পরমাণুর নিউক্লিয়াস: তেজস্ক্রিয়তা ও নিউক্লীয় শক্তির মূলনীতি
১.০ ভূমিকা: পরমাণুর কেন্দ্র এবং তার স্থায়িত্ব
প্রতিটি পদার্থের মূল গঠন একক হলো পরমাণু, যার কেন্দ্রে রয়েছে একটি ক্ষুদ্র কিন্তু অত্যন্ত ভরযুক্ত অংশ, যা নিউক্লিয়াস নামে পরিচিত। এই নিউক্লিয়াস প্রোটন এবং নিউট্রন নামক দুই ধরনের কণা দ্বারা গঠিত। একটি পরমাণুর রাসায়নিক পরিচয় তার প্রোটন সংখ্যার উপর নির্ভর করলেও, নিউক্লিয়াসের স্থায়িত্ব নির্ভর করে প্রোটন ও নিউট্রনের সংখ্যার ভারসাম্য এবং তাদের মধ্যকার শক্তিশালী বন্ধনের উপর। অধিকাংশ পরমাণুর নিউক্লিয়াস স্থায়ী, কিন্তু কিছু ভারী মৌলের নিউক্লিয়াস প্রাকৃতিকভাবেই অস্থিতিশীল হয়। এই অস্থিতিশীল নিউক্লিয়াসগুলো যখন স্থায়িত্ব খোঁজে, তখন তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কিছু কণা বা রশ্মি বিকিরণ করে—আর এই প্রাকৃতিক ঘটনাই হলো তেজস্ক্রিয়তা। তেজস্ক্রিয়তার আবিষ্কার পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানের জগতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে এবং মানব সভ্যতাকে পারমাণবিক শক্তির অফুরন্ত উৎসের সন্ধান দিয়েছে।
২.০ তেজস্ক্রিয়তার ধারণা (Concept of Radioactivity)
তেজস্ক্রিয়তার আবিষ্কার ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা, যা পরমাণুর গঠন এবং শক্তির উৎস সম্পর্কে মানুষের ধারণাকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দেয়। এই বিভাগটি তেজস্ক্রিয়তার মৌলিক সংজ্ঞা, এর আবিষ্কারের ইতিহাস এবং এর পেছনের মূল কারণগুলিকে বিশ্লেষণ করবে।
২.১ সংজ্ঞা ও আবিষ্কার
ফরাসি বিজ্ঞানী অঁরি বেকারেল ১৮৯৬ সালে তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার করেন। যে নিউক্লীয় প্রক্রিয়ায় কিছু উচ্চ পারমাণবিক ভর সংখ্যাবিশিষ্ট মৌলের পরমাণুর নিউক্লিয়াস স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিভাজিত হয়ে আলফা (α), বিটা (β) এবং গামা (γ) নামক অদৃশ্য রশ্মি বিকিরণ করে এবং নতুন মৌলের পরমাণুতে রূপান্তরিত হয়, তাকে তেজস্ক্রিয়তা বলে। যে সকল মৌলের নিউক্লিয়াস থেকে এই বিশেষ ধরনের অদৃশ্য তেজস্ক্রিয় রশ্মি নির্গত হয়, তাদের তেজস্ক্রিয় মৌল বলা হয়।
২.২ তেজস্ক্রিয়তার প্রকারভেদ
তেজস্ক্রিয়তাকে তার উৎসের উপর ভিত্তি করে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়: প্রাকৃতিক এবং কৃত্রিম।
|
বৈশিষ্ট্য |
প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয়তা |
কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা |
|
সংজ্ঞা |
যে সকল তেজস্ক্রিয় মৌল প্রকৃতিতে পাওয়া যায় এবং যাদের তেজস্ক্রিয়তা একটি স্বতঃস্ফূর্ত প্রাকৃতিক ঘটনা, তাদের ধর্মকে প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয়তা বলে। |
অপেক্ষাকৃত হালকা স্থায়ী নিউক্লিয়াসকে উচ্চ শক্তিসম্পন্ন কণা (যেমন: নিউট্রন, প্রোটন, আলফা কণা) দ্বারা আঘাত করে কৃত্রিম উপায়ে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপে পরিণত করা হলে, সেই ঘটনাকে কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা বলে। |
|
উদাহরণ |
ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, অ্যাকটিনিয়াম ইত্যাদি। |
সোডিয়াম-২৪ (²⁴Na), ফসফরাস-৩২ (³²P) ইত্যাদি। |
২.৩ তেজস্ক্রিয়তার কারণ
তেজস্ক্রিয়তার মূল কারণ হলো নিউক্লিয়াসের অস্থিতিশীলতা। একটি নিউক্লিয়াসের স্থায়িত্ব তার নিউট্রন ও প্রোটন সংখ্যার অনুপাতের (n/p) উপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। সাধারণভাবে, যে সব মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা ৮২-এর বেশি, অর্থাৎ সীসার (²⁰⁶Pb) পরবর্তী সকল মৌলই তেজস্ক্রিয়। অপেক্ষাকৃত ভারী মৌলের নিউক্লিয়াসে যখন নিউট্রন-প্রোটন অনুপাত ১.৫-এর চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখন নিউক্লিয়াসটি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। এই অস্থিতিশীল অবস্থা থেকে স্থায়িত্ব অর্জনের জন্য নিউক্লিয়াস স্বতঃস্ফূর্তভাবে তেজস্ক্রিয় রশ্মি বিকিরণ করে।
উদাহরণস্বরূপ, ইউরেনিয়াম-২৩৫ (²³⁵U) এর নিউক্লিয়াস বিবেচনা করা যাক:
- ভর সংখ্যা (A) = ২৩৫
- পারমাণবিক সংখ্যা বা প্রোটন সংখ্যা (p) = ৯২
- নিউট্রন সংখ্যা (n) = A – p = ২৩৫ – ৯২ = ১৪৩
সুতরাং, নিউট্রন-প্রোটন অনুপাত: \frac{n}{p} = \frac{143}{92} \approx 1.55 যেহেতু এই মান ১.৫ এর চেয়ে বেশি, তাই ইউরেনিয়াম-২৩৫ একটি তেজস্ক্রিয় মৌল। এই অস্থিতিশীলতা দূর করার জন্যই এটি তেজস্ক্রিয় রশ্মি নির্গমন করে।
৩.০ তেজস্ক্রিয় রশ্মি ও তাদের ধর্ম (Radioactive Emissions and Their Properties)
অস্থিতিশীল নিউক্লিয়াস যখন স্থিতিশীল অবস্থায় রূপান্তরিত হয়, তখন এটি প্রধানত তিন ধরনের রশ্মি বা কণা নির্গত করে: আলফা (α), বিটা (β) এবং গামা (γ)। এই বিকিরণগুলির ধর্ম এবং প্রকৃতি বোঝা পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলি নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরীণ গঠন এবং শক্তি সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য প্রদান করে।
৩.১ রশ্মির পরিচিতি
- আলফা (α) কণা: এটি মূলত একটি হিলিয়াম নিউক্লিয়াস (He²⁺), যা দুটি প্রোটন এবং দুটি নিউট্রন দ্বারা গঠিত। এর আধান ধনাত্মক।
- বিটা (β) কণা: এটি একটি দ্রুতগামী ইলেকট্রন (⁰₋₁e)। নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরে যখন একটি নিউট্রন একটি প্রোটনে রূপান্তরিত হয়, তখন এই কণাটি নির্গত হয়। প্রক্রিয়াটি নিম্নরূপ: ¹₀n → ¹₁p + ⁰₋₁e
- গামা (γ) রশ্মি: এটি কোনো কণা নয়, বরং একটি উচ্চ শক্তিসম্পন্ন তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ। আলফা বা বিটা কণা নির্গত হওয়ার পর নিউক্লিয়াসটি প্রায়শই একটি উত্তেজিত (excited) অবস্থায় থাকে। এই উত্তেজিত অবস্থা থেকে স্থিতিশীল বা ভূমি অবস্থায় ফিরে আসার সময় অতিরিক্ত শক্তি গামা রশ্মি হিসেবে নির্গত হয়।
৩.২ আলফা, বিটা ও গামা রশ্মির ধর্মের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
এই তিনটি রশ্মির প্রধান ধর্মগুলির একটি তুলনামূলক চিত্র নিচের সারণিতে উপস্থাপন করা হলো:
|
ধর্ম |
আলফা (α) রশ্মি |
বিটা (β) রশ্মি |
গামা (γ) রশ্মি |
|
প্রকৃতি |
দুই একক ধনাত্মক আধানযুক্ত হিলিয়াম আয়ন (He²⁺) বা দ্রুতগামী α-কণার স্রোত। |
দ্রুতগামী ইলেকট্রন কণার স্রোত (⁰₋₁e)। |
অতি ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যবিশিষ্ট এবং উচ্চ শক্তিসম্পন্ন তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ। |
|
আধান |
+3.204 × 10⁻¹⁹ কুলম্ব (প্রোটনের দ্বিগুণ)। |
-1.602 × 10⁻¹⁹ কুলম্ব (ইলেকট্রনের সমান)। |
আধানহীন (নিস্তড়িৎ)। |
|
ভর |
6.642 × 10⁻²⁷ kg (প্রোটনের প্রায় চারগুণ)। |
9.1 × 10⁻³¹ kg (ইলেকট্রনের সমান)। |
ভরহীন। |
|
গতিবেগ |
আলোর বেগের প্রায় ১০%। |
আলোর বেগের প্রায় ৯০% (প্রায় 2.7×10⁸ m/s)। |
শূন্যস্থানে আলোর বেগের সমান (3 x 10⁸ m/s)। |
|
ভেদন ক্ষমতা |
কম। ০.০১ মিমি পুরু অ্যালুমিনিয়াম পাত দ্বারা আটকানো যায়। |
α-কণার তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি। ১ সেমি পুরু অ্যালুমিনিয়াম পাত প্রয়োজন হয়। |
সর্বাধিক। আলফা কণার প্রায় ১০,০০০ গুণ এবং বিটা কণার প্রায় ১০০ গুণ বেশি। |
|
গ্যাসকে আয়নিত করার ক্ষমতা |
সর্বাধিক। |
α-রশ্মির চেয়ে কম, কিন্তু γ-রশ্মির চেয়ে বেশি। |
সর্বনিম্ন। |
|
প্রতিপ্রভা সৃষ্টির ক্ষমতা |
জিঙ্ক সালফাইড (ZnS) পর্দায় তীব্র প্রতিপ্রভা সৃষ্টি করে। |
জিঙ্ক সালফাইড পর্দায় মৃদু প্রতিপ্রভা সৃষ্টি করে। |
সৃষ্ট প্রতিপ্রভা অত্যন্ত মৃদু। |
|
তড়িৎ ও চৌম্বক ক্ষেত্রে প্রভাব |
উভয় ক্ষেত্র দ্বারাই বিক্ষিপ্ত হয়, যা এর ধনাত্মক আধান প্রমাণ করে। |
উভয় ক্ষেত্র দ্বারা α-কণার বিপরীত দিকে এবং অনেক বেশি পরিমাণে বিক্ষিপ্ত হয়, যা এর ঋণাত্মক আধান প্রমাণ করে। |
কোনো ক্ষেত্র দ্বারাই বিক্ষিপ্ত হয় না, যা এর নিস্তড়িৎ প্রকৃতি প্রমাণ করে। |
এই রশ্মিগুলোর নির্গমনের ফলেই একটি তেজস্ক্রিয় মৌল অন্য একটি মৌলে রূপান্তরিত হয়, যা তেজস্ক্রিয় বিঘটন নামে পরিচিত।
৪.০ তেজস্ক্রিয় বিঘটন এবং রূপান্তর (Radioactive Decay and Transformation)
তেজস্ক্রিয় বিঘটন হলো সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একটি অস্থিতিশীল নিউক্লিয়াস কণা বা শক্তি নির্গত করে একটি নতুন, অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল নিউক্লিয়াসে রূপান্তরিত হয়। এই রূপান্তরের ফলে মূল মৌলটি পরিবর্তিত হয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মৌল তৈরি হতে পারে, যা রসায়ন এবং পদার্থবিজ্ঞানের জন্য একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।
৪.১ আলফা (α) বিঘটন
যখন একটি নিউক্লিয়াস থেকে একটি আলফা কণা (⁴₂He) নির্গত হয়, তখন এর:
- ভর সংখ্যা (A) ৪ একক কমে যায়।
- পারমাণবিক সংখ্যা (Z) ২ একক কমে যায়।
ফলে, পর্যায় সারণিতে নতুন সৃষ্ট মৌলটির অবস্থান মূল মৌলের অবস্থান থেকে দুই ঘর বাম দিকে সরে যায়। উদাহরণ: ইউরেনিয়াম-২৩৮ (²³⁸U) একটি আলফা কণা নির্গত করে থোরিয়াম-২৩৪ (²³⁴Th)-এ রূপান্তরিত হয়। ^{238}{92}U \rightarrow ^{234}{90}Th + ^4_2He
৪.২ বিটা (β) বিঘটন
যখন একটি নিউক্লিয়াস থেকে একটি বিটা কণা (⁰₋₁e) নির্গত হয়, তখন এর:
- ভর সংখ্যা (A) অপরিবর্তিত থাকে।
- পারমাণবিক সংখ্যা (Z) ১ একক বৃদ্ধি পায়।
ফলে, পর্যায় সারণিতে নতুন মৌলটির অবস্থান মূল মৌলের অবস্থান থেকে এক ঘর ডান দিকে সরে যায়। উদাহরণ: কোবাল্ট-৬০ (⁶⁰Co) একটি বিটা কণা নির্গত করে নিকেল-৬০ (⁶⁰Ni)-এ রূপান্তরিত হয়। ^{60}{27}Co \rightarrow ^{60}{28}Ni + ^0_{-1}e
৪.৩ গামা (γ) নিঃসরণ
গামা রশ্মি হলো শক্তি, কোনো কণা নয়। তাই, গামা রশ্মি নির্গমনের ফলে নিউক্লিয়াসের:
- ভর সংখ্যা (A) অপরিবর্তিত থাকে।
- পারমাণবিক সংখ্যা (Z) অপরিবর্তিত থাকে।
এই প্রক্রিয়ায় নিউক্লিয়াসটি শুধুমাত্র একটি উত্তেজিত বা উচ্চ শক্তিস্তর থেকে স্থিতিশীল বা ভূমি স্তরে ফিরে আসে। উদাহরণ: কোবাল্ট-৬০ এর বিটা বিঘটন থেকে প্রাপ্ত উত্তেজিত নিকেল-৬০ (⁶⁰Ni*) নিউক্লিয়াসটি একটি গামা রশ্মি নিঃসরণ করে স্থিতিশীল নিকেল-৬০ (⁶⁰Ni) এ পরিণত হয়। ^{60}{28}Ni^* \rightarrow ^{60}{28}Ni + \gamma
৪.৪ জনক ও দুহিতা নিউক্লিয়াস
- জনক নিউক্লিয়াস (Parent Nucleus): যে তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াসটির বিঘটন ঘটে, তাকে জনক নিউক্লিয়াস বলে।
- দুহিতা নিউক্লিয়াস (Daughter Nucleus): তেজস্ক্রিয় রশ্মি নির্গমনের পর জনক নিউক্লিয়াসটি যে নতুন নিউক্লিয়াসে রূপান্তরিত হয়, তাকে দুহিতা নিউক্লিয়াস বলে।
৪.৫ তেজস্ক্রিয়তার একক
তেজস্ক্রিয় বিঘটন হার পরিমাপের জন্য দুটি প্রধান একক ব্যবহৃত হয়:
- বেকারেল (Becquerel, Bq): এটি তেজস্ক্রিয়তার SI একক। প্রতি সেকেন্ডে একটি বিঘটনকে ১ বেকারেল বলা হয়।
- কুরি (Curie, Ci): এটি তেজস্ক্রিয়তার প্রচলিত CGS একক।
- সম্পর্ক: 1 Ci = 3.7 × 10¹⁰ Bq
তেজস্ক্রিয়তার এই তাত্ত্বিক ধারণাগুলো বাস্তবে মানবকল্যাণে বহুবিধ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছে।
৫.০ তেজস্ক্রিয়তার ব্যবহারিক প্রয়োগ
তেজস্ক্রিয়তা একদিকে যেমন বিধ্বংসী হতে পারে, তেমনই নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে এটি আধুনিক সভ্যতার জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। কীভাবে এই বিপজ্জনক শক্তিকে মানবকল্যাণে নিয়োজিত করা হয়েছে? চিকিৎসাবিজ্ঞান থেকে শুরু করে ভূতাত্ত্বিক বয়স নির্ণয় এবং শক্তি উৎপাদন পর্যন্ত এর প্রয়োগ অত্যন্ত বিস্তৃত ও গুরুত্বপূর্ণ।
- চিকিৎসাবিজ্ঞান:
- ক্যান্সার চিকিৎসা: তেজস্ক্রিয় কোবাল্ট-৬০ (⁶⁰Co) এবং রেডিয়াম থেকে নির্গত গামা রশ্মি ব্যবহার করে ক্যান্সার কোশ ধ্বংস করা হয়।
- লিউকেমিয়া ও মস্তিষ্কের টিউমার: এই রোগগুলোর চিকিৎসায় তেজস্ক্রিয় ফসফরাস-৩২ (³²P) ব্যবহৃত হয়।
- থাইরয়েড রোগ: থাইরয়েড গ্রন্থি প্রাকৃতিকভাবে আয়োডিন শোষণ করে, তাই তেজস্ক্রিয় আয়োডিন-১৩১ (¹³¹I) ব্যবহার করে সরাসরি এই গ্রন্থির রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা করা সম্ভব হয়।
- রোগ নির্ণয়: রক্ত সঞ্চালনে কোনো বাধা আছে কিনা তা নির্ণয় করতে তেজস্ক্রিয় সোডিয়াম-২৪ (²⁴Na) ব্যবহার করা হয়।
- বয়স নির্ণয়:
- ইউরেনিয়াম ডেটিং: শিলা বা পৃথিবীর বয়স নির্ণয়ের জন্য ইউরেনিয়ামের আইসোটোপ ব্যবহার করা হয়। শিলায় উপস্থিত ইউরেনিয়াম এবং এর বিঘটনের ফলে উৎপন্ন সীসার (²⁰⁶Pb) অনুপাত বিশ্লেষণ করে বয়স গণনা করা হয়।
- রেডিওকার্বন ডেটিং: জীবিত অবস্থায় সকল প্রাণী ও উদ্ভিদ পরিবেশ থেকে কার্বন-১৪ (¹⁴C) গ্রহণ করে, কিন্তু মৃত্যুর পর তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ¹⁴C-এর ক্ষয়ের পরিমাণ মেপেই তার বয়স নির্ধারণ করা হয়।
- শক্তি উৎপাদন ও অন্যান্য ব্যবহার:
- নিউক্লিয় জ্বালানি: নিউক্লিয় চুল্লিতে ইউরেনিয়াম ও প্লুটোনিয়ামের মতো তেজস্ক্রিয় মৌলকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন করা হয়।
- প্রদীপ্ত রং: জিঙ্ক সালফাইডের সাথে সামান্য পরিমাণে রেডিয়াম মিশিয়ে প্রদীপ্ত বা স্বপ্রভ রং (luminous paint) তৈরি করা হয়। রেডিয়াম থেকে নির্গত বিকিরণ অন্ধকারেও দেখা যায় বলে এটি ঘড়ির কাঁটা বা ডায়ালে ব্যবহার করা হয়।
তেজস্ক্রিয়তা থেকে প্রাপ্ত এই বিশাল শক্তির মূল উৎস হলো নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা ভর ও শক্তির সম্পর্ক।
৬.০ নিউক্লীয় শক্তি: ভর ও শক্তির সম্পর্ক
বস্তুর ভর এবং শক্তি যে আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, এই যুগান্তকারী ধারণাটি ১৯০৫ সালে বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর বিখ্যাত আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্বের মাধ্যমে প্রথম উপস্থাপন করেন। তাঁর এই তত্ত্বই পারমাণবিক শক্তির তাত্ত্বিক ভিত্তি স্থাপন করে এবং আমাদের শেখায় কীভাবে ভরকে শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।
৬.১ ভর-শক্তির তুল্যতা
আইনস্টাইনের বিখ্যাত সমীকরণটি হলো: E = mc^2 এখানে, E হলো শক্তি, m হলো ভর এবং c হলো শূন্যস্থানে আলোর গতিবেগ (প্রায় 3 × 10⁸ m/s)। এই সমীকরণ অনুযায়ী, খুব সামান্য পরিমাণ ভরকেও যদি সম্পূর্ণরূপে শক্তিতে রূপান্তরিত করা যায়, তবে বিপুল পরিমাণ শক্তি পাওয়া সম্ভব।
৬.২ ভর বিচ্যুতি (Mass Defect)
যেকোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের প্রকৃত ভর এর উপাদান, অর্থাৎ প্রোটন ও নিউট্রনগুলির মোট ভরের যোগফলের চেয়ে কিছুটা কম হয়। ভরের এই পার্থক্যকে ভর বিচ্যুতি (Mass Defect) বলা হয়। গাণিতিকভাবে, \Delta m = [Z \cdot m_p + (A-Z) \cdot m_n] – M যেখানে:
Δm= ভর বিচ্যুতিZ= প্রোটন সংখ্যাA= ভর সংখ্যাm_p= একটি প্রোটনের ভরm_n= একটি নিউট্রনের ভরM= নিউক্লিয়াসের প্রকৃত ভর
৬.৩ বন্ধন শক্তি (Binding Energy)
আইনস্টাইনের সমীকরণ অনুযায়ী, নিউক্লিয়াস গঠনের সময় যে ভর বিচ্যুতি ঘটে, সেই হারিয়ে যাওয়া ভরই শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এই শক্তিই নিউক্লিয়নগুলোকে (প্রোটন ও নিউট্রন) একত্রে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ করে রাখে এবং একে নিউক্লীয় বন্ধন শক্তি (Binding Energy) বলা হয়।
- E = Δm · c²
একটি নিউক্লিয়াসের স্থায়িত্ব তার প্রতি নিউক্লিয়ন বন্ধন শক্তি-এর উপর নির্ভর করে। যে নিউক্লিয়াসের প্রতি নিউক্লিয়ন বন্ধন শক্তি যত বেশি, সেটি তত বেশি স্থিতিশীল। যেসব নিউক্লিয়াসের ক্ষেত্রে এই মান প্রায় ৮ MeV (মেগা ইলেকট্রন ভোল্ট)-এর কাছাকাছি, তারা সর্বাধিক স্থিতিশীল হয়। অস্থিতিশীল নিউক্লিয়াসগুলো এই বন্ধন শক্তির পরিবর্তন ঘটিয়েই নিউক্লীয় বিক্রিয়ার মাধ্যমে স্থিতিশীলতা অর্জনের চেষ্টা করে।
৭.০ প্রধান নিউক্লীয় বিক্রিয়া
নিউক্লিয়াসের বন্ধন শক্তির পরিবর্তন ঘটিয়ে শক্তি উৎপাদনের দুটি প্রধান প্রক্রিয়া হলো নিউক্লীয় বিভাজন এবং নিউক্লীয় সংযোজন। এই দুটি বিক্রিয়ার মূলনীতি ভিন্ন হলেও উভয় ক্ষেত্রেই আইনস্টাইনের ভর-শক্তি সমতুল্যতা নীতি অনুসারে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়।
৭.১ নিউক্লীয় বিভাজন (Nuclear Fission)
সংজ্ঞা: যে নিউক্লীয় বিক্রিয়ায় একটি ভারী নিউক্লিয়াসকে নিউট্রন কণা দ্বারা আঘাত করার ফলে এটি প্রায় সমান ভরের দুটি হালকা নিউক্লিয়াসে বিভাজিত হয় এবং বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত করে, তাকে নিউক্লীয় বিভাজন বলে।
- প্রক্রিয়া: ধীরগতির নিউট্রন দ্বারা ইউরেনিয়াম-২৩৫ (²³⁵U) নিউক্লিয়াসকে আঘাত করলে এটি বিভাজিত হয়ে বেরিয়াম (Ba) ও ক্রিপটন (Kr) নিউক্লিয়াস তৈরি করে এবং এর সাথে তিনটি নতুন নিউট্রন ও প্রায় ২০০ MeV শক্তি নির্গত হয়। ^{235}{92}U + ^1_0n \rightarrow ^{141}{56}Ba + ^{92}_{36}Kr + 3 ^1_0n + \text{শক্তি} (\approx 200 \text{ MeV})
- শৃঙ্খল বিক্রিয়া (Chain Reaction): বিভাজন বিক্রিয়ায় উৎপন্ন নিউট্রনগুলো আবার অন্য ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়াসকে আঘাত করে, ফলে বিক্রিয়াটি শৃঙ্খলের মতো চলতে থাকে।
- অনিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খল বিক্রিয়া: পারমাণবিক বোমার মূলনীতি, যেখানে বিক্রিয়াটি মুহূর্তের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ঘটে বিপুল শক্তি উৎপন্ন করে।
- নিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খল বিক্রিয়া: নিউক্লিয় চুল্লিতে এই বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রিত হারে ঘটিয়ে উৎপাদিত শক্তিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বা মানবকল্যাণে ব্যবহার করা হয়।
নিউক্লিয় চুল্লি থেকে শক্তি উৎপাদন একটি কার্যকর উপায় হলেও এর সাথে মারাত্মক ঝুঁকি জড়িত। ১৯৮৬ সালের চেরনোবিল এবং ২০১১ সালের ফুকুশিমা দুর্ঘটনা এর ভয়াবহতার প্রমাণ।
৭.২ নিউক্লীয় সংযোজন (Nuclear Fusion)
সংজ্ঞা: যে নিউক্লীয় বিক্রিয়ায় দুই বা ততোধিক অত্যন্ত হালকা নিউক্লিয়াস প্রচণ্ড উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপে একত্রিত হয়ে একটি অপেক্ষাকৃত ভারী নিউক্লিয়াস গঠন করে এবং বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত করে, তাকে নিউক্লীয় সংযোজন বলে।
- প্রয়োজনীয় শর্ত: এই বিক্রিয়ার জন্য প্রায় ১০⁷ থেকে ১০⁸ কেলভিন তাপমাত্রা এবং প্রচণ্ড উচ্চ চাপ প্রয়োজন হয়। এই কারণে একে তাপ-নিউক্লীয় বিক্রিয়া (Thermonuclear Reaction) বলা হয়।
- প্রক্রিয়া: দুটি ডিউটেরিয়াম (²H) নিউক্লিয়াস সংযুক্ত হয়ে একটি হিলিয়াম-৩ (³He) নিউক্লিয়াস, একটি নিউট্রন এবং শক্তি উৎপাদন করে। ^2_1H + ^2_1H \rightarrow ^3_2He + ^1_0n + 3.27 \text{ MeV}
- শক্তি ও উৎস: নিউক্লীয় সংযোজনে বিভাজনের তুলনায় অনেক বেশি শক্তি উৎপন্ন হয়। নির্দিষ্ট ভরের জন্য, ১ গ্রাম হাইড্রোজেন সংযোজনে নির্গত শক্তি ১ গ্রাম ইউরেনিয়াম-২৩৫ বিভাজনের শক্তির তুলনায় প্রায় ৭.৩ গুণ বেশি। সূর্য এবং অন্যান্য নক্ষত্রের শক্তির অফুরন্ত উৎসের মূল কারণ হলো তাদের কেন্দ্রে অবিরাম ঘটে চলা নিউক্লীয় সংযোজন বিক্রিয়া, যেখানে চারটি হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস (প্রোটন) সংযুক্ত হয়ে একটি হিলিয়াম নিউক্লিয়াস তৈরি করছে। 4 \ ^1_1H \rightarrow \ ^4_2He + 2 \ ^0_{+1}e + 25 \text{ MeV}
এই নিউক্লীয় বিক্রিয়াগুলো পরমাণুর ক্ষুদ্র জগৎ এবং মহাবিশ্বের নক্ষত্রমণ্ডলীর মধ্যে এক অসাধারণ যোগসূত্র স্থাপন করে।
৮.০ উপসংহার
পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ক্ষুদ্র জগৎ এক অফুরন্ত শক্তি ও সম্ভাবনার ভান্ডার। তেজস্ক্রিয়তার আবিষ্কার থেকে শুরু করে ভরকে শক্তিতে রূপান্তরের মূলনীতি বোঝা এবং নিউক্লীয় বিভাজন ও সংযোজন বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অর্জন—এই সব কিছুই বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। একদিকে যেমন এই জ্ঞান চিকিৎসাবিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব এবং শিল্পে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে, তেমনই নিউক্লিয় শক্তি বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে সভ্যতার অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে পারমাণবিক বোমা এবং ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনার ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে এই অপরিসীম শক্তির সাথে এক বিরাট দায়িত্বও জড়িত। পারমাণবিক বিজ্ঞানের সঠিক, নিরাপদ এবং শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা মানবজাতির ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য।
মাধ্যমিক ভৌত বিজ্ঞান: পরমাণুর নিউক্লিয়াস অধ্যায়ের যে ৫টি বিষয় না জানলেই নয়!
মাধ্যমিক ভৌত বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হলো ‘পরমাণুর নিউক্লিয়াস’। অনেক ছাত্রছাত্রীর কাছেই এই অধ্যায়ের ধারণাগুলো বেশ জটিল মনে হয়। তেজস্ক্রিয়তা, নিউক্লিয় বিভাজন, কিংবা আইনস্টাইনের বিখ্যাত সমীকরণ—এইসব বিষয় পরীক্ষার্থীদের মনে কিছুটা ভয়ের সঞ্চার করে। কিন্তু চিন্তা নেই! এই পোস্টে আমরা অধ্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৫টি বিষয়কে সহজভাবে আলোচনা করব, যা তোমার পরীক্ষার প্রস্তুতিকে আরও মজবুত করে তুলবে এবং এই আশ্চর্যজনক জগৎ সম্পর্কে তোমার ধারণা পরিষ্কার করবে।
১. তেজস্ক্রিয়তা: পরমাণুর নিউক্লিয়াস কেন অস্থির হয়ে ওঠে?
তেজস্ক্রিয়তা হলো কিছু ভারী মৌলের পরমাণুর নিউক্লিয়াস থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং অবিরামভাবে আলফা (α), বিটা (β), এবং গামা (γ) নামক অদৃশ্য রশ্মি নির্গত হওয়ার ঘটনা। এই রশ্মিগুলো নির্গত হওয়ার পর মৌলটি একটি নতুন মৌলের পরমাণুতে রূপান্তরিত হয়। ফরাসি বিজ্ঞানী অঁরি বেকেরেল প্রথম এই ঘটনাটি আবিষ্কার করেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, নিউক্লিয়াস কেন এমন আচরণ করে? এর মূল কারণ হলো নিউক্লিয়াসের অস্থিতিশীলতা। এর দুটি প্রধান কারণ রয়েছে:
প্রথমত, যখন কোনো ভারী পরমাণুর নিউক্লিয়াসে নিউট্রন ও প্রোটনের অনুপাত (n/p) ১.৫-এর বেশি হয়ে যায়, তখন নিউক্লিয়াসটি অস্থির হয়ে পড়ে এবং স্থায়িত্ব লাভের জন্য রশ্মি বিকিরণ করতে শুরু করে। উদাহরণস্বরূপ, ইউরেনিয়াম-২৩৫ (²³⁵U)-এর নিউক্লিয়াসে প্রোটন সংখ্যা (পারমাণবিক সংখ্যা) ৯২ এবং নিউট্রন সংখ্যা হলো (ভরসংখ্যা – প্রোটন সংখ্যা) অর্থাৎ ২৩৫ – ৯২ = ১৪৩। এখানে n/p অনুপাত হলো ১৪৩/৯২ ≈ ১.৫৫, যা ১.৫-এর থেকে বেশি। তাই ইউরেনিয়াম একটি তেজস্ক্রিয় মৌল।
দ্বিতীয়ত, যে সব মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা ৮২-এর বেশি, অর্থাৎ লেড (²⁰⁶Pb)-এর পরবর্তী সকল মৌলই তেজস্ক্রিয় হয়।
তেজস্ক্রিয়তা দুই ধরনের হতে পারে:
- স্বাভাবিক তেজস্ক্রিয়তা: যে তেজস্ক্রিয় মৌলগুলো প্রকৃতিতে পাওয়া যায় (যেমন: ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম)।
- কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা: যখন কোনো সুস্থির মৌলকে নিউট্রন বা প্রোটনের মতো দ্রুতগামী কণা দিয়ে আঘাত করে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপে পরিণত করা হয়।
২. আলফা, বিটা, ও গামা: নিউক্লিয়াসের তিন জাদুকরী রশ্মি এবং তাদের চরিত্র
তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াস মূলত তিন ধরনের রশ্মি বা কণা নির্গত করে স্থিতিশীল হওয়ার চেষ্টা করে। এদের বলা হয় আলফা, বিটা ও গামা বিঘটন।
- আলফা (α) বিঘটন: এক্ষেত্রে নিউক্লিয়াস থেকে একটি আলফা কণা (যা আসলে একটি হিলিয়াম নিউক্লিয়াস, He²⁺) বেরিয়ে যায়। এর ফলে মৌলটির ভরসংখ্যা ৪ একক এবং পারমাণবিক সংখ্যা ২ একক কমে যায়।
- বিটা (β) বিঘটন: এক্ষেত্রে নিউক্লিয়াসের একটি নিউট্রন একটি প্রোটনে রূপান্তরিত হয় এবং একটি ইলেকট্রন (β-কণা) নির্গত করে। এর ফলে মৌলটির ভরসংখ্যা অপরিবর্তিত থাকে কিন্তু পারমাণবিক সংখ্যা ১ একক বেড়ে যায়। এই রূপান্তরটি হলো: ¹₀n → ¹₁p + ⁰₋₁e।
- গামা (γ) রশ্মি নিঃসরণ: আলফা বা বিটা বিঘটন হওয়ার পর নিউক্লিয়াসটি প্রায়শই উত্তেজিত অবস্থায় থাকে। এই উত্তেজিত অবস্থা থেকে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে আসার সময় নিউক্লিয়াসটি উচ্চ শক্তিসম্পন্ন তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ (ফোটন কণার স্রোত) নির্গত করে, যা গামা রশ্মি নামে পরিচিত। এর ফলে পরমাণুর ভরসংখ্যা বা পারমাণবিক সংখ্যার কোনো পরিবর্তন হয় না।
এই তিনটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি অস্থিতিশীল (unstable) নিউক্লিয়াস কণা বা শক্তি নির্গত করে ধীরে ধীরে একটি স্থিতিশীল (stable) অবস্থায় পৌঁছানোর চেষ্টা করে।
আলফা, বিটা ও গামা রশ্মির ধর্মের তুলনা:
|
ধর্ম |
আলফা (α) রশ্মি |
বিটা (β) রশ্মি |
গামা (γ) রশ্মি |
|
প্রকৃতি |
হিলিয়াম আয়ন (He²⁺) বা দ্রুতগামী α-কণার স্রোত। |
দ্রুতগামী ইলেকট্রন কণার স্রোত (e⁻)। |
অতি ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যবিশিষ্ট (10⁻³ Å ক্রমের) উচ্চ শক্তিসম্পন্ন তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ। |
|
আধান |
ধনাত্মক (+2 একক)। |
ঋণাত্মক (-1 একক)। |
নিস্তড়িৎ। |
|
ভর |
একটি প্রোটনের ভরের প্রায় চারগুণ। |
একটি ইলেকট্রনের ভরের সমান। |
ভরহীন। |
|
ভেদন ক্ষমতা |
সর্বনিম্ন (0.01 mm পুরু অ্যালুমিনিয়াম পাত দিয়ে আটকানো যায়)। |
আলফার চেয়ে প্রায় ১০০ গুণ বেশি (1 cm পুরু অ্যালুমিনিয়াম পাত ভেদ করতে পারে)। |
সর্বোচ্চ, আলফার চেয়ে প্রায় ১০,০০০ গুণ বেশি (100 cm পুরু অ্যালুমিনিয়াম পাতও ভেদ করতে পারে)। |
|
গ্যাসকে আয়নিত করার ক্ষমতা |
সর্বোচ্চ। |
আলফার চেয়ে কম। |
নগণ্য। |
|
গতিবেগ |
আলোর বেগের প্রায় ১০%। |
আলোর বেগের প্রায় ৯০% পর্যন্ত। |
আলোর বেগের সমান (3 x 10⁸ m/s)। |
৩. ভর ও শক্তির খেলা: আইনস্টাইনের সেই বিখ্যাত সমীকরণ (E=mc²)
পরমাণুর নিউক্লিয়াসের অন্যতম আশ্চর্যজনক বিষয় হলো এর ভর ও শক্তির সম্পর্ক।
ভর বিচ্যুতি (Mass Defect): কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের প্রকৃত ভর তার মধ্যে থাকা প্রোটন ও নিউট্রন কণাগুলির (যাদের একত্রে নিউক্লিয়ন বলা হয়) মোট ভরের চেয়ে সামান্য কম হয়। ভরের এই পার্থক্যকে ভর বিচ্যুতি বলা হয়।
এখন প্রশ্ন হলো, এই ভর হারিয়ে যায় কোথায়? এখানেই বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের যুগান্তকারী ধারণাটি আসে। তাঁর বিখ্যাত E=mc² সমীকরণ অনুসারে, এই হারিয়ে যাওয়া ভরই শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এই শক্তিই বন্ধন শক্তি (Binding Energy) নামে পরিচিত, যা নিউক্লিয়াসের ভেতরে থাকা নিউক্লিয়নগুলোকে (প্রোটন ও নিউট্রন) প্রচণ্ড শক্তিশালী আকর্ষণ বলের মাধ্যমে একসঙ্গে বেঁধে রাখে।
আইনস্টাইনের মূল ধারণাটি ছিল:
“ভর ও শক্তি পরস্পরের তুল্য, বিশেষ পরিস্থিতিতে ভরের শক্তিতে রূপান্তর এবং শক্তিকে ভরে রূপান্তরিত করা সম্ভব।”
এই বন্ধন শক্তি যত বেশি হয়, নিউক্লিয়াস তত বেশি স্থিতিশীল হয়।
৪. নিউক্লিয় বিভাজন বনাম সংযোজন: শক্তি মুক্তির দুই উপায়
অস্থির নিউক্লিয়াস থেকে শক্তি নির্গত হওয়ার দুটি প্রধান প্রক্রিয়া হলো নিউক্লিয় বিভাজন এবং নিউক্লিয় সংযোজন।
নিউক্লিয় বিভাজন (Nuclear Fission): এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে একটি ভারী নিউক্লিয়াসকে (যেমন: ²³⁵U) নিউট্রন কণা দিয়ে আঘাত করলে সেটি প্রায় সমান ভরের দুটি হালকা নিউক্লিয়াসে ভেঙে যায় এবং তার সাথে প্রচুর পরিমাণে শক্তি ও কয়েকটি নতুন নিউট্রন নির্গত হয়। এই নতুন নিউট্রনগুলো আবার অন্য নিউক্লিয়াসকে আঘাত করে, যার ফলে একটি শৃঙ্খল বিক্রিয়া (Chain Reaction) শুরু হয়—কারণ প্রতিটি বিভাজনে নির্গত নিউট্রনগুলো আবার নতুন নিউক্লিয়াসকে আঘাত করে, যা একটি ক্রমবর্ধমান শৃঙ্খল তৈরি করে। পারমাণবিক বোমা এবং পারমাণবিক চুল্লি (Nuclear Reactor) এই নীতির উপর ভিত্তি করেই কাজ করে। তবে এই প্রক্রিয়ার ভুল ব্যবহার বা দুর্ঘটনা ভয়াবহ হতে পারে, যার উদাহরণ হলো চেরনোবিল (১৯৮৬) ও ফুকুশিমা (২০১১) দুর্ঘটনা।
নিউক্লিয় সংযোজন (Nuclear Fusion): এই প্রক্রিয়ায় দুটি বা তার বেশি হালকা নিউক্লিয়াস প্রচণ্ড উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপে একত্রিত হয়ে একটি অপেক্ষাকৃত ভারী নিউক্লিয়াস গঠন করে। এই প্রক্রিয়ায় বিভাজনের থেকেও অনেক বেশি শক্তি নির্গত হয়। নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, ১ গ্রাম হাইড্রোজেনের সংযোজনে নির্গত শক্তি ১ গ্রাম ²³⁵U বিভাজনের ফলে নির্গত শক্তির তুলনায় প্রায় ৭.৩ গুণ বেশি। আমাদের সূর্য এবং অন্যান্য নক্ষত্রের শক্তির অফুরন্ত উৎসের মূল কারণই হলো এই নিউক্লিয় সংযোজন বিক্রিয়া।
৫. তেজস্ক্রিয়তার ব্যবহারিক প্রয়োগ: ক্যানসার চিকিৎসা থেকে পৃথিবীর বয়স নির্ণয়
তেজস্ক্রিয়তার কেবল ধ্বংসাত্মক দিকই নেই, মানব কল্যাণে এর বহুবিধ ব্যবহারও রয়েছে। নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ উল্লেখ করা হলো:
- ক্যানসার ও টিউমার চিকিৎসায়: ক্যানসার কোষ ধ্বংস করার জন্য তেজস্ক্রিয় কোবাল্ট-৬০ (⁶⁰Co) ব্যবহার করা হয়। থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যায় তেজস্ক্রিয় আয়োডিন-১৩১ (¹³¹I) এবং মস্তিষ্কের টিউমারের চিকিৎসায় ফসফরাস-৩২ (³²P) ব্যবহৃত হয়।
- রোগ নির্ণয়ে: রক্ত সংবহন তন্ত্রে কোনো বাধা সৃষ্টি হয়েছে কিনা, তা জানার জন্য তেজস্ক্রিয় সোডিয়াম-২৪ (²⁴Na) ব্যবহার করা হয়।
- পৃথিবীর বয়স নির্ণয়ে: ইউরেনিয়াম ডেটিং পদ্ধতির সাহায্যে শিলাখণ্ডে উপস্থিত তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়াম এবং তার থেকে উৎপন্ন স্থায়ী সিসার অনুপাত পরিমাপ করে শিলা বা পৃথিবীর বয়স নির্ণয় করা সম্ভব হয়।
- জীবাশ্মের বয়স নির্ণয়ে: রেডিওকার্বন ডেটিং পদ্ধতিতে জীবাশ্মে উপস্থিত তেজস্ক্রিয় কার্বন-১৪ (¹⁴C) এবং স্থিতিশীল কার্বন-১২ (¹²C)-এর অনুপাত বিশ্লেষণ করে সেই জীবাশ্মের বয়স নির্ভুলভাবে জানা যায়।
- পারমাণবিক শক্তিতে: পারমাণবিক চুল্লিতে ইউরেনিয়ামকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে নিউক্লিয় বিভাজনের মাধ্যমে উৎপন্ন তাপশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়, যা বর্তমানে শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
- প্রদীপ্ত রঙ তৈরিতে: জিঙ্ক সালফাইডের সঙ্গে সামান্য রেডিয়াম মিশিয়ে প্রদীপ্ত রঙ প্রস্তুত করা হয়, যা অন্ধকারে জ্বলে। ঘড়ির কাঁটা ও ডায়ালে এটি ব্যবহার করা হয়।
উপসংহার
পরমাণুর নিউক্লিয়াস অধ্যায়টি থেকে আমরা জানতে পারি যে একটি অতি ক্ষুদ্র কণার কেন্দ্রে কী বিপুল পরিমাণ শক্তি লুকিয়ে থাকতে পারে। তেজস্ক্রিয়তার প্রাকৃতিক ঘটনা থেকে শুরু করে নিউক্লিয় বিভাজন ও সংযোজনের মাধ্যমে শক্তি উৎপাদন—এই সবকিছুই পদার্থবিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর দিক। সঠিকভাবে বুঝতে পারলে এই অধ্যায়টি কেবল পরীক্ষার জন্যই নয়, বরং বিজ্ঞানকে ভালোবাসার জন্যও অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
এখন তোমার কাছে একটি প্রশ্ন, এই বিপুল পারমাণবিক শক্তিকে মানবজাতি ভবিষ্যতে আর কোন কোন উপায়ে শান্তির কাজে ব্যবহার করতে পারে বলে তুমি মনে করো?
পারমাণবিক চুল্লির ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদন
1.0 ভূমিকা
এই প্রতিবেদনের মূল উদ্দেশ্য হলো পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের সাথে জড়িত অন্তর্নিহিত ঝুঁকিগুলোর একটি বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করা। এই মূল্যায়নটি আবশ্যিকভাবে পারমাণবিক বিভাজনের (nuclear fission) মৌলিক ভৌত নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত, এবং ঐতিহাসিকভাবে নথিভুক্ত বিপর্যয়মূলক দুর্ঘটনাগুলোর পর্যালোচনার মাধ্যমে এটি সমৃদ্ধ হয়েছে। পারমাণবিক শক্তির একই ভৌত প্রক্রিয়া যা নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় বিপুল শক্তি উৎপাদন করে, সেই প্রক্রিয়াই নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের কারণ হতে পারে—এই দ্বৈত প্রকৃতির বিশ্লেষণই এই প্রতিবেদনের মূল ভিত্তি। এই বৈজ্ঞানিক ভিত্তি অনুধাবন করা পারমাণবিক ঝুঁকির সঠিক মূল্যায়নের জন্য অপরিহার্য।
2.0 পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি
পারমাণবিক শক্তির ঝুঁকি অনুধাবন করার জন্য প্রথমে সেই মৌলিক ভৌত নীতিগুলো সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা থাকা আবশ্যক, যা পরমাণুর নিউক্লিয়াস থেকে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গমনের প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই প্রক্রিয়াটিই নিয়ন্ত্রিত উপায়ে শক্তি উৎপাদন এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিপর্যয় সৃষ্টির উৎস।
2.1 ভর ও শক্তির রূপান্তর
১৯০৫ সালে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন তাঁর বিখ্যাত আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্বের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, ভর ও শক্তি পরস্পরের তুল্য এবং একটিকে অন্যটিতে রূপান্তরিত করা সম্ভব। এই নীতির গাণিতিক রূপটি হলো:
E = mc²
এখানে E হলো শক্তি, m হলো ভর এবং c হলো শূন্য মাধ্যমে আলোর বেগ। এই সমীকরণটি প্রতিষ্ঠা করে যে, সামান্য পরিমাণ ভর বিপুল পরিমাণ শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে, যা পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের মূল ভিত্তি।
2.2 নিউক্লিয় বিভাজন প্রক্রিয়া
নিউক্লিয় বিভাজন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে একটি ভারী নিউক্লিয়াস প্রায় সমান ভরের দুটি নিউক্লিয়াসে বিভক্ত হয়ে যায় এবং এর ফলে প্রচুর পরিমাণে শক্তি নির্গত হয়। উদাহরণস্বরূপ, যখন একটি ধীর গতিসম্পন্ন নিউট্রন দ্বারা একটি ইউরেনিয়াম-২৩৫ (²³⁵₉₂U) নিউক্লিয়াসকে আঘাত করা হয়, তখন এটি বিভাজিত হয়। এই বিক্রিয়াটি নিম্নরূপ:
²³⁵₉₂U + ¹₀n → ²³⁶₉₂U* → ¹⁴¹₅₆Ba + ⁹²₃₆Kr + 3¹₀n + 200 MeV
এই বিক্রিয়ার তাৎপর্য এর দুটি যুগপৎ ফলাফলের মধ্যে নিহিত। প্রথমত, প্রতিটি বিভাজনে প্রায় ২০০ মেগা-ইলেকট্রন ভোল্ট (MeV) বিপুল শক্তি নির্গত হয়। দ্বিতীয়ত, একাধিক নতুন নিউট্রন নির্গত হয়, যা পরবর্তী বিভাজন ঘটাতে সক্ষম। বিপুল শক্তি এবং স্ব-প্রচারক নিউট্রনের এই যুগপৎ নির্গমনই পারমাণবিক বিভাজনের উপযোগিতা এবং এর অন্তর্নিহিত বিপদের মূল কারণ। শক্তি বিদ্যুৎ সরবরাহ করে, আর নির্গত নিউট্রনগুলো একটি স্ব-নির্ভরশীল—এবং সম্ভাব্য অনিয়ন্ত্রিত—শৃঙ্খল বিক্রিয়ার সূচনা করে।
2.3 পারমাণবিক চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খল বিক্রিয়া
শৃঙ্খল বিক্রিয়া (chain reaction) হলো একটি স্ব-নির্ভরশীল প্রক্রিয়া, যা ফিশন বিক্রিয়ায় নির্গত নিউট্রনগুলোর মাধ্যমে ক্রমাগত চলতে থাকে। এই বিক্রিয়া অনিয়ন্ত্রিতভাবে ঘটলে তা পারমাণবিক বোমার মূলনীতি হিসেবে কাজ করে। এর বিপরীতে, পারমাণবিক চুল্লি (নিউক্লিয় চুল্লি) এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেখানে এই শৃঙ্খল বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রিত হারে ঘটিয়ে স্থিরভাবে শক্তি উৎপাদন করা হয়, যা বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। অতএব, চুল্লির নকশার মূল ভিত্তি হলো শৃঙ্খল বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা; সেই নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতাই পারমাণবিক বিপর্যয়ের সূচনা বিন্দু।
3.0 ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ
একটি সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন, বিপর্যয়কর ব্যর্থতার পূর্ববর্তী বিশ্লেষণ ছাড়া অসম্পূর্ণ, কারণ এই ঘটনাগুলোই একটি সিস্টেমের সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার পরিণতির একমাত্র পরীক্ষামূলক তথ্য সরবরাহ করে। যদিও পারমাণবিক চুল্লিগুলো কঠোর নিয়ন্ত্রণের জন্য ডিজাইন করা হয়, ইতিহাস আমাদের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে সৃষ্ট বিপর্যয়কর ব্যর্থতার বাস্তব তথ্য দেয়।
3.1 শনাক্তকৃত ঝুঁকি: পারমাণবিক চুল্লির বিপর্যয়
নথিভুক্ত তথ্য অনুযায়ী, পারমাণবিক চুল্লির সাথে জড়িত প্রাথমিক ঝুঁকিটি হলো নিউক্লিয় বিভাজন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থতার ফলে সৃষ্ট একটি “ভয়াবহ দুর্ঘটনা”। এই ধরনের ঘটনায় চুল্লির মূল কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অনিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়ার ফলে মারাত্মক পরিণতি ঘটে।
3.2 বিশ্লেষণমূলক কেস স্টাডি
নিম্নলিখিত নথিভুক্ত বিপর্যয়গুলো পারমাণবিক চুল্লির ব্যর্থতার विनाशकारी সম্ভাবনার উদাহরণ হিসেবে কাজ করে।
কেস স্টাডি ১: চেরনোবিল দুর্ঘটনা
এটি নিয়ন্ত্রিত বিক্রিয়া থেকে অনিয়ন্ত্রিত তাপীয় বিস্ফোরণে রূপান্তরের একটি দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ। পারমাণবিক চুল্লির বিপর্যয়ের এই ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটেছিল ২৬শে এপ্রিল, ১৯৮৬ সালে।
কেস স্টাডি ২: ফুকুশিমা দুর্ঘটনা
সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিপর্যয় হলো জাপানের ফুকুশিমা দুর্ঘটনা। এই ঘটনাটি ঘটেছিল ১১ই মার্চ, ২০১১ সালে।
এই ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো চিহ্নিত করার মাধ্যমে তাদের বিপর্যয়কর ফলাফলগুলো আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়।
4.0 সম্ভাব্য বিপর্যয়কর ফলাফল বিশ্লেষণ
চেরনোবিল এবং ফুকুশিমা দুর্ঘটনার বিপর্যয়কর প্রকৃতি মূলত ফিশন শৃঙ্খল বিক্রিয়ার উপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর প্রত্যক্ষ ফলাফল থেকে উদ্ভূত। নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ—বিশেষত ফিশন প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট বিভাজিত অংশ (fission products)—এবং ভেদন ক্ষমতাসম্পন্ন বিকিরণ অনিয়ন্ত্রিতভাবে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।
4.1 তেজস্ক্রিয়তার অনিয়ন্ত্রিত নির্গমন
পারমাণবিক চুল্লির দুর্ঘটনার মূল বিপদ হলো চুল্লির প্রতিরোধ ব্যবস্থা (containment) ভেঙে যাওয়া এবং ফিশন বিক্রিয়ায় উৎপন্ন অস্থিতিশীল নিউক্লিয়াস (যেমন বেরিয়াম-১৪১ এবং ক্রিপটন-৯২) পরিবেশে নির্গত হওয়া। এই পদার্থগুলো তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের (radioactive decay) মধ্য দিয়ে যায়। তেজস্ক্রিয়তা হলো এমন একটি স্বতঃস্ফূর্ত পারমাণবিক ঘটনা যেখানে অস্থিতিশীল নিউক্লিয়াস থেকে আলফা (α), বিটা (β) এবং গামা (γ) রশ্মির মতো অদৃশ্য বিকিরণ নির্গত হয়।
4.2 বিপদজনক বিকিরণের প্রভাব
পরিবেশে নির্গত এই বিকিরণগুলো জীবন্ত কোষ এবং পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। নির্গত প্রধান তিন ধরনের বিকিরণের বৈশিষ্ট্য ও বিপদ নিচে তুলে ধরা হলো:
- আলফা (α) রশ্মি: এটি দুই একক ধনাত্মক আধানবিশিষ্ট হিলিয়াম আয়ন (He²⁺)-এর স্রোত। এর ভেদন ক্ষমতা কম হলেও এর আয়নায়ন ক্ষমতা (ionizing power) অন্য দুটির তুলনায় সবচেয়ে বেশি, যা জীবন্ত কোষের সংস্পর্শে এলে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
- বিটা (β) রশ্মি: এটি উচ্চ গতিসম্পন্ন ইলেকট্রনের স্রোত। এর ভেদন ক্ষমতা আলফা কণার চেয়ে প্রায় ১০০ গুণ বেশি এবং এটি ১ সেন্টিমিটার পুরু অ্যালুমিনিয়াম পাত ভেদ করতে পারে। এর আয়নায়ন ক্ষমতা গামা রশ্মির চেয়ে বেশি কিন্তু আলফা রশ্মির চেয়ে কম।
- গামা (γ) রশ্মি: এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক বিকিরণ। এটি অতি ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের উচ্চ শক্তিসম্পন্ন তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ, যার কোনো আধান নেই এবং এটি আলোর গতিতে চলে। এর ভেদন ক্ষমতা চরম—আলফা কণার চেয়ে প্রায় ১০,০০০ গুণ বেশি—এবং এটি ১০০ সেন্টিমিটার পুরু অ্যালুমিনিয়াম পাতও ভেদ করতে পারে। এর আয়নায়ন ক্ষমতা ন্যূনতম।
এই বিকিরণগুলোর যুগপৎ নির্গমন একটি জটিল রেডিওলজিক্যাল বিপদ তৈরি করে: উচ্চ আয়নায়ন ক্ষমতাসম্পন্ন আলফা কণা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ശരീരর অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে, অন্যদিকে উচ্চ ভেদন ক্ষমতাসম্পন্ন গামা রশ্মি বিশাল এলাকা জুড়ে বাহ্যিক মারাত্মক হুমকি হিসেবে কাজ করে। জৈবিক সিস্টেমের উপর এই বহুমুখী আক্রমণই পারমাণবিক দূষণকে স্বতন্ত্রভাবে विनाशकारी করে তোলে।
5.0 উপসংহার
এই প্রতিবেদনটি নিশ্চিত করে যে, পারমাণবিক শক্তির ঝুঁকিগুলো আকস্মিক নয়, বরং এর মূল প্রক্রিয়ার গভীরে প্রোথিত। ভরের শক্তিতে রূপান্তর, যা E=mc² দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং নিউট্রন-চালিত শৃঙ্খল বিক্রিয়ার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, এটি নিশ্চিত করে যে নিয়ন্ত্রণের যেকোনো বিচ্যুতি শক্তি এবং তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ উভয়েরই একটি বিপর্যয়কর নির্গমনের কারণ হবে। এই উপসংহারটি ২৬শে এপ্রিল, ১৯৮৬ সালের চেরনোবিল এবং ১১ই মার্চ, ২০১১ সালের ফুকুশিমা দুর্ঘটনার ঐতিহাসিক রেকর্ডের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে, যা পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়ার উপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়াবহ পরিণতির অকাট্য প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।
পরমাণুর নিউক্লিয়াস: একটি বিশদ বিশ্লেষণ
কার্যনির্বাহী সারাংশ
এই নথিটি দশম শ্রেণীর ভৌত বিজ্ঞানের অন্তর্গত পরমাণুর নিউক্লিয়াস অধ্যায়ের একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে। এর মূল বিষয়বস্তু হলো তেজস্ক্রিয়তা, যা কিছু ভারী মৌলের নিউক্লিয়াসের একটি স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনা। ফরাসি বিজ্ঞানী হেনরি বেকারেল আবিষ্কৃত এই ঘটনায়, অস্থিতিশীল নিউক্লিয়াস থেকে আলফা (α), বিটা (β), এবং গামা (γ) নামক অদৃশ্য রশ্মি নির্গত হয়, যার ফলে মূল মৌলটি একটি নতুন মৌলে রূপান্তরিত হয়। এই রূপান্তরের কারণ হিসেবে নিউট্রন-প্রোটন অনুপাতের (n/p) অসামঞ্জস্যকে (সাধারণত ১.৫-এর বেশি) চিহ্নিত করা হয়েছে।
নথিতে α, β, ও γ রশ্মির প্রকৃতি, আধান, ভর, ভেদন ক্ষমতা এবং তড়িৎ ও চৌম্বক ক্ষেত্রে তাদের আচরণের বিস্তারিত তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে। তেজস্ক্রিয় রূপান্তরের সূত্রগুলি, যেমন α-বিঘটনে ভরসংখ্যার ৪ একক হ্রাস ও পরমাণু ক্রমাঙ্কের ২ একক হ্রাস এবং β-বিঘটনে পরমাণু ক্রমাঙ্কের ১ একক বৃদ্ধি, উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আইনস্টাইনের বিখ্যাত ভর-শক্তি তুল্যতা সূত্র (E=mc²) এবং এর উপর ভিত্তি করে নিউক্লিয় শক্তি, ভর বিচ্যুতি ও বন্ধন শক্তির ধারণা আলোচনা করা হয়েছে। দুটি প্রধান নিউক্লিয় বিক্রিয়া—নিউক্লিয় বিভাজন (ভারী নিউক্লিয়াসের ভাঙন) ও নিউক্লিয় সংযোজন (হালকা নিউক্লিয়াসের জুড়ে যাওয়া)—তাদের প্রক্রিয়া, শক্তি উৎপাদন এবং প্রয়োগ (পারমাণবিক বোমা, নিউক্লিয় চুল্লি, সূর্যের শক্তি) নিয়ে বিশদ আলোকপাত করা হয়েছে। পরিশেষে, চিকিৎসা, বয়স নির্ণয় (কার্বন ডেটিং, ইউরেনিয়াম ডেটিং), এবং শিল্পে তেজস্ক্রিয়তার বিভিন্ন ব্যবহারিক প্রয়োগ তুলে ধরা হয়েছে।
——————————————————————————–
তেজস্ক্রিয়তা: পরিচিতি ও আবিষ্কার
তেজস্ক্রিয়তা হলো একটি নিউক্লিয় ঘটনা যেখানে কিছু উচ্চ পারমাণবিক ভরসংখ্যাবিশিষ্ট মৌলের পরমাণুর নিউক্লিয়াস স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিভাজিত হয়ে আলফা (α), বিটা (β) এবং গামা (γ) নামক অদৃশ্য রশ্মি বিকিরণ করে এবং একটি নতুন মৌলের পরমাণুতে রূপান্তরিত হয়।
- আবিষ্কার: ফরাসি বিজ্ঞানী হেনরি বেকারেল তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার করেন।
- তেজস্ক্রিয় মৌল: যে সকল মৌলের নিউক্লিয়াস থেকে এই বিশেষ ধরনের অদৃশ্য তেজস্ক্রিয় রশ্মি নির্গত হয়, তাদের তেজস্ক্রিয় মৌল বলা হয়।
তেজস্ক্রিয়তার প্রকারভেদ ও কারণ
তেজস্ক্রিয়তাকে তার উৎসের ভিত্তিতে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়।
প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয়তা
যেসব তেজস্ক্রিয় মৌল প্রকৃতিতে পাওয়া যায়, তাদের প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয় মৌল বলে এবং তাদের এই ধর্মকে প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয়তা বলা হয়।
- উদাহরণ: ইউরেনিয়াম (U), থোরিয়াম (Th), অ্যাকটিনিয়াম (Ac) ইত্যাদি।
কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা
কিছু অপেক্ষাকৃত হালকা মৌলের নিউক্লিয়াসকে উচ্চগতিসম্পন্ন কণা (যেমন নিউট্রন, প্রোটন, α-কণা) দ্বারা আঘাত করে কৃত্রিম উপায়ে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপে পরিণত করা যায়। এই ঘটনাকে কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা বলে।
- উদাহরণ: ²⁴Na, ³²P।
তেজস্ক্রিয়তার মূল কারণ
তেজস্ক্রিয়তার প্রধান কারণ হলো নিউক্লিয়াসের অস্থিতিশীলতা।
- নিউট্রন-প্রোটন অনুপাত: ভারী মৌলের নিউক্লিয়াসে নিউট্রন ও প্রোটন সংখ্যার অনুপাত (n/p) যখন ১.৫-এর থেকে বেশি হয়, তখন নিউক্লিয়াসটি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
- পারমাণবিক ক্রমাঙ্ক: যেসব মৌলের পারমাণবিক ক্রমাঙ্ক ৮২-এর বেশি (অর্থাৎ, সীসা বা ²⁰⁶₈₂Pb-এর পরবর্তী মৌল), তারা সাধারণত তেজস্ক্রিয় হয়।
- উদাহরণ: ²³⁵₉₂U-এর ক্ষেত্রে:
- ভরসংখ্যা (A) = ২৩৫
- পারমাণবিক ক্রমাঙ্ক বা প্রোটন সংখ্যা (Z) = ৯২
- নিউট্রন সংখ্যা (n) = ২৩৫ – ৯২ = ১৪৩
- নিউট্রন-প্রোটন অনুপাত (n/p) = ১৪৩ / ৯২ ≈ ১.৫৫, যা ১.৫-এর চেয়ে বেশি। সুতরাং, ইউরেনিয়াম একটি তেজস্ক্রিয় মৌল।
তেজস্ক্রিয় বিঘটন এবং নির্গত রশ্মি
অস্থিতিশীল নিউক্লিয়াস স্থায়িত্ব লাভের জন্য অদৃশ্য রশ্মি বিকিরণ করে, যা তেজস্ক্রিয় বিঘটন নামে পরিচিত। এই প্রক্রিয়ায় তিন প্রকার রশ্মি নির্গত হয়।
- আলফা (α) কণার নিঃসরণ: নিউক্লিয়াস থেকে যখন দুটি প্রোটন ও দুটি নিউট্রন একত্রে নির্গত হয়, তখন তাকে α-রশ্মি নিঃসরণ বলে। α-কণা প্রকৃতপক্ষে একটি হিলিয়াম নিউক্লিয়াস (⁴₂He বা He²⁺)।
- বিটা (β) কণার নিঃসরণ: নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরে যখন একটি নিউট্রন একটি প্রোটন ও একটি ইলেকট্রনে রূপান্তরিত হয় (¹₀n → ¹₁p + ⁰₋₁e⁻), তখন নির্গত ইলেকট্রনটি β-রশ্মি (বা β-কণা) নামে পরিচিত।
- গামা (γ) রশ্মির নিঃসরণ: α বা β কণা নিঃসরণের পর নিউক্লিয়াসটি উত্তেজিত অবস্থায় থাকে। এই উত্তেজিত অবস্থা থেকে স্থিতিশীল (ভূমি) অবস্থায় ফিরে আসার সময় নিউক্লিয়াস উচ্চ শক্তিসম্পন্ন তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ বিকিরণ করে, যা গামা (γ) রশ্মি নামে পরিচিত।
আলফা (α), বিটা (β) ও গামা (γ) রশ্মির ধর্মের তুলনা
|
ধর্ম |
আলফা (α) রশ্মি |
বিটা (β) রশ্মি |
গামা (γ) রশ্মি |
|
প্রকৃতি |
দুই একক ধনাত্মক আধানবিশিষ্ট হিলিয়াম আয়ন (He²⁺) বা দ্রুতগামী α-কণার স্রোত। |
দ্রুতগামী ইলেকট্রন কণার স্রোত (⁰₋₁e⁻)। |
অতি ক্ষুদ্র (10⁻³ Å ক্রমের) তরঙ্গদৈর্ঘ্যবিশিষ্ট এবং উচ্চ শক্তিসম্পন্ন তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ। |
|
আধান |
প্রোটনের আধানের দ্বিগুণ (প্রায় +3.204 × 10⁻¹⁹ কুলম্ব)। |
ইলেকট্রনের আধানের সমান (-1.602 × 10⁻¹⁹ কুলম্ব)। |
নিস্তড়িৎ, অর্থাৎ আধানহীন। |
|
ভর |
একটি প্রোটনের ভরের চারগুণ (6.642 × 10⁻²⁷ kg বা 4.0015 u)। |
একটি ইলেকট্রনের ভরের সমান (9.1 × 10⁻³¹ kg বা 0.000548 u)। |
ভরহীন। |
|
গতিবেগ |
আলোর বেগের প্রায় ১০%। |
আলোর বেগের প্রায় ৯০% (প্রায় 2.7×10⁸ m/s)। |
শূন্যস্থানে আলোর বেগের সমান (3 x 10⁸ m/s)। |
|
ভেদন ক্ষমতা |
আকারে বড় ও গতিবেগ কম হওয়ায় ভেদন ক্ষমতা সবচেয়ে কম। 0.01 mm পুরু অ্যালুমিনিয়াম (Al) পাত দ্বারা আটকানো যায়। |
ভেদন ক্ষমতা α-কণার তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি। 1 cm পুরু Al পাত দ্বারা আটকানো যায়। |
ভেদন ক্ষমতা সর্বোচ্চ, α-কণার তুলনায় প্রায় ১০,০০০ গুণ। 100 cm পুরু Al পাতও ভেদ করতে পারে। |
|
গ্যাসকে আয়োনিত করার ক্ষমতা |
সর্বোচ্চ। |
γ-রশ্মির চেয়ে বেশি, কিন্তু α-রশ্মির চেয়ে কম। |
সর্বনিম্ন। |
|
প্রতিপ্রভা সৃষ্টির ক্ষমতা |
জিঙ্ক সালফাইড বা বেরিয়াম প্লাটিনোসায়ানাইড পর্দায় তীব্র প্রতিপ্রভা সৃষ্টি করে। |
জিঙ্ক সালফাইড বা বেরিয়াম প্লাটিনোসায়ানাইড পর্দায় মৃদু প্রতিপ্রভা সৃষ্টি করে। |
সৃষ্ট প্রতিপ্রভা α ও β রশ্মির তুলনায় মৃদু হয়। |
|
তড়িৎ ও চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রভাব |
উভয় ক্ষেত্র দ্বারা বিক্ষিপ্ত হয়। বিক্ষেপের অভিমুখ থেকে এর ধনাত্মক আধান প্রমাণিত হয়। |
α-রশ্মির বিপরীত দিকে এবং অনেক বেশি বাঁকে, যা এর ঋণাত্মক আধান প্রমাণ করে। |
কোনো ক্ষেত্র দ্বারাই বিক্ষিপ্ত হয় না, যা প্রমাণ করে এটি নিস্তড়িৎ। |
তেজস্ক্রিয় রূপান্তর সূত্র
- জনক ও দুহিতা নিউক্লিয়াস: যে তেজস্ক্রিয় মৌলের নিউক্লিয়াসের বিঘটন ঘটে তাকে জনক নিউক্লিয়াস বলে এবং রূপান্তরের পর উৎপন্ন নতুন নিউক্লিয়াসটিকে দুহিতা নিউক্লিয়াস বলে।
আলফা (α) বিঘটন
একটি α-কণা (⁴₂He) নিঃসরণের ফলে জনক নিউক্লিয়াসের ভরসংখ্যা ৪ একক কমে এবং পারমাণবিক ক্রমাঙ্ক ২ একক কমে যায়। ফলে মৌলটি পর্যায় সারণিতে দুই ঘর বামদিকে সরে যায়।
- সাধারণ সমীকরণ: ᴬzX → ᴬ⁻⁴z₋₂Y + ⁴₂α
- উদাহরণ: ²³⁸₉₂U → ²³⁴₉₀Th + ⁴₂He
বিটা (β) বিঘটন
একটি β-কণা (⁰₋₁e⁻) নিঃসরণের ফলে জনক নিউক্লিয়াসের ভরসংখ্যা অপরিবর্তিত থাকে কিন্তু পারমাণবিক ক্রমাঙ্ক ১ একক বেড়ে যায়। ফলে মৌলটি পর্যায় সারণিতে এক ঘর ডানদিকে সরে যায়।
- সাধারণ সমীকরণ: ᴬzX → ᴬz₊₁Y + ⁰₋₁β
- উদাহরণ: ⁶⁰₂₇Co → ⁶⁰₂₈Ni + ⁰₋₁e⁻
গামা (γ) রশ্মি নিঃসরণ
γ-রশ্মি নিঃসরণের ফলে নিউক্লিয়াসের ভরসংখ্যা বা পারমাণবিক ক্রমাঙ্কের কোনো পরিবর্তন হয় না। কেবল উত্তেজিত নিউক্লিয়াসটি স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে আসে।
- উদাহরণ: প্রথমে β-বিঘটনের ফলে কোবাল্ট থেকে উত্তেজিত নিকেল তৈরি হয়: ⁶⁰₂₇Co → ⁶⁰₂₈Ni* + ⁰₋₁β। এরপর, ⁶⁰₂₈Ni* (উত্তেজিত) → ⁶⁰₂₈Ni (স্থিতিশীল) + γ
তেজস্ক্রিয়তার বৈশিষ্ট্য ও একক
বৈশিষ্ট্য
- এটি একটি নিউক্লিয় ঘটনা।
- এটি একটি স্বতঃস্ফূর্ত, অবিরাম এবং স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
- চাপ, উষ্ণতা, তড়িৎ বা চৌম্বক ক্ষেত্রের মতো বাহ্যিক প্রভাব দ্বারা এটি প্রভাবিত হয় না।
- তেজস্ক্রিয় মৌল যৌগ গঠন করলেও তার তেজস্ক্রিয়তার কোনো পরিবর্তন হয় না।
- সাধারণত ভারী মৌল (যাদের n/p অনুপাত > ১.৫) এই ধর্ম প্রদর্শন করে।
একক
- SI একক: বেকারেল (Becquerel, Bq)
- CGS একক: কুরি (Curie, Ci)
- সম্পর্ক: 1 Ci = 3.7 × 10¹⁰ Bq
নিউক্লিয় শক্তি: ভর ও শক্তির রূপান্তর
আইনস্টাইনের ভর-শক্তি তুল্যতা
১৯০৫ সালে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্বে বলেন যে, ভর ও শক্তি পরস্পরের তুল্য। কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে ভরকে শক্তিতে এবং শক্তিকে ভরে রূপান্তরিত করা সম্ভব।
- সূত্র: E = mc²
- যেখানে, E = শক্তি, m = ভর, c = শূন্য মাধ্যমে আলোর বেগ (3 × 10⁸ m/s)
- তুল্যতা: 1 amu (পারমাণবিক ভর একক) ভরের তুল্য শক্তি হলো 931 MeV (মেগা ইলেকট্রন-ভোল্ট)।
ভর বিচ্যুতি ও বন্ধন শক্তি
- ভর বিচ্যুতি (Mass Defect): পরমাণুর নিউক্লিয়াসের প্রকৃত ভর তার উপাদান কণাগুলির (প্রোটন ও নিউট্রন) মোট ভরের চেয়ে কিছুটা কম হয়। ভরের এই ঘাটতিকে ভর বিচ্যুতি (Δm) বলে।
- সূত্র: Δm = [Z.mₚ + (A – Z).mₙ] – M
- (যেখানে Z = প্রোটন সংখ্যা, A = ভরসংখ্যা, mₚ = প্রোটনের ভর, mₙ = নিউট্রনের ভর, M = নিউক্লিয়াসের প্রকৃত ভর)
- সূত্র: Δm = [Z.mₚ + (A – Z).mₙ] – M
- বন্ধন শক্তি (Binding Energy): নিউক্লিয়াস গঠনের সময় যে পরিমাণ ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হয় (ভর বিচ্যুতির কারণে), সেই শক্তি নিউক্লিয়নের মধ্যে আবদ্ধ থাকে এবং নিউক্লিয়াসকে স্থিতিশীল রাখে। এই শক্তিকে বন্ধন শক্তি বলে।
- সূত্র: E = Δm.c²
- যেসব নিউক্লিয়াসের প্রতি নিউক্লিয়ন বন্ধন শক্তি বেশি (প্রায় 8 MeV), তারা বেশি স্থিতিশীল হয়।
প্রধান নিউক্লিয় বিক্রিয়া
নিউক্লিয় বিভাজন (Nuclear Fission)
যে নিউক্লিয় বিক্রিয়ায় একটি ভারী মৌলের নিউক্লিয়াসকে ধীরগতিসম্পন্ন নিউট্রন দ্বারা আঘাত করলে সেটি প্রায় সমান ভরের দুটি নিউক্লিয়াসে বিভাজিত হয় এবং বিপুল পরিমাণ শক্তি মুক্তি ঘটায়, তাকে নিউক্লিয় বিভাজন বলে।
- এটি একটি অনিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খল বিক্রিয়া (Chain Reaction) হতে পারে, যা পারমাণবিক বোমার মূলনীতি।
- উদাহরণ: ²³⁵₉₂U + ¹₀n → ²³⁶₉₂U* → ¹⁴¹₅₆Ba + ⁹²₃₆Kr + 3¹₀n + ~200 MeV শক্তি
- নিয়ন্ত্রিত প্রয়োগ: নিউক্লিয় চুল্লিতে এই বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রিত করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।
- দুর্ঘটনা: চেরনোবিল (১৯৮৬) এবং ফুকুশিমা (২০১১) নিউক্লিয় চুল্লির ভয়াবহ দুর্ঘটনার উদাহরণ।
নিউক্লিয় সংযোজন (Nuclear Fusion)
যে নিউক্লিয় বিক্রিয়ায় দুই বা ততোধিক হালকা পরমাণুর নিউক্লিয়াস অত্যন্ত উচ্চ উষ্ণতা (প্রায় 10⁷ – 10⁸ K) ও চাপে যুক্ত হয়ে একটি ভারী নিউক্লিয়াস গঠন করে এবং বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত করে, তাকে নিউক্লিয় সংযোজন বলে।
- এই বিক্রিয়াকে তাপ-নিউক্লিয় বিক্রিয়া (Thermonuclear Reaction) বলা হয়।
- উদাহরণ: ²₁H + ²₁H → ³₂He + ¹₀n + 3.27 MeV
- শক্তির উৎস: সূর্য ও অন্যান্য নক্ষত্রের শক্তির উৎস হলো নিউক্লিয় সংযোজন, যেখানে হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস সংযোজিত হয়ে হিলিয়াম তৈরি করে।
- শক্তির পরিমাণ: সংযোজন বিক্রিয়ায় বিভাজনের তুলনায় অনেক বেশি শক্তি উৎপন্ন হয়। ১ গ্রাম হাইড্রোজেনের সংযোজনে নির্গত শক্তি ১ গ্রাম ইউরেনিয়ামের বিভাজনে নির্গত শক্তির চেয়ে প্রায় ৭.৩ গুণ বেশি।
তেজস্ক্রিয়তার ব্যবহারিক প্রয়োগ
|
ক্ষেত্র |
প্রয়োগ |
ব্যবহৃত মৌল |
|
চিকিৎসাক্ষেত্রে |
ক্যানসার কোষ ধ্বংস করা। |
রেডিয়াম, কোবাল্ট-60 (⁶⁰Co) |
|
|
লিউকেমিয়া ও মস্তিষ্কের টিউমারের চিকিৎসা। |
তেজস্ক্রিয় ফসফরাস (³²P) |
|
|
থাইরয়েড রোগের চিকিৎসা। |
তেজস্ক্রিয় আয়োডিন (¹³¹I) |
|
|
রক্ত সঞ্চালনে বাধা নির্ণয়। |
তেজস্ক্রিয় সোডিয়াম (²⁴Na) |
|
বয়স নির্ণয়ে |
পৃথিবী বা প্রাচীন শিলার বয়স নির্ণয় (ইউরেনিয়াম ডেটিং)। |
তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়াম ও সীসার আইসোটোপ (²⁰⁶Pb) |
|
|
জীবাশ্ম বা প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তুর বয়স নির্ণয় (রেডিওকার্বন ডেটিং)। |
কার্বন-14 (¹⁴C) ও কার্বন-12 (¹²C) এর অনুপাত |
|
নিউক্লিয় জ্বালানি |
পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন। |
ইউরেনিয়াম, প্লুটোনিয়াম |
|
শিল্প |
প্রদীপ্ত রং তৈরি (ঘড়ির কাঁটা বা ডায়ালে ব্যবহৃত)। |
জিঙ্ক সালফাইডের সঙ্গে সামান্য রেডিয়াম |
তেজস্ক্রিয়তা: পরমাণুর নিউক্লিয়াসের রহস্য ভেদ
ভূমিকা: তেজস্ক্রিয়তা কী?
তেজস্ক্রিয়তা হলো এমন একটি নিউক্লিয় ঘটনা যেখানে কিছু ভারী মৌলের পরমাণুর নিউক্লিয়াস স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভেঙে গিয়ে আলফা (α), বিটা (β), এবং গামা (γ) নামক অদৃশ্য রশ্মি বিকিরণ করে এবং একটি নতুন মৌলের পরমাণুতে রূপান্তরিত হয়। এই যুগান্তকারী ঘটনাটি আবিষ্কার করেন ফরাসি বিজ্ঞানী হেনরি বেকেরেল।
১. তেজস্ক্রিয়তার মূল ধারণা
তেজস্ক্রিয়তা পরমাণুর নিউক্লিয়াসের একটি অন্তর্নিহিত ধর্ম। এর কিছু মৌলিক ধারণা নিচে আলোচনা করা হলো।
তেজস্ক্রিয়তা (Radioactivity): যে নিউক্লিয় ঘটনার দ্বারা কিছু উচ্চ পারমাণবিক ভরসংখ্যাবিশিষ্ট মৌল বা ভারী মৌলের পরমাণুর নিউক্লিয়াস স্বতঃস্ফূর্তভাবে আলফা (α), বিটা (β) ও গামা (γ) রশ্মি বিকিরণ করে এবং নতুন মৌলের পরমাণুতে রূপান্তরিত হয়, তাকে তেজস্ক্রিয়তা বলে।
তেজস্ক্রিয় মৌল (Radioactive Element): যে সকল মৌলের নিউক্লিয়াস থেকে এই বিশেষ ধরনের অদৃশ্য তেজস্ক্রিয় রশ্মি নির্গত হয়, তাদের তেজস্ক্রিয় মৌল বলা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য (Key Characteristics): তেজস্ক্রিয়তার কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো:
- এটি একটি সম্পূর্ণ নিউক্লিয় ঘটনা, যা পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ভেতরে ঘটে।
- এটি একটি স্বতঃস্ফূর্ত এবং অবিরাম প্রক্রিয়া।
- এই প্রক্রিয়াটি চাপ, উষ্ণতা, বা তড়িৎ ও চৌম্বক ক্ষেত্রের মতো বাহ্যিক প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত হয় না।
- তেজস্ক্রিয় মৌল দিয়ে কোনো যৌগ গঠন করলেও তার তেজস্ক্রিয়তার ধর্মের কোনো পরিবর্তন হয় না।
এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়াটি কেন ঘটে, তা জানতে হলে আমাদের পরমাণুর নিউক্লিয়াসের স্থিতিশীলতার গভীরে যেতে হবে।
২. কেন কিছু মৌল তেজস্ক্রিয় হয়?
তেজস্ক্রিয়তার মূল কারণ হলো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের অস্থিতিশীলতা। একটি নিউক্লিয়াস স্থিতিশীল হবে কি না, তা মূলত তার গঠন এবং কণার অনুপাতের ওপর নির্ভর করে।
- নিউক্লিয়াসের অস্থিতিশীলতা (Nuclear Instability): তেজস্ক্রিয়তার প্রধান কারণ হলো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের অস্থিতিশীলতা।
- নিউট্রন-প্রোটন অনুপাত (Neutron-Proton Ratio): একটি নিউক্লিয়াসের স্থিতিশীলতা তার নিউট্রন (n) এবং প্রোটন (p) সংখ্যার অনুপাতের ওপর নির্ভরশীল। যদি কোনো ভারী মৌলের নিউক্লিয়াসে এই অনুপাত 1.5 -এর চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তবে নিউক্লিয়াসটি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
- ভারী মৌলের প্রবণতা (Tendency in Heavy Elements): সাধারণত যেসব মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা 82 -এর বেশি, তারাই তেজস্ক্রিয় ধর্ম প্রদর্শন করে।
- উদাহরণসহ বিশ্লেষণ (Analysis with an Example): ইউরেনিয়াম-235 (²³⁵₉₂U) একটি পরিচিত তেজস্ক্রিয় মৌল। এর নিউক্লিয়াসের গঠন বিশ্লেষণ করলে তেজস্ক্রিয়তার কারণ স্পষ্ট হয়:
- ভরসংখ্যা (A): 235
- পারমাণবিক সংখ্যা (Z): 92
- নিউট্রন সংখ্যা (n): 235 – 92 = 143 (এখানে পারমাণবিক সংখ্যা Z=92 ব্যবহার করা হয়েছে)
- n/p অনুপাত: 143 / 92 ≈ 1.55, যা 1.5 -এর চেয়ে বেশি।
যেহেতু ইউরেনিয়ামের নিউট্রন-প্রোটন অনুপাত 1.5 -এর বেশি, তাই এর নিউক্লিয়াস অস্থিতিশীল এবং এটি একটি তেজস্ক্রিয় মৌল।
তেজস্ক্রিয়তা প্রকৃতিতে স্বাভাবিকভাবে ঘটতে পারে, আবার গবেষণাগারে কৃত্রিমভাবেও তৈরি করা যায়।
৩. তেজস্ক্রিয়তার প্রকারভেদ
উৎস অনুসারে তেজস্ক্রিয়তাকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়: প্রাকৃতিক এবং কৃত্রিম।
|
বৈশিষ্ট্য |
প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয়তা |
কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা |
|
সংজ্ঞা |
প্রকৃতিতে স্বাভাবিকভাবে প্রাপ্ত কিছু ভারী মৌল যে তেজস্ক্রিয় ধর্ম প্রদর্শন করে, তাকে প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয়তা বলে। |
অপেক্ষাকৃত হালকা স্থিতিশীল মৌলকে নিউট্রন বা প্রোটনের মতো উচ্চ গতিসম্পন্ন কণা দ্বারা আঘাত করে কৃত্রিম উপায়ে তেজস্ক্রিয় করে তোলার পদ্ধতিকে কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা বলে। |
|
উদাহরণ |
ইউরেনিয়াম (Uranium), থোরিয়াম (Thorium), অ্যাকটিনিয়াম (Actinium) ইত্যাদি। |
স্থিতিশীল অ্যালুমিনিয়ামকে (²⁷Al) কণা দ্বারা আঘাত করে তেজস্ক্রিয় ফসফরাসে (³⁰P) পরিণত করা, যা কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তার একটি উদাহরণ। |
এই তেজস্ক্রিয় প্রক্রিয়া চলাকালীন যে অদৃশ্য রশ্মি নির্গত হয়, তাদের ধর্ম ও প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন।
৪. অদৃশ্য রশ্মি: আলফা, বিটা ও গামা
তেজস্ক্রিয় মৌলের নিউক্লিয়াস থেকে তিন ধরনের রশ্মি নির্গত হতে পারে: আলফা (α) রশ্মি, বিটা (β) রশ্মি এবং গামা (γ) রশ্মি। এদের ধর্মগুলো নিচে ছকের মাধ্যমে তুলনা করা হলো।
|
ধর্ম |
আলফা (α) রশ্মি |
বিটা (β) রশ্মি |
গামা (γ) রশ্মি |
|
প্রকৃতি |
দুই একক ধনাত্মক আধানবিশিষ্ট হিলিয়াম আয়ন (He²⁺) বা α-কণার স্রোত। |
দ্রুতগামী ইলেকট্রন কণার (⁰₋₁e⁻) স্রোত। |
উচ্চ শক্তিসম্পন্ন তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ। |
|
আধান |
প্রোটনের আধানের দ্বিগুণ (+3.204 × 10⁻¹⁹ কুলম্ব)। |
ইলেকট্রনের আধানের সমান (-1.602 × 10⁻¹⁹ কুলম্ব)। |
নিস্তড়িৎ (আধানহীন)। |
|
ভর |
একটি প্রোটনের ভরের চারগুণ (6.642 × 10⁻²⁷ কেজি)। |
একটি ইলেকট্রনের ভরের সমান (9.1 × 10⁻³¹ কেজি)। |
ভরহীন। |
|
গতিবেগ |
আলোর বেগের প্রায় ১০%। |
আলোর বেগের ৯০% পর্যন্ত (প্রায় 2.7×10⁸ মি/সে)। |
আলোর বেগের সমান (3 x 10⁸ মি/সে)। |
|
ভেদন ক্ষমতা |
কম। ০.০১ মিমি পুরু অ্যালুমিনিয়াম পাত দ্বারা আটকানো যায়। |
মাঝারি (α-এর প্রায় ১০০ গুণ)। ১ সেমি পুরু অ্যালুমিনিয়াম পাত দ্বারা আটকানো যায়। |
খুব উচ্চ (α-এর প্রায় ১০,০০০ গুণ)। ১০০ সেমি পুরু অ্যালুমিনিয়াম পাতও ভেদ করতে পারে। |
|
গ্যাসকে আয়নিত করার ক্ষমতা |
সর্বোচ্চ। |
α-এর চেয়ে কম কিন্তু γ-এর চেয়ে বেশি। |
সর্বনিম্ন। |
|
তড়িৎ ও চৌম্বক ক্ষেত্রে প্রভাব |
বিক্ষিপ্ত হয়, যা এর ধনাত্মক আধান প্রমাণ করে। |
α-এর চেয়ে বেশি এবং বিপরীত দিকে বিক্ষিপ্ত হয়, যা এর ঋণাত্মক আধান প্রমাণ করে। |
কোনো বিক্ষেপণ হয় না, যা প্রমাণ করে এটি নিস্তড়িৎ। |
এই রশ্মিগুলো নির্গত হওয়ার সময় মৌলের নিউক্লিয়াসে কী পরিবর্তন আসে তা নিচে উল্লেখ করা হলো।
- আলফা (α) বিঘটন: যখন একটি নিউক্লিয়াস থেকে একটি α-কণা নির্গত হয়, তখন মৌলটির ভরসংখ্যা ৪ এবং পারমাণবিক সংখ্যা ২ কমে যায়।
- সাধারণ সূত্র:
ᴬzX → ᴬ⁻⁴z₋₂Y + ⁴₂He - উদাহরণ: ইউরেনিয়াম থেকে থোরিয়াম-এ রূপান্তর:
²³⁸₉₂U → ²³⁴₉₀Th + ⁴₂He
- সাধারণ সূত্র:
- বিটা (β) বিঘটন: যখন একটি নিউক্লিয়াস থেকে একটি β-কণা নির্গত হয়, তখন মৌলটির ভরসংখ্যা অপরিবর্তিত থাকে কিন্তু পারমাণবিক সংখ্যা ১ বৃদ্ধি পায়।
- সাধারণ সূত্র:
ᴬzX → ᴬz₊₁Y + ⁰₋₁e - উদাহরণ: কোবাল্ট থেকে নিকেল-এ রূপান্তর:
⁶⁰₂₇Co → ⁶⁰₂₈Ni + ⁰₋₁e
- সাধারণ সূত্র:
- গামা (γ) রশ্মি নিঃসরণ: সাধারণত আলফা বা বিটা বিঘটন ঘটার পর নতুন সৃষ্ট নিউক্লিয়াসটি উত্তেজিত (excited) অবস্থায় থাকে। এই উত্তেজিত নিউক্লিয়াস যখন স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে আসে, তখন অতিরিক্ত শক্তি গামা রশ্মি হিসেবে নির্গত হয়। এর ফলে মৌলের ভরসংখ্যা বা পারমাণবিক সংখ্যার কোনো পরিবর্তন হয় না।
- উদাহরণ: উত্তেজিত নিকেল থেকে স্থিতিশীল নিকেল-এ রূপান্তর:
⁶⁰₂₈Ni* → ⁶⁰₂₈Ni + γ
- উদাহরণ: উত্তেজিত নিকেল থেকে স্থিতিশীল নিকেল-এ রূপান্তর:
তেজস্ক্রিয়তার এই ধর্মগুলোকে কাজে লাগিয়ে মানবকল্যাণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ করা হয়।
৫. তেজস্ক্রিয়তার ব্যবহারিক প্রয়োগ
তেজস্ক্রিয়তার ধর্ম কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিভিন্ন শাখায় এর বহুমুখী ব্যবহার করা হয়।
- চিকিৎসাবিজ্ঞানে:
- ক্যান্সার রোগের চিকিৎসায়: ক্যানসারে আক্রান্ত কোষ ধ্বংস করতে তেজস্ক্রিয় রেডিয়াম এবং কোবাল্ট (⁶⁰Co) ব্যবহৃত হয়।
- লিউকেমিয়া ও মস্তিষ্কের টিউমারের চিকিৎসায়: তেজস্ক্রিয় ফসফরাস (³²P) ব্যবহার করা হয়।
- থাইরয়েড রোগের চিকিৎসায়: তেজস্ক্রিয় আয়োডিন (¹³¹I) ব্যবহার করা হয়।
- রক্ত সঞ্চালনের বাধা নির্ণয়ে: শরীরে রক্ত চলাচলে কোনো বাধা আছে কি না, তা জানতে তেজস্ক্রিয় সোডিয়াম (²⁴Na) ব্যবহার করা হয়।
- বয়স নির্ণয়ে:
- পৃথিবীর বয়স নির্ণয়ে: তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়ামের ক্ষয়ের হার বিশ্লেষণ করে পৃথিবীর বয়স নির্ণয় করা হয় (ইউরেনিয়াম ডেটিং)।
- জীবাশ্মের বয়স নির্ণয়ে: জীবাশ্ম বা বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তুর বয়স নির্ণয় করতে তেজস্ক্রিয় কার্বন (¹⁴C) ব্যবহৃত হয় (রেডিওকার্বন ডেটিং)।
- নিউক্লিয় জ্বালানি হিসেবে:
- পারমাণবিক চুল্লিতে ইউরেনিয়াম, প্লুটোনিয়াম ইত্যাদি তেজস্ক্রিয় মৌলকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপাদন করা হয়।
- প্রদীপ্ত রঙ প্রস্তুতিতে:
- জিঙ্ক সালফাইডের সঙ্গে সামান্য রেডিয়াম মিশিয়ে প্রদীপ্ত রঙ তৈরি করা হয়, যা অন্ধকারে জ্বলে। এটি ঘড়ির কাঁটা ও ডায়ালে ব্যবহার করা হয়।
তেজস্ক্রিয়তার মাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপাদিত হয়, তার পেছনের মূলনীতি হলো নিউক্লিয় শক্তি।
৬. নিউক্লিয় শক্তি: ভরের শক্তিতে রূপান্তর
তেজস্ক্রিয়তা এবং নিউক্লিয় শক্তি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এর মূলে রয়েছে আইনস্টাইনের বিখ্যাত ভর-শক্তি সমীকরণ।
- ভর ও শক্তির তুল্যতা (Mass-Energy Equivalence): বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন তাঁর বিখ্যাত সমীকরণ
E = mc²-এর মাধ্যমে দেখান যে, ভর (m) এবং শক্তি (E) পরস্পরের তুল্য। অর্থাৎ, উপযুক্ত পরিস্থিতিতে ভরকে শক্তিতে এবং শক্তিকে ভরে রূপান্তরিত করা সম্ভব। - ভর ত্রুটি ও বন্ধন শক্তি (Mass Defect & Binding Energy): কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের প্রকৃত ভর তার ভেতরের প্রোটন ও নিউট্রনগুলোর মোট ভরের চেয়ে কিছুটা কম হয়। ভরের এই পার্থক্যকে ভর ত্রুটি (Mass Defect) বলে। আইনস্টাইনের E=mc² সূত্রানুযায়ী, এই হারিয়ে যাওয়া ভরই বিপুল পরিমাণ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়, যা বন্ধন শক্তি (Binding Energy) হিসেবে নিউক্লিয়নগুলোকে (প্রোটন ও নিউট্রন) একত্রে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ রাখে। এই বন্ধন শক্তির ভিন্নতাই নিউক্লিয় বিভাজন ও সংযোজন প্রক্রিয়ায় শক্তি নির্গমনের মূল কারণ।
- নিউক্লিয় বিভাজন (Nuclear Fission):
- এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে একটি ভারী নিউক্লিয়াসকে ভেঙে প্রায় সমান ভরের দুটি হালকা নিউক্লিয়াসে পরিণত করা হয় এবং এর ফলে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়। এর কারণ হলো, বিভাজনের পর সৃষ্ট হালকা নিউক্লিয়াস দুটির মোট ভর মূল ভারী নিউক্লিয়াসটির ভরের চেয়ে কম হয়। এই হারানো ভরই শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে নির্গত হয়।
- পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে (নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া) এবং পারমাণবিক বোমায় (অনিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া) এই নীতি ব্যবহার করা হয়।
- নিউক্লিয় সংযোজন (Nuclear Fusion):
- এই প্রক্রিয়ায় দুই বা ততোধিক হালকা নিউক্লিয়াস অত্যন্ত উচ্চ তাপ ও চাপে একত্রিত হয়ে একটি ভারী নিউক্লিয়াস গঠন করে এবং বিভাজনের চেয়েও অনেক বেশি শক্তি নির্গত করে। এখানেও, নতুন সৃষ্ট ভারী নিউক্লিয়াসটির ভর হালকা নিউক্লিয়াসগুলোর মোট ভরের চেয়ে কম হয়, এবং এই ভরের পার্থক্যই বিপুল শক্তি হিসেবে মুক্তি পায়।
- সূর্য এবং অন্যান্য নক্ষত্রের শক্তির উৎস হলো নিউক্লিয় সংযোজন। এই প্রক্রিয়া ঘটানোর জন্য অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়।
উপসংহার: সারসংক্ষেপ
তেজস্ক্রিয়তা பற்றிய এই আলোচনা থেকে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি:
- তেজস্ক্রিয়তা একটি প্রাকৃতিক নিউক্লিয় ঘটনা, যা মূলত ভারী নিউক্লিয়াসের অস্থিতিশীলতার (নিউট্রন-প্রোটন অনুপাত > 1.5) কারণে ঘটে।
- এই প্রক্রিয়া থেকে নির্গত আলফা, বিটা ও গামা রশ্মির প্রত্যেকের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা এদেরকে একদিকে যেমন বিভিন্ন ক্ষেত্রে উপকারী করে তুলেছে, তেমনই বিপজ্জনকও বটে।
- এই নিউক্লিয় প্রক্রিয়াটি চিকিৎসাবিজ্ঞান থেকে শুরু করে নিউক্লিয় বিভাজন (fission) ও সংযোজন (fusion) -এর মাধ্যমে বিপুল শক্তি উৎপাদনের মতো শক্তিশালী প্রয়োগের ভিত্তি স্থাপন করেছে।
দশম শ্রেণী ভৌত বিজ্ঞান: পরমাণুর নিউক্লিয়াস (অধ্যয়ন নির্দেশিকা)
এই অধ্যয়ন নির্দেশিকাটি দশম শ্রেণীর ভৌত বিজ্ঞানের ‘পরমাণুর নিউক্লিয়াস’ অধ্যায়টির একটি বিশদ পর্যালোচনা। এখানে মূল ধারণা, সংজ্ঞা এবং প্রক্রিয়াগুলি সহজভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের জ্ঞান যাচাই করার জন্য একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব, উত্তরমালা, সম্ভাব্য রচনামূলক প্রশ্ন এবং একটি পরিভাষা কোষ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (Quiz)
নির্দেশনা: নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর ২-৩টি বাক্যে দিন।
১. তেজস্ক্রিয়তা বলতে কী বোঝায়? এর আবিষ্কারক কে?
২. তেজস্ক্রিয়তার মূল কারণ কী? কোন ধরনের মৌল সাধারণত তেজস্ক্রিয় হয়?
৩. আলফা (α) ও বিটা (β) কণার প্রকৃতি ও আধান কী?
৪. গামা (γ) রশ্মি নিঃসরণের ফলে পরমাণুর ভরসংখ্যা ও পারমাণবিক সংখ্যার কী পরিবর্তন হয় এবং কেন?
৫. নিউক্লিয় বিভাজন এবং নিউক্লিয় সংযোজনের মধ্যে দুটি মূল পার্থক্য লিখুন।
৬. ভর ত্রুটি কী? এটি কীভাবে নিউক্লিয়াসের বন্ধন শক্তির সাথে সম্পর্কিত?
৭. একটি বিটা (β) কণা নিঃসরণের ফলে জনক নিউক্লিয়াসের কী পরিবর্তন ঘটে এবং পর্যায় সারণীতে নতুন মৌলটির অবস্থান কোথায় হয়?
৮. চিকিৎসা ক্ষেত্রে তেজস্ক্রিয়তার দুটি ব্যবহারিক প্রয়োগ উল্লেখ করুন।
৯. নিউক্লিয় শৃঙ্খল বিক্রিয়া বলতে কী বোঝায়? এটি কোথায় ব্যবহৃত হয়?
১০. সূর্য এবং অন্যান্য নক্ষত্রের শক্তির উৎস কী? এই প্রক্রিয়াটিকে কী বলা হয়?
——————————————————————————–
উত্তরমালা (Answer Key)
১. তেজস্ক্রিয়তা হলো এমন একটি নিউক্লিয় ঘটনা যেখানে কিছু উচ্চ পারমাণবিক ভরসংখ্যাবিশিষ্ট মৌলের পরমাণুর নিউক্লিয়াস স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিভাজিত হয়ে আলফা, বিটা ও গামা রশ্মি বিকিরণ করে এবং নতুন মৌলের পরমাণুতে রূপান্তরিত হয়। ফরাসি বিজ্ঞানী হেনরি বেকেরেল তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার করেন।
২. তেজস্ক্রিয়তার মূল কারণ হলো নিউক্লিয়াসের অস্থিতিশীলতা, যা মূলত নিউট্রন ও প্রোটন সংখ্যার অনুপাতের ওপর নির্ভরশীল। যখন এই অনুপাত (n/p) ১.৫-এর বেশি হয়, তখন নিউক্লিয়াস অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। সাধারণত যেসব মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা ৮২-এর বেশি, সেই ভারী মৌলগুলি তেজস্ক্রিয় ধর্ম প্রদর্শন করে।
৩. আলফা (α) কণা হলো দুই একক ধনাত্মক আধানযুক্ত হিলিয়াম আয়ন (He²⁺) বা দ্রুতগামী হিলিয়াম নিউক্লিয়াসের স্রোত। এর আধান প্রোটনের আধানের দ্বিগুণ (+3.204 × 10⁻¹⁹ কুলম্ব)। বিটা (β) কণা হলো দ্রুতগামী ইলেকট্রন কণার স্রোত (⁰₋₁e), এবং এর আধান ঋণাত্মক (-1.602 × 10⁻¹⁹ কুলম্ব)।
৪. গামা (γ) রশ্মি নিঃসরণের ফলে পরমাণুর ভরসংখ্যা বা পারমাণবিক সংখ্যার কোনো পরিবর্তন হয় না। কারণ গামা রশ্মি হলো উচ্চ শক্তিসম্পন্ন তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ বা ফোটন কণার স্রোত; এটি কোনো কণা নয়। যখন উত্তেজিত নিউক্লিয়াস স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে আসে, তখন অতিরিক্ত শক্তি গামা রশ্মি রূপে নির্গত হয়।
৫. নিউক্লিয় বিভাজনে একটি ভারী নিউক্লিয়াস ভেঙে প্রায় সমান ভরের দুটি হালকা নিউক্লিয়াসে পরিণত হয়, কিন্তু নিউক্লিয় সংযোজনে দুই বা ততোধিক হালকা নিউক্লিয়াস যুক্ত হয়ে একটি ভারী নিউক্লিয়াস গঠন করে। বিভাজন বিক্রিয়া ধীরগতিসম্পন্ন নিউট্রন দ্বারা শুরু করা যায়, কিন্তু সংযোজন বিক্রিয়ার জন্য অতি উচ্চ উষ্ণতা (প্রায় ১০⁷ থেকে ১০⁸ K) ও চাপের প্রয়োজন হয়।
৬. কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসে অবস্থিত প্রোটন ও নিউট্রনগুলির মোট ভরের চেয়ে নিউক্লিয়াসটির প্রকৃত ভর কিছুটা কম হয়; ভরের এই ঘাটতিকে ভর ত্রুটি বলে। আইনস্টাইনের ভর-শক্তি তুল্যতা নীতি (E=mc²) অনুযায়ী, এই হারানো ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হয়, যা নিউক্লিয়াসের বন্ধন শক্তি হিসেবে নিউক্লিয়নগুলিকে একত্রে ধরে রাখে।
৭. একটি বিটা (β) কণা নিঃসরণের ফলে নিউক্লিয়াসের ভরসংখ্যার কোনো পরিবর্তন হয় না, কিন্তু পারমাণবিক সংখ্যা ১ একক বৃদ্ধি পায়। এর ফলে পর্যায় সারণীতে উৎপন্ন নতুন মৌলটির (দুহিতা মৌল) অবস্থান মূল মৌলটির (জনক মৌল) সাপেক্ষে এক ঘর ডানদিকে সরে যায়।
৮. চিকিৎসা ক্ষেত্রে তেজস্ক্রিয়তার দুটি প্রয়োগ হলো: ক) ক্যানসার কোষ ধ্বংস করার জন্য তেজস্ক্রিয় কোবাল্ট (⁶⁰Co) বা রেডিয়াম ব্যবহৃত হয়। খ) থাইরয়েড রোগের চিকিৎসায় তেজস্ক্রিয় আয়োডিন (¹³¹I) এবং লিউকেমিয়া বা মস্তিষ্কের টিউমারের চিকিৎসায় তেজস্ক্রিয় ফসফরাস (³²P) ব্যবহার করা হয়।
৯. নিউক্লিয় বিভাজন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন নিউট্রনগুলি যখন আবার অন্য নিউক্লিয়াসের বিভাজন ঘটায় এবং এই প্রক্রিয়া পরপর চলতে থাকে, তখন তাকে শৃঙ্খল বিক্রিয়া বলে। এই নীতি পারমাণবিক বোমা (অনিয়ন্ত্রিত বিক্রিয়া) এবং নিউক্লিয় চুল্লিতে শক্তি উৎপাদন (নিয়ন্ত্রিত বিক্রিয়া) করার জন্য ব্যবহৃত হয়।
১০. সূর্য এবং অন্যান্য নক্ষত্রের শক্তির উৎস হলো নিউক্লিয় সংযোজন বিক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় অতি উচ্চ উষ্ণতা ও চাপে নক্ষত্রের অভ্যন্তরে হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসগুলি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে হিলিয়াম নিউক্লিয়াস গঠন করে এবং বিপুল পরিমাণ তাপ ও আলোকশক্তি নির্গত হয়। এই বিক্রিয়াকে তাপ-নিউক্লিয় বিক্রিয়াও বলা হয়।
——————————————————————————–
রচনামূলক প্রশ্ন (Essay Format Questions)
১. আলফা, বিটা ও গামা রশ্মির ধর্মগুলির তুলনামূলক আলোচনা করুন (প্রকৃতি, ভর, আধান, ভেদন ক্ষমতা, আয়নায়ন ক্ষমতা এবং তড়িৎ ও চৌম্বক ক্ষেত্রে প্রভাবের ভিত্তিতে)।
২. আইনস্টাইনের ভর-শক্তি তুল্যতা সমীকরণটি লেখ এবং এর সাহায্যে ‘ভর ত্রুটি’ ও ‘নিউক্লিয় বন্ধন শক্তি’-র ধারণা ব্যাখ্যা কর। একটি নিউক্লিয়াসের স্থায়িত্ব কীভাবে বন্ধন শক্তির উপর নির্ভর করে?
৩. নিউক্লিয় বিভাজন বিক্রিয়াটি ইউরেনিয়ামের উদাহরণসহ ব্যাখ্যা কর। নিয়ন্ত্রিত ও অনিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খল বিক্রিয়ার মধ্যে পার্থক্য কী এবং এদের প্রয়োগ কোথায় দেখা যায়?
৪. তেজস্ক্রিয়তার বিভিন্ন ব্যবহারিক প্রয়োগগুলি বিস্তারিত আলোচনা কর, বিশেষ করে চিকিৎসা, বয়স নির্ণয় এবং শিল্পক্ষেত্রে এর ভূমিকা উল্লেখ কর।
৫. নিউক্লিয় সংযোজন বিক্রিয়াকে তাপ-নিউক্লিয় বিক্রিয়া বলা হয় কেন? এই বিক্রিয়ায় কীভাবে বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয়, উদাহরণসহ ব্যাখ্যা কর। নিউক্লিয় বিভাজনের তুলনায় এর সুবিধা কী?
——————————————————————————–
পরিভাষা কোষ (Glossary)
|
পরিভাষা (Term) |
সংজ্ঞা (Definition) |
|
তেজস্ক্রিয়তা (Radioactivity) |
যে নিউক্লিয় ঘটনায় কিছু উচ্চ পারমাণবিক ভরসংখ্যাবিশিষ্ট মৌলের নিউক্লিয়াস স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিভাজিত হয়ে আলফা (α), বিটা (β) ও গামা (γ) রশ্মি বিকিরণ করে এবং নতুন মৌলে রূপান্তরিত হয়। |
|
আলফা কণা (Alpha Particle) |
দুই একক ধনাত্মক আধানযুক্ত হিলিয়াম নিউক্লিয়াস (⁴₂He²⁺)। এর নিঃসরণে মৌলের ভরসংখ্যা ৪ একক এবং পারমাণবিক সংখ্যা ২ একক কমে যায়। |
|
বিটা কণা (Beta Particle) |
একটি দ্রুতগামী ইলেকট্রন কণা (⁰₋₁e)। নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরে একটি নিউট্রন, একটি প্রোটন ও একটি ইলেকট্রনে রূপান্তরিত হলে এই কণা নির্গত হয়। |
|
গামা রশ্মি (Gamma Ray) |
উচ্চ শক্তিসম্পন্ন, ভরহীন ও আধানহীন তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ। উত্তেজিত নিউক্লিয়াস সুস্থিত অবস্থায় আসার সময় এই রশ্মি নির্গত হয়। |
|
জনক নিউক্লিয়াস (Parent Nucleus) |
যে তেজস্ক্রিয় মৌলের কেন্দ্রক বা নিউক্লিয়াসের তেজস্ক্রিয় বিকিরণের ফলে विघটন ঘটে। |
|
দুহিতা নিউক্লিয়াস (Daughter Nucleus) |
জনক নিউক্লিয়াস থেকে তেজস্ক্রিয় রশ্মি নির্গমনের ফলে যে নতুন নিউক্লিয়াস উৎপন্ন হয়। |
|
ভর ত্রুটি (Mass Defect) |
কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের প্রকৃত ভর এবং এর উপাদান প্রোটন ও নিউট্রনগুলির মোট ভরের মধ্যেকার পার্থক্য। এই হারানো ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। |
|
বন্ধন শক্তি (Binding Energy) |
যে পরিমাণ শক্তি নির্গত হলে একটি নিউক্লিয়াসের উপাদান নিউক্লিয়নসমূহ (প্রোটন ও নিউট্রন) একত্রে মিলিত হয়ে নিউক্লিয়াস গঠন করে। এই শক্তি নিউক্লিয়নগুলিকে একত্রে আবদ্ধ রাখে। |
|
নিউক্লিয় বিভাজন (Nuclear Fission) |
যে নিউক্লিয় বিক্রিয়ায় একটি ভারী মৌলের নিউক্লিয়াসকে নিউট্রন দ্বারা আঘাত করলে তা প্রায় সমান ভরের দুটি হালকা নিউক্লিয়াসে বিভাজিত হয় এবং বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত করে। |
|
নিউক্লিয় সংযোজন (Nuclear Fusion) |
যে নিউক্লিয় বিক্রিয়ায় অতি উচ্চ উষ্ণতা ও চাপে দুই বা ততোধিক হালকা নিউক্লিয়াস সংযুক্ত হয়ে একটি ভারী নিউক্লিয়াস গঠন করে এবং বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত করে। |
|
শৃঙ্খল বিক্রিয়া (Chain Reaction) |
নিউক্লিয় বিভাজনে উৎপন্ন নিউট্রন যখন পরবর্তী নিউক্লিয়াসগুলির বিভাজন ঘটায় এবং বিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে থাকে, সেই প্রক্রিয়া। |
|
বেকেরেল (Becquerel – Bq) |
তেজস্ক্রিয়তার SI একক। |
|
কুরি (Curie – Ci) |
তেজস্ক্রিয়তার CGS একক। 1 Ci = 3.7 × 10¹⁰ Bq। |
|
রেডিও কার্বন ডেটিং |
কোনো জীবাশ্ম বা পুরাতাত্ত্বিক বস্তুর মধ্যে ¹⁴C এবং ¹²C-এর অনুপাত নির্ণয় করে তাদের বয়স নির্ধারণ করার পদ্ধতি। |
আলফা (α), বিটা (β) ও গামা (γ) রশ্মির তুলনামূলক আলোচনা
1.0 ভূমিকা: তেজস্ক্রিয় রশ্মি কী?
তেজস্ক্রিয়তা হলো এমন একটি নিউক্লিয় ঘটনা যেখানে কিছু ভারী মৌলের পরমাণুর অস্থিতিশীল নিউক্লিয়াস স্বতঃস্ফূর্তভাবে আলফা, বিটা বা গামা-র মতো অদৃশ্য রশ্মি বিকিরণ করে একটি নতুন মৌলের নিউক্লিয়াসে রূপান্তরিত হয়, যে প্রক্রিয়াটিকে তেজস্ক্রিয় বিঘটন বলা হয়। এই সহায়িকাটিতে, আমরা এই তিন প্রকার তেজস্ক্রিয় রশ্মির মৌলিক ধর্মগুলির মধ্যে একটি বিস্তারিত তুলনামূলক আলোচনা করব।
1.1 এই রশ্মিগুলির উৎস
তেজস্ক্রিয় মৌল থেকে এই বিশেষ রশ্মিগুলো নির্গত হওয়ার মূল কারণ হলো নিউক্লিয়াসের অস্থিতিশীলতা। এর উৎসকে আমরা দুটি মূল পয়েন্টে ভাগ করতে পারি:
- কেন নির্গত হয়: যখন কোনো ভারী মৌলের নিউক্লিয়াসে নিউট্রন ও প্রোটনের সংখ্যার অনুপাত (n/p) প্রায় ১.৫-এর চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখন নিউক্লিয়াসটি অত্যন্ত অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
- লক্ষ্য: স্থায়িত্ব লাভ করার জন্য, এই অস্থিতিশীল নিউক্লিয়াসগুলি স্বতঃস্ফূর্তভাবে আলফা (α), বিটা (β), বা গামা (γ) রশ্মি বিকিরণ করে।
এখন, আমরা একটি সারণির মাধ্যমে এই তিনটি রশ্মির প্রধান ধর্মগুলির মধ্যে পার্থক্য বিস্তারিতভাবে দেখব।
2.0 আলফা, বিটা ও গামা রশ্মির ধর্ম: একটি তুলনামূলক সারণি
|
ধর্ম |
আলফা (α) রশ্মি |
বিটা (β) রশ্মি |
গামা (γ) রশ্মি |
|
প্রকৃতি |
দুই একক ধনাত্মক আধানবিশিষ্ট হিলিয়াম আয়ন (He²⁺) বা দ্রুতগামী α-কণার স্রোত। |
দ্রুতগামী ইলেকট্রন কণার স্রোত (e⁻)। |
অতি ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যবিশিষ্ট এবং উচ্চ শক্তিসম্পন্ন তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ। |
|
আধান |
ধনাত্মক (+)। প্রোটনের আধানের দ্বিগুণ (প্রায় +3.204 × 10⁻¹⁹ কুলম্ব)। |
ঋণাত্মক (-)। ইলেকট্রনের আধানের সমান (-1.602 × 10⁻¹⁹ কুলম্ব)। |
নিস্তড়িৎ বা আধানহীন। |
|
ভর |
একটি প্রোটনের ভরের প্রায় চারগুণ (6.642 × 10⁻²⁷ kg)। |
একটি ইলেকট্রনের ভরের সমান (9.1 × 10⁻³¹ kg), যা নগণ্য। |
এই রশ্মি ভরহীন। |
|
গতিবেগ |
আলোর বেগের প্রায় ১০%। |
আলোর বেগের প্রায় ৯০% (প্রায় 2.7×10⁸ m/s)। |
শূন্যস্থানে আলোর বেগের সমান (3 x 10⁸ m/s)। |
|
ভেদন ক্ষমতা |
কম। আকার বড় এবং গতিবেগ কম হওয়ায় এর ভেদন ক্ষমতা সবচেয়ে কম। 0.01 mm পুরু অ্যালুমিনিয়াম পাত ভেদ করতে পারে না। |
মাঝারি। ভেদন ক্ষমতা α-কণার তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি। 1 cm পুরু পাত দ্বারা আটকানো যায়। |
সর্বোচ্চ। ভেদন ক্ষমতা α-কণার তুলনায় প্রায় ১০,০০০ গুণ বেশি। 100 cm পুরু অ্যালুমিনিয়াম পাতও ভেদ করতে পারে। |
|
গ্যাসকে আয়ানিত করার ক্ষমতা |
সর্বোচ্চ। গ্যাসকে আয়নিত করার ক্ষমতা β বা γ-রশ্মির তুলনায় অনেক বেশি। |
মাঝারি। আয়নন ক্ষমতা γ-রশ্মির থেকে বেশি, কিন্তু α-রশ্মির থেকে কম। |
সর্বনিম্ন। গ্যাসকে আয়নিত করার ক্ষমতা α ও β রশ্মির তুলনায় অনেক কম। |
|
প্রতিপ্রভা সৃষ্টির ক্ষমতা |
জিঙ্ক সালফাইড (ZnS) বা বেরিয়াম প্ল্যাটিনোসায়ানাইড পর্দার ওপর তীব্র প্রতিপ্রভা সৃষ্টি করে। |
একই ধরনের পর্দার ওপর মৃদু প্রতিপ্রভা সৃষ্টি করে। |
একই ধরনের প্রতিপ্রভ পর্দায় এর প্রভাব মৃদু, আলফা রশ্মির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। |
|
তড়িৎ ও চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রভাব |
উভয় ক্ষেত্র দ্বারাই বিক্ষিপ্ত হয়। বিক্ষেপের দিক থেকে এর ধনাত্মক আধান প্রমাণিত হয়। |
উভয় ক্ষেত্র দ্বারাই বিক্ষিপ্ত হয়, কিন্তু α-কণার বিপরীত দিকে এবং অনেক বেশি বাঁকে। |
কোনো ক্ষেত্র দ্বারাই বিক্ষিপ্ত হয় না, যা প্রমাণ করে এটি নিস্তড়িৎ। |
এই তুলনার পর, এবার প্রতিটি রশ্মির প্রকৃতি ও নিউক্লিয়াসের উপর তার প্রভাব আলাদাভাবে বোঝা যাক।
3.0 আলফা (α) কণার পরিচয়
আলফা কণা আসলে কী? একটি আলফা কণা প্রকৃতপক্ষে একটি হিলিয়াম নিউক্লিয়াস বা হিলিয়াম আয়ন (He²⁺)। এটি দুটি প্রোটন এবং দুটি নিউট্রন দ্বারা গঠিত। তাই এর ভর সংখ্যা ৪ এবং পারমাণবিক সংখ্যা ২।
3.1 আলফা নিঃসরণের প্রভাব
যখন কোনো তেজস্ক্রিয় জনক নিউক্লিয়াস (parent nucleus) থেকে একটি আলফা কণা নির্গত হয়, তখন উৎপন্ন নতুন নিউক্লিয়াসের (দুহিতা নিউক্লিয়াস) ভর সংখ্যা ৪ একক এবং পারমাণবিক সংখ্যা ২ একক কমে যায়।
ᴬ_Z X → ᴬ⁻⁴_Z₋₂Y + ⁴_₂α
আলফা কণার মতো, বিটা কণাও নিউক্লিয়াসের পরিবর্তন ঘটায়, কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ে।
4.0 বিটা (β) কণার পরিচয়
বিটা কণা আসলে কী? একটি বিটা কণা হলো অত্যন্ত দ্রুত গতিসম্পন্ন ইলেকট্রনের (e⁻) স্রোত। এর উৎস নিউক্লিয়াসের বাইরে থাকা ইলেকট্রন নয়, বরং নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরে একটি নিউট্রন ভেঙে একটি প্রোটন ও একটি ইলেকট্রনে রূপান্তরিত হওয়ার ফলে এই কণাটি উৎপন্ন হয়।
4.1 বিটা নিঃসরণের প্রভাব
যখন কোনো নিউক্লিয়াস থেকে একটি বিটা কণা নির্গত হয়, তখন নিউক্লিয়াসটির ভর সংখ্যার কোনো পরিবর্তন হয় না, কিন্তু পারমাণবিক সংখ্যা ১ একক বৃদ্ধি পায়।
ᴬ_Z X → ᴬ_Z₊₁Y + ⁰_₋₁β
বিটা নিঃসরণের পর নিউক্লিয়াসটি উত্তেজিত অবস্থায় থাকতে পারে, যা গামা রশ্মি নিঃসরণের পথ তৈরি করে।
5.0 গামা (γ) রশ্মির পরিচয়
গামা রশ্মি আসলে কী? গামা রশ্মি কোনো কণা নয়, এটি একটি উচ্চ শক্তিসম্পন্ন তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ বা ফোটন কণার স্রোত। আলফা বা বিটা কণার মতো এর কোনো ভর বা আধান নেই।
5.1 গামা নিঃসরণের প্রভাব
সাধারণত আলফা বা বিটা কণা নিঃসরণের পর নিউক্লিয়াসটি উত্তেজিত বা অস্থিতিশীল অবস্থায় থাকে। এই উত্তেজিত অবস্থা থেকে স্থিতিশীল অবস্থায় বা ভূমিস্তরে ফিরে আসার সময় অতিরিক্ত শক্তি গামা রশ্মি রূপে বিকিরিত হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গামা রশ্মি নিঃসরণের ফলে নিউক্লিয়াসের ভর সংখ্যা বা পারমাণবিক সংখ্যার কোনো পরিবর্তন হয় না।
এখন যেহেতু আমরা প্রতিটি রশ্মির পরিচয় জেনেছি, আসুন তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যগুলো সংক্ষেপে আলোচনা করি।
6.0 মূল পার্থক্য ও সারসংক্ষেপ
একজন শিক্ষার্থীর জন্য আলফা, বিটা ও গামা রশ্মির মধ্যে মূল পার্থক্যগুলি মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি। নিচে তিনটি প্রধান পার্থক্য তুলে ধরা হলো:
- কণার প্রকৃতি ও আধান:
- আলফা (α): এটি একটি ভারী, ধনাত্মক আধানযুক্ত কণা (হিলিয়াম নিউক্লিয়াস)।
- বিটা (β): এটি একটি অত্যন্ত হালকা, ঋণাত্মক আধানযুক্ত কণা (ইলেকট্রন)।
- গামা (γ): এটি কোনো কণাই নয়, বরং আধান ও ভরহীন একটি তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ।
- গুরুত্ব: এদের প্রকৃতি এবং আধানের এই মৌলিক পার্থক্যই এদের বাকি সমস্ত ধর্মের (যেমন ভেদন ক্ষমতা, আয়নন ক্ষমতা) পার্থক্যের মূল কারণ।
- ভেদন ক্ষমতার বিশাল পার্থক্য:
- আলফা কণার আকার বড় এবং আধান বেশি হওয়ায় এটি পদার্থের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় সহজেই অন্য পরমাণুর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং দ্রুত শক্তি হারায়। তাই এর ভেদন ক্ষমতা সবচেয়ে কম।
- গামা রশ্মির কোনো আধান বা ভর না থাকায় এটি পদার্থের সঙ্গে খুব কম প্রতিক্রিয়া করে এবং সহজেই পদার্থ ভেদ করে চলে যেতে পারে। তাই এর ভেদন ক্ষমতা সর্বোচ্চ।
- বিটা কণার ভেদন ক্ষমতা এই দুটির মাঝামাঝি।
- বিষয়টিকে এভাবেও ভাবা যেতে পারে: আলফা কণা একটি বোলিং বলের মতো যা সহজেই বাধা পায়, বিটা কণা একটি টেনিস বলের মতো, এবং গামা রশ্মি একটি লেজার রশ্মির মতো যা প্রায় বাধাহীনভাবে চলে যায়।
- আয়নন ক্ষমতা:
- আলফা কণা সবচেয়ে ভারী এবং এর আধানও সর্বাধিক (+2) হওয়ায় গ্যাসীয় মাধ্যমের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় এটি সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পরমাণুকে আয়নিত করতে পারে। তাই এর আয়নন ক্ষমতা সর্বোচ্চ।
- অন্যদিকে, গামা রশ্মি নিস্তড়িৎ হওয়ায় এর আয়নন ক্ষমতা সবচেয়ে কম বা নগণ্য। এই কারণেই আলফা কণা কণা শনাক্তকারক যন্ত্রে সহজে ধরা পড়ে, কিন্তু গামা রশ্মিকে শনাক্ত করা তুলনামূলকভাবে কঠিন।
7.0 উপসংহার
পরিশেষে, এটি পরিষ্কার যে আলফা, বিটা এবং গামা রশ্মি হলো তিন ধরনের স্বতন্ত্র নিউক্লিয় বিকিরণ। এদের প্রত্যেকের নিজস্ব প্রকৃতি, আধান, ভর এবং শক্তি রয়েছে, যা পদার্থের সাথে তাদের আচরণকে সম্পূর্ণ ভিন্ন করে তোলে। এই পার্থক্যগুলি বোঝা কেবল তেজস্ক্রিয়তার মূল ধারণা স্পষ্ট করতেই সাহায্য করে না, বরং পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন প্রয়োগ বুঝতেও সহায়তা করে।
পারমাণবিক নিউক্লিয়াস এবং তেজস্ক্রিয়তার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
|
বিষয় বা ঘটনা
|
সংজ্ঞা বা বর্ণনা
|
বৈশিষ্ট্য বা উদাহরণ
|
রাসায়নিক সংকেত বা সমীকরণ
|
গুরুত্বপূর্ণ একক বা মান
|
ব্যবহার বা প্রভাব
|
|
|---|---|---|---|---|---|---|
|
তেজস্ক্রিয়তা
|
উচ্চ পারমাণবিক ভর সংখ্যাবিশিষ্ট ভারী মৌলের নিউক্লিয়াস স্বতঃস্ফূর্তভাবে আলফা, বিটা ও গামা রশ্মি বিকিরণ করে নতুন মৌলে রূপান্তরের ঘটনা।
|
এটি একটি নিউক্লীয় ঘটনা; স্বতঃস্ফূর্ত ও অবিরাম প্রক্রিয়া; উষ্ণতা বা চাপের ওপর নির্ভরশীল নয়।
|
(ভারী মৌলের ক্ষেত্রে)
|
SI একক: বেকেরেল (Bq); CGS একক: কুরি (Ci)
|
পৃথিবীর বয়স নির্ণয়, ক্যানসার চিকিৎসা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
|
|
|
আলফা () রশ্মি
|
দুই একক ধনাত্মক আধানবিশিষ্ট হিলিয়াম আয়নের () স্রোত।
|
ভেদন ক্ষমতা কম ( mm Al পাত), কিন্তু আয়নন ক্ষমতা সর্বাধিক।
|
|
আধান: কুলম্ব; গতিবেগ: আলোর বেগের
|
জিঙ্ক সালফাইড পর্দায় তীব্র প্রতিপ্রভা সৃষ্টি করে।
|
|
|
বিটা () রশ্মি
|
নিউক্লিয়াস থেকে নির্গত দ্রুতগামী ইলেকট্রন কণার স্রোত।
|
আধান ঋণাত্মক; ভেদন ক্ষমতা আলফা রশ্মির ১০০ গুণ।
|
|
ভর: kg; গতিবেগ: আলোর বেগের
|
লিউকেমিয়া ও টিউমার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
|
|
|
গামা () রশ্মি
|
নিউক্লিয়াস থেকে নির্গত অতি ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের উচ্চ শক্তি সম্পন্ন তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ।
|
নিস্তড়িৎ এবং ভরহীন; ভেদন ক্ষমতা সর্বাধিক (আলফার ১০,০০০ গুণ)।
|
তথ্যে নেই
|
বেগ: m/s (আলোর বেগের সমান)
|
ক্যানসার কোষ ধ্বংস করতে রেডিওথেরাপিতে ব্যবহৃত হয়।
|
|
|
নিউক্লীয় বিভাজন
|
ভারী মৌলের নিউক্লিয়াসকে নিউট্রন দিয়ে আঘাত করে প্রায় সমান ভরের দুটি নিউক্লিয়াসে ভেঙে ফেলার প্রক্রিয়া।
|
প্রচুর শক্তি নির্গত হয়; এটি শৃঙ্খল বিক্রিয়া (Chain Reaction)। উদাহরণ: পারমাণবিক বোমা।
|
MeV
|
প্রতি বিভাজনে প্রায় MeV শক্তি নির্গত হয়।
|
পারমাণবিক চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিতভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
|
|
|
নিউক্লীয় সংযোজন
|
অতি উচ্চ তাপমাত্রায় দুই বা তার বেশি হালকা নিউক্লিয়াস মিলিত হয়ে একটি ভারী নিউক্লিয়াস গঠনের প্রক্রিয়া।
|
বিভাজনের তুলনায় অনেক বেশি শক্তি নির্গত হয়। সূর্য ও নক্ষত্রের শক্তির উৎস।
|
MeV
|
প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা: – K
|
হাইড্রোজেন বোমা তৈরিতে এবং নক্ষত্রের শক্তি উৎপাদনে।
|
|
|
তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের ব্যবহার
|
চিকিৎসা ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তেজস্ক্রিয় মৌলের আইসোটোপের ব্যবহার।
|
(ক্যানসার), (থাইরয়েড), (কার্বন ডেটিং)।
|
তথ্যে নেই
|
Ci = Bq
|
রোগ নির্ণয়, প্রাচীন বস্তুর বয়স নির্ধারণ এবং শস্যের মানোন্নয়নে।
|
![]()





