পর দ্বি-বন্ধন বা ত্রি-বন্ধন দ্বারা যুক্ত থাকে।

2.1. অ্যালকেন (Alkanes) – সম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন

অ্যালকেন হলো সম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন, অর্থাৎ এদের গঠনে কার্বন পরমাণুর মধ্যে কেবল এক-বন্ধন (single bond) থাকে। অ্যালকেন সমগোত্রীয় শ্রেণির যৌগগুলির সাধারণ সংকেত হলো CnH2n+2। এদের নামকরণের নিয়মটি অত্যন্ত সহজ।

IUPAC নাম = শব্দমূল + ane (এন)

নিচের সারণিটি দেখলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে:

যৌগের সংকেত

শব্দমূল

শ্রেণি প্রত্যয়

IUPAC নাম

CH₄

meth (মিথ)

ane (এন)

Methane (মিথেন)

C₂H₆

eth (ইথ)

ane (এন)

Ethane (ইথেন)

C₃H₈

prop (প্রোপ)

ane (এন)

Propane (প্রোপেন)

2.2. অ্যালকিন (Alkenes) – অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন

অ্যালকিন হলো সেইসব অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন, যাদের গঠনে অন্তত একটি কার্বন-কার্বন দ্বি-বন্ধন (double bond) থাকে। অ্যালকিন সমগোত্রীয় শ্রেণির যৌগগুলির সাধারণ সংকেত হলো CnH2n।

IUPAC নাম = শব্দমূল + ene (ইন)

যৌগের সংকেত

শব্দমূল

শ্রেণি প্রত্যয়

IUPAC নাম

C₂H₄

eth (ইথ)

ene (ইন)

Ethene (ইথিন)

C₃H₆

prop (প্রোপ)

ene (ইন)

Propene (প্রোপিন)

2.3. অ্যালকাইন (Alkynes) – অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন

অ্যালকাইন হলো সেইসব অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন, যাদের গঠনে অন্তত একটি কার্বন-কার্বন ত্রি-বন্ধন (triple bond) থাকে। অ্যালকাইন সমগোত্রীয় শ্রেণির যৌগগুলির সাধারণ সংকেত হলো CnH2n-2।

IUPAC নাম = শব্দমূল + yne (আইন)

যৌগের সংকেত

শব্দমূল

শ্রেণি প্রত্যয়

IUPAC নাম

C₂H₂

eth (ইথ)

yne (আইন)

Ethyne (ইথাইন)

C₃H₄

prop (প্রোপ)

yne (আইন)

Propyne (প্রোপাইন)

এতক্ষণ আমরা দেখলাম কিভাবে কার্বন সংখ্যা (শব্দমূল) এবং বন্ধনের ধরন (প্রত্যয়) ব্যবহার করে হাইড্রোকার্বনের নামকরণ করতে হয়। এখন আমরা দেখব, যৌগের মধ্যে হাইড্রোজেন ছাড়াও অন্য কোনো পরমাণু বা মূলক—অর্থাৎ কার্যকরী মূলক—যুক্ত হলে নামকরণ পদ্ধতি কিভাবে পরিবর্তিত হয়।

3. কার্যকরী মূলকযুক্ত যৌগের নামকরণ: অ্যালকোহল

কার্যকরী মূলক (Functional Group) হলো কোনো পরমাণু বা মূলক যা জৈব যৌগের অণুতে উপস্থিত থেকে সেই যৌগের প্রকৃতি, ধর্ম এবং বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে।

অ্যালকোহল শ্রেণির যৌগগুলিতে যে কার্যকরী মূলকটি থাকে, সেটি হলো হাইড্রক্সিল (hydroxyl) গ্রুপ (–OH)। এই মূলকটি উপস্থিত থাকার কারণে এদের নামকরণের নিয়মটি একটু ভিন্ন।

অ্যালকোহলের নামকরণের নিয়মটি হলো: IUPAC নাম = অ্যালকেনের নাম – ‘e’ + ‘ol’ (অল)

চলো, কয়েকটি ধাপের মাধ্যমে নিয়মটি বুঝে নেওয়া যাক:

  1. প্রথমে যৌগের কার্বন সংখ্যার উপর ভিত্তি করে সংশ্লিষ্ট অ্যালকেনটির নাম বের কর।
  2. সেই অ্যালকেনের নামের শেষ থেকে ‘e’ অক্ষরটি বাদ দাও।
  3. সবশেষে ‘ol’ প্রত্যয়টি যোগ কর।

নিচের সারণিতে উদাহরণসহ নিয়মটি দেখানো হলো:

যৌগের সংকেত

মূল অ্যালকেন

নিয়ম

IUPAC নাম

CH₃OH

Methane

methane – e + ol (মিথেন – e + অল)

Methanol (মিথানল)

CH₃CH₂OH

Ethane

ethane – e + ol (ইথেন – e + অল)

Ethanol (ইথানল)

CH₃CH₂CH₂OH

Propane

propane – e + ol (প্রোপেন – e + অল)

Propanol (প্রোপানল)

একইভাবে, অন্যান্য কার্যকরী মূলকের জন্যও আলাদা আলাদা নামকরণের নিয়ম রয়েছে। তবে অ্যালকোহলের (–OH) ক্ষেত্রে আমরা সবসময় -ol প্রত্যয়টি ব্যবহার করব।

4. সারসংক্ষেপ

এই টিউটোরিয়াল থেকে আমরা জৈব যৌগের নামকরণের মূল ভিত্তিগুলি শিখলাম। চলো, মূল বিষয়গুলো আরেকবার দেখে নেওয়া যাক:

  1. শব্দমূল (Word Root): এটি জৈব যৌগের দীর্ঘতম কার্বন শৃঙ্খলে কার্বন পরমাণুর সংখ্যা বোঝাতে ব্যবহৃত হয় (যেমন, ১টি কার্বনের জন্য মিথ, ২টি-র জন্য ইথ, ৩টি-র জন্য প্রোপ)।
  2. প্রত্যয় (Suffix): এটি যৌগের প্রকৃতি বা শ্রেণি বোঝায়। হাইড্রোকার্বনের ক্ষেত্রে এটি কার্বন-কার্বন বন্ধনের ধরন নির্দেশ করে (এক-বন্ধনের জন্য -ane, দ্বি-বন্ধনের জন্য -ene, এবং ত্রি-বন্ধনের জন্য -yne)।
  3. কার্যকরী মূলক (Functional Group): যৌগে কোনো কার্যকরী মূলক উপস্থিত থাকলে প্রত্যয়টি সেই মূলকের উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। যেমন, অ্যালকোহল শ্রেণির কার্যকরী মূলক (–OH) থাকলে প্রত্যয় হিসেবে -ol ব্যবহৃত হয়।

জৈব রসায়ন প্রথমদিকে একটু কঠিন মনে হতে পারে, কিন্তু নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে এর নিয়মগুলো সহজেই আয়ত্ত করা যায়। আশা করি, এই পাঠটি তোমাদের IUPAC নামকরণ পদ্ধতি বুঝতে সাহায্য করবে এবং তোমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহায়ক হবে। শুভকামনা!

মাধ্যমিক ভৌত বিজ্ঞানের জৈব রসায়ন সংক্রান্ত তথ্য সারণী

যৌগ বা শ্রেণীর নাম
রাসায়নিক সংকেত
কার্যকরী মূলক
IUPAC নাম
প্রধান উৎস
গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার
রাসায়নিক বিক্রিয়া ও বৈশিষ্ট্য
 
অ্যালকেন (মিথেন)
এক-বন্ধন ()
Methane (মিথেন)
প্রাকৃতিক গ্যাস () এবং কোলগ্যাস
জ্বালানি হিসেবে, মিথানল ও ফর্মালডিহাইড উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়
দহন বিক্রিয়ায়  ও তাপ উৎপন্ন করে; ক্লোরিনের সাথে প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া ঘটায়
 
অ্যালকিন (ইথিলিন)
দ্বি-বন্ধন ()
Ethene (ইথিন)
প্রাকৃতিক গ্যাস () এবং কোক ওভেন গ্যাস
কাঁচা ফল পাকাতে, পলিথিন ও মাস্টার্ড গ্যাস তৈরিতে ব্যবহৃত হয়
ব্রোমিনের সাথে যুত বিক্রিয়া করে বর্ণহীন যৌগ উৎপন্ন করে; এটি একটি অসম্পৃক্ত যৌগ
 
অ্যালকাইন (অ্যাসিটিলিন)
ত্রি-বন্ধন ()
Ethyne (ইথাইন)
উচ্চ উষ্ণতায় প্রাকৃতিক গ্যাসের বিয়োজন
অক্সি-অ্যাসিটিলিন শিখা তৈরিতে, PVC ও কৃত্রিম রবার উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়
হাইড্রোজেনের সাথে যুত বিক্রিয়ায় প্রথমে ইথিন ও পরে ইথেন উৎপন্ন করে
 
ইথাইল অ্যালকোহল (ইথানল)
হাইড্রক্সিল ()
Ethanol (ইথানল)
উৎস উপাত্তে নেই
দ্রাবক হিসেবে, জীবাণুনাশক ও পাওয়ার অ্যালকোহল প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়
সোডিয়ামের সাথে বিক্রিয়ায় হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন করে; নির্জলীভবনে ইথিন উৎপন্ন হয়
 
অ্যাসিটিক অ্যাসিড
কার্বক্সিল ()
Ethanoic acid (ইথানয়িক অ্যাসিড)
উৎস উপাত্তে নেই
ভিনেগার হিসেবে খাদ্য সংরক্ষণে, হোয়াইট লেড ও অ্যাসিটোন প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়
ক্ষারের সাথে বিক্রিয়ায় লবণ ও জল উৎপন্ন করে; অ্যালকোহলের সাথে এস্টারিফিকেশন বিক্রিয়া ঘটায়

Loading

Leave a Reply

error: