চলতড়িৎ: দশম শ্রেণীর মাধ্যমিক পরীক্ষার সম্পূর্ণ সহায়িকা
1.0 তড়িৎ আধান এবং কুলম্বের সূত্র: স্থিরতড়িতের ভিত্তি
1.1 ভূমিকা
চলতড়িৎ বা কারেন্ট ইলেকট্রিসিটি বোঝার জন্য প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হল তড়িৎ আধানের মৌলিক ধারণা অর্জন করা। পদার্থের এই অন্তর্নিহিত ধর্মই স্থিরতড়িৎ এবং চলতড়িতের সমস্ত ঘটনার মূল ভিত্তি। আধানের প্রকৃতি, তাদের মধ্যেকার বল এবং তাদের বৈশিষ্ট্যগুলি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকলে তড়িৎ প্রবাহ, বিভব বা রোধের মতো জটিল বিষয়গুলি বোঝা সম্ভব নয়। তাই, এই অধ্যায়ের ভিত্তি এখানেই স্থাপিত হয়।
1.2 তড়িৎ আধানের সংজ্ঞা
তড়িৎ আধান হলো বস্তুর এমন এক ভৌত ধর্ম যার জন্য বস্তুটি কোনো তড়িদগ্রস্ত বা অন্য বস্তুর উপর বল প্রয়োগ করে। তড়িৎ আধান প্রধানত দুই প্রকার। এর মাত্রা হলো [IT]।
|
আধানের প্রকার |
বাহক কণা ও মান |
|
ধনাত্মক আধান |
প্রোটন (+1.6 × 10⁻¹⁹ C) |
|
ঋণাত্মক আধান |
ইলেকট্রন (–1.6 × 10⁻¹⁹ C) |
এছাড়াও পরমাণুতে নিস্তড়িৎ কণা নিউট্রন থাকে, যার কোনো আধান নেই।
1.3 পরমাণুর নিস্তড়িৎ অবস্থা ও তড়িৎ প্রবাহ
সাধারণ অবস্থায় পরমাণু নিস্তড়িৎ হয়, কারণ পরমাণুতে যতগুলি ঋণাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রন থাকে, ঠিক ততগুলিই ধনাত্মক আধানযুক্ত প্রোটন থাকে। ফলে মোট আধান শূন্য হয়। তড়িৎ প্রবাহের জন্য দায়ী হলো মুক্ত ইলেকট্রনের প্রবাহ। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, তড়িৎ প্রবাহের অভিমুখ ইলেকট্রনের প্রবাহের বিপরীত দিকে, অর্থাৎ ধনাত্মক আধানের প্রবাহের দিকে ধরা হয়।
1.4 আধানের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ
তড়িৎ আধানের কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা নিম্নরূপ:
- আকর্ষণ ও বিকর্ষণ: সমধর্মী তড়িৎ আধান পরস্পরকে বিকর্ষণ করে এবং বিপরীতধর্মী আধান পরস্পরকে আকর্ষণ করে।
- সংরক্ষণ: কোনো বিচ্ছিন্ন সংস্থার (isolated system) মোট আধান সর্বদা সংরক্ষিত বা ধ্রুবক থাকে।
- কোয়ান্টায়ন: কোনো আহিত বস্তুতে উপস্থিত মোট তড়িৎ-আধানের পরিমাণ সর্বদা একটি ইলেকট্রনের আধানের পূর্ণসংখ্যার সরল গুণিতক হয়। একেই আধানের কোয়ান্টায়ন বলা হয়।
- সূত্র:
Q = ne - এখানে,
Q= বস্তুর মোট আধান,n= ইলেকট্রনের সংখ্যা (একটি পূর্ণসংখ্যা) এবংe= একটি ইলেকট্রনের আধান।
- সূত্র:
1.5 কুলম্বের সূত্রের বিশ্লেষণ
দুটি বিন্দু আধানের মধ্যে ক্রিয়াশীল আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বলের মান নির্ণয়ের জন্য কুলম্বের সূত্র ব্যবহৃত হয়। সূত্রটি হলো: দুটি বিন্দু আধানের মধ্যে ক্রিয়াশীল আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বলের মান আধান দুটির গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।
- গাণিতিক রূপ:
F = k * (q1 * q2) / r²- এখানে
Fহলো বল,q1ওq2হলো আধানের পরিমাণ,rহলো আধান দুটির মধ্যবর্তী দূরত্ব এবংkহলো একটি সমানুপাতিক ধ্রুবক, যার মান মাধ্যমের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে।
- এখানে
|
মাধ্যম |
পদ্ধতি |
k-এর মান |
|
বায়ু বা শূন্য |
SI |
|
|
বায়ু বা শূন্য |
CGS |
|
1.6 উপসংহার ও পরবর্তী প্রসঙ্গের সূচনা
এখন পর্যন্ত আমরা স্থির আধানের মধ্যেকার বল নিয়ে আলোচনা করেছি। কিন্তু যদি এই আধানগুলিকে গতিশীল করে তড়িৎপ্রবাহ সৃষ্টি করতে হয়, তবে একটি চালিকাশক্তির প্রয়োজন। এই চালিকাশক্তি হলো তড়িৎক্ষেত্র এবং বিভব প্রভেদ, যা আমাদের পরবর্তী আলোচনার বিষয়।
——————————————————————————–
2.0 তড়িৎক্ষেত্র, বিভব এবং প্রবাহমাত্রা: আধানকে গতিশীল করার চালিকাশক্তি
2.1 ভূমিকা
একটি বর্তনীতে তড়িৎ প্রবাহ নিজে থেকেই ঘটে না। জলের প্রবাহ যেমন উচ্চতার পার্থক্যের কারণে হয়, তেমনই তড়িৎ প্রবাহ বিভবের পার্থক্যের কারণে ঘটে। তড়িৎ বিভব, বিভব প্রভেদ এবং তড়িৎচালক বল (EMF) হলো সেই চালিকাশক্তি যা আধানকে একটি নির্দিষ্ট দিকে প্রবাহিত হতে বাধ্য করে এবং চলতড়িৎ সৃষ্টি করে। এই ধারণাগুলি স্থিরতড়িৎ ও চলতড়িতের মধ্যে সেতু স্থাপন করে।
2.2 মৌলিক সংজ্ঞাসমূহ
- তড়িৎক্ষেত্র (Electric Field): কোনো তড়িৎ আধানের চারপাশে যে অঞ্চল জুড়ে তার আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বল ক্রিয়া করে, সেই অঞ্চলকে ওই আধানের তড়িৎক্ষেত্র বলে।
- তড়িৎবিভব (Electric Potential): অসীম দূরত্ব থেকে একটি একক ধনাত্মক আধানকে তড়িৎক্ষেত্রের কোনো বিন্দুতে আনতে যে পরিমাণ কার্য করতে হয়, তাকে ওই বিন্দুর তড়িৎবিভব বলে। এর সূত্রটি হলো:
V = w/q। - বিভব প্রভেদ (Potential Difference): একটি একক ধনাত্মক আধানকে তড়িৎক্ষেত্রের এক বিন্দু থেকে অপর বিন্দুতে সরাতে যে পরিমাণ কার্য করতে হয়, তাকে ওই দুই বিন্দুর বিভব প্রভেদ বলে। এর সূত্র:
VA – VB = w/q।
2.3 বিভব প্রভেদের বিস্তারিত আলোচনা
বিভব প্রভেদ সম্পর্কিত মূল তথ্যগুলি নিচে সারণিবদ্ধ করা হলো:
|
বৈশিষ্ট্য |
বিবরণ |
|
SI একক |
ভোল্ট (Volt) |
|
CGS একক |
স্ট্যাটভোল্ট (Statvolt) |
|
এককের সম্পর্ক |
1 ভোল্ট = 1/300 স্ট্যাটভোল্ট |
|
মাত্রা |
|
|
1 Volt-এর সংজ্ঞা |
তড়িৎক্ষেত্রের একটি বিন্দু থেকে অপর একটি বিন্দুতে 1 কুলম্ব আধানকে নিয়ে যেতে যদি 1 জুল কার্য করতে হয়, তবে ওই দুই বিন্দুর বিভব প্রভেদকে 1 ভোল্ট বলা হয়। |
|
পরিমাপক যন্ত্র |
ভোল্টমিটার (Voltmeter) |
|
বর্তনীতে সংযোগ |
সমান্তরাল সমবায় (Parallel) |
|
আদর্শ রোধ |
অসীম (Infinite) |
2.4 তড়িৎচালক বল (EMF)
তড়িৎচালক বল (Electromotive Force) হলো কোনো তড়িৎকোষের মধ্যে একক ধনাত্মক আধানকে নিম্নবিভব থেকে উচ্চবিভব প্রান্তে নিয়ে যেতে যে পরিমাণ কার্য করতে হয়। বিভব প্রভেদের সাথে এর মূল পার্থক্য হলো, EMF হলো একটি মুক্ত বর্তনীর (open circuit) দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদ। এর SI এককও ভোল্ট।
2.5 তড়িৎ প্রবাহমাত্রার বিশ্লেষণ
তড়িৎ প্রবাহমাত্রা (Electric Current) হলো কোনো পরিবাহীর যেকোনো প্রস্থচ্ছেদের মধ্য দিয়ে একক সময়ে যে পরিমাণ তড়িৎ আধান প্রবাহিত হয়। এর সূত্র: I = Q/t।
|
বৈশিষ্ট্য |
বিবরণ |
|
SI একক |
অ্যাম্পিয়ার (Ampere, A) |
|
1 অ্যাম্পিয়ারের সংজ্ঞা |
কোনো পরিবাহীর যেকোনো প্রস্থচ্ছেদের মধ্য দিয়ে 1 সেকেন্ড সময়ে 1 কুলম্ব আধান প্রবাহিত হলে প্রবাহমাত্রাকে 1 অ্যাম্পিয়ার বলা হয়। |
|
পরিমাপক যন্ত্র |
অ্যামমিটার (Ammeter) |
|
বর্তনীতে সংযোগ |
শ্রেণী সমবায় (Series) |
|
আদর্শ রোধ |
শূন্য (Zero) |
2.6 উপসংহার ও পরবর্তী প্রসঙ্গের সূচনা
আমরা দেখলাম যে বিভব প্রভেদ প্রয়োগ করলে পরিবাহীর মধ্যে তড়িৎ প্রবাহ সৃষ্টি হয়। কিন্তু এই বিভব প্রভেদ ও প্রবাহমাত্রার মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট গাণিতিক সম্পর্ক রয়েছে। বিদ্যুতের এই অন্যতম মৌলিক সম্পর্কটি ওহমের সূত্র দ্বারা সংজ্ঞায়িত, যা আমরা পরবর্তী বিভাগে আলোচনা করব।
——————————————————————————–
3.0 ওহমের সূত্র এবং রোধ: তড়িৎ প্রবাহের নিয়ন্ত্রক
3.1 ভূমিকা
ওহমের সূত্র (Ohm’s Law) হলো চলতড়িতের একটি কেন্দ্রীয় নীতি, যা একটি পরিবাহীর দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদ (Voltage), তার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তড়িৎ (Current) এবং তার রোধের (Resistance) মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে। যেকোনো বৈদ্যুতিক বর্তনী বিশ্লেষণ ও নকশা করার জন্য এই সূত্রের জ্ঞান অপরিহার্য।
3.2 ওহমের সূত্রের বিবৃতি
সূত্র: পরিবাহীর উষ্ণতা ও অন্যান্য ভৌত অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে, পরিবাহীর মধ্য দিয়ে প্রবাহমাত্রা পরিবাহীর দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদের সমানুপাতিক হয়।
- গাণিতিক রূপ:
V = IR- এখানে,
V= বিভব প্রভেদ,I= প্রবাহমাত্রা এবংRহলো একটি ধ্রুবক, যা পরিবাহীর রোধ নামে পরিচিত।
- এখানে,
- রোধ (Resistance): পরিবাহীর যে ধর্মের জন্য এটি তার মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহকে বাধা দেয়, তাকে ওই পরিবাহীর রোধ বলে। এর SI একক হলো ওহম (Ω) এবং এর মাত্রা হলো
[ML²T⁻³I⁻²]। - 1 ওহমের সংজ্ঞা: কোনো পরিবাহীর দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্য 1 ভোল্ট হলে তার মধ্য দিয়ে 1 অ্যাম্পিয়ার তড়িৎ প্রবাহিত হলে ঐ পরিবাহীর রোধকে 1 ওহম বলা হয়।
3.3 লেখচিত্রের মাধ্যমে বিশ্লেষণ
ওহমের সূত্রকে লেখচিত্রের মাধ্যমেও প্রকাশ করা যায়:
- I-V লেখচিত্র: এই লেখচিত্রে V-অক্ষ বরাবর বিভব প্রভেদ এবং I-অক্ষ বরাবর প্রবাহমাত্রা স্থাপন করলে মূলবিন্দুগামী একটি সরলরেখা পাওয়া যায়।
- নতি (Slope): এই লেখচিত্রের নতি (
I/V) পরিবাহীর পরিবাহিতা (1/R) নির্দেশ করে।
- নতি (Slope): এই লেখচিত্রের নতি (
- V-I লেখচিত্র: এই লেখচিত্রে I-অক্ষ বরাবর প্রবাহমাত্রা এবং V-অক্ষ বরাবর বিভব প্রভেদ স্থাপন করলে মূলবিন্দুগামী একটি সরলরেখা পাওয়া যায়।
- নতি (Slope): এই লেখচিত্রের নতি (
V/I) সরাসরি পরিবাহীর রোধ (R) নির্দেশ করে।
- নতি (Slope): এই লেখচিত্রের নতি (
3.4 রোধের নির্ভরশীলতা
একটি পরিবাহীর রোধ কয়েকটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে:
- দৈর্ঘ্য (l): রোধ পরিবাহীর দৈর্ঘ্যের সমানুপাতিক (
R ∝ l)। - প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল (A): রোধ পরিবাহীর প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফলের ব্যস্তানুপাতিক (
R ∝ 1/A)। - উপাদান: পরিবাহীর উপাদান পরিবর্তন হলে রোধ পরিবর্তিত হয়।
- উষ্ণতা: উষ্ণতার পরিবর্তনের সাথে রোধের পরিবর্তন ঘটে।
3.5 রোধাঙ্ক ও পরিবাহিতাঙ্ক
উপরোক্ত নির্ভরশীলতা থেকে রোধের সূত্রটি হলো R = ρl/A।
- রোধাঙ্ক (Resistivity, ρ): একক দৈর্ঘ্য ও একক প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল বিশিষ্ট কোনো পরিবাহীর রোধকে ওই পরিবাহীর উপাদানের রোধাঙ্ক বলা হয়। এটি শুধুমাত্র উপাদানের প্রকৃতি ও উষ্ণতার উপর নির্ভর করে। এর মাত্রা হলো
[ML³T⁻³I⁻²]। - পরিবাহিতা (Conductance): রোধের অনোন্যক অর্থাৎ
1/R-কে পরিবাহিতা বলে। এটি তড়িৎ প্রবাহে সুবিধার পরিমাপ। - পরিবাহিতাঙ্ক (Conductivity, σ): রোধাঙ্কের অনোন্যককে পরিবাহিতাঙ্ক বলে। অর্থাৎ,
σ = 1/ρ।
3.6 উষ্ণতার প্রভাব
উষ্ণতার সাথে বিভিন্ন পদার্থের রোধাঙ্কের পরিবর্তন ভিন্ন ভিন্ন হয়।
- পরিবাহী (Conductors): পরিবাহী পদার্থের (যেমন: লোহা, তামা, রূপা) উষ্ণতা বাড়ালে রোধাঙ্ক বৃদ্ধি পায়।
- অর্ধপরিবাহী (Semiconductors): অর্ধপরিবাহী পদার্থের (যেমন: জার্মেনিয়াম, সিলিকন) উষ্ণতা বাড়ালে রোধাঙ্ক হ্রাস পায়।
- অতিপরিবাহী (Superconductors): কিছু পদার্থের ক্ষেত্রে, একটি নির্দিষ্ট সংকট উষ্ণতার (critical temperature) নিচে উষ্ণতা কমালে তাদের রোধাঙ্ক হঠাৎ শূন্য হয়ে যায়। যেমন, পারদের সংকট উষ্ণতা 4.2 K এবং সিসার 7 K।
3.7 উপসংহার ও পরবর্তী প্রসঙ্গের সূচনা
যেহেতু রোধ বর্তনীর একটি অপরিহার্য উপাদান, তাই বাস্তব বর্তনীতে প্রয়োজন অনুযায়ী রোধের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য একাধিক রোধকে একত্রিত করতে হয়। এই রোধগুলিকে কীভাবে একত্রিত করা হয় এবং তার ফল কী হয়, তা বোঝা বর্তনী নকশা এবং বিশ্লেষণের পরবর্তী যৌক্তিক পদক্ষেপ।
——————————————————————————–
4.0 রোধের সমবায় এবং তড়িৎকোষ: বর্তনী গঠন ও বিশ্লেষণ
4.1 ভূমিকা
বাস্তব বৈদ্যুতিক বর্তনীতে প্রায়শই একটিমাত্র রোধের পরিবর্তে একাধিক রোধ ব্যবহার করা হয়। কাঙ্ক্ষিত প্রবাহমাত্রা বা বিভব পাওয়ার জন্য এই রোধগুলিকে নির্দিষ্ট উপায়ে সাজানো হয়, যা রোধের সমবায় নামে পরিচিত। শ্রেণী এবং সমান্তরাল—এই দুই প্রকার সমবায় বোঝা বর্তনী বিশ্লেষণ ও নকশার জন্য অপরিহার্য।
4.2 শ্রেণী সমবায় বিশ্লেষণ
যখন একাধিক রোধকে এমনভাবে পরপর যুক্ত করা হয় যে প্রতিটি রোধের মধ্যে দিয়ে একই তড়িৎ প্রবাহ চলে, তখন সেই সমবায়কে শ্রেণী সমবায় (Series Combination) বলে।
- মূল বৈশিষ্ট্য:
- প্রতিটি রোধের মধ্য দিয়ে একই তড়িৎ প্রবাহ (
I) চলে। - প্রতিটি রোধের দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদ ভিন্ন হয় (
V = V1 + V2 + V3 ...)। - তুল্য রোধের সূত্র:
RS = R1 + R2 + R3 + ... - n সংখ্যক একই মানের রোধ (R) শ্রেণী সমবায়ে যুক্ত থাকলে তুল্যরোধ
Rs = nRহয়।
- প্রতিটি রোধের মধ্য দিয়ে একই তড়িৎ প্রবাহ (
4.3 সমান্তরাল সমবায় বিশ্লেষণ
যখন একাধিক রোধের এক প্রান্তগুলিকে একটি সাধারণ বিন্দুতে এবং অপর প্রান্তগুলিকে অন্য একটি সাধারণ বিন্দুতে যুক্ত করা হয়, তখন সেই সমবায়কে সমান্তরাল সমবায় (Parallel Combination) বলে।
- মূল বৈশিষ্ট্য:
- প্রতিটি রোধের দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদ একই থাকে (
V)। - মূল প্রবাহটি প্রতিটি রোধের মধ্যে দিয়ে বিভক্ত হয়ে যায় (
I = I1 + I2 + I3 ...) এবং প্রবাহের অনুপাত হয়I1 : I2 : I3 = 1/R1 : 1/R2 : 1/R3। - তুল্য রোধের সূত্র:
1/Rp = 1/R1 + 1/R2 + 1/R3 + ... - n সংখ্যক একই মানের রোধ (R) সমান্তরাল সমবায়ে যুক্ত থাকলে তুল্যরোধ
Rp = R/nহয়।
- প্রতিটি রোধের দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদ একই থাকে (
4.4 তুলনামূলক সারণী
|
বৈশিষ্ট্য |
শ্রেণী সমবায় |
সমান্তরাল সমবায় |
|
তড়িৎ প্রবাহ |
প্রতিটি রোধে সমান থাকে |
প্রতিটি রোধে বিভক্ত হয়ে যায় |
|
বিভব প্রভেদ |
প্রতিটি রোধে ভিন্ন হয় |
প্রতিটি রোধে সমান থাকে |
|
তুল্য রোধ |
|
|
4.5 অভ্যন্তরীণ রোধ ও নষ্ট ভোল্ট
- অভ্যন্তরীণ রোধ (Internal Resistance): তড়িৎকোষের মধ্যে থাকা সক্রিয় তরল বা উপাদান তড়িৎ প্রবাহের বিরুদ্ধে যে বাধা সৃষ্টি করে, তাকে কোষের অভ্যন্তরীণ রোধ (
r) বলে। - নষ্ট ভোল্ট (Lost Volts): বর্তনীতে তড়িৎ প্রবাহ চলার সময় কোষের অভ্যন্তরীণ রোধের জন্য কিছুটা বিভব কোষের ভিতরেই নষ্ট হয়। এই বিভব পতনকে নষ্ট ভোল্ট বলা হয়।
- বর্তনীতে প্রবাহমাত্রা:
I = E / (R+r)(যেখানেEহলো EMF,Rহলো বাহ্যিক রোধ,rহলো অভ্যন্তরীণ রোধ) - কোষের দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদ:
V = E - Ir - এখানে
Irরাশিটিই হলো নষ্ট ভোল্ট, যা কোষের অভ্যন্তরে বিভব পতনকে নির্দেশ করে।
- বর্তনীতে প্রবাহমাত্রা:
4.6 উপসংহার ও পরবর্তী প্রসঙ্গের সূচনা
যখন কোনো রোধের মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ চালনা করা হয়, তখন রোধের বাধা অতিক্রম করার জন্য কার্য করতে হয়। এই কার্য তাপশক্তিতে রূপান্তরিত হয়। তড়িৎ প্রবাহের এই তাপীয় ফল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যার বহু বাস্তব প্রয়োগ রয়েছে এবং যা আমাদের পরবর্তী আলোচনার বিষয়।
——————————————————————————–
5.0 তড়িৎপ্রবাহের তাপীয় ফল এবং তড়িৎ ক্ষমতা
5.1 ভূমিকা
তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফল একটি দ্বিমুখী ঘটনা। একদিকে এটি বৈদ্যুতিক হিটার বা বাল্বের মতো বহু প্রয়োজনীয় যন্ত্রের কার্যকারিতার মূল ভিত্তি, অন্যদিকে দূরবর্তী স্থানে শক্তি সঞ্চালনের সময় এটি রোধজনিত অপচয়ের একটি প্রধান উৎস। এই প্রভাবটি বোঝা শক্তি সংরক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত প্রয়োগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
5.2 জুলের সূত্রের বিশদ বিবরণ
পরিবাহীতে উৎপন্ন তাপ সংক্রান্ত জুলের সূত্রগুলি নিচে দেওয়া হলো:
- প্রবাহমাত্রার সূত্র: পরিবাহীর রোধ (
R) ও প্রবাহের সময় (t) অপরিবর্তিত থাকলে, উৎপন্ন তাপ (H) প্রবাহমাত্রার (I) বর্গের সমানুপাতিক। অর্থাৎ,H ∝ I²। - রোধের সূত্র: প্রবাহমাত্রা (
I) ও সময় (t) অপরিবর্তিত থাকলে, উৎপন্ন তাপ (H) পরিবাহীর রোধের (R) সমানুপাতিক। অর্থাৎ,H ∝ R। - সময়ের সূত্র: প্রবাহমাত্রা (
I) ও রোধ (R) অপরিবর্তিত থাকলে, উৎপন্ন তাপ (H) সময়ের (t) সমানুপাতিক। অর্থাৎ,H ∝ t।
5.3 গাণিতিক সূত্রাবলী
এই সূত্রগুলিকে একত্রিত করলে পাওয়া যায়, H ∝ I²Rt।
- একক-নিরপেক্ষ রূপ:
H = I²Rt/J- এখানে,
Jহলো তাপের যান্ত্রিক তুল্যাঙ্ক। SI পদ্ধতিতেJ=1কিন্তু CGS পদ্ধতিতেJ = 4.2 জুল/ক্যালোরি।
- এখানে,
- SI পদ্ধতিতে তাপের সূত্র:
H = I²RtH = VItH = V²t/R(এখানেHজ়ুল এককে পরিমাপ করা হয়)।
5.4 বাস্তব প্রয়োগ
তড়িৎপ্রবাহের তাপীয় ফলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব প্রয়োগ নিচে দেওয়া হলো:
|
যন্ত্র |
কার্যকারী অংশ ও উপাদান |
মূলনীতি |
|
ইলেকট্রিক বাল্ব |
টাংস্টেন ফিলামেন্ট |
উচ্চ রোধ ও উচ্চ গলনাঙ্ক (3380°C), যার ফলে এটি না গলে উচ্চ তাপমাত্রায় আলো বিকিরণ করে। |
|
ইলেকট্রিক হিটার/ইস্ত্রি |
নাইক্রোম (Ni, Cr, Fe-এর সংকর) কুন্ডলী |
উচ্চ রোধাঙ্ক ও উচ্চ গলনাঙ্ক, যা উচ্চ তাপ উৎপন্ন করতে সাহায্য করে। এটি ইলেকট্রিক ইস্ত্রিতেও ব্যবহৃত হয়। |
|
ইলেকট্রিক ফিউজ |
টিন ও সিসার সংকর ধাতু |
উচ্চ রোধ ও নিম্ন গলনাঙ্ক। অতিরিক্ত প্রবাহে এটি গলে গিয়ে বর্তনীকে বিচ্ছিন্ন করে এবং যন্ত্রপাতিকে রক্ষা করে। এটি সর্বদা লাইভ তারের সাথে শ্রেণী সমবায়ে যুক্ত থাকে। |
5.5 তড়িৎ ক্ষমতা ও শক্তি
- তড়িৎ ক্ষমতা (Electric Power, P): কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্রের কার্য করার হারকে তড়িৎ ক্ষমতা বলে। এর SI একক ওয়াট (Watt)।
- সূত্র:
P = IV = I²R = V²/R
- সূত্র:
- তড়িৎশক্তি (Electric Energy, E): কোনো যন্ত্রের মোট কৃতকার্য বা ব্যয়িত শক্তিকে তড়িৎশক্তি বলে।
- সূত্র:
E = P × t - এর SI একক জুল (Joule)।
- সূত্র:
5.6 বাণিজ্যিক একক
বৈদ্যুতিক শক্তির বাণিজ্যিক বা ব্যবসায়িক একক হলো বোর্ড অফ ট্রেড (B.O.T.) ইউনিট বা কিলোওয়াট-ঘণ্টা (kWh)।
- রূপান্তর:
1 B.O.T. = 1 kWh = 3.6 × 10⁶ J
5.7 বাল্বের রেটিং বিশ্লেষণ
একটি বাল্বের গায়ে “220V – 100W” লেখার অর্থ হলো, বাল্বটিকে 220V বিভব প্রভেদে যুক্ত করলে এটি সর্বোত্তম ঔজ্জ্বল্যে জ্বলবে এবং প্রতি সেকেন্ডে 100 জুল তড়িৎশক্তি ব্যয় করবে (অর্থাৎ, এর ক্ষমতা 100 ওয়াট)।
5.8 উপসংহার ও পরবর্তী প্রসঙ্গের সূচনা
তাপীয় প্রভাব ছাড়াও তড়িৎ প্রবাহের আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে, যা হলো চৌম্বক ফল। এই প্রভাবটিই বিদ্যুৎ ও চুম্বকত্বকে একসূত্রে বেঁধেছে এবং আধুনিক প্রযুক্তির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যা আমাদের পরবর্তী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
——————————————————————————–
6.0 তড়িৎপ্রবাহের চৌম্বক ফল এবং তড়িৎচুম্বকত্ব
6.1 ভূমিকা
বিজ্ঞানী ওরস্টেডের আবিষ্কার এক যুগান্তকারী মুহূর্ত ছিল, যা প্রমাণ করে যে বিদ্যুৎ এবং চুম্বকত্ব দুটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তিনি দেখান যে তড়িৎবাহী তারের চারপাশে চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়। এই সম্পর্কই বৈদ্যুতিক মোটর, জেনারেটর এবং শক্তিশালী তড়িৎচুম্বকের মতো প্রযুক্তির ভিত্তি স্থাপন করেছে।
6.2 চুম্বকের ধর্ম ও চৌম্বক বলরেখা
তড়িৎপ্রবাহের চৌম্বক ফল বোঝার আগে চুম্বকের কিছু মৌলিক ধর্ম জেনে নেওয়া প্রয়োজন। চুম্বক লোহা, নিকেল, কোবাল্টের মতো পদার্থকে আকর্ষণ করে। এর দুটি মেরু (উত্তর ও দক্ষিণ) থাকে এবং সমমেরু পরস্পরকে বিকর্ষণ ও বিপরীত মেরু আকর্ষণ করে। এছাড়াও এর দিক নির্দেশক ধর্ম রয়েছে।
চুম্বকের চারপাশের এই প্রভাবকে চৌম্বক বলরেখা নামক কাল্পনিক রেখার সাহায্যে চিত্রিত করা হয়।
- বৈশিষ্ট্য:
- এগুলি কাল্পনিক বদ্ধ বক্ররেখা।
- চুম্বকের বাইরে বলরেখাগুলি উত্তর মেরু থেকে নির্গত হয়ে দক্ষিণ মেরুতে প্রবেশ করে।
- দুটি বলরেখা কখনও পরস্পরকে ছেদ করে না।
- যেখানে বলরেখাগুলি ঘন সন্নিবিষ্ট থাকে, সেখানে চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি বেশি হয়।
6.3 ওরস্টেডের পরীক্ষা
ওরস্টেডের পরীক্ষা প্রমাণ করে যে, কোনো পরিবাহীর মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হলে তার চারপাশে একটি চৌম্বক ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়। এই চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রভাবে কাছে রাখা কোনো চুম্বক শলাকার বিক্ষেপ ঘটে। এই ঘটনাকেই তড়িৎপ্রবাহের চৌম্বক ফল বলা হয়। এই ক্ষেত্রের শক্তি তড়িৎ প্রবাহমাত্রার সমানুপাতিক এবং তার থেকে দূরত্বের ব্যস্তানুপাতিক হয়।
6.4 চৌম্বক ক্ষেত্রের অভিমুখ নির্ণয়
তড়িৎবাহী তারের চারপাশে সৃষ্ট চৌম্বক ক্ষেত্রের অভিমুখ নির্ণয়ের জন্য কয়েকটি নিয়ম রয়েছে:
- অ্যাম্পিয়ারের সন্তরণ নিয়ম (Ampere’s Swimming Rule): কোনো ব্যক্তিকে তড়িৎবাহী তার বরাবর প্রবাহের দিকে সাঁতার কাটছে কল্পনা করলে এবং তার মুখ যদি চুম্বক শলাকার দিকে থাকে, তবে ওই ব্যক্তির বাম হাত যেদিকে বিক্ষিপ্ত হবে, শলাকার উত্তর মেরুও সেদিকেই বিক্ষিপ্ত হবে।
- দক্ষিণ মুষ্টি নিয়ম (Right-Hand Grip Rule): একটি ঋজু বা সরল পরিবাহীকে ডান হাতে এমনভাবে ধরলে যদি বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ তড়িৎ প্রবাহের অভিমুখ নির্দেশ করে, তবে বাকি আঙ্গুলগুলি চৌম্বক বলরেখার অভিমুখ নির্দেশ করবে।
- ঘড়ি সূত্র (Clock Face Rule): একটি বৃত্তাকার তড়িৎবাহী কুন্ডলীর কোনো তলের দিকে তাকালে যদি প্রবাহ দক্ষিণাবর্তী (Clockwise) মনে হয়, তবে ওই তলে দক্ষিণ মেরু (South Pole) সৃষ্টি হয়। আর যদি প্রবাহ বামাবর্তী (Anticlockwise) মনে হয়, তবে ওই তলে উত্তর মেরু (North Pole) সৃষ্টি হয়।
6.5 তড়িৎচুম্বক
একটি কাঁচা লোহার দণ্ডের উপর অন্তরক তামার তার জড়িয়ে তড়িৎ প্রবাহ পাঠালে দণ্ডটি একটি শক্তিশালী, অস্থায়ী চুম্বকে পরিণত হয়। একে তড়িৎচুম্বক (Electromagnet) বলে।
- শক্তি নির্ভর করে:
- কুন্ডলীর পাক সংখ্যার উপর।
- তড়িৎপ্রবাহমাত্রার উপর।
- মজ্জার উপাদানের (যেমন কাঁচা লোহা) উপর।
6.6 উপসংহার ও পরবর্তী প্রসঙ্গের সূচনা
যেহেতু তড়িৎ প্রবাহ একটি চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে, তাহলে এই সৃষ্ট চৌম্বক ক্ষেত্র এবং অন্য একটি স্থায়ী চুম্বকের মধ্যেকার পারস্পরিক ক্রিয়া একটি যান্ত্রিক বল তৈরি করতে পারে। এই নীতিই হলো বৈদ্যুতিক মোটরের ভিত্তি, যা আমরা পরবর্তী বিভাগে আলোচনা করব।
——————————————————————————–
7.0 চৌম্বক ক্ষেত্রে তড়িৎবাহী পরিবাহীর উপর বল: মোটরের কার্যনীতি
7.1 ভূমিকা
একটি চৌম্বক ক্ষেত্রে অবস্থিত তড়িৎবাহী পরিবাহীর উপর যে বল প্রযুক্ত হয়, তা তড়িৎচুম্বকত্বের একটি প্রত্যক্ষ এবং অত্যন্ত কার্যকর প্রয়োগ। এই নীতির উপর ভিত্তি করেই বৈদ্যুতিক মোটর তৈরি করা হয়েছে, যা বৈদ্যুতিক শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বিপ্লব এনেছে।
7.2 ফ্লেমিং-এর বামহস্ত নিয়ম
চৌম্বক ক্ষেত্রে অবস্থিত তড়িৎবাহী পরিবাহীর উপর প্রযুক্ত বলের অভিমুখ ফ্লেমিং-এর বামহস্ত নিয়ম (Fleming’s Left-Hand Rule) দ্বারা নির্ণয় করা হয়।
- নিয়ম: বামহাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ, তর্জনী এবং মধ্যমাকে পরস্পরের সাথে সমকোণে প্রসারিত করলে, যদি তর্জনী চৌম্বক ক্ষেত্রের অভিমুখ এবং মধ্যমা তড়িৎ প্রবাহের অভিমুখ নির্দেশ করে, তবে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ পরিবাহীর গতির বা প্রযুক্ত বলের অভিমুখ নির্দেশ করবে।
7.3 বার্লোচক্র
বার্লোচক্র (Barlow’s Wheel) হলো একটি সরল যন্ত্র যা তড়িৎবাহী পরিবাহীর উপর চুম্বকের ক্রিয়া প্রদর্শন করে। এই যন্ত্রে তড়িৎপ্রবাহ ও চৌম্বক ক্ষেত্রের পারস্পরিক ক্রিয়ার ফলে একটি ধাতব চক্র অবিরাম ঘুরতে থাকে।
- কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ:
- তড়িৎপ্রবাহমাত্রা বা চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি বাড়ালে চক্রের ঘূর্ণন বেগ বাড়ে।
- বর্তনীতে সমপ্রবাহের (DC) পরিবর্তে পরিবর্তী প্রবাহ (AC) ব্যবহার করলে চক্রের ঘূর্ণন বন্ধ হয়ে যায়।
7.4 বৈদ্যুতিক মোটরের কার্যনীতি
বৈদ্যুতিক মোটর ফ্লেমিং-এর বামহস্ত নিয়মের উপর ভিত্তি করে কাজ করে। এর মধ্যে থাকা আর্মেচার বা কুন্ডলীর মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ পাঠালে চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রভাবে একটি ঘূর্ণন বল তৈরি হয়, যা কুন্ডলীটিকে ঘোরায়।
- শক্তি রূপান্তর: বৈদ্যুতিক শক্তি → যান্ত্রিক শক্তি।
- শক্তি বৃদ্ধির উপায়:
- আর্মেচারের পাক সংখ্যা বৃদ্ধি করা।
- তড়িৎ প্রবাহমাত্রা বৃদ্ধি করা।
- আরও শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যবহার করা।
- ব্যবহার: পাখা, পাম্প, ট্রাম, ট্রেন, এবং প্রায় সমস্ত ঘূর্ণনশীল বৈদ্যুতিক যন্ত্রে মোটর ব্যবহৃত হয়।
7.5 উপসংহার ও পরবর্তী প্রসঙ্গের সূচনা
আমরা দেখলাম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে গতি তৈরি করা সম্ভব। এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে: এর বিপরীত প্রক্রিয়া কি সম্ভব? অর্থাৎ, গতি ব্যবহার করে কি বিদ্যুৎ তৈরি করা যায়? এই প্রশ্নের উত্তরই আমাদের পরবর্তী আলোচনার বিষয়—তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ।
——————————————————————————–
8.0 তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ: জেনারেটরের কার্যনীতি
8.1 ভূমিকা
বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডে আবিষ্কৃত তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ (Electromagnetic Induction) হলো মোটরের ক্রিয়ার ঠিক বিপরীত একটি ঘটনা। এই নীতি অনুসারে, যান্ত্রিক শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। আমরা বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিতে যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করি, তার প্রায় সবটাই এই নীতির উপর ভিত্তি করে উৎপাদিত হয়, যা আধুনিক সভ্যতাকে চালিত করার মূল উৎস।
8.2 ফ্যারাডে ও লেঞ্জের সূত্র
- তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ: কোনো বদ্ধ কুন্ডলীর সাথে জড়িত চৌম্বক বলরেখার সংখ্যা বা চৌম্বক প্রবাহের পরিবর্তন ঘটলে, ওই কুন্ডলীতে একটি ক্ষণস্থায়ী তড়িৎচালক বল আবিষ্ট হয় এবং একটি তড়িৎপ্রবাহের সৃষ্টি হয়। এই ঘটনাকেই তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ বলে। যতক্ষণ চৌম্বক প্রবাহের পরিবর্তন ঘটে, ততক্ষণই এই আবিষ্ট প্রবাহ স্থায়ী হয়।
- ফ্যারাডের সূত্র:
- কোনো বদ্ধ বর্তনীর সাথে জড়িত চৌম্বক প্রবাহের পরিবর্তন হলে বর্তনীতে একটি তড়িৎচালক বল আবিষ্ট হয়।
- আবিষ্ট তড়িৎচালক বলের মান চৌম্বক প্রবাহের পরিবর্তনের হারের সমানুপাতিক।
- লেঞ্জের সূত্র: তড়িৎচুম্বকীয় আবেশের ফলে সৃষ্ট আবিষ্ট তড়িৎপ্রবাহের অভিমুখ এমন হয়, যা নিজের সৃষ্টির কারণকেই বাধা দেয়। লেঞ্জের সূত্র আসলে শক্তির সংরক্ষণ সূত্রের একটি ভিন্ন রূপ।
8.3 ফ্লেমিং-এর ডানহস্ত নিয়ম
আবিষ্ট তড়িৎ প্রবাহের অভিমুখ নির্ণয়ের জন্য ফ্লেমিং-এর ডানহস্ত নিয়ম (Fleming’s Right-Hand Rule) ব্যবহার করা হয়।
- নিয়ম: ডানহাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ, তর্জনী ও মধ্যমাকে পরস্পরের সমকোণে রাখলে, যদি তর্জনী চৌম্বক ক্ষেত্রের অভিমুখ এবং বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ পরিবাহীর গতির অভিমুখ নির্দেশ করে, তবে মধ্যমা আবিষ্ট তড়িৎপ্রবাহের অভিমুখ নির্দেশ করবে।
8.4 জেনারেটরের কার্যনীতি
বৈদ্যুতিক জেনারেটর বা ডায়নামো (Electric Generator or Dynamo) তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ নীতির একটি বাস্তব প্রয়োগ। এই যন্ত্রে একটি কুন্ডলীকে চৌম্বক ক্ষেত্রে ঘোরানো হয়, যার ফলে কুন্ডলীর সাথে জড়িত চৌম্বক প্রবাহের পরিবর্তন ঘটে এবং বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।
- শক্তি রূপান্তর: যান্ত্রিক শক্তি → বৈদ্যুতিক শক্তি।
8.5 উপসংহার ও পরবর্তী প্রসঙ্গের সূচনা
জেনারেটরের মাধ্যমে দুই ভিন্ন প্রকৃতির তড়িৎ প্রবাহ তৈরি করা সম্ভব—সমপ্রবাহ (DC) এবং পরিবর্তী প্রবাহ (AC)। এদের বৈশিষ্ট্য এবং প্রয়োগ সম্পূর্ণ ভিন্ন, যা আমাদের গৃহস্থালীর বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই প্রকার প্রবাহ এবং আমাদের বাড়ির ওয়্যারিং ব্যবস্থা নিয়েই আমাদের চূড়ান্ত আলোচনা।
——————————————————————————–
9.0 পরিবর্তী প্রবাহ (AC) ও সমপ্রবাহ (DC) এবং গৃহস্থালীর বর্তনী
9.1 ভূমিকা
আধুনিক জীবনে বিদ্যুৎ অপরিহার্য। এই বিদ্যুৎ প্রধানত দুই প্রকারের—AC এবং DC। এদের মধ্যে পার্থক্য এবং আমাদের বাড়িতে কীভাবে নিরাপদে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়, তা জানা শুধুমাত্র অ্যাকাডেমিক দিক থেকেই নয়, দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তার জন্যও অত্যন্ত জরুরি।
9.2 AC বনাম DC তুলনা
সমপ্রবাহ (Direct Current) এবং পরিবর্তী প্রবাহের (Alternating Current) মধ্যে মূল পার্থক্যগুলি নিচে দেওয়া হলো:
|
বৈশিষ্ট্য |
সমপ্রবাহ (DC) |
পরিবর্তী প্রবাহ (AC) |
|
সংজ্ঞা |
যে তড়িৎপ্রবাহের মান ও অভিমুখ সময়ের সাথে অপরিবর্তিত থাকে। |
যে তড়িৎপ্রবাহের অভিমুখ নির্দিষ্ট সময় অন্তর পরিবর্তিত হয় এবং মান পর্যায়বৃত্তভাবে পরিবর্তিত হয়। |
|
উৎস |
ব্যাটারী, তড়িৎকোষ, DC জেনারেটর। |
AC জেনারেটর, পাওয়ার প্ল্যান্ট। |
9.3 AC-এর সুবিধাসমূহ
দৈনন্দিন জীবনে এবং শিল্পে DC-এর তুলনায় AC-এর ব্যবহার অনেক বেশি। এর কিছু প্রধান কারণ হলো:
- AC-এর উৎপাদন খরচ এবং সঞ্চালনের সময় শক্তি অপচয় তুলনামূলকভাবে কম।
- ট্রান্সফর্মার ব্যবহার করে খুব সহজে AC ভোল্টেজকে কমানো বা বাড়ানো যায়।
- AC-কে অনেক দূর পর্যন্ত সহজে প্রেরণ করা যায়।
9.4 গৃহস্থালীর বর্তনীর বিশ্লেষণ
একটি সাধারণ গৃহস্থালীর বৈদ্যুতিক বর্তনীতে (Domestic Electric Circuit) কয়েকটি মূল উপাদান থাকে। নিরাপত্তার জন্য সমস্ত বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি সমান্তরাল সমবায়ে যুক্ত থাকে, যাতে প্রতিটি যন্ত্র সঠিক ভোল্টেজ পায় এবং একটি খারাপ হলেও অন্যগুলি চলতে পারে। বর্তনীতে প্রধানত তিন ধরনের তার ব্যবহার করা হয়:
- লাইভ তার (Live wire):
- রঙ: লাল বা বাদামী।
- কাজ: এটি উচ্চবিভব সম্পন্ন (যেমন 220V) এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন থেকে তড়িৎপ্রবাহকে বাড়িতে নিয়ে আসে।
- নিউট্রাল তার (Neutral wire):
- রঙ: কালো বা নীল।
- কাজ: এটি নিম্নবিভব বা প্রায় শূন্য বিভব সম্পন্ন। এটি বর্তনী পূর্ণ করে এবং তড়িৎপ্রবাহকে উৎস বা সরবরাহ লাইনে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
- আর্থিং তার (Earth wire):
- রঙ: সবুজ।
- কাজ: এটি একটি সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা। এর এক প্রান্ত যন্ত্রের ধাতব আবরণের সাথে এবং অন্য প্রান্ত মাটির গভীরে পোঁতা একটি ধাতব পাতের সাথে যুক্ত থাকে। কোনো কারণে লাইভ তার যন্ত্রের কাঠামো স্পর্শ করলে, এই তার অতিরিক্ত প্রবাহকে নিরাপদে মাটিতে পাঠিয়ে দেয় এবং বৈদ্যুতিক শক থেকে রক্ষা করে। এর বিভব শূন্য ধরা হয়।
চলতড়িৎ: একটি বিস্তারিত কারিগরি মনোগ্রাফ
1.0 ভূমিকা: চলতড়িতের মূল ভিত্তি
চলতড়িৎ বা প্রবাহী তড়িৎ বিষয়টি বোঝার প্রথম ধাপ হলো এর সবচেয়ে মৌলিক ধারণা—তড়িৎ আধান সম্পর্কে জানা। বস্তুর এই অন্তর্নিহিত ধর্মই তড়িৎ সংক্রান্ত সমস্ত ঘটনার মূল কারণ। এই প্রাথমিক নীতিগুলিই পরবর্তীকালের সমস্ত জটিল আলোচনার ভিত্তি স্থাপন করে, সাধারণ বৈদ্যুতিক বর্তনী থেকে শুরু করে মোটর এবং জেনারেটরের মতো উন্নত যন্ত্রের কার্যকারিতা পর্যন্ত সবকিছুই এর উপর নির্ভরশীল। তাই, এই ভিত্তিপ্রস্তরকে সঠিকভাবে অনুধাবন করা অপরিহার্য।
1.1 তড়িৎ আধান (Electric Charge)
তড়িৎ আধান হলো বস্তুর এমন একটি অন্তর্নিহিত ভৌত ধর্ম, যার ফলে বস্তুটি অন্য কোনো তড়িৎগ্রস্ত বা অনাহিত বস্তুর উপর বল প্রয়োগ করতে পারে। প্রকৃতিতে তড়িৎ আধান দুই প্রকারের হয়।
- ধনাত্মক আধান: এই আধানের বাহক কণা হলো প্রোটন, যার আধানের মান
+1.6 × 10–19কুলম্ব (C)। - ঋণাত্মক আধান: এই আধানের বাহক কণা হলো ইলেকট্রন, যার আধানের মান
–1.6 × 10–19কুলম্ব (C)।
সাধারণ অবস্থায় পরমাণু নিস্তড়িৎ থাকে, কারণ পরমাণুতে যতগুলি ধনাত্মক আধানযুক্ত প্রোটন থাকে, ঠিক ততগুলি ঋণাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রন থাকে, ফলে মোট আধান শূন্য হয়। তড়িৎ প্রবাহের জন্য মূলত ইলেকট্রনের প্রবাহই দায়ী। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, ইলেকট্রন যেদিকে প্রবাহিত হয়, তড়িৎ প্রবাহের দিক তার বিপরীত দিকে ধরা হয়, অর্থাৎ ধনাত্মক আধানের প্রবাহের দিককেই তড়িৎ প্রবাহের দিক হিসেবে গণ্য করা হয়।
তড়িৎ আধানের একক ও মাত্রা নিচে সারণিতে দেওয়া হলো:
|
বৈশিষ্ট্য |
মান |
|
SI একক |
কুলম্ব (C) |
|
CGS একক |
স্ট্যাটকুলম্ব (e.s.u) |
|
মাত্রা |
|
তড়িৎ আধানের বৈশিষ্ট্য
তড়িৎ আধানের কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা এর আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে:
- আকর্ষণ ও বিকর্ষণ: সমধর্মী বা একই প্রকারের তড়িৎ আধান পরস্পরকে বিকর্ষণ করে এবং বিপরীতধর্মী আধান পরস্পরকে আকর্ষণ করে।
- সংরক্ষণ: কোনো বিচ্ছিন্ন সংস্থায় মোট তড়িৎ আধান সর্বদা সংরক্ষিত বা ধ্রুবক থাকে।
- কোয়ান্টায়ন: কোনো আহিত বস্তুতে উপস্থিত মোট তড়িৎ আধানের পরিমাণ সবসময় একটি ইলেকট্রনের আধানের মানের পূর্ণসংখ্যার সরল গুণিতক হয়। গাণিতিকভাবে,
Q = ne, যেখানেQহলো মোট আধান,nহলো পূর্ণসংখ্যা (ইলেকট্রন সংখ্যা) এবংeহলো একটি ইলেকট্রনের আধানের মান।
1.2 কুলম্বের সূত্র এবং তড়িৎক্ষেত্র (Coulomb’s Law and Electric Field)
দুটি বিন্দু আধানের মধ্যে ক্রিয়াশীল আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বলের মান নির্ণয়ের জন্য কুলম্বের সূত্র ব্যবহৃত হয়।
কুলম্বের সূত্র: দুটি বিন্দু আধানের মধ্যে ক্রিয়াশীল আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বলের মান আধান দুটির গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।
গাণিতিকভাবে, যদি q₁ ও q₂ মানের দুটি আধান r দূরত্বে থাকে, তবে তাদের মধ্যে ক্রিয়াশীল বল F হলে: F ∝ q₁q₂ এবং F ∝ 1/r²
এই দুটি সম্পর্ককে একত্রিত করে পাই: F = k * (q₁q₂ / r²) এখানে k হলো কুলম্বীয় ধ্রুবক। শূন্যস্থান বা বায়ু মাধ্যমে:
- SI পদ্ধতিতে
k = 9 × 10⁹ Nm²/C² - CGS পদ্ধতিতে
k = 1 dyn. cm² / (esu)²
তড়িৎক্ষেত্র: কোনো একটি আধানকে কোনো স্থানে রাখলে তার চারপাশে এমন একটি অঞ্চল তৈরি হয়, যেখানে অন্য কোনো আধান আনলে সেটি একটি আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বল অনুভব করে। ঐ আধানটির চারপাশে বিস্তৃত সেই অঞ্চলটিকেই তার তড়িৎক্ষেত্র বলা হয়।
1.3 তড়িৎ বিভব ও বিভব প্রভেদ (Electric Potential and Potential Difference)
তড়িৎবিভব (Electric Potential): অসীম দূরত্ব থেকে একটি একক ধনাত্মক আধানকে তড়িৎক্ষেত্রের কোনো বিন্দুতে আনতে যে পরিমাণ কার্য করতে হয়, তাকে ওই বিন্দুর তড়িৎ বিভব বলে। যদি q আধানকে আনতে w কার্য করতে হয়, তবে বিভব V = w/q।
বিভব প্রভেদ (Potential Difference): একটি একক ধনাত্মক আধানকে তড়িৎক্ষেত্রের একটি বিন্দু থেকে অপর একটি বিন্দুতে স্থানান্তরিত করতে যে পরিমাণ কার্য করতে হয়, তাকে ওই দুই বিন্দুর বিভব প্রভেদ বলে। A ও B বিন্দুর মধ্যে q আধানকে সরাতে w কার্য করতে হলে, বিভব প্রভেদ VA – VB = w/q।
তড়িৎ বিভবের একক ও মাত্রা নিচে সারণিবদ্ধ করা হলো:
|
বৈশিষ্ট্য |
মান |
|
SI একক |
ভোল্ট (V) |
|
CGS একক |
স্ট্যাটভোল্ট |
|
সম্পর্ক |
1 V = 1/300 Stat Volt |
|
মাত্রা |
|
সংজ্ঞানুসারে, 1 ভোল্ট হলো তড়িৎক্ষেত্রের দুটি বিন্দুর মধ্যেকার সেই বিভব প্রভেদ, যার জন্য 1 কুলম্ব (C) আধানকে এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে নিয়ে যেতে 1 জুল (Joule) কার্য করতে হয়।
বিভব প্রভেদ পরিমাপ করার জন্য ভোল্টমিটার যন্ত্র ব্যবহার করা হয়, যা বর্তনীর সাথে সমান্তরাল সমবায়ে যুক্ত থাকে। একটি আদর্শ ভোল্টমিটারের রোধ অসীম ধরা হয়। এই বিভব প্রভেদই বর্তনীতে আধানকে চালনা করে, যার ফলে তড়িৎপ্রবাহ সৃষ্টি হয়, যা ওহমের সূত্রের মূল ভিত্তি।
2.0 ওহমের সূত্র এবং বৈদ্যুতিক রোধ
চলতড়িতের জগতে ওহমের সূত্র একটি যুগান্তকারী নীতি, যা বিভব প্রভেদ, তড়িৎপ্রবাহ এবং বর্তনীর একটি নতুন কিন্তু অপরিহার্য ধর্ম—রোধের মধ্যে একটি সরল গাণিতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। এই বিভাগে আমরা এই সম্পর্কটি বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করব এবং কোনো পরিবাহীর রোধ কী কী বিষয়ের উপর নির্ভর করে তা আলোচনা করব। এই আলোচনা শুরু করার আগে তড়িৎপ্রবাহ এবং তড়িৎচালক বলের ধারণা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
2.1 তড়িৎ প্রবাহমাত্রা ও তড়িৎচালক বল (Electric Current and Electromotive Force)
তড়িৎচালক বল (Electromotive Force – EMF): কোনো তড়িৎকোষের তড়িৎচালক বল (EMF) হলো মুক্ত বর্তনী অবস্থায় কোষের অভ্যন্তরে একক ধনাত্মক আধানকে নিম্ন বিভব থেকে উচ্চ বিভবে চালনা করতে প্রয়োজনীয় কার্য। এটি এক প্রকার শক্তি, এবং এর SI একক ভোল্ট (V)।
তড়িৎ প্রবাহমাত্রা (Electric Current): কোনো পরিবাহীর যেকোনো প্রস্থচ্ছেদের মধ্যে দিয়ে একক সময়ে যে পরিমাণ তড়িৎ আধান প্রবাহিত হয়, তাকে তড়িৎ প্রবাহমাত্রা বলে। যদি t সময়ে Q পরিমাণ আধান প্রবাহিত হয়, তবে প্রবাহমাত্রা I = Q/t।
এর SI একক হলো অ্যাম্পিয়ার (A)। সংজ্ঞানুযায়ী, কোনো পরিবাহীর প্রস্থচ্ছেদের মধ্যে দিয়ে 1 সেকেন্ডে 1 কুলম্ব আধান প্রবাহিত হলে প্রবাহমাত্রাকে 1 অ্যাম্পিয়ার বলা হয় (1A = 1C/1S)।
প্রবাহমাত্রা পরিমাপের জন্য অ্যামমিটার যন্ত্র ব্যবহার করা হয়, যা সর্বদা বর্তনীর সাথে শ্রেণী সমবায়ে যুক্ত থাকে। একটি আদর্শ অ্যামমিটারের রোধ শূন্য ধরা হয়।
2.2 ওহমের সূত্র: নীতি ও বিশ্লেষণ (Ohm’s Law: Principle and Analysis)
ওহমের সূত্র: পরিবাহীর উষ্ণতা ও অন্যান্য ভৌত অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে, কোনো পরিবাহীর মধ্যে দিয়ে প্রবাহমাত্রা পরিবাহীটির দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদের সমানুপাতিক হয়।
যদি কোনো পরিবাহীর দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদ V এবং প্রবাহমাত্রা I হয়, তবে সূত্রানুসারে: V ∝ I বা, V = IR এখানে R হলো একটি সমানুপাতিক ধ্রুবক, যা পরিবাহীর রোধ নামে পরিচিত।
ওহমের সূত্রের লেখচিত্র বিশ্লেষণ করলে রোধ এবং পরিবাহিতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়:
- V-I লেখচিত্র: এই লেখচিত্রে y-অক্ষে বিভব প্রভেদ (V) এবং x-অক্ষে প্রবাহমাত্রা (I) স্থাপন করলে একটি মূলবিন্দুগামী সরলরেখা পাওয়া যায়। এই সরলরেখার নতি (slope) পরিবাহীর রোধ (R) নির্দেশ করে।
- নতি =
V/I = R(রোধ)
- নতি =
- I-V লেখচিত্র: এই লেখচিত্রে y-অক্ষে প্রবাহমাত্রা (I) এবং x-অক্ষে বিভব প্রভেদ (V) স্থাপন করলে প্রাপ্ত সরলরেখার নতি পরিবাহীর পরিবাহিতা (Conductance) নির্দেশ করে, যা রোধের অন্যোন্যক।
- নতি =
I/V = 1/R = K(পরিবাহিতা)
- নতি =
2.3 রোধ এবং এর নির্ভরশীলতা (Resistance and its Dependencies)
রোধ (Resistance): পরিবাহীর যে ধর্মের জন্য এটি তার মধ্যে দিয়ে তড়িৎপ্রবাহকে বাধা দেয়, তাকে ওই পরিবাহীর রোধ বলে। এর সূত্রটি হলো R = V/I।
রোধের SI একক হলো ওহম (Ω)। কোনো পরিবাহীর দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্য 1 ভোল্ট হলে যদি তার মধ্যে দিয়ে 1 অ্যাম্পিয়ার তড়িৎ প্রবাহিত হয়, তবে ওই পরিবাহীর রোধকে 1 ওহম বলা হয়। এর মাত্রা হলো [ML²T⁻³I⁻²]।
একটি পরিবাহীর রোধ চারটি প্রধান বিষয়ের উপর নির্ভর করে:
- দৈর্ঘ্য (l): পরিবাহীর রোধ তার দৈর্ঘ্যের সমানুপাতিক (
R ∝ l)। - প্রস্থচ্ছেদ (A): পরিবাহীর রোধ তার প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফলের ব্যস্তানুপাতিক (
R ∝ 1/A)। - উপাদান: বিভিন্ন উপাদানের রোধ ভিন্ন হয়।
- উষ্ণতা: উষ্ণতার পরিবর্তনে রোধের মানের পরিবর্তন ঘটে।
উপরোক্ত নির্ভরশীলতা থেকে পাওয়া যায়: R ∝ l/A বা, R = ρ(l/A) এখানে ρ (rho) হলো একটি ধ্রুবক, যা পরিবাহীর উপাদানের রোধাঙ্ক (Resistivity) নামে পরিচিত। রোধাঙ্ক হলো কোনো পদার্থের একক দৈর্ঘ্য ও একক প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফলবিশিষ্ট একটি পরিবাহীর রোধ। এটি উপাদানের নিজস্ব ধর্ম এবং এর মাত্রা হলো [ML³T⁻³I⁻²]। অন্যভাবে বললে, কোনো পদার্থের রোধাঙ্ক হলো ঐ পদার্থ দিয়ে তৈরি একটি একক ঘনকের (অর্থাৎ ১ মিটার দীর্ঘ, ১ মিটার প্রস্থ এবং ১ মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট) দুটি বিপরীত পৃষ্ঠের মধ্যবর্তী রোধ।
2.4 পরিবাহিতা এবং পরিবাহিতাঙ্ক (Conductance and Conductivity)
পরিবাহিতা (Conductance): পরিবাহীর যে ধর্মের জন্য তার মধ্যে দিয়ে তড়িৎ সহজে প্রবাহিত হতে পারে, তাকে পরিবাহিতা বলে। এটি রোধের অন্যোন্যক, অর্থাৎ K = 1/R। এর SI একক হলো মসম্যানহো (mho) বা সিমেন্স (S)।
পরিবাহিতাঙ্ক (Conductivity): এটি রোধাঙ্কের অন্যোন্যক (σ = 1/ρ) এবং পরিবাহীর তড়িৎ পরিবহনের সহজাত ক্ষমতার পরিমাপ। এর SI একক হলো mho m⁻¹ বা Ω⁻¹m⁻¹।
একক রোধকের ধর্ম বোঝার পর, এখন আমরা দেখব কীভাবে একাধিক রোধককে বর্তনীতে সংযুক্ত করলে তাদের সম্মিলিত আচরণ পরিবর্তিত হয়।
3.0 রোধের সমবায় এবং বর্তনীর বিশ্লেষণ
বাস্তব ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক বর্তনী ডিজাইনের জন্য রোধকগুলিকে বিভিন্নভাবে সংযুক্ত করার প্রয়োজন হয়। রোধের সমবায় বোঝা তাই ব্যবহারিক বর্তনী বিশ্লেষণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোধকগুলিকে মূলত দুটি মৌলিক উপায়ে সংযুক্ত করা হয়—শ্রেণী সমবায় এবং সমান্তরাল সমবায়। এই বিভাগে আমরা প্রতিটি সমবায়ের নিয়মাবলী এবং বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করব।
3.1 শ্রেণী সমবায় (Series Combination)
যখন একাধিক রোধককে এমনভাবে পরপর যুক্ত করা হয় যে প্রতিটি রোধকের মধ্যে দিয়ে একই পরিমাণ তড়িৎপ্রবাহ চালিত হয়, তখন সেই সমবায়কে শ্রেণী সমবায় বলা হয়।
বৈশিষ্ট্য:
- বর্তনীতে মোট তড়িৎপ্রবাহ (I) ধ্রুবক থাকে।
- প্রতিটি রোধকের দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদ (V) বিভক্ত হয়ে যায়। মোট বিভব প্রভেদ হয়
V = V₁ + V₂ + V₃।
এই সমবায়ে তুল্য রোধের মান প্রতিটি রোধের যোগফলের সমান হয়। তুল্য রোধ: Rs = R₁ + R₂ + R₃
যদি n সংখ্যক একই মানের (R) রোধককে শ্রেণী সমবায়ে যুক্ত করা হয়, তবে তুল্য রোধ হবে Rs = nR।
3.2 সমান্তরাল সমবায় (Parallel Combination)
যখন একাধিক রোধকের এক প্রান্ত একটি সাধারণ বিন্দুতে এবং অপর প্রান্ত অন্য একটি সাধারণ বিন্দুতে যুক্ত থাকে, তখন সেই সমবায়কে সমান্তরাল সমবায় বলা হয়।
বৈশিষ্ট্য:
- প্রতিটি রোধকের দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদ (V) ধ্রুবক থাকে।
- মূল তড়িৎপ্রবাহ (I) প্রতিটি রোধকের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যায়। মোট প্রবাহমাত্রা হয়
I = I₁ + I₂ + I₃।
এই সমবায়ে তুল্য রোধের অন্যোন্যক প্রতিটি রোধের অন্যোন্যকের যোগফলের সমান হয়। তুল্য রোধ: 1/Rp = 1/R₁ + 1/R₂ + 1/R₃
যদি n সংখ্যক একই মানের (R) রোধককে সমান্তরাল সমবায়ে যুক্ত করা হয়, তবে তুল্য রোধ হবে Rp = R/n।
3.3 অভ্যন্তরীণ রোধ ও নষ্ট ভোল্ট (Internal Resistance and Lost Volts)
অভ্যন্তরীণ রোধ (r): তড়িৎকোষের মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হওয়ার সময় কোষের উপাদানগুলি প্রবাহের বিরুদ্ধে যে বাধার সৃষ্টি করে, তাকে কোষের অভ্যন্তরীণ রোধ বলা হয়।
একটি তড়িৎকোষ থেকে তড়িৎ প্রবাহের সময় বর্তনীর মোট রোধ হয় বাহ্যিক রোধ (R) এবং অভ্যন্তরীণ রোধ (r)-এর যোগফল। সুতরাং, বর্তনীর প্রবাহমাত্রা: I = E / (R + r) এখানে E হলো কোষের তড়িৎচালক বল।
বর্তনীতে প্রবাহ চলার সময় অভ্যন্তরীণ রোধের কারণে কোষের ভিতরে বিভবের একটি অংশ হ্রাস পায়। এই হ্রাসপ্রাপ্ত বিভবকে নষ্ট ভোল্ট (Lost Volts) বলা হয়। কোষের দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদ V হলে, সম্পর্কটি দাঁড়ায়: V = E - Ir এখানে Ir অংশটিই হলো নষ্ট ভোল্ট।
বর্তনী এবং রোধের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণের পর এখন আমরা বর্তনীতে শক্তির রূপান্তর, বিশেষত তাপ উৎপাদনের ঘটনা নিয়ে আলোচনা করব।
4.0 তড়িৎপ্রবাহের তাপীয় ফল এবং এর প্রয়োগ
তড়িৎপ্রবাহের তাপীয় ফলকে কেবল শক্তির অপচয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে বৈদ্যুতিক শক্তির তাপ শক্তিতে রূপান্তরের একটি মৌলিক নীতি, যা আধুনিক প্রযুক্তিতে বহুবিধ praktisch প্রয়োগের জন্ম দিয়েছে। এই বিভাগে আমরা বিজ্ঞানী জুলের সূত্রের মাধ্যমে এই তাপ উৎপাদনের পরিমাণগত নিয়মাবলী এবং তার ব্যবহারিক প্রয়োগগুলি সম্পর্কে জানব।
4.1 জুলের সূত্র: তাপ উৎপাদনের নীতি (Joule’s Law: Principles of Heat Generation)
কোনো পরিবাহীতে তড়িৎপ্রবাহের ফলে উৎপন্ন তাপের পরিমাণ তিনটি সূত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়, যা জুলের সূত্র নামে পরিচিত:
- প্রথম সূত্র (প্রবাহমাত্রার সূত্র): পরিবাহীর রোধ (R) এবং প্রবাহের সময় (t) অপরিবর্তিত থাকলে, উৎপন্ন তাপ (H) প্রবাহমাত্রার (I) বর্গের সমানুপাতিক।
H ∝ I²(যখন R ও t ধ্রুবক)
- দ্বিতীয় সূত্র (রোধের সূত্র): প্রবাহমাত্রা (I) এবং প্রবাহের সময় (t) অপরিবর্তিত থাকলে, উৎপন্ন তাপ (H) পরিবাহীর রোধের (R) সমানুপাতিক।
H ∝ R(যখন I ও t ধ্রুবক)
- তৃতীয় সূত্র (সময়ের সূত্র): পরিবাহীর রোধ (R) এবং প্রবাহমাত্রা (I) অপরিবর্তিত থাকলে, উৎপন্ন তাপ (H) সময়ের (t) সমানুপাতিক।
H ∝ t(যখন I ও R ধ্রুবক)
এই তিনটি সূত্রকে একত্রিত করে পাওয়া যায়: H = (I²Rt)/J এখানে J হলো তাপের যান্ত্রিক তুল্যাঙ্ক।
- SI পদ্ধতিতে এর মান
J = 1। - CGS পদ্ধতিতে এর মান
J = 4.2জুল/ক্যালোরি।
SI পদ্ধতিতে উৎপন্ন তাপের (H) বিভিন্ন রূপ হলো: H = I²Rt H = VIt H = V²t/R
4.2 তড়িৎ ক্ষমতা ও তড়িৎ শক্তি (Electric Power and Energy)
তড়িৎ ক্ষমতা (Electric Power, P): কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্রের কার্য করার হারকে তার তড়িৎ ক্ষমতা বলে। গাণিতিকভাবে, P = VI। এর অন্য রূপগুলি হলো P = I²R এবং P = V²/R। ক্ষমতার SI একক হলো ওয়াট (Watt, W)।
তড়িৎ শক্তি (Electric Energy, E): কোনো যন্ত্রের মোট কৃতকার্য বা ব্যয়িত শক্তি হলো তার ক্ষমতা এবং সময়ের গুণফল। গাণিতিকভাবে, E = P × t।
শক্তির SI একক জুল (Joule) এবং CGS একক আর্গ (erg)। তবে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে শক্তির পরিমাপের জন্য একটি বৃহত্তর একক ব্যবহৃত হয়, যা বোর্ড অফ ট্রেড ইউনিট (B.O.T.) বা কিলোওয়াট-ঘণ্টা (kWh) নামে পরিচিত। 1 B.O.T বা 1 kWh = 3.6 × 10⁶ J।
একটি বালবের গায়ে “220V – 100W” লেখার অর্থ হলো, বালবটিকে 220V বিভব প্রভেদে যুক্ত করলে এটি সবচেয়ে ভালোভাবে কাজ করবে এবং প্রতি সেকেন্ডে 100 জুল তড়িৎ শক্তি ব্যয় করবে।
4.3 তাপীয় ফলের ব্যবহারিক প্রয়োগ (Practical Applications of Heating Effect)
তড়িৎপ্রবাহের তাপীয় ফলের নীতিকে কাজে লাগিয়ে বহু প্রয়োজনীয় যন্ত্র তৈরি করা হয়েছে:
- বৈদ্যুতিক বাল্ব (Electric Bulb): এর মধ্যে টাংস্টেন ধাতুর ফিলামেন্ট ব্যবহার করা হয়। টাংস্টেনের উচ্চ রোধ এবং অতি উচ্চ গলনাঙ্ক (3380°C) থাকায় এটি উত্তপ্ত হয়ে আলো বিকিরণ করে কিন্তু গলে যায় না।
- বৈদ্যুতিক হিটার (Electric Heater): এতে নাইক্রোম (লোহা, নিকেল ও ক্রোমিয়ামের সংকর ধাতু) তারের কুণ্ডলী ব্যবহৃত হয়। নাইক্রোমের উচ্চ রোধ এবং উচ্চ গলনাঙ্কের কারণে এটি প্রচুর তাপ উৎপন্ন করতে পারে।
- বৈদ্যুতিক ফিউজ (Electric Fuse): এটি একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা যা টিন ও সিসার সংকর ধাতু দিয়ে তৈরি। এর বৈশিষ্ট্য হলো উচ্চ রোধ এবং নিম্ন গলনাঙ্ক। ফিউজকে লাইভ তারের সঙ্গে শ্রেণী সমবায়ে যুক্ত করা হয়। বর্তনীতে অতিরিক্ত তড়িৎ প্রবাহিত হলে এটি উত্তপ্ত হয়ে গলে যায় এবং বর্তনীকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, ফলে মূল্যবান যন্ত্রপাতি সুরক্ষিত থাকে।
তড়িৎপ্রবাহের একমাত্র ফল তাপ নয়; এর একটি চৌম্বকীয় ফলও রয়েছে, যা পরবর্তী অধ্যায়ের মূল আলোচ্য বিষয়।
5.0 তড়িৎপ্রবাহের চৌম্বকীয় ফল
পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে তড়িৎ ও চুম্বকত্বকে দুটি ভিন্ন শাখা হিসেবে বিবেচনা করা হতো, যতক্ষণ না ওরস্টেডের যুগান্তকারী আবিষ্কার এই দুটি ধারণাকে একত্রিত করে। তড়িৎপ্রবাহ যে চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে, এই আবিষ্কারই তড়িৎচুম্বকত্বের জন্ম দেয়। এই বিভাগে আমরা ওরস্টেডের পরীক্ষা এবং তড়িৎপ্রবাহের ফলে সৃষ্ট চৌম্বক ক্ষেত্রের দিকনির্ণয়ের নিয়মাবলী নিয়ে আলোচনা করব।
5.1 ওরস্টেডের পরীক্ষা ও তড়িৎচুম্বকত্ব (Oersted’s Experiment and Electromagnetism)
ওরস্টেডের পরীক্ষার মূল সিদ্ধান্ত হলো, কোনো তড়িৎবাহী তারের চারপাশে একটি চৌম্বক ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়, যা নিকটবর্তী কোনো চুম্বক শলাকাকে বিক্ষিপ্ত করতে পারে। এই ঘটনাটিকেই তড়িৎচুম্বকত্ব বলা হয়।
এই চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি দুটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে:
- ক্ষেত্রের শক্তি তড়িৎ প্রবাহমাত্রার সমানুপাতিক। অর্থাৎ, প্রবাহ বাড়লে ক্ষেত্রের শক্তি বাড়ে।
- ক্ষেত্রের শক্তি তার থেকে দূরত্বের ব্যস্তানুপাতিক। অর্থাৎ, তার থেকে দূরে গেলে ক্ষেত্রের শক্তি কমে যায়।
চুম্বক শলাকার বিক্ষেপের দিক নির্ণয়ের জন্য অ্যাম্পিয়ারের সন্তরণ নিয়ম ব্যবহার করা হয়।
অ্যাম্পিয়ারের সন্তরণ নিয়ম: কোনো ব্যক্তিকে তড়িৎবাহী তার বরাবর প্রবাহের অভিমুখে সাঁতার কাটছে বলে কল্পনা করলে এবং তার মুখ যদি চুম্বক শলাকার উত্তর মেরুর দিকে থাকে, তবে ওই ব্যক্তির বাম হাত যেদিকে বিক্ষিপ্ত হবে, শলাকার উত্তর মেরুটিও সেদিকেই বিক্ষিপ্ত হবে।
5.2 তড়িৎবাহী পরিবাহীর চারপাশে চৌম্বক ক্ষেত্র নির্ণয়ের নিয়মাবলী (Rules for Determining Magnetic Field around Conductors)
তড়িৎবাহী পরিবাহীর আকারের উপর নির্ভর করে সৃষ্ট চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রকৃতি ভিন্ন হয় এবং এর দিক নির্ণয়ের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে।
ঋজু তড়িৎবাহী তার (For a Straight Conductor)
একটি সোজা তারের চারপাশে সৃষ্ট চৌম্বক বলরেখার অভিমুখ দക്ഷിণ মুষ্টি নিয়ম (Right-Hand Thumb Rule) দ্বারা নির্ণয় করা হয়।
- নিয়ম: একটি তড়িৎবাহী তারকে ডান হাতে এমনভাবে মুষ্টিবদ্ধ করে ধরা হয় যেন বৃদ্ধাঙ্গুলি তড়িৎপ্রবাহের অভিমুখ নির্দেশ করে। এক্ষেত্রে, অন্য আঙুলগুলি যেদিকে বেঁকে থাকে, সেই দিকই চৌম্বক বলরেখার অভিমুখ নির্দেশ করে।
- প্রবাহ ওপরের দিকে হলে বলরেখাগুলি বামাবর্তী (Anticlockwise) এবং প্রবাহ নিচের দিকে হলে বলরেখাগুলি দক্ষিণাবর্তী (Clockwise) হয়।
বৃত্তাকার তারের কুন্ডলী (For a Circular Loop)
একটি বৃত্তাকার তড়িৎবাহী কুণ্ডলীর দুই পৃষ্ঠে দুটি বিপরীত চৌম্বক মেরুর সৃষ্টি হয়। এই মেরু প্রকৃতি নির্ণয়ের জন্য ঘড়ি সূত্র (Clock Face Rule) ব্যবহার করা হয়।
- নিয়ম: কুণ্ডলীর কোনো পৃষ্ঠের দিকে তাকালে যদি তড়িৎপ্রবাহ ঘড়ির কাঁটার দিকে (Clockwise) মনে হয়, তবে ওই পৃষ্ঠে দক্ষিণ মেরু (South Pole) সৃষ্টি হয়। বিপরীতভাবে, যদি প্রবাহ ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে (Anticlockwise) মনে হয়, তবে ওই পৃষ্ঠে উত্তর মেরু (North Pole) সৃষ্টি হয়।
একইভাবে, একটি তড়িৎবাহী সলিনয়েড (Solenoid) দণ্ডচুম্বকের মতো আচরণ করে।
5.3 তড়িৎচুম্বক এবং এর কার্যকারিতা (The Electromagnet and its Functionality)
তড়িৎচুম্বক (Electromagnet): একটি কাঁচা লোহার দণ্ডের উপর অন্তরক তার জড়িয়ে (সলিনয়েড) তার মধ্যে দিয়ে তড়িৎপ্রবাহ পাঠালে দণ্ডটি একটি শক্তিশালী অস্থায়ী চুম্বকে পরিণত হয়। এটিকেই তড়িৎচুম্বক বলে।
তড়িৎচুম্বকের শক্তি নিম্নলিখিত বিষয়গুলির উপর নির্ভর করে:
- কুণ্ডলীর পাক সংখ্যা।
- তড়িৎপ্রবাহের মান।
- মজ্জা হিসেবে ব্যবহৃত পদার্থের উপাদান।
তড়িৎপ্রবাহ যেমন চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে, তেমনই একটি চৌম্বক ক্ষেত্রও তড়িৎপ্রবাহের উপর বল প্রয়োগ করতে পারে, যা বৈদ্যুতিক মোটরের মূল ভিত্তি।
6.0 চৌম্বক ক্ষেত্রে তড়িৎবাহী পরিবাহীর উপর ক্রিয়া
যখন একটি তড়িৎবাহী পরিবাহীকে কোনো চৌম্বক ক্ষেত্রে রাখা হয়, তখন পরিবাহীটির উপর একটি যান্ত্রিক বল প্রযুক্ত হয়। তড়িৎ এবং চুম্বকত্বের এই পারস্পরিক ক্রিয়াই হলো বৈদ্যুতিক মোটরের কার্যকারিতার মূল ভিত্তি, যা তড়িৎ শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে আধুনিক সভ্যতাকে গতিশীল করেছে। এই বলের দিক বোঝার জন্য ফ্লেমিং-এর বামহস্ত নিয়ম একটি অপরিহার্য হাতিয়ার।
6.1 ফ্লেমিং-এর বামহস্ত নিয়ম এবং এর তাৎপর্য (Fleming’s Left-Hand Rule and its Significance)
ফ্লেমিং-এর বামহস্ত নিয়ম: বামহাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি, তর্জনী এবং মধ্যমাকে পরস্পরের সঙ্গে সমকোণে রেখে প্রসারিত করলে যদি তর্জনী চৌম্বকক্ষেত্রের অভিমুখ এবং মধ্যমা তড়িৎপ্রবাহের অভিমুখ নির্দেশ করে, তবে বৃদ্ধাঙ্গুলি পরিবাহীর গতির বা প্রযুক্ত বলের অভিমুখ নির্দেশ করবে।
- তর্জনী: চৌম্বকক্ষেত্র (Magnetic Field)
- মধ্যমা: তড়িৎপ্রবাহ (Current)
- বৃদ্ধাঙ্গুলি: পরিবাহীর গতির অভিমুখ (Direction of Force/Motion)
এই নীতির একটি ক্লাসিক উদাহরণ হলো বার্লোচক্র (Barlow’s Wheel), যা তড়িৎপ্রবাহ ও চৌম্বকক্ষেত্রের মিথস্ক্রিয়ায় সৃষ্ট ঘূর্ণন প্রদর্শন করে।
6.2 বৈদ্যুতিক মোটর: কার্যনীতি ও প্রয়োগ (The Electric Motor: Principle and Application)
বৈদ্যুতিক মোটর (Electric Motor) এমন একটি যন্ত্র যা তড়িৎ শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে। এর কার্যনীতি ফ্লেমিং-এর বামহস্ত নিয়মের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। চৌম্বক ক্ষেত্রে অবস্থিত একটি তড়িৎবাহী কুণ্ডলীর উপর প্রযুক্ত বলের কারণে কুণ্ডলীটি ঘুরতে শুরু করে, যা যান্ত্রিক কার্য সম্পাদন করে।
একটি মোটরের শক্তি বৃদ্ধি করার জন্য নিম্নলিখিত উপায়গুলি অবলম্বন করা হয়:
- আর্মেচারের (কুণ্ডলীর) পাক সংখ্যা বাড়ানো।
- তড়িৎপ্রবাহের মান বৃদ্ধি করা।
- আরও শক্তিশালী ক্ষেত্র-চুম্বক ব্যবহার করা।
প্রয়োগ: বৈদ্যুতিক পাখা, পাম্প, ট্রাম, ট্রেন এবং অসংখ্য আধুনিক যন্ত্রপাতিতে মোটরের ব্যবহার অনস্বীকার্য।
যদি তড়িৎপ্রবাহ এবং চুম্বকত্ব মিলে গতি তৈরি করতে পারে, তবে বিপরীত প্রশ্নটিও স্বাভাবিক: গতি এবং চুম্বকত্ব ব্যবহার করে কি তড়িৎ তৈরি করা সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তরই আমাদের তড়িৎচুম্বকীয় আবেশের দিকে নিয়ে যায়।
7.0 তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ
তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ হলো বৈদ্যুতিক মোটরের কার্যাবলী ঠিক তার বিপরীত একটি ঘটনা। বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডের এই যুগান্তকারী আবিষ্কার আধুনিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছে। এই নীতি অনুসারে, যান্ত্রিক শক্তিকে তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করা সম্ভব। এই বিভাগে আমরা সেই নিয়মাবলী নিয়ে আলোচনা করব যা এই অসাধারণ ঘটনাটিকে নিয়ন্ত্রণ করে।
7.1 ফ্যারাডে ও লেঞ্জের সূত্র (Faraday’s and Lenz’s Laws)
তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ (Electromagnetic Induction): কোনো বদ্ধ কুণ্ডলীর সঙ্গে জড়িত চৌম্বক বলরেখার সংখ্যা বা চৌম্বক ফ্লাক্সের পরিবর্তন ঘটলে, ওই কুণ্ডলীতে একটি তড়িৎচালক বল আবিষ্ট হয় এবং তার ফলে একটি ক্ষণস্থায়ী তড়িৎপ্রবাহের সৃষ্টি হয়। এই ঘটনাকেই তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ বলে। যতক্ষণ ফ্লাক্সের পরিবর্তন ঘটে, ততক্ষণই এই আবিষ্ট প্রবাহ স্থায়ী হয়।
ফ্যারাডের সূত্র (Faraday’s Laws of Induction):
- প্রথম সূত্র: কোনো বদ্ধ বর্তনীর সঙ্গে জড়িত চৌম্বক প্রবাহের পরিবর্তন হলে ওই বর্তনীতে একটি তড়িৎচালক বল আবিষ্ট হয়।
- দ্বিতীয় সূত্র: আবিষ্ট তড়িৎচালক বলের মান কুণ্ডলীর সঙ্গে জড়িত চৌম্বক প্রবাহের পরিবর্তনের হারের সমানুপাতিক।
লেঞ্জের সূত্র (Lenz’s Law): তড়িৎচুম্বকীয় আবেশের ফলে বর্তনীতে সৃষ্ট আবিষ্ট তড়িৎপ্রবাহের অভিমুখ এমন হয় যে, এটি নিজের সৃষ্টির কারণকেই বাধা দেয়। এই সূত্রটি আসলে শক্তির সংরক্ষণ সূত্রের একটি বিকল্প রূপ।
7.2 ফ্লেমিং-এর ডানহস্ত নিয়ম (Fleming’s Right-Hand Rule)
আবিষ্ট তড়িৎপ্রবাহের অভিমুখ নির্ণয় করার জন্য ফ্লেমিং-এর ডানহস্ত নিয়ম ব্যবহার করা হয়।
নিয়ম: ডানহাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি, তর্জনী ও মধ্যমাকে পরস্পরের সমকোণে প্রসারিত করলে, যদি তর্জনী চৌম্বক ক্ষেত্রের অভিমুখ এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি পরিবাহীর গতির অভিমুখ নির্দেশ করে, তবে মধ্যমা আবিষ্ট তড়িৎপ্রবাহের অভিমুখ নির্দেশ করবে।
- তর্জনী: চৌম্বক ক্ষেত্র (Magnetic Field)
- বৃদ্ধাঙ্গুলি: পরিবাহীর গতির অভিমুখ (Direction of Motion)
- মধ্যমা: আবিষ্ট তড়িৎপ্রবাহের অভিমুখ (Direction of Induced Current)
7.3 ডায়নামো বা জেনারেটর: কার্যনীতি (Dynamo/Generator: Principle of Operation)
বৈদ্যুতিক জেনারেটর বা ডায়নামো (Dynamo/Generator) হলো তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ নীতির একটি ব্যবহারিক প্রয়োগ। এই যন্ত্রে যান্ত্রিক শক্তিকে তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করা হয়। একটি চৌম্বক ক্ষেত্রে কুণ্ডলীকে ঘুরিয়ে চৌম্বক ফ্লাক্সের পরিবর্তন ঘটানো হয়, যার ফলে কুণ্ডলীতে তড়িৎপ্রবাহ আবিষ্ট হয়।
জেনারেটর দুই ধরনের তড়িৎপ্রবাহ উৎপাদন করতে পারে—সমপ্রবাহ (DC) এবং পরিবর্তী প্রবাহ (AC), যা আমাদের পরবর্তী আলোচনার বিষয়।
8.0 পরিবর্তী ও সমপ্রবাহ এবং গার্হস্থ্য বৈদ্যুতিক বর্তনী
তড়িৎপ্রবাহ প্রধানত দুই প্রকার—সমপ্রবাহ (Direct Current বা DC) এবং পরিবর্তী প্রবাহ (Alternating Current বা AC)। এদের মধ্যে পার্থক্য বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটিই নির্ধারণ করে কেন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং আমাদের বাড়ির বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় মূলত AC ব্যবহার করা হয়।
8.1 সমপ্রবাহ (DC) বনাম পরিবর্তী প্রবাহ (AC) (Direct Current (DC) vs. Alternating Current (AC))
DC এবং AC প্রবাহের মধ্যে মূল পার্থক্যগুলি নিচে সারণিবদ্ধ করা হলো:
|
বৈশিষ্ট্য |
সমপ্রবাহ (Direct Current – DC) |
পরিবর্তী প্রবাহ (Alternating Current – AC) |
|
সংজ্ঞা |
যে তড়িৎপ্রবাহের মান ও অভিমুখ সময়ের সঙ্গে অপরিবর্তিত থাকে। |
যে তড়িৎ প্রবাহের অভিমুখ নির্দিষ্ট সময় অন্তর পরিবর্তিত হয় এবং মান পর্যায়বৃত্তভাবে পরিবর্তিত হয়। |
|
উৎস |
ব্যাটারি, তড়িৎকোষ, DC জেনারেটর। |
AC জেনারেটর। |
|
সুবিধা |
— |
উৎপাদন খরচ ও অপচয় কম, উচ্চ বিভবে বহুদূর পাঠানো যায়, এবং বিভব সহজে রূপান্তরিত করা যায়। |
8.2 গৃহস্থালীর বৈদ্যুতিক বর্তনীর গঠন (Structure of Domestic Electrical Wiring)
বাড়িতে ব্যবহৃত সমস্ত বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, যেমন—বাতি, পাখা, টিভি ইত্যাদি সমান্তরাল সমবায়ে যুক্ত থাকে। এর ফলে প্রতিটি যন্ত্র প্রয়োজনীয় বিভব প্রভেদ (যেমন 220V) পায় এবং একটি যন্ত্র বন্ধ বা খারাপ হলেও অন্যগুলি চলতে পারে।
গার্হস্থ্য বর্তনীতে মূলত তিন ধরনের তার ব্যবহার করা হয়:
- লাইভ তার (Live wire): এর রং সাধারণত লাল বা বাদামী হয়। এটি উচ্চ বিভবের সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং এর মধ্যে দিয়েই তড়িৎ বর্তনীতে প্রবেশ করে।
- নিউট্রাল তার (Neutral wire): এর রং কালো বা নীল হয়। এটি নিম্ন বিভবের সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং এর মধ্যে দিয়ে তড়িৎপ্রবাহ ফিরে গিয়ে বর্তনী পূর্ণ করে।
- আর্থিং তার (Earth wire): এর রং সবুজ। এটি একটি সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা। যন্ত্রের ধাতব আবরণের সঙ্গে যুক্ত এই তারটি কোনো কারণে লিকেজ কারেন্ট হলে সেটিকে মাটিতে পাঠিয়ে দেয় এবং ব্যবহারকারীকে বৈদ্যুতিক শক থেকে রক্ষা করে। এর বিভব শূন্য ধরা হয়।
এই আলোচনা আমাদের চলতড়িতের মৌলিক ধারণা থেকে শুরু করে এর বাস্তব প্রয়োগ পর্যন্ত একটি সম্পূর্ণ চিত্র প্রদান করে।
9.0 উপসংহার: চলতড়িতের সমন্বিত গুরুত্ব
এই মনোগ্রাফে আমরা দেখেছি কিভাবে আধানের এক অদৃশ্য কণা থেকে শুরু করে ওহম ও জুলের সূত্রের গাণিতিক সুতো ধরে তড়িৎ ও চুম্বকত্বের অবিচ্ছেদ্য বন্ধন উন্মোচিত হয়। এই মৌলিক নীতিগুলি শুধু পরীক্ষাগারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৈদ্যুতিক মোটর থেকে জেনারেটর—প্রতিটি আবিষ্কারই এই ভিত্তিপ্রস্তরের উপর দাঁড়িয়ে আছে, যা আধুনিক সভ্যতাকে চালিত করে। পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে এই সমন্বিত জ্ঞান আয়ত্ত করা শুধুমাত্র পরীক্ষায় সাফল্যের চাবিকাঠি নয়, বরং আমাদের পারিপার্শ্বিক প্রযুক্তি-নির্ভর বিশ্বকে বোঝার এক অপরিহার্য সোপান।
চলতড়িৎ: দশম শ্রেণীর জন্য একটি বিশদ বিশ্লেষণ
১.০ তড়িৎ আধান এবং বিভবের প্রাথমিক ধারণা
তড়িৎ আধান পদার্থের একটি অন্তর্নিহিত এবং মৌলিক ধর্ম। পরমাণুর গঠন থেকে শুরু করে বিশাল বৈদ্যুতিক বর্তনীর কার্যকারিতা পর্যন্ত সমস্ত কিছুই এই আধানের আচরণের উপর নির্ভরশীল। প্রকৃতপক্ষে, আধানের স্থিতি বা গতিই স্থিরতড়িৎ এবং চলতড়িৎ-এর মতো শাখার জন্ম দিয়েছে। এই বিভাগে আমরা তড়িৎ আধান, কুলম্বের সূত্র, তড়িৎ বিভব এবং তড়িৎচালক বলের মতো মৌলিক ধারণাগুলি নিয়ে আলোচনা করব, যা চলতড়িৎ বোঝার ভিত্তি স্থাপন করে।
তড়িৎ আধান এবং এর বৈশিষ্ট্য
তড়িৎ আধান হলো পদার্থের এমন একটি ভৌত ধর্ম যার জন্য কোনো বস্তু অন্য কোনো তড়িদগ্রস্ত বস্তুর উপর বল প্রয়োগ করতে পারে। আধান প্রধানত দুই প্রকারের হয়ে থাকে:
- ধনাত্মক আধান: প্রোটনের আধান (+1.6 × 10⁻¹⁹ কুলম্ব)।
- ঋণাত্মক আধান: ইলেকট্রনের আধান (–1.6 × 10⁻¹⁹ কুলম্ব)।
সাধারণ অবস্থায় পরমাণু নিস্তড়িৎ থাকে, কারণ এতে সমসংখ্যক প্রোটন ও ইলেকট্রন থাকে, ফলে মোট আধান শূন্য হয়। তড়িৎ আধানের SI একক কুলম্ব (C) এবং CGS একক স্ট্যাটকুলম্ব (e.s.u)। এর মাত্রা হলো [IT]।
তড়িৎ আধানের কয়েকটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে:
- আকর্ষণ ও বিকর্ষণ: সমধর্মী আধান পরস্পরকে বিকর্ষণ করে এবং বিপরীতধর্মী আধান পরস্পরকে আকর্ষণ করে।
- নিত্যতা বা সংরক্ষণ: কোনো বিচ্ছিন্ন সংস্থার মোট আধান সর্বদা সংরক্ষিত বা ধ্রুবক থাকে।
- কোয়ান্টায়ন: কোনো আহিত বস্তুতে মোট আধানের পরিমাণ একটি ইলেকট্রনের আধানের পূর্ণসংখ্যার সরল গুণিতক হয়। এই সম্পর্কটি
Q = neসূত্র দ্বারা প্রকাশ করা হয়, যেখানেQহলো মোট আধান,nহলো ইলেকট্রনের সংখ্যা (একটি পূর্ণসংখ্যা) এবংeহলো একটি ইলেকট্রনের আধানের মান।
কুলম্বের সূত্র এবং তড়িৎক্ষেত্র
দুটি বিন্দু আধানের মধ্যে ক্রিয়াশীল আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বলের মান নির্ণয়ের জন্য কুলম্বের সূত্র ব্যবহৃত হয়। সূত্রটি অনুযায়ী, দুটি বিন্দু আধানের মধ্যে ক্রিয়াশীল বলের মান আধান দুটির গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।
গাণিতিকভাবে, F = k * (q1 * q2) / r²
এখানে, F হলো বল, q1 ও q2 হলো আধানের পরিমাণ, r হলো তাদের মধ্যবর্তী দূরত্ব এবং k হলো একটি সমানুপাতিক ধ্রুবক, যা মাধ্যমের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে।
- SI পদ্ধতিতে: শূন্যস্থানে
k-এর মান9 × 10⁹ Nm²/C²। - CGS পদ্ধতিতে: শূন্যস্থানে
k-এর মান1 dyn.cm²/(esu)²।
তড়িৎক্ষেত্র হলো কোনো আধানের চারপাশে বিস্তৃত এমন একটি অঞ্চল, যেখানে অন্য কোনো আধান আনলে সেটি একটি আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বল অনুভব করে।
তড়িৎ বিভব, বিভব প্রভেদ এবং তড়িৎচালক বল (EMF)
তড়িৎ বিভব হলো অসীম দূরত্ব থেকে একটি একক ধনাত্মক আধানকে তড়িৎক্ষেত্রের কোনো বিন্দুতে আনতে যে পরিমাণ কার্য করতে হয়। এর গাণিতিক রূপ হলো V = w/q।
বিভব প্রভেদ হলো তড়িৎক্ষেত্রের একটি বিন্দু থেকে অন্য একটি বিন্দুতে একক ধনাত্মক আধানকে নিয়ে যেতে যে পরিমাণ কার্য করতে হয়। যদি A ও B দুটি বিন্দু হয়, তবে তাদের বিভব প্রভেদ VA – VB = w/q।
- একক: বিভব ও বিভব প্রভেদের SI একক হলো ভোল্ট (V) এবং CGS একক হলো স্ট্যাটভোল্ট। এদের মধ্যে সম্পর্কটি হলো 1 Volt = 1/300 Statvolt। বিভবের মাত্রা হলো
[ML²T⁻³I⁻¹]। - পরিমাপ: বিভব প্রভেদ ভোল্টমিটার যন্ত্রের সাহায্যে মাপা হয়। ভোল্টমিটারকে বর্তনীর দুটি বিন্দুর মধ্যে সমান্তরাল সমবায়ে যুক্ত করা হয়। একটি আদর্শ ভোল্টমিটারের রোধ অসীম ধরা হয়, যাতে এর মধ্যে দিয়ে প্রায় কোনো তড়িৎ প্রবাহিত না হয় এবং বর্তনীর মূল প্রবাহের মানের কোনো পরিবর্তন না ঘটে।
তড়িৎচালক বল (EMF) হলো মুক্ত বর্তনীতে (অর্থাৎ, যখন বর্তনীর মধ্যে দিয়ে কোনো তড়িৎপ্রবাহ চলে না) কোনো তড়িৎ কোষের দুটি প্রান্তের মধ্যেকার সর্বোচ্চ বিভব প্রভেদ। সহজ কথায়, এটি কোষের ভিতরে একক ধনাত্মক আধানকে নিম্ন বিভব থেকে উচ্চ বিভবে নিয়ে যেতে কৃতকার্যের পরিমাণ। এর SI এককও ভোল্ট।
এই তড়িৎ বিভবের পার্থক্যই পরিবাহীর মুক্ত ইলেকট্রনগুলিকে একটি নির্দিষ্ট দিকে চালিত করে, যা তড়িৎপ্রবাহ সৃষ্টি করে। পরবর্তী বিভাগে আমরা এই প্রবাহের পরিমাণ এবং তার নিয়ন্ত্রক নিয়মগুলি নিয়ে আলোচনা করব।
২.০ তড়িৎ প্রবাহ এবং ওহমের সূত্র
যখন কোনো পরিবাহীর দুই প্রান্তের মধ্যে বিভব প্রভেদ সৃষ্টি করা হয়, তখন আধানগুলি একটি নির্দিষ্ট দিকে সচল হয়। আধানের এই সচল অবস্থাই হলো তড়িৎ প্রবাহ। তড়িৎ বর্তনীর বিশ্লেষণে বিভব প্রভেদ, প্রবাহমাত্রা এবং রোধের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনকারী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রটি হলো ওহমের সূত্র, যা আধুনিক তড়িৎবিজ্ঞানের একটি মৌলিক স্তম্ভ।
তড়িৎ প্রবাহমাত্রা
কোনো পরিবাহীর যেকোনো প্রস্থচ্ছেদের মধ্য দিয়ে প্রতি একক সময়ে যে পরিমাণ তড়িৎ আধান প্রবাহিত হয়, তাকে ওই পরিবাহীর তড়িৎ প্রবাহমাত্রা বলা হয়।
এর গাণিতিক রূপ হলো: I = Q/t, যেখানে I প্রবাহমাত্রা, Q আধান এবং t সময়।
তড়িৎ প্রবাহমাত্রার SI একক হলো অ্যাম্পিয়ার (A)। কোনো পরিবাহীর মধ্যে দিয়ে ১ সেকেন্ডে ১ কুলম্ব আধান প্রবাহিত হলে প্রবাহমাত্রাকে ১ অ্যাম্পিয়ার বলা হয়। এটি অ্যামিটার নামক যন্ত্রের সাহায্যে পরিমাপ করা হয়। প্রবাহমাত্রা সঠিকভাবে পরিমাপের জন্য অ্যামিটারকে বর্তনীতে শ্রেণী সমবায়ে যুক্ত করা হয়, কারণ শ্রেণী সমবায়ে বর্তনীর মূল প্রবাহ যন্ত্রটির মধ্যে দিয়ে যায়। একটি আদর্শ অ্যামিটারের রোধ শূন্য ধরা হয়, যাতে এটি বর্তনীর মোট রোধকে প্রভাবিত না করে।
ওহমের সূত্র
উষ্ণতা এবং অন্যান্য ভৌত অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে, কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহমাত্রা ওই পরিবাহীর দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদের সমানুপাতিক হয়।
গাণিতিকভাবে, V ∝ I বা V = IR।
এখানে R হলো একটি সমানুপাতিক ধ্রুবক, যা রোধ নামে পরিচিত। এটি পরিবাহীর একটি ধর্ম যা তড়িৎ প্রবাহকে বাধা দেয়। রোধের SI একক ওহম (Ω) এবং এর মাত্রা হলো [ML²T⁻³I⁻²]।
ওহমের সূত্র থেকে প্রাপ্ত V-I এবং I-V লেখচিত্র দুটি রৈখিক হয় এবং এদের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে:
- V-I লেখচিত্র: এই লেখচিত্রের নতি (
V/I) পরিবাহীর রোধ (R) নির্দেশ করে। - I-V লেখচিত্র: এই লেখচিত্রের নতি (
I/V) পরিবাহীর পরিবাহিতা (1/R) নির্দেশ করে।
ওহমের সূত্র থেকে আমরা রোধ (R) নামক একটি নতুন রাশির সম্মুখীন হলাম, যা শুধুমাত্র তড়িৎ প্রবাহকে বাধা দেওয়ার পরিমাপ নয়, বরং এটি পদার্থের একটি মৌলিক ধর্ম যার উপর পরিবাহীর আচরণ নির্ভর করে। পরবর্তী বিভাগে আমরা এই ধর্মের গভীরে প্রবেশ করব।
৩.০ রোধ এবং রোধাঙ্ক: পদার্থের ধর্মভিত্তিক বিশ্লেষণ
ওহমের সূত্রে প্রাপ্ত রোধ শুধুমাত্র একটি গাণিতিক ধ্রুবক নয়, বরং এটি পদার্থের একটি অন্তর্নিহিত ধর্ম যা তার মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহকে বাধা দেয়। কোনো পদার্থের রোধের মান তার গঠন, আকার এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর নির্ভর করে। এই বিভাগে আমরা রোধ এবং এর সাথে সম্পর্কিত রোধাঙ্ক, পরিবাহিতা ও পরিবাহিতাঙ্কের মতো ধারণাগুলি বিশ্লেষণ করব।
রোধ এবং এর নির্ভরশীলতা
যে ধর্মের জন্য কোনো পরিবাহী তার মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহকে বাধা দেয়, তাকে ওই পরিবাহীর রোধ বলে। রোধ নিম্নলিখিত বিষয়গুলির উপর নির্ভর করে:
- পরিবাহীর দৈর্ঘ্য (l): পরিবাহীর রোধ তার দৈর্ঘ্যের সমানুপাতিক (
R ∝ l)। - পরিবাহীর প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল (A): পরিবাহীর রোধ তার প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফলের ব্যস্তানুপাতিক (
R ∝ 1/A)। - পরিবাহীর উপাদান: ভিন্ন ভিন্ন উপাদানের রোধ ভিন্ন হয় (যেমন—তামার রোধ লোহার থেকে কম)।
- উষ্ণতা: পরিবাহীর উষ্ণতার পরিবর্তন হলে রোধের মানের পরিবর্তন হয়।
রোধাঙ্ক (Resistivity)
উপরোক্ত নির্ভরশীলতাগুলিকে একত্রিত করে আমরা পাই, R = ρ(l/A)।
এখানে ρ (রো) হলো একটি সমানুপাতিক ধ্রুবক, যা পরিবাহীর রোধাঙ্ক বা আপেক্ষিক রোধ নামে পরিচিত। রোধাঙ্ক হলো কোনো পদার্থের একক দৈর্ঘ্য ও একক প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফলবিশিষ্ট একটি খণ্ডের রোধ। এটি উপাদানের একটি ذاتی ধর্ম এবং এর মান পরিবাহীর আকার বা আকৃতির উপর নির্ভর করে না, শুধুমাত্র উপাদান এবং উষ্ণতার উপর নির্ভর করে।
পরিবাহিতা এবং পরিবাহিতাঙ্ক (Conductance and Conductivity)
পরিবাহিতা (Conductance) হলো রোধের বিপরীত রাশি। যে ধর্মের জন্য কোনো পদার্থ তার মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহকে সহজ করে, তাকে পরিবাহিতা বলে।
K = 1/R- এর SI একক হলো সিমেন্স (S) বা म्हो (mho)।
পরিবাহিতাঙ্ক (Conductivity) হলো রোধাঙ্কের বিপরীত রাশি। এটি কোনো উপাদানের তড়িৎ পরিবহন করার ক্ষমতার পরিমাপ।
σ = 1/ρ- এর SI একক হলো সিমেন্স প্রতি মিটার (S/m)।
পদার্থের এই অভ্যন্তরীণ ধর্ম, বিশেষত রোধাঙ্ক, পারিপার্শ্বিক উষ্ণতার উপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল। উষ্ণতার পরিবর্তনে এই ধর্মের ভিন্নতাই বিভিন্ন পদার্থকে প্রযুক্তিগতভাবে স্বতন্ত্র করে তোলে, যা আমাদের পরবর্তী আলোচনার বিষয়।
৪.০ উষ্ণতার সঙ্গে রোধাঙ্কের পরিবর্তন: পরিবাহী, অর্ধপরিবাহী এবং অতিপরিবাহী
উষ্ণতার পরিবর্তন পদার্থের তড়িৎ ধর্মে নাটকীয় পরিবর্তন আনতে পারে। কোনো উপাদান তড়িৎ সুপরিবাহী, কুপরিবাহী নাকি অর্ধপরিবাহী হবে, তা অনেকাংশে উষ্ণতার সঙ্গে তার রোধাঙ্কের পরিবর্তনের ধরনের উপর নির্ভর করে। এই বৈশিষ্ট্যই আধুনিক ইলেকট্রনিক্স এবং প্রযুক্তিতে বিভিন্ন পদার্থের ব্যবহার নির্ধারণ করে।
পরিবাহী (Conductors)
ধাতব পরিবাহীর ক্ষেত্রে উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে রোধাঙ্ক বৃদ্ধি পায়। এর কারণ হলো, উষ্ণতা বাড়লে ধাতুর অভ্যন্তরে থাকা মুক্ত ইলেকট্রনগুলির সাথে ধাতব আয়নগুলির সংঘর্ষের হার বেড়ে যায়, ফলে তড়িৎ প্রবাহে বাধা বৃদ্ধি পায়। লোহা, তামা এবং রুপা হলো এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। পরিবাহীর ক্ষেত্রে, উষ্ণতাকে X-অক্ষে এবং রোধাঙ্ককে Y-অক্ষে স্থাপন করলে লেখচিত্রটি একটি ঊর্ধ্বমুখী বক্ররেখা হয়, যা স্পষ্টভাবে দেখায় যে উষ্ণতা বৃদ্ধির সাথে সাথে রোধাঙ্কও বৃদ্ধি পায়।
অর্ধপরিবাহী (Semiconductors)
অর্ধপরিবাহীর আচরণ পরিবাহীর ঠিক বিপরীত। এদের ক্ষেত্রে উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে রোধাঙ্ক হ্রাস পায়। উষ্ণতা বাড়ার সাথে সাথে অর্ধপরিবাহীর মধ্যে കൂടുതൽ সমযোজী বন্ধন ভেঙে গিয়ে মুক্ত ইলেকট্রন ও হোল (hole) তৈরি হয়, যা তড়িৎ পরিবহনে সাহায্য করে। জার্মেনিয়াম এবং সিলিকন হলো বহুল ব্যবহৃত অর্ধপরিবাহী। অর্ধপরিবাহীর ক্ষেত্রে, উষ্ণতা এবং রোধাঙ্কের লেখচিত্রটি একটি নিম্নমুখী বক্ররেখা হয়, যা নির্দেশ করে যে উষ্ণতা বাড়লে রোধাঙ্ক দ্রুত হ্রাস পায়।
অতিপরিবাহী (Superconductors)
কিছু পদার্থকে একটি নির্দিষ্ট নিম্ন উষ্ণতার নিচে ঠান্ডা করলে তাদের রোধাঙ্ক হঠাৎ করে শূন্য হয়ে যায়। এই ঘটনাকে অতিপরিবাহিতা বলে এবং যে উষ্ণতায় এটি ঘটে, তাকে সংকট উষ্ণতা (Critical Temperature) বলা হয়। এই অবস্থায় পদার্থের মধ্য দিয়ে কোনো রকম বাধা ছাড়াই তড়িৎ প্রবাহিত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, পারদ 4.2 K এবং সিসা 7 K উষ্ণতায় অতিপরিবাহীতে পরিণত হয়। অতিপরিবাহীর ক্ষেত্রে, উষ্ণতা কমতে থাকলে রোধাঙ্ক কমতে থাকে এবং সংকট উষ্ণতায় (Tc) পৌঁছালে তা হঠাৎ শূন্য হয়ে যায়।
পদার্থের এই স্বতন্ত্র ধর্মগুলিকে কাজে লাগিয়েই ব্যবহারিক বর্তনীতে কাঙ্ক্ষিত প্রবাহ বা বিভব পাওয়ার জন্য রোধগুলিকে বিভিন্নভাবে যুক্ত করা হয়, যা রোধের সমবায় নামে পরিচিত।
৫.০ রোধের সমবায়: শ্রেণী এবং সমান্তরাল
ব্যবহারিক বৈদ্যুতিক বর্তনীতে প্রায়শই একটিমাত্র রোধ ব্যবহার করে কাঙ্ক্ষিত প্রবাহমাত্রা বা বিভব প্রভেদ পাওয়া সম্ভব হয় না। এই কারণে, একাধিক রোধকে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন সমবায়ে যুক্ত করা হয়। রোধের সমবায় প্রধানত দুই প্রকারের: শ্রেণী সমবায় এবং সমান্তরাল সমবায়।
শ্রেণী সমবায় (Series Combination)
যখন একাধিক রোধকে এমনভাবে পরপর যুক্ত করা হয় যে, প্রতিটি রোধের মধ্যে দিয়ে একই তড়িৎপ্রবাহ যায়, তখন সেই সমবায়কে শ্রেণী সমবায় বলা হয়।
এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:
- প্রতিটি রোধের মধ্যে দিয়ে একই তড়িৎপ্রবাহ (I) প্রবাহিত হয়।
- প্রতিটি রোধের দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদ ভিন্ন হয় এবং মোট বিভব প্রভেদ প্রতিটি রোধের বিভব প্রভেদের যোগফলের সমান (
V = V₁ + V₂ + V₃)। - সমবায়ের তুল্য রোধ প্রতিটি রোধের যোগফলের সমান হয়। তুল্য রোধের রাশিমালা:
Rs = R₁ + R₂ + R₃ - যদি
nসংখ্যক একই মানের (R) রোধ শ্রেণী সমবায়ে যুক্ত থাকে, তবে তুল্য রোধ হবেRs = nR।
সমান্তরাল সমবায় (Parallel Combination)
যখন একাধিক রোধের এক প্রান্ত একটি সাধারণ বিন্দুতে এবং অপর প্রান্ত অন্য একটি সাধারণ বিন্দুতে যুক্ত থাকে, তখন সেই সমবায়কে সমান্তরাল সমবায় বলা হয়।
এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:
- প্রতিটি রোধের দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদ একই থাকে।
- প্রতিটি রোধের মধ্যে দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তড়িৎপ্রবাহ যায় এবং মোট প্রবাহ প্রতিটি শাখার প্রবাহের যোগফলের সমান (
I = I₁ + I₂ + I₃)। - সমবায়ের তুল্য রোধের অন্যোন্যক প্রতিটি রোধের অন্যোন্যকের যোগফলের সমান হয়। তুল্য রোধের রাশিমালা:
1/Rp = 1/R₁ + 1/R₂ + 1/R₃ - যদি
nসংখ্যক একই মানের (R) রোধ সমান্তরাল সমবায়ে যুক্ত থাকে, তবে তুল্য রোধ হবেRp = R/n।
রোধের মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহের ফলে কেবল বর্তনীর ধর্মই নিয়ন্ত্রিত হয় না, এর একটি অনিবার্য তাপীয় ফলও রয়েছে, যা জুলের সূত্রের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয় এবং এর বহুবিধ ব্যবহারিক প্রয়োগ আমাদের আধুনিক জীবনকে সহজ করে তুলেছে।
৬.০ তড়িৎপ্রবাহের তাপীয় ফল এবং এর প্রয়োগ
যখন কোনো রোধযুক্ত পরিবাহীর মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হয়, তখন পরিবাহীটি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তড়িৎ শক্তির এই তাপ শক্তিতে রূপান্তরের ঘটনাকে তড়িৎপ্রবাহের তাপীয় ফল বলা হয়। এই নীতির উপর ভিত্তি করেই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বহু প্রয়োজনীয় যন্ত্র তৈরি করা হয়েছে। এর কার্যকারিতা বোঝার জন্য প্রথমে তড়িৎ ক্ষমতা এবং পরে জুলের সূত্র জানা প্রয়োজন।
তড়িৎ ক্ষমতা (Electric Power)
কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্রের কার্য করার হারকে তার তড়িৎ ক্ষমতা বলে। অর্থাৎ, কোনো যন্ত্র প্রতি সেকেন্ডে যে পরিমাণ তড়িৎ শক্তি ব্যয় করে, তাই হলো তার ক্ষমতা (P)। এর গাণিতিক রূপ: P = VI ওহমের সূত্র (V = IR) প্রয়োগ করে আমরা ক্ষমতার আরও দুটি রূপ পাই: P = I²R এবং P = V²/R তড়িৎ ক্ষমতার SI একক হলো ওয়াট (Watt)।
জুলের সূত্র
কোনো পরিবাহীতে উৎপন্ন তাপ (H) তার ক্ষমতা (P) এবং সময়ের (t) গুণফলের সমান, অর্থাৎ H = P × t। এই সম্পর্ক থেকে বিজ্ঞানী জেমস প্রেসকট জুল তিনটি সূত্র প্রদান করেন:
- প্রবাহমাত্রার সূত্র: পরিবাহীর রোধ (R) ও সময় (t) স্থির থাকলে, উৎপন্ন তাপ প্রবাহমাত্রার বর্গের সমানুপাতিক (
H ∝ I²)। - রোধের সূত্র: প্রবাহমাত্রা (I) ও সময় (t) স্থির থাকলে, উৎপন্ন তাপ পরিবাহীর রোধের সমানুপাতিক (
H ∝ R)। - সময়ের সূত্র: প্রবাহমাত্রা (I) ও রোধ (R) স্থির থাকলে, উৎপন্ন তাপ প্রবাহের সময়ের সমানুপাতিক (
H ∝ t)।
এই তিনটি সূত্রকে একত্রিত করে এবং ক্ষমতার বিভিন্ন রূপ ব্যবহার করে উৎপন্ন তাপের জন্য নিম্নলিখিত রাশিমালাগুলি পাওয়া যায়: H = I²Rt H = VIt H = (V²/R)t
SI পদ্ধতিতে তাপের একক জুল (J)। CGS পদ্ধতিতে তাপের একক ক্যালোরি (cal) এবং এক্ষেত্রে সূত্রটি হয় H = I²Rt / J, যেখানে J হলো তাপের যান্ত্রিক তুল্যাঙ্ক এবং এর মান 4.2 জুল/ক্যালোরি।
তাপীয় ফলের ব্যবহারিক প্রয়োগ
তড়িৎপ্রবাহের তাপীয় ফলের নীতিকে কাজে লাগিয়ে নির্মিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র নিচে আলোচনা করা হলো:
|
যন্ত্র |
ব্যবহৃত উপাদান |
মূলনীতি ও বৈশিষ্ট্য |
|
বৈদ্যুতিক বাতি |
টাংস্টেন ফিলামেন্ট |
এর উচ্চ রোধের কারণে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয় এবং উচ্চ গলনাঙ্ক (3380°C) থাকায় এটি না গলে শ্বেততপ্ত হয়ে আলো বিকিরণ করে। |
|
বৈদ্যুতিক হিটার |
নাইক্রোম তার |
এটি লোহা (Fe), নিকেল (Ni) ও ক্রোমিয়ামের (Cr) একটি সংকর ধাতু। এর উচ্চ রোধাঙ্ক ও উচ্চ গলনাঙ্ক থাকায় এটি উত্তপ্ত হয়ে তাপ শক্তি বিকিরণ করে। |
|
বৈদ্যুতিক ফিউজ |
টিন ও সিসার সংকর ধাতু |
এর বৈশিষ্ট্য হলো উচ্চ রোধ এবং নিম্ন গলনাঙ্ক। বর্তনীতে অতিরিক্ত তড়িৎ প্রবাহিত হলে উৎপন্ন তাপে এটি গলে যায় এবং বর্তনীকে বিচ্ছিন্ন করে মূল্যবান যন্ত্রপাতিকে রক্ষা করে। |
তড়িৎপ্রবাহের কেবল তাপীয় ফলই নয়, এর একটি যুগান্তকারী চৌম্বকীয় ফলও রয়েছে, যা ওরস্টেডের পরীক্ষার মাধ্যমে প্রথম আবিষ্কৃত হয় এবং এটি তড়িৎ ও চুম্বকত্বের মধ্যে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
৭.০ তড়িৎপ্রবাহের চৌম্বকীয় ফল
উনিশ শতকের গোড়ার দিকে বিজ্ঞানী হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান ওরস্টেড এক যুগান্তকারী পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে তড়িৎপ্রবাহ এবং চুম্বকত্ব দুটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এরা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তাঁর আবিষ্কার দেখায় যে, কোনো তড়িৎবাহী তারের চারপাশে একটি চৌম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি হয়। এই আবিষ্কার তড়িৎচুম্বকত্বের ভিত্তি স্থাপন করে।
ওরস্টেডের পরীক্ষা এবং তড়িৎচুম্বকত্ব
ওরস্টেড লক্ষ্য করেন যে, কোনো পরিবাহী তারের মধ্যে দিয়ে তড়িৎ পাঠালে তার কাছাকাছি থাকা একটি চুম্বক শলাকার বিক্ষেপ ঘটে। এর থেকে তিনি সিদ্ধান্তে আসেন যে, তড়িৎবাহী তার তার চারপাশে একটি চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করে, যা চুম্বকের উপর বল প্রয়োগ করে। এই ঘটনাটিই তড়িৎচুম্বকত্ব নামে পরিচিত।
চৌম্বক বলরেখা ও তার অভিমুখ নির্ণয়
চৌম্বকক্ষেত্রকে দৃশ্যমান করার জন্য চৌম্বক বলরেখা নামক কাল্পনিক রেখা ব্যবহার করা হয়।
- এই বলরেখাগুলি বদ্ধ বক্ররেখা।
- এরা চুম্বকের বাইরে উত্তর মেরু থেকে নির্গত হয়ে দক্ষিণ মেরুতে প্রবেশ করে।
- বলরেখাগুলি পরস্পরকে ছেদ করে না।
তড়িৎবাহী তারের চারপাশে সৃষ্ট চৌম্বকক্ষেত্রের অভিমুখ কয়েকটি নিয়মের সাহায্যে নির্ণয় করা হয়:
- অ্যাম্পিয়ারের সন্তরণ নিয়ম: কোনো ব্যক্তিকে তড়িৎপ্রবাহের দিকে একটি তার বরাবর সাঁতার কাটতে কল্পনা করলে, তার বাম হাত যেদিকে বিক্ষিপ্ত হবে, চুম্বক শলাকার উত্তর মেরুও সেদিকেই বিক্ষিপ্ত হবে।
- দক্ষিণ মুষ্টি নিয়ম: একটি ঋজু তড়িৎবাহী তারকে ডান হাতে এমনভাবে ধরলে যদি বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ তড়িৎপ্রবাহের দিক নির্দেশ করে, তবে বাকি আঙুলগুলি চৌম্বক বলরেখার অভিমুখ নির্দেশ করবে।
- ঘড়ি সূত্র (Clock Face Rule): একটি বৃত্তাকার তড়িৎবাহী কুণ্ডলীর দিকে তাকালে যদি প্রবাহ ঘড়ির কাঁটার দিকে (দক্ষিণাবর্তী) মনে হয়, তবে ওই প্রান্তে দক্ষিণ মেরু সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে, প্রবাহ ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে (বামাবর্তী) হলে উত্তর মেরু সৃষ্টি হবে।
এই আবিষ্কার এক নতুন সম্ভাবনার জন্ম দেয়: যদি তড়িৎপ্রবাহ চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করতে পারে, তবে একটি বাহ্যিক চৌম্বকক্ষেত্রে অবস্থিত তড়িৎবাহী তারের উপর কি কোনো বল প্রযুক্ত হবে? এই প্রশ্নের উত্তরই আধুনিক যন্ত্রবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করে।
৮.০ চৌম্বকক্ষেত্রে তড়িৎবাহী তারের উপর ক্রিয়াশীল বল
তড়িৎ এবং চুম্বকত্বের পারস্পরিক ক্রিয়া কেবল চৌম্বকক্ষেত্রই তৈরি করে না, এটি যান্ত্রিক গতিও সৃষ্টি করতে পারে। যখন একটি তড়িৎবাহী পরিবাহীকে কোনো চৌম্বকক্ষেত্রে স্থাপন করা হয়, তখন পরিবাহীটির উপর একটি বল প্রযুক্ত হয়, যা তাকে গতিশীল করতে পারে। এই নীতিটিই বৈদ্যুতিক মোটরের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির ভিত্তি স্থাপন করেছে।
ফ্লেমিং-এর বামহস্ত নিয়ম
চৌম্বকক্ষেত্রে অবস্থিত তড়িৎবাহী পরিবাহীর উপর ক্রিয়াশীল বলের অভিমুখ ফ্লেমিং-এর বামহস্ত নিয়ম দ্বারা নির্ণয় করা হয়। নিয়মটি হলো:
বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ, তর্জনী এবং মধ্যমাকে পরস্পরের সাথে সমকোণে প্রসারিত করলে, যদি তর্জনী চৌম্বকক্ষেত্রের অভিমুখ এবং মধ্যমা তড়িৎপ্রবাহের অভিমুখ নির্দেশ করে, তবে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ পরিবাহীর উপর প্রযুক্ত বল বা গতির অভিমুখ নির্দেশ করবে।
বৈদ্যুতিক মোটর (Electric Motor)
বৈদ্যুতিক মোটর এমন একটি যন্ত্র যা তড়িৎ শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে। এর কার্যনীতি ফ্লেমিং-এর বামহস্ত নিয়মের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত।
কার্যনীতি: একটি চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্যে অবস্থিত একটি আয়তাকার কুণ্ডলীর (আর্মেচার) মধ্যে দিয়ে তড়িৎপ্রবাহ পাঠালে কুণ্ডলীর দুই বিপরীত বাহুর উপর দুটি সমান ও বিপরীতমুখী বল প্রযুক্ত হয়। এই বলদ্বয়ের ক্রিয়ায় একটি দ্বন্ব সৃষ্টি হয়, যা কুণ্ডলীটিকে তার অক্ষের সাপেক্ষে ঘোরাতে থাকে। এইভাবে তড়িৎ শক্তি ঘূর্ণন গতি বা যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
মোটরের শক্তি বৃদ্ধি করার উপায়গুলি হলো:
- কুণ্ডলীর পাকসংখ্যা বৃদ্ধি করা।
- তড়িৎপ্রবাহমাত্রা বৃদ্ধি করা।
- অধিক শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র ব্যবহার করা।
ব্যবহার: বৈদ্যুতিক পাখা, পাম্প, ট্রাম, ট্রেন এবং বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক মোটর ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
তড়িৎ থেকে যান্ত্রিক গতি তৈরির এই প্রক্রিয়ার ঠিক বিপরীত ঘটনাও সম্ভব, অর্থাৎ যান্ত্রিক শক্তি ব্যবহার করে তড়িৎ শক্তি উৎপাদন করা, যা তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ নামে পরিচিত এবং আধুনিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল ভিত্তি।
৯.০ তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ এবং পরিবর্তী প্রবাহ
বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডে আবিষ্কার করেন যে, শুধুমাত্র তড়িৎপ্রবাহই চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করে না, পরিবর্তনশীল চৌম্বকক্ষেত্রও তড়িৎপ্রবাহ সৃষ্টি করতে পারে। তাঁর এই যুগান্তকারী আবিষ্কার তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ নামে পরিচিত এবং এটিই আধুনিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি।
তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ
কোনো বদ্ধ কুণ্ডলীর সাথে জড়িত চৌম্বক বলরেখার সংখ্যার (বা চৌম্বক প্রবাহের) পরিবর্তন ঘটলে, ওই কুণ্ডলীতে একটি ক্ষণস্থায়ী তড়িৎচালক বল আবিষ্ট হয়। এর ফলে কুণ্ডলীতে একটি তড়িৎপ্রবাহের সৃষ্টি হয়। এই ঘটনাকেই তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ বলে। যতক্ষণ চৌম্বক প্রবাহের পরিবর্তন ঘটতে থাকে, ততক্ষণই এই আবিষ্ট প্রবাহ বজায় থাকে।
ফ্যারাডে এবং লেঞ্জের সূত্র
ফ্যারাডের সূত্র: তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ সংক্রান্ত ফ্যারাডের দুটি সূত্র রয়েছে:
- প্রথম সূত্র: কোনো বদ্ধ কুণ্ডলীর সাথে জড়িত চৌম্বক প্রবাহের পরিবর্তন হলে কুণ্ডলীতে একটি তড়িৎচালক বল আবিষ্ট হয়।
- দ্বিতীয় সূত্র: আবিষ্ট তড়িৎচালক বলের মান কুণ্ডলীর সাথে জড়িত চৌম্বক প্রবাহের পরিবর্তনের হারের সমানুপাতিক।
লেঞ্জের সূত্র: এই সূত্রটি আবিষ্ট তড়িৎপ্রবাহের অভিমুখ নির্ধারণ করে। সূত্রানুযায়ী, তড়িৎচুম্বকীয় আবেশের ফলে সৃষ্ট আবিষ্ট তড়িৎপ্রবাহের অভিমুখ এমন হয় যে, এটি তার উৎপত্তির কারণকেই বাধা দেয়। লেঞ্জের সূত্রটি শক্তির সংরক্ষণ সূত্রেরই একটি রূপ, কারণ আবিষ্ট প্রবাহ যদি তার উৎপত্তির কারণকে বাধা না দিয়ে সাহায্য করত, তবে কোনো অতিরিক্ত শক্তি ছাড়াই অবিরাম তড়িৎপ্রবাহ চলতে থাকত, যা শক্তির নিত্যতা সূত্রের পরিপন্থী।
ডায়নামো বা জেনারেটর
ডায়নামো বা জেনারেটর হলো এমন একটি যন্ত্র যা তড়িৎচুম্বকীয় আবেশের নীতিকে কাজে লাগিয়ে যান্ত্রিক শক্তিকে তড়িৎশক্তিতে রূপান্তরিত করে। একটি শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রে একটি কুণ্ডলীকে যান্ত্রিকভাবে ঘোরানো হলে, কুণ্ডলীর সাথে জড়িত চৌম্বক প্রবাহের ক্রমাগত পরিবর্তন হয়, ফলে কুণ্ডলীতে তড়িৎপ্রবাহ আবিষ্ট হয়। আবিষ্ট প্রবাহের অভিমুখ ফ্লেমিং-এর ডানহস্ত নিয়ম দ্বারা নির্ণয় করা হয়।
ফ্লেমিং-এর ডানহস্ত নিয়ম: ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ, তর্জনী ও মধ্যমাকে পরস্পরের সমকোণে প্রসারিত রাখলে, যদি তর্জনী চৌম্বকক্ষেত্রের অভিমুখ এবং বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ পরিবাহীর গতির অভিমুখ নির্দেশ করে, তবে মধ্যমা আবিষ্ট তড়িৎপ্রবাহের অভিমুখ নির্দেশ করবে।
সমপ্রবাহ (DC) ও পরিবর্তী প্রবাহ (AC)
আবিষ্ট প্রবাহ দুই প্রকারের হতে পারে:
|
বৈশিষ্ট্য |
সমপ্রবাহ (Direct Current – DC) |
পরিবর্তী প্রবাহ (Alternating Current – AC) |
|
সংজ্ঞা |
যে তড়িৎপ্রবাহের মান ও অভিমুখ সময়ের সাথে অপরিবর্তিত থাকে। |
যে তড়িৎপ্রবাহের মান ও অভিমুখ সময়ের সাথে পর্যায়বৃত্তভাবে পরিবর্তিত হয়। |
|
উৎস |
ব্যাটারি, তড়িৎ কোষ, DC জেনারেটর। |
AC জেনারেটর, পাওয়ার স্টেশন। |
AC প্রবাহের ব্যবহারিক সুবিধা:
- AC উৎপাদনের খরচ তুলনামূলকভাবে কম।
- ট্রান্সফর্মারের সাহায্যে খুব সহজে AC ভোল্টেজ কমানো বা বাড়ানো যায়।
- অনেক কম শক্তি অপচয় করে AC প্রবাহকে বহুদূরে প্রেরণ করা সম্ভব।
গৃহস্থালীর বর্তনীতে এই নীতিগুলির বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায়, যেখানে পরিবর্তী প্রবাহকে নিরাপদে ও দক্ষতার সাথে ব্যবহার করা হয়।
১০.০ গৃহস্থালীর বৈদ্যুতিক বর্তনী
দৈনন্দিন জীবনে বিদ্যুতের নিরাপদ এবং কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য গৃহস্থালীর বৈদ্যুতিক বর্তনী একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী তৈরি করা হয়। সঠিক বর্তনী সজ্জা না থাকলে শর্ট সার্কিট বা ওভারলোডিং-এর মতো দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে, যা আগুন লাগা বা বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ক্ষতি করতে পারে।
গৃহস্থালীর বর্তনীতে প্রধানত তিনটি তার ব্যবহৃত হয়, যাদের প্রত্যেকটির নির্দিষ্ট কাজ ও রঙ রয়েছে:
|
তারের নাম |
প্রচলিত রঙ |
কাজ ও বিভব |
|
লাইভ (Live) তার |
লাল বা বাদামী |
এটি উচ্চ বিভবে (যেমন, 220V) থাকে এবং মেইন লাইন থেকে তড়িৎপ্রবাহ সরবরাহ করে। |
|
নিউট্রাল (Neutral) তার |
কালো বা নীল |
এটি নিম্ন বিভবে (প্রায় শূন্য) থাকে এবং তড়িৎপ্রবাহকে উৎসে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে বর্তনী পূর্ণ করে। |
|
আর্থ (Earth) তার |
সবুজ |
এটি একটি সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা। যন্ত্রের ধাতব আবরণের সাথে যুক্ত এই তারটি কোনো কারণে লিকেজ কারেন্ট হলে তা মাটিতে পাঠিয়ে দেয় এবং ব্যবহারকারীকে বৈদ্যুতিক শক থেকে রক্ষা করে। এর বিভব শূন্য ধরা হয়। |
গৃহস্থালীর বর্তনীতে সমস্ত বৈদ্যুতিক যন্ত্র, যেমন—বাতি, পাখা, টিভি ইত্যাদি সমান্তরাল সমবায়ে যুক্ত করা হয়। এর কারণ হলো:
- সমান্তরাল সমবায়ে প্রতিটি যন্ত্র সরবরাহ লাইনের সমান বিভব প্রভেদ (যেমন, 220V) পায়, ফলে তারা সঠিকভাবে কাজ করতে পারে।
- প্রতিটি যন্ত্রের জন্য আলাদা সুইচ থাকে, তাই একটি যন্ত্রকে বন্ধ বা চালু করলে অন্য যন্ত্রের উপর কোনো প্রভাব পড়ে না।
- যদি একটি যন্ত্র খারাপ হয়ে যায়, তবে বর্তনীর বাকি অংশ সচল থাকে। শ্রেণী সমবায়ে এমনটা হলে পুরো বর্তনী অকেজো হয়ে যেত।
এই অধ্যায়ের আলোচনা থেকে আমরা দেখলাম কীভাবে তড়িৎ আধানের মতো একটি অদৃশ্য ধারণা থেকে শুরু করে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রযুক্তি, যেমন আলো, পাখা ও মোটর চালিত হয়। চলতড়িৎ-এর এই মৌলিক নীতিগুলি বোঝা শুধুমাত্র পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্যই নয়, বরং আধুনিক সভ্যতাকে চালনাকারী শক্তিকে জানা এবং দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তিকে নিরাপদে ও সঠিকভাবে ব্যবহার করার জন্যও অপরিহার্য।
দশম শ্রেণীর চলতড়িৎ: একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কার্যনির্বাহী সারসংক্ষেপ
এই নথিটি দশম শ্রেণীর ভৌত বিজ্ঞানের ‘চলতড়িৎ’ অধ্যায়ের একটি বিশদ ও সুসংগঠিত সারসংক্ষেপ প্রদান করে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো পরীক্ষার্থীদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতিমূলক উপাদান হিসেবে কাজ করা এবং বিষয়বস্তুর গভীর অনুধাবনে সহায়তা করা। এখানে তড়িৎ আধানের মৌলিক ধারণা, কুলম্বের সূত্র, ওহমের সূত্র থেকে শুরু করে তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ও চৌম্বকীয় ফলের মতো জটিল বিষয়গুলি আলোচনা করা হয়েছে। রোধের সমবায়, তড়িৎ ক্ষমতা ও শক্তি, বৈদ্যুতিক মোটর, জেনারেটরের কার্যনীতি এবং গৃহস্থালীর বৈদ্যুতিক বর্তনীর গঠন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিটি তত্ত্বকে প্রয়োজনীয় সূত্র, একক, মাত্রা এবং ব্যবহারিক প্রয়োগের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য এই অধ্যায়টিকে সহজবোধ্য করে তুলবে।
——————————————————————————–
বিস্তারিত আলোচনা
১. তড়িৎ আধান এবং কুলম্বের সূত্র
ক. তড়িৎ আধান (Electric Charge)
তড়িৎ আধান হলো বস্তুর একটি ভৌত ধর্ম, যার ফলে বস্তুটি কোনো তড়িৎগ্রস্ত বা অনাড়হত বস্তুর উপর বল প্রয়োগ করে।
- প্রকারভেদ:
- ধনাত্মক আধান: উদাহরণস্বরূপ, প্রোটনের আধান (+1.6 × 10⁻¹⁹ C)।
- ঋণাত্মক আধান: উদাহরণস্বরূপ, ইলেকট্রনের আধান (–1.6 × 10⁻¹⁹ C)।
- পরমাণুতে নিস্তড়িৎ কণা নিউট্রনও থাকে।
- মৌলিক ধারণা:
- সাধারণ অবস্থায় পরমাণু নিস্তড়িৎ থাকে, কারণ এতে ইলেকট্রন ও প্রোটনের সংখ্যা সমান।
- তড়িৎ প্রবাহের জন্য মূলত মুক্ত ইলেকট্রনের প্রবাহই দায়ী। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, ইলেকট্রন যেদিকে প্রবাহিত হয়, তড়িৎ প্রবাহ তার বিপরীত দিকে হয়, অর্থাৎ ধনাত্মক আধানের প্রবাহের দিক ও তড়িৎ প্রবাহের দিক একই ধরা হয়।
- একক ও মাত্রা:
- SI একক: কুলম্ব (C)
- CGS একক: স্ট্যাটকুলম্ব (e.s.u)
- মাত্রা: [IT]
খ. তড়িৎ আধানের বৈশিষ্ট্য
- সমধর্মী আধান পরস্পরকে বিকর্ষণ করে এবং বিপরীতধর্মী আধান পরস্পরকে আকর্ষণ করে।
- কোনো বিচ্ছিন্ন সংস্থায় মোট আধান সর্বদা সংরক্ষিত থাকে।
- আধানের কোয়ান্টায়ন: কোনো আহিত বস্তুতে মোট আধানের পরিমাণ সর্বদা একটি ইলেকট্রনের আধানের পূর্ণসংখ্যার সরল গুণিতক হয়। সূত্রটি হলো:
Q = ne(যেখানে Q = মোট আধান, n = ইলেকট্রনের সংখ্যা, e = একটি ইলেকট্রনের আধান)।
গ. কুলম্বের সূত্র (Coulomb’s Law)
দুটি বিন্দু আধানের মধ্যে ক্রিয়াশীল আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বলের মান আধান দুটির গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।
- গাণিতিক রূপ:
F = k * (q1 * q2) / r² - কুলম্বীয় ধ্রুবক (k):
- SI পদ্ধতিতে (শূন্য বা বায়ু মাধ্যমে): k = 9 × 10⁹ Nm²/C²
- CGS পদ্ধতিতে (শূন্য বা বায়ু মাধ্যমে): k = 1 dyn.cm²/(esu)²
২. তড়িৎ ক্ষেত্র, বিভব, বিভব প্রভেদ এবং তড়িৎচালক বল
- তড়িৎক্ষেত্র (Electric Field): কোনো আধানের চারপাশে যে অঞ্চল জুড়ে তার আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বল অনুভূত হয়, সেই অঞ্চলকে ওই আধানের তড়িৎক্ষেত্র বলে।
- তড়িৎ বিভব (Electric Potential): অসীম দূরত্ব থেকে একক ধনাত্মক আধানকে তড়িৎক্ষেত্রের কোনো বিন্দুতে আনতে যে পরিমাণ কার্য করতে হয়, তাকে ওই বিন্দুর তড়িৎ বিভব বলে।
- সূত্র:
V = W / q
- সূত্র:
- বিভব প্রভেদ (Potential Difference): একক ধনাত্মক আধানকে তড়িৎক্ষেত্রের এক বিন্দু থেকে অপর বিন্দুতে স্থানান্তরিত করতে যে কার্য করতে হয়, তাকে ওই দুই বিন্দুর বিভব প্রভেদ বলে।
- সূত্র:
V_A – V_B = W / q
- সূত্র:
|
বৈশিষ্ট্য |
বিবরণ |
|
SI একক |
ভোল্ট (V) |
|
CGS একক |
স্ট্যাটভোল্ট |
|
সম্পর্ক |
1 V = 1/300 Stat Volt |
|
মাত্রা |
[ML²T⁻³I⁻¹] |
|
পরিমাপক যন্ত্র |
ভোল্টমিটার (বর্তনীতে সমান্তরাল সমবায়ে যুক্ত থাকে) |
|
আদর্শ ভোল্টমিটারের রোধ |
অসীম |
- 1 ভোল্টের সংজ্ঞা: তড়িৎক্ষেত্রের দুটি বিন্দুর মধ্যে 1 কুলম্ব আধানকে নিয়ে যেতে যদি 1 জুল কার্য করতে হয়, তবে ওই দুই বিন্দুর বিভব প্রভেদকে 1 ভোল্ট বলা হয়।
- তড়িৎচালক বল (Electromotive Force – EMF): মুক্ত বর্তনীতে কোনো তড়িৎকোষের অভ্যন্তরে একক ধনাত্মক আধানকে নিম্নবিভব থেকে উচ্চবিভব প্রান্তে নিয়ে যেতে যে কার্য করতে হয়, তাকে কোষটির তড়িৎচালক বল বলে। এটি এক প্রকার শক্তি এবং এর SI একক ভোল্ট।
৩. তড়িৎ প্রবাহমাত্রা এবং ওহমের সূত্র
- তড়িৎ প্রবাহমাত্রা (Electric Current): কোনো পরিবাহীর যেকোনো প্রস্থচ্ছেদের মধ্য দিয়ে একক সময়ে যে পরিমাণ আধান প্রবাহিত হয়, তাকে তড়িৎ প্রবাহমাত্রা বলে।
- সূত্র:
I = Q / t - SI একক: অ্যাম্পিয়ার (A)
- 1 অ্যাম্পিয়ারের সংজ্ঞা: কোনো পরিবাহীর প্রস্থচ্ছেদের মধ্য দিয়ে 1 সেকেন্ডে 1 কুলম্ব আধান প্রবাহিত হলে প্রবাহমাত্রাকে 1 অ্যাম্পিয়ার বলা হয়।
- পরিমাপক যন্ত্র: অ্যামমিটার (বর্তনীতে শ্রেণী সমবায়ে যুক্ত থাকে)।
- আদর্শ অ্যামমিটারের রোধ: শূন্য।
- সূত্র:
- ওহমের সূত্র (Ohm’s Law): উষ্ণতা এবং অন্যান্য ভৌত অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে প্রবাহমাত্রা তার দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদের সমানুপাতিক হয়।
- গাণিতিক রূপ:
V ∝ IবাV = IR - এখানে
Rহলো পরিবাহীর রোধ (Resistance), যা একটি ধ্রুবক।
- গাণিতিক রূপ:
|
লেখচিত্র |
নতি (Slope) দ্বারা নির্দেশিত রাশি |
|
V-I লেখচিত্র |
রোধ (R = V/I) |
|
I-V লেখচিত্র |
পরিবাহিতা (K = 1/R = I/V) |
৪. রোধ, রোধাঙ্ক এবং পরিবাহিতা
- রোধ (Resistance): পরিবাহীর যে ধর্মের জন্য এটি তার মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহকে বাধা দেয়, তাকে রোধ বলে।
- SI একক: ওহম (Ω)
- মাত্রা: [ML²T⁻³I⁻²]
- রোধের নির্ভরশীলতা:
- দৈর্ঘ্য (l):
R ∝ l - প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল (A):
R ∝ 1/A - উপাদান
- উষ্ণতা
- সমন্বিত রূপ:
R = ρ * (l/A), যেখানেρ(rho) হলো রোধাঙ্ক।
- দৈর্ঘ্য (l):
- রোধাঙ্ক (Resistivity, ρ): নির্দিষ্ট উষ্ণতায় একক দৈর্ঘ্য ও একক প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফলবিশিষ্ট কোনো পরিবাহীর রোধকে তার উপাদানের রোধাঙ্ক বলে।
- মাত্রা: [ML³T⁻³I⁻²]
- পরিবাহিতা (Conductance, K): রোধের অনোন্যককে পরিবাহিতা বলে। এটি পরিবাহীর তড়িৎ পরিবহনের ক্ষমতা নির্দেশ করে।
- SI একক: সিমেন্স (S) বা म्हো (mho)।
- উষ্ণতার সাথে রোধাঙ্কের পরিবর্তন:
- পরিবাহী (Conductor): উষ্ণতা বাড়লে রোধাঙ্ক বাড়ে (যেমন: লোহা, তামা)।
- অর্ধপরিবাহী (Semiconductor): উষ্ণতা বাড়লে রোধাঙ্ক কমে (যেমন: জার্মেনিয়াম, সিলিকন)।
- অতিপরিবাহী (Superconductor): উষ্ণতা কমালে রোধাঙ্ক কমতে থাকে এবং একটি নির্দিষ্ট উষ্ণতায় (সংকট উষ্ণতা) রোধাঙ্ক শূন্য হয়ে যায় (যেমন: 4.2 K উষ্ণতায় পারদ)।
৫. রোধের সমবায়
- শ্রেণী সমবায় (Series Combination):
- একাধিক রোধকে এমনভাবে যুক্ত করা হয় যাতে প্রতিটির মধ্যে দিয়ে একই প্রবাহমাত্রা (I) চলে।
- প্রতিটি রোধের দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদ আলাদা হয়।
- তুল্য রোধ:
R_s = R_1 + R_2 + R_3 + ...
- সমান্তরাল সমবায় (Parallel Combination):
- একাধিক রোধের এক প্রান্তগুলিকে একটি সাধারণ বিন্দুতে এবং অপর প্রান্তগুলিকে অন্য একটি সাধারণ বিন্দুতে যুক্ত করা হয়।
- প্রতিটি রোধের দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদ (V) একই থাকে।
- তড়িৎপ্রবাহ ভিন্ন ভিন্ন শাখায় ভাগ হয়ে যায়।
- তুল্য রোধ:
1/R_p = 1/R_1 + 1/R_2 + 1/R_3 + ...
৬. তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফল: জুলের সূত্র
যখন কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হয়, তখন রোধের কারণে তাপ উৎপন্ন হয়। এই সংক্রান্ত জুলের সূত্রগুলি হলো:
H ∝ I²(যখন R এবং t ধ্রুবক)H ∝ R(যখন I এবং t ধ্রুবক)H ∝ t(যখন I এবং R ধ্রুবক)
- সমন্বিত রূপ:
H = (I²Rt) / JJহলো তাপের যান্ত্রিক তুল্যাঙ্ক। SI পদ্ধতিতে J = 1 এবং CGS পদ্ধতিতে J ≈ 4.2 জুল/ক্যালোরি।- SI পদ্ধতিতে উৎপন্ন তাপ,
H = I²Rtজুল। - অন্যান্য রূপ:
H = VItএবংH = (V²/R)t
- ব্যবহারিক প্রয়োগ:
- বৈদ্যুতিক বাতি: টাংস্টেন ধাতুর ফিলামেন্ট ব্যবহৃত হয়, যার উচ্চ রোধ ও উচ্চ গলনাঙ্ক (3380°C) থাকে।
- ইলেকট্রিক হিটার/ইস্ত্রি: নাইক্রোম (Ni, Fe, Cr-এর সংকর ধাতু) তারের কুণ্ডলী ব্যবহৃত হয়, যার উচ্চ রোধ ও গলনাঙ্ক থাকে।
- ফিউজ তার: টিন ও সিসার সংকর ধাতু দিয়ে তৈরি, যার উচ্চ রোধ ও নিম্ন গলনাঙ্ক থাকে। এটি শ্রেণী সমবায়ে যুক্ত থেকে অতিরিক্ত প্রবাহের ফলে গলে গিয়ে বর্তনীকে রক্ষা করে।
৭. তড়িৎ ক্ষমতা ও শক্তি
- তড়িৎ ক্ষমতা (Electric Power, P): তড়িৎ শক্তি ব্যয়ের হারকে তড়িৎ ক্ষমতা বলে।
- সূত্র:
P = W/t = VIt/t = VI - অন্যান্য রূপ:
P = I²RএবংP = V²/R - SI একক: ওয়াট (Watt)।
1 Watt = 1 Volt × 1 Ampere
- সূত্র:
- তড়িৎ শক্তি (Electric Energy, E): ব্যয়িত ক্ষমতা ও সময়ের গুণফল হলো তড়িৎ শক্তি।
- সূত্র:
E = P × t - SI একক: জুল।
- ব্যবহারিক একক: কিলোওয়াট-ঘণ্টা (kWh) বা বোর্ড অফ ট্রেড ইউনিট (B.O.T Unit)।
1 B.O.T Unit = 1 kWh = 3.6 × 10⁶ জুল
- সূত্র:
- বাল্বের রেটিং: একটি বাল্বের গায়ে ‘220V – 100W’ লেখার অর্থ হলো, বাল্বটিকে 220V বিভব প্রভেদে যুক্ত করলে এটি সবচেয়ে ভালোভাবে কাজ করবে এবং প্রতি সেকেন্ডে 100 জুল তড়িৎ শক্তি ব্যয় করবে।
৮. তড়িৎপ্রবাহের চৌম্বক ফল
- ওয়েরস্টেডের পরীক্ষা: কোনো পরিবাহী তারের মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ পাঠালে তার চারপাশে একটি চৌম্বক ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়, যা নিকটবর্তী চৌম্বক শলাকাকে বিক্ষিপ্ত করে।
- অ্যাম্পিয়ারের সন্তরণ নিয়ম: কোনো ব্যক্তিকে তড়িৎবাহী তার বরাবর প্রবাহের অভিমুখে সাঁতার কাটছে কল্পনা করলে এবং তার মুখ চৌম্বক শলাকার উত্তর মেরুর দিকে থাকলে, ওই ব্যক্তির বাম হাত যেদিকে বিক্ষিপ্ত হবে, শলাকার উত্তর মেরুও সেদিকে বিক্ষিপ্ত হবে।
- চৌম্বক বলরেখার অভিমুখ নির্ণয়:
- দক্ষিণ মুষ্টি নিয়ম (ঋজু পরিবাহীর ক্ষেত্রে): তড়িৎবাহী তারকে ডান হাতে এমনভাবে ধরলে যদি বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ প্রবাহের দিক নির্দেশ করে, তবে অন্য আঙ্গুলগুলি চৌম্বক বলরেখার অভিমুখ নির্দেশ করে।
- ঘড়ি সূত্র (বৃত্তাকার কুণ্ডলীর ক্ষেত্রে): কুণ্ডলীর যে তলের দিকে তাকালে প্রবাহ ঘড়ির কাঁটার দিকে (দক্ষিণাবর্তী) মনে হয়, সেই তলে দক্ষিণ মেরু এবং যে তলে ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে (বামাবর্তী) মনে হয়, সেই তলে উত্তর মেরু সৃষ্টি হয়।
- তড়িৎচুম্বক (Electromagnet): একটি কাঁচা লোহার দণ্ডের উপর অন্তরিত তামার তার জড়িয়ে তড়িৎ প্রবাহ পাঠালে এটি একটি শক্তিশালী অস্থায়ী চুম্বকে পরিণত হয়। এর শক্তি কুণ্ডলীর পাক সংখ্যা, প্রবাহমাত্রা এবং মজ্জার উপাদানের ওপর নির্ভর করে।
৯. চৌম্বক ক্ষেত্রে তড়িৎবাহী পরিবাহীর উপর ক্রিয়াশীল বল
- ফ্লেমিং-এর বামহস্ত নিয়ম: বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ, তর্জনী ও মধ্যমাকে পরস্পরের সঙ্গে সমকোণে রাখলে, যদি তর্জনী চৌম্বক ক্ষেত্রের অভিমুখ এবং মধ্যমা তড়িৎ প্রবাহের অভিমুখ নির্দেশ করে, তবে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ পরিবাহীর ওপর ক্রিয়াশীল বল বা গতির অভিমুখ নির্দেশ করবে।
- বৈদ্যুতিক মোটর (DC Motor): এই যন্ত্রে তড়িৎ শক্তি যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এটি ফ্লেমিং-এর বামহস্ত নিয়মের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। এর ঘূর্ণন গতি আর্মেচারের পাক সংখ্যা, প্রবাহমাত্রা ও চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি বৃদ্ধি করে বাড়ানো যায়। এটি পাখা, পাম্প, ট্রেন ইত্যাদিতে ব্যবহৃত হয়।
১০. তড়িৎচৌম্বকীয় আবেশ
- ঘটনা: কোনো বদ্ধ কুণ্ডলীর সঙ্গে জড়িত চৌম্বক বলরেখার সংখ্যা বা চৌম্বক প্রবাহের পরিবর্তন হলে ওই কুণ্ডলীতে একটি ক্ষণস্থায়ী তড়িৎচালক বল আবিষ্ট হয় এবং একটি তড়িৎপ্রবাহ চলে। এই ঘটনাকে তড়িৎচৌম্বকীয় আবেশ বলে। বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডে এটি আবিষ্কার করেন।
- সূত্রসমূহ:
- ফ্যারাডের সূত্র: আবিষ্ট তড়িৎচালক বলের মান কুণ্ডলীর সঙ্গে জড়িত চৌম্বক প্রবাহের পরিবর্তনের হারের সমানুপাতিক।
- লেঞ্জের সূত্র: আবিষ্ট তড়িৎপ্রবাহের অভিমুখ এমন হয়, যা নিজের সৃষ্টির কারণকেই বাধা দেয়। এই সূত্রটি শক্তির সংরক্ষণ সূত্রের একটি বিকল্প রূপ।
- ফ্লেমিং-এর ডানহস্ত নিয়ম: আবিষ্ট প্রবাহের অভিমুখ এই নিয়ম দ্বারা নির্ণয় করা হয়। ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ, তর্জনী ও মধ্যমাকে পরস্পরের সঙ্গে সমকোণে রাখলে, যদি তর্জনী চৌম্বক ক্ষেত্রের অভিমুখ এবং বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ পরিবাহীর গতির অভিমুখ নির্দেশ করে, তবে মধ্যমা আবিষ্ট প্রবাহের অভিমুখ নির্দেশ করবে।
- জেনারেটর বা ডায়নামো: এটি এমন একটি যন্ত্র যা তড়িৎচৌম্বকীয় আবেশ নীতির ওপর ভিত্তি করে যান্ত্রিক শক্তিকে তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করে।
১১. পরিবর্তী প্রবাহ (AC), সমপ্রবাহ (DC) এবং গৃহস্থালীর বর্তনী
- সমপ্রবাহ (Direct Current – DC): যে প্রবাহের মান ও অভিমুখ সময়ের সাথে অপরিবর্তিত থাকে। উৎস: ব্যাটারি, DC জেনারেটর।
- পরিবর্তী প্রবাহ (Alternating Current – AC): যে প্রবাহের মান পর্যায়বৃত্তভাবে পরিবর্তিত হয় এবং অভিমুখ নির্দিষ্ট সময় অন্তর পাল্টে যায়। উৎস: AC জেনারেটর। AC প্রবাহের উৎপাদন খরচ ও অপচয় কম এবং একে সহজেই রূপান্তরিত করা যায়।
- গৃহস্থালীর বৈদ্যুতিক বর্তনী (Domestic Electric Circuit):
- বাড়ির সমস্ত বৈদ্যুতিক যন্ত্র সমান্তরাল সমবায়ে যুক্ত থাকে।
- লাইভ তার (Live Wire): লাল বা বাদামী বর্ণের। এটি উচ্চ বিভবের (যেমন: 220V) সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং এর মাধ্যমে তড়িৎ প্রবাহ প্রবেশ করে।
- নিউট্রাল তার (Neutral Wire): কালো বা নীল বর্ণের। এটি নিম্ন বিভবের সঙ্গে যুক্ত এবং এর মাধ্যমে তড়িৎ প্রবাহ ফিরে যায়।
- আর্থিং তার (Earth Wire): সবুজ বর্ণের। এটি একটি সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে এবং এর বিভব শূন্য ধরা হয়। এটি যন্ত্রের ধাতব অংশের সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং কোনো কারণে লাইভ তার সংস্পর্শে এলে অতিরিক্ত প্রবাহকে মাটিতে পাঠিয়ে দেয়।
চলতড়িৎ: মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য একটি সম্পূর্ণ সহায়িকা
এই সহায়িকাটি দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য চলতড়িৎ (Current Electricity)-এর অপরিহার্য ধারণাগুলিকে সহজ এবং ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে প্রতিটি বিষয়কে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
১. তড়িৎবিজ্ঞানের ভিত্তি: তড়িৎ আধান (Electric Charge)
তড়িৎ আধান হলো পদার্থের এমন একটি ভৌত ধর্ম যার জন্য কোনো বস্তু অন্য কোনো তড়িদগ্রস্ত বস্তুর উপর বল প্রয়োগ করতে পারে। এটিই তড়িৎ সংক্রান্ত সমস্ত ঘটনার মূল।
১.১ আধানের প্রকারভেদ ও প্রকৃতি
তড়িৎ আধান প্রধানত দুই প্রকারের হয়।
- ধনাত্মক আধান: এই আধানের বাহক কণা হলো প্রোটন। এর আধানের মান +1.6 × 10⁻¹⁹ কুলম্ব (C)।
- ঋণাত্মক আধান: এই আধানের বাহক কণা হলো ইলেকট্রন। এর আধানের মান –1.6 × 10⁻¹⁹ কুলম্ব (C)।
এছাড়াও পরমাণুতে নিস্তড়িৎ কণা নিউট্রন থাকে। সাধারণত, একটি পরমাণু নিস্তড়িৎ হয় কারণ পরমাণুতে যতগুলি ইলেকট্রন (ঋণাত্মক আধান) থাকে, ঠিক ততগুলি প্রোটন (ধনাত্মক আধান) থাকে, ফলে মোট আধান শূন্য হয়। তড়িৎ প্রবাহের জন্য মূলত ইলেকট্রনের প্রবাহই দায়ী। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রচলিত তড়িৎ প্রবাহের অভিমুখ ইলেকট্রন প্রবাহের অভিমুখের বিপরীত দিকে ধরা হয়।
১.২ আধানের মূল বৈশিষ্ট্য
তড়িৎ আধানের তিনটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে:
- আকর্ষণ ও বিকর্ষণ: সমধর্মী আধান (যেমন, ধনাত্মক ও ধনাত্মক) পরস্পরকে বিকর্ষণ করে এবং বিপরীতধর্মী আধান (যেমন, ধনাত্মক ও ঋণাত্মক) পরস্পরকে আকর্ষণ করে।
- সংরক্ষণ: কোনো বিচ্ছিন্ন সংস্থার মোট আধান সর্বদা সংরক্ষিত বা ধ্রুবক থাকে। আধান সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না, কেবল এক বস্তু থেকে অন্য বস্তুতে স্থানান্তরিত করা যায়।
- কোয়ান্টায়ন: কোনো বস্তুর মোট আধানের পরিমাণ (Q) সর্বদা একটি ইলেকট্রনের আধানের (e) পূর্ণ সংখ্যার সরল গুণিতক হয়। অর্থাৎ, আধানকে অবিচ্ছিন্নভাবে বিভাজন করা যায় না। এর গাণিতিক রূপ হলো: Q = ne, যেখানে ‘n’ একটি পূর্ণ সংখ্যা।
১.৩ কুলম্বের সূত্র: আধানের মধ্যে বল
দুটি বিন্দু আধানের মধ্যে ক্রিয়াশীল আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বলের মান আধান দুটির গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।
গাণিতিকভাবে, F = k * (q1 * q2) / r^2
এখানে k হলো কুলম্বীয় ধ্রুবক, যার মান মাধ্যম এবং একক পদ্ধতির উপর নির্ভর করে।
|
সিস্টেম |
k-এর মান |
|
SI পদ্ধতি |
9 × 10⁹ Nm²/C² |
|
CGS পদ্ধতি |
1 dyn. cm² / (esu)² |
এখন যেহেতু আমরা আধান এবং তাদের মধ্যেকার বল সম্পর্কে জেনেছি, চলুন দেখি কী কারণে এই আধানগুলি গতিশীল হয়।
২. আধানকে চালনা করা: বিভব, তড়িৎচালক বল ও প্রবাহমাত্রা
কোনো আধানের চারপাশে যে অঞ্চল জুড়ে তার প্রভাব (আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বল) অনুভূত হয়, তাকে ওই আধানের তড়িৎক্ষেত্র (Electric Field) বলে। এই তড়িৎক্ষেত্রই আধানের প্রবাহের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি তৈরি করে।
২.১ তড়িৎ বিভব ও বিভব প্রভেদ
তড়িৎ বিভব (Electric Potential) হলো অসীম দূরত্ব থেকে একটি একক ধনাত্মক আধানকে তড়িৎক্ষেত্রের কোনো বিন্দুতে আনতে যে পরিমাণ কার্য করতে হয়। এর সূত্রটি হলো V = w/q।
বিভব প্রভেদ (Potential Difference) হলো একটি একক ধনাত্মক আধানকে তড়িৎক্ষেত্রের একটি বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে সরাতে যে পরিমাণ কার্য করতে হয়। এর সূত্রটি হলো VA – VB = w/q।
- বিভব প্রভেদের SI একক হলো ভোল্ট (Volt) এবং CGS একক হলো স্ট্যাটভোল্ট (Statvolt)।
- 1 ভোল্ট বলতে বোঝায়, 1 কুলম্ব আধানকে একটি বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে নিয়ে যেতে যদি 1 জুল কার্য করতে হয়, তবে ওই দুই বিন্দুর বিভব প্রভেদ হলো 1 ভোল্ট।
- এটি ভোল্টমিটার যন্ত্রের সাহায্যে মাপা হয়, যা বর্তনীর সাথে সমান্তরাল সমবায়ে যুক্ত থাকে। একটি আদর্শ ভোল্টমিটারের রোধ অসীম ধরা হয়।
২.২ তড়িৎচালক বল (EMF)
তড়িৎচালক বল (Electromotive Force) হলো মুক্ত বর্তনীতে (যখন কোনো তড়িৎ প্রবাহ চলে না) কোনো তড়িৎ কোষের দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদ। নামের মধ্যে ‘বল’ শব্দটি থাকলেও এটি আসলে এক প্রকার শক্তি যা বর্তনীতে আধানকে চালনা করে, এটি কোনো যান্ত্রিক বল নয়। এর SI এককও ভোল্ট।
২.৩ তড়িৎ প্রবাহমাত্রা (Electric Current)
কোনো পরিবাহীর যেকোনো প্রস্থচ্ছেদের মধ্য দিয়ে একক সময়ে যে পরিমাণ আধান প্রবাহিত হয়, তাকে তড়িৎ প্রবাহমাত্রা (Electric Current) বলে। এর মূল সূত্রটি হলো: I = Q/t।
- এর SI একক হলো অ্যাম্পিয়ার (Ampere)।
- 1 অ্যাম্পিয়ার বলতে বোঝায়, কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে 1 সেকেন্ডে 1 কুলম্ব আধান প্রবাহিত হলে প্রবাহমাত্রা হয় 1 অ্যাম্পিয়ার।
- এটি অ্যামিটার যন্ত্রের সাহায্যে মাপা হয়, যা বর্তনীর সাথে শ্রেণী সমবায়ে যুক্ত থাকে। একটি আদর্শ অ্যামিটারের রোধ শূন্য ধরা হয়।
এখন আমরা দেখব বিভব প্রভেদ এবং তড়িৎ প্রবাহমাত্রার মধ্যে সম্পর্কটি কী, যা ওহমের সূত্রের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
৩. ওহমের সূত্র ও রোধ
৩.১ ওহমের সূত্র
এই সূত্র অনুযায়ী, উষ্ণতা ও অন্যান্য ভৌত অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে, কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহমাত্রা (I) ওই পরিবাহীর দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদের (V) সমানুপাতিক হয়।
অর্থাৎ, V ∝ I বা, V = IR
এখানে, R হলো একটি ধ্রুবক, যাকে পরিবাহীর রোধ বলা হয়।
৩.২ রোধ এবং এর নির্ভরশীলতা
রোধ (Resistance) হলো পরিবাহীর সেই ধর্ম যা তার মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহকে বাধা দেয়। এর SI একক হলো ওহম (Ω)।
একটি পরিবাহীর রোধ চারটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে:
- দৈর্ঘ্য (l): পরিবাহীর দৈর্ঘ্য বাড়লে রোধ বাড়ে (
R ∝ l)। - প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল (A): পরিবাহী যত মোটা হয়, রোধ তত কমে (
R ∝ 1/A)। - উপাদান: ভিন্ন ভিন্ন উপাদানের রোধ ভিন্ন হয়।
- উষ্ণতা: উষ্ণতার পরিবর্তনে রোধের পরিবর্তন হয়।
এই বিষয়গুলিকে একত্রিত করে রোধের সূত্রটি দাঁড়ায়: R = ρ(l/A) এখানে, ρ (রো) হলো পরিবাহীর উপাদানের রোধাঙ্ক।
৩.৩ রোধাঙ্ক ও পরিবাহিতা
রোধাঙ্ক (Resistivity) হলো কোনো পদার্থের একক দৈর্ঘ্য ও একক প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফলযুক্ত একটি পরিবাহীর রোধ। এটি সম্পূর্ণরূপে পদার্থের উপাদানের উপর নির্ভর করে।
পরিবাহিতা (Conductivity): এটি রোধের অনোন্যক। পরিবাহীর যে ধর্মের জন্য তার মধ্য দিয়ে তড়িৎ সহজে চলাচল করতে পারে, তাকে পরিবাহিতা বলে।
পরিবাহিতাঙ্ক (Conductivity Coefficient, σ): এটি রোধাঙ্কের অনোন্যক (σ = 1/ρ)। একক দৈর্ঘ্য ও একক প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল বিশিষ্ট কোনো পরিবাহীর পরিবাহিতাকে তার পরিবাহিতাঙ্ক বলে।
উষ্ণতার সাথে বিভিন্ন পদার্থের রোধাঙ্কের পরিবর্তন নিচে দেওয়া হলো:
|
পদার্থের প্রকার |
উষ্ণতার প্রভাব |
উদাহরণ |
|
পরিবাহী |
উষ্ণতা বাড়লে রোধাঙ্ক বাড়ে। |
লোহা, তামা |
|
অর্ধপরিবাহী |
উষ্ণতা বাড়লে রোধাঙ্ক কমে। |
জার্মেনিয়াম, সিলিকন |
|
অতিপরিবাহী |
সংকট উষ্ণতার নিচে রোধাঙ্ক শূন্য হয়ে যায়। |
পারদ (4.2 K) |
যেহেতু বর্তনীতে একাধিক রোধক ব্যবহার করা হয়, তাই তাদের একত্রে যুক্ত করলে বর্তনীর আচরণ কেমন হয় তা জানা প্রয়োজন।
৪. বর্তনী গঠন: রোধের সমবায়
তড়িৎ বর্তনীতে রোধকগুলিকে মূলত দুটি উপায়ে যুক্ত করা হয়।
৪.১ শ্রেণী সমবায় (Series Combination)
যখন একাধিক রোধকে এমনভাবে পরপর যুক্ত করা হয় যে তাদের সকলের মধ্যে দিয়ে একই পরিমাণ তড়িৎ প্রবাহিত হয়, তখন তাকে শ্রেণী সমবায় বলে।
- বৈশিষ্ট্য:
- একই তড়িৎ প্রবাহ প্রতিটি রোধের মধ্যে দিয়ে যায়।
- প্রতিটি রোধের দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্য আলাদা হয়।
- তুল্য রোধের সূত্র:
Rs = R1 + R2 + R3
৪.২ সমান্তরাল সমবায় (Parallel Combination)
যখন একাধিক রোধের এক প্রান্তগুলিকে একটি সাধারণ বিন্দুতে এবং অপর প্রান্তগুলিকে অন্য একটি সাধারণ বিন্দুতে যুক্ত করা হয়, তখন তাকে সমান্তরাল সমবায় বলে।
- বৈশিষ্ট্য:
- প্রতিটি রোধের দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্য একই থাকে।
- প্রতিটি রোধের মধ্যে দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তড়িৎ প্রবাহ যায়।
- তুল্য রোধের সূত্র:
1/Rp = 1/R1 + 1/R2 + 1/R3
এই রোধকগুলির মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহের ফলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ व्यावहारिक প্রভাব দেখা যায়।
৫. তড়িৎপ্রবাহের ফল (Effects of Current)
তড়িৎ প্রবাহের দুটি প্রধান ফল হলো তাপীয় ফল এবং চৌম্বক ফল।
৫.১ তাপীয় ফল: জুলের সূত্র ও তার প্রয়োগ
বিজ্ঞানী জুলের সূত্রানুযায়ী, কোনো পরিবাহীতে উৎপন্ন তাপ (H) তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল:
- প্রবাহমাত্রার বর্গের সমানুপাতিক:
H ∝ I² - রোধের সমানুপাতিক:
H ∝ R - সময়ের সমানুপাতিক:
H ∝ t
এই তিনটি সূত্রকে একত্রিত করলে SI পদ্ধতিতে তাপের পরিমাণ দাঁড়ায়: H = I²Rt
বাস্তব প্রয়োগ:
- বৈদ্যুতিক বাল্ব: উচ্চ গলনাঙ্ক ও উচ্চ রোধের টাংস্টেন ধাতুর ফিলামেন্ট ব্যবহার করা হয়, যা তড়িৎ প্রবাহে উত্তপ্ত হয়ে আলো দেয়।
- বৈদ্যুতিক হিটার: উচ্চ রোধ ও উচ্চ গলনাঙ্কের নাইক্রোম (নিকেল, ক্রোমিয়াম, লোহা) সংকর ধাতুর তার ব্যবহার করা হয়।
- বৈদ্যুতিক ফিউজ: এটি একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা। টিন ও সিসার সংকর ধাতুর তৈরি একটি সরু তার, যার রোধ উচ্চ এবং গলনাঙ্ক নিম্ন। অতিরিক্ত প্রবাহে এটি গলে গিয়ে বর্তনীকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
৫.২ চৌম্বক ফল: ওরস্টেডের পরীক্ষা থেকে মোটর পর্যন্ত
বিজ্ঞানী ওরস্টেড আবিষ্কার করেন যে, কোনো তড়িৎবাহী তারের চারপাশে একটি চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়।
চৌম্বক ক্ষেত্রের অভিমুখ নির্ণয়ের নিয়ম:
- সরল পরিবাহীর জন্য: দക്ഷിণ মুষ্টি নিয়ম (Right-Hand Thumb Rule) ব্যবহার করা হয়। ডান হাতের মুষ্টিতে তারটিকে ধরলে যদি বুড়ো আঙুল প্রবাহের দিক নির্দেশ করে, তবে বাকি আঙুলগুলি চৌম্বক বলরেখার দিক নির্দেশ করে।
- বৃত্তাকার কুন্ডলীর জন্য: ঘড়ি সূত্র (Clock Face Rule) ব্যবহার করে উত্তর ও দক্ষিণ মেরু চেনা যায়। প্রবাহ ঘড়ির কাঁটার দিকে (Clockwise) হলে দক্ষিণ মেরু এবং ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে (Anticlockwise) হলে উত্তর মেরু তৈরি হয়।
তড়িৎচুম্বক (Electromagnet): একটি কাঁচা লোহার দণ্ডের ওপর অন্তরক তার জড়িয়ে তড়িৎ প্রবাহ পাঠালে এটি একটি শক্তিশালী অস্থায়ী চুম্বকে পরিণত হয়।
ফ্লেমিং-এর বামহস্ত নিয়ম (Fleming’s Left-Hand Rule): এই নিয়মটি চৌম্বক ক্ষেত্রে রাখা কোনো তড়িৎবাহী পরিবাহীর উপর ক্রিয়াশীল বলের অভিমুখ নির্ণয় করে। এই নীতির উপর ভিত্তি করেই বৈদ্যুতিক মোটর (Electric Motor) তৈরি হয়, যা তড়িৎ শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে।
তড়িৎ যেমন চুম্বকত্ব তৈরি করতে পারে, তেমনই চুম্বকত্ব ব্যবহার করেও তড়িৎ উৎপাদন করা সম্ভব।
৬. তড়িৎ উৎপাদন: তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ (Electromagnetic Induction)
তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ (Electromagnetic Induction) হলো সেই ঘটনা যেখানে একটি বদ্ধ কুণ্ডলীর সাথে জড়িত চৌম্বক ক্ষেত্রের পরিবর্তন ঘটালে কুণ্ডলীতে একটি ক্ষণস্থায়ী তড়িৎ প্রবাহ আবিষ্ট হয়। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি করেন বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডে।
ফ্যারাডের সূত্র:
- প্রথম সূত্র: কোনো বদ্ধ বর্তনীর সাথে জড়িত চৌম্বক প্রবাহের পরিবর্তন হলে ওই বর্তনীতে একটি তড়িৎচালক বল আবিষ্ট হয় এবং বর্তনীতে তড়িৎপ্রবাহ চলে।
- দ্বিতীয় সূত্র: আবিষ্ট তড়িৎচালক বলের মান কুণ্ডলীর সাথে জড়িত চৌম্বক প্রবাহের পরিবর্তনের হারের সমানুপাতিক।
লেঞ্জের সূত্র (Lenz’s Law): এই সূত্র আবিষ্ট তড়িৎ প্রবাহের অভিমুখ নির্ধারণ করে। সূত্রটি বলে, আবিষ্ট প্রবাহের অভিমুখ এমন হয় যা নিজের সৃষ্টির কারণকেই বাধা দেয়। এটি আসলে শক্তির সংরক্ষণ সূত্রের একটি রূপ।
ফ্লেমিং-এর ডানহস্ত নিয়ম (Fleming’s Right-Hand Rule): এই নিয়মটি আবিষ্ট তড়িৎ প্রবাহের অভিমুখ নির্ণয়ে ব্যবহৃত হয়।
এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ হলো বৈদ্যুতিক জেনারেটর বা ডায়নামো (Electric Generator or Dynamo), যা যান্ত্রিক শক্তিকে তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করে।
এবার আমরা জানব আমাদের বাড়িতে ব্যবহৃত তড়িৎ প্রবাহের প্রকারভেদ ও তারের ব্যবস্থা সম্পর্কে।
৭. প্রবাহের প্রকারভেদ ও বাড়ির ওয়্যারিং
৭.১ সমপ্রবাহ (DC) ও পরিবর্তী প্রবাহ (AC)
তড়িৎ প্রবাহ প্রধানত দুই ধরনের হয়, যার পার্থক্য নিচে দেখানো হলো:
|
বৈশিষ্ট্য |
সমপ্রবাহ (DC) |
পরিবর্তী প্রবাহ (AC) |
|
সংজ্ঞা |
যে তড়িৎপ্রবাহের মান ও অভিমুখ সময়ের সাথে অপরিবর্তিত থাকে। |
যে তড়িৎ প্রবাহের অভিমুখ নির্দিষ্ট সময় অন্তর পরিবর্তিত হয়। |
|
উৎস |
ব্যাটারি, DC জেনারেটর |
AC জেনারেটর |
|
সুবিধা |
– |
উৎপাদন খরচ কম, সহজে এক ভোল্টেজ থেকে অন্য ভোল্টেজে রূপান্তর করা যায় (স্টেপ-আপ বা স্টেপ-ডাউন) এবং অনেক দূরে পাঠানো যায়। |
৭.২ গৃহস্থালীর বৈদ্যুতিক বর্তনী
বাড়িতে ব্যবহৃত সমস্ত বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি সমান্তরাল সমবায়ে (parallel combination) যুক্ত থাকে, যাতে প্রতিটি যন্ত্র সঠিক ভোল্টেজ পায় এবং একটি খারাপ হলেও অন্যগুলি চলতে পারে। আমাদের বাড়ির ওয়্যারিং-এ তিন ধরনের তার ব্যবহার করা হয়:
- লাইভ তার (Live wire): এর রঙ সাধারণত লাল বা বাদামী হয়। এটি উচ্চ বিভবে থাকে এবং এর মাধ্যমেই মূল তড়িৎ প্রবাহ সরবরাহ করা হয়।
- নিউট্রাল তার (Neutral wire): এর রঙ সাধারণত কালো বা নীল হয়। এটি নিম্ন বিভবে থাকে এবং বর্তনী পূর্ণ করতে সাহায্য করে।
- আর্থিং তার (Earth wire): এর রঙ সবুজ হয়। এটি একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা। যন্ত্রের ধাতব আবরণের সাথে যুক্ত এই তারটি কোনো কারণে লিকেজ কারেন্ট হলে তা মাটিতে পাঠিয়ে দেয় এবং বৈদ্যুতিক শক থেকে রক্ষা করে। এর বিভব শূন্য ধরা হয়।
এই সহায়িকাটিতে আমরা আধানের মৌলিক ধারণা থেকে শুরু করে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বিদ্যুতের व्यावहारिक প্রয়োগ পর্যন্ত একটি সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছি। এই মূল নীতিগুলি ভালোভাবে বুঝলে চলতড়িৎ সংক্রান্ত যেকোনো জটিল বিষয় বোঝা সহজ হয়ে যাবে।
দশম শ্রেণীর ভৌত বিজ্ঞান: চলতড়িৎ স্টাডি গাইড
প্রশ্নোত্তর (সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক)
নির্দেশাবলী: নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দুই-তিনটি বাক্যে দাও।
প্রশ্ন ১: তড়িৎ আধানের কোয়ান্টায়ন বা কোয়ান্টাইজেশন বলতে কী বোঝ? এর গাণিতিক রূপটি লেখ।
প্রশ্ন ২: ওহমের সূত্রটি বিবৃত করো এবং এর V-I লেখচিত্র থেকে কীভাবে রোধ নির্ণয় করা হয়?
প্রশ্ন ৩: কোনো পরিবাহীর রোধ কোন কোন বিষয়ের উপর নির্ভর করে? রোধাঙ্কের সংজ্ঞা দাও।
প্রশ্ন ৪: জুলের সূত্র অনুযায়ী, পরিবাহীতে উৎপন্ন তাপ কোন তিনটি বিষয়ের উপর কীভাবে নির্ভর করে?
প্রশ্ন ৫: ফিউজ তার কী দিয়ে তৈরি? এটি গৃহস্থালীর বর্তনীতে কীভাবে সুরক্ষা প্রদান করে?
প্রশ্ন ৬: অ্যাম্পিয়ারের সন্তরণ নিয়মটি লেখ। এই নিয়মটি কী নির্ধারণ করতে ব্যবহৃত হয়?
প্রশ্ন ৭: ফ্লেমিং-এর বামহস্ত নিয়মটি বিবৃত করো। এই নিয়মের একটি ব্যবহারিক প্রয়োগ উল্লেখ করো।
প্রশ্ন ৮: তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ কাকে বলে? এই ঘটনা কে আবিষ্কার করেন?
প্রশ্ন ৯: পরিবর্তী প্রবাহ (AC) ও সমপ্রবাহের (DC) মধ্যে মূল পার্থক্য কী? গৃহস্থালীর ক্ষেত্রে কোনটি বেশি সুবিধাজনক এবং কেন?
প্রশ্ন ১০: গৃহস্থালীর বৈদ্যুতিক বর্তনীতে লাইভ, নিউট্রাল ও আর্থিং তারের বর্ণ ও কাজ উল্লেখ করো।
——————————————————————————–
উত্তরমালা
উত্তর ১: কোনো আহিত বস্তুতে উপস্থিত মোট তড়িৎ আধানের পরিমাণ সর্বদা একটি ইলেকট্রনের আধানের পূর্ণসংখ্যার সরল গুণিতক হয়, একেই আধানের কোয়ান্টায়ন বলে। এর গাণিতিক রূপ হলো Q = ne, যেখানে Q হল মোট আধান, n হল ইলেকট্রনের সংখ্যা (একটি পূর্ণসংখ্যা) এবং e হল একটি ইলেকট্রনের আধান।
উত্তর ২: ওহমের সূত্র অনুযায়ী, উষ্ণতা ও অন্যান্য ভৌত অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে কোনো পরিবাহীর মধ্যে দিয়ে প্রবাহমাত্রা (I) পরিবাহীর দুই প্রান্তের বিভবপ্রভেদের (V) সমানুপাতিক হয়। V-I লেখচিত্র অঙ্কন করলে একটি সরলরেখা পাওয়া যায়, যার নতি (V/I) পরিবাহীর রোধ (R) নির্দেশ করে।
উত্তর ৩: কোনো পরিবাহীর রোধ চারটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে: (i) পরিবাহীর দৈর্ঘ্য, (ii) পরিবাহীর প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল, (iii) পরিবাহীর উপাদান এবং (iv) পরিবাহীর উষ্ণতা। নির্দিষ্ট উষ্ণতায় একক দৈর্ঘ্য ও একক প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফলবিশিষ্ট কোনো পরিবাহীর রোধের মানকে ওই পরিবাহীর উপাদানের রোধাঙ্ক (ρ) বলে।
উত্তর ৪: জুলের সূত্র অনুযায়ী, পরিবাহীতে উৎপন্ন তাপ (H) প্রবাহমাত্রার (I) বর্গের সমানুপাতিক (H ∝ I²), পরিবাহীর রোধের (R) সমানুপাতিক (H ∝ R) এবং প্রবাহের সময়ের (t) সমানুপাতিক (H ∝ t)।
উত্তর ৫: ফিউজ তার লেড (সীসা) ও টিনের সংকর ধাতু দিয়ে তৈরি, যার বৈশিষ্ট্য হলো উচ্চ রোধ এবং নিম্ন গলনাঙ্ক। যখন বর্তনীতে অতিরিক্ত তড়িৎ প্রবাহিত হয়, তখন উৎপন্ন তাপে ফিউজ তারটি গলে গিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং এর ফলে মূল্যবান যন্ত্রপাতি সুরক্ষিত থাকে।
উত্তর ৬: অ্যাম্পিয়ারের সন্তরণ নিয়ম অনুযায়ী, কোনো তড়িৎবাহী তারের নিচে রাখা একটি চুম্বক শলাকার উত্তর মেরুর দিকে মুখ করে তড়িৎপ্রবাহের অভিমুখে সাঁতার কাটার কল্পনা করলে, সাঁতারুর বাম হাত যেদিকে বিক্ষিপ্ত হবে, শলাকার উত্তর মেরুটিও সেদিকে বিক্ষিপ্ত হবে। এই নিয়ম তড়িৎবাহী তারের জন্য সৃষ্ট চৌম্বক ক্ষেত্রে চুম্বক শলাকার বিক্ষেপের দিক নির্ণয় করতে ব্যবহৃত হয়।
উত্তর ৭: ফ্লেমিং-এর বামহস্ত নিয়মটি হলো—বামহস্তের বৃদ্ধাঙ্গুলি, তর্জনী এবং মধ্যমাকে পরস্পরের সঙ্গে সমকোণে প্রসারিত করলে যদি তর্জনী চৌম্বকক্ষেত্রের দিক এবং মধ্যমা তড়িৎপ্রবাহের দিক নির্দেশ করে, তবে বৃদ্ধাঙ্গুলি পরিবাহীর গতির অভিমুখ নির্দেশ করবে। এই নিয়ম বৈদ্যুতিক মোটরের কার্যনীতি ব্যাখ্যা করতে ব্যবহৃত হয়।
উত্তর ৮: কোনো বদ্ধ কুণ্ডলীর মধ্যে দিয়ে অতিক্রান্ত চৌম্বক বলরেখার সংখ্যার পরিবর্তন ঘটলে ওই কুণ্ডলীতে একটি তড়িৎচালক বল আবিষ্ট হয় এবং এর ফলে একটি ক্ষণস্থায়ী তড়িৎপ্রবাহের সৃষ্টি হয়। এই ঘটনাকে তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ বলে। বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডে এই ঘটনা আবিষ্কার করেন।
উত্তর ৯: সমপ্রবাহের (DC) মান ও অভিমুখ সময়ের সাথে অপরিবর্তিত থাকে, কিন্তু পরিবর্তী প্রবাহের (AC) মান ও অভিমুখ নির্দিষ্ট সময় অন্তর পরিবর্তিত হয়। গৃহস্থালীর ক্ষেত্রে AC ব্যবহার করা বেশি সুবিধাজনক কারণ এর উৎপাদন খরচ ও অপচয় কম, এবং একে সহজেই রূপান্তরিত করা যায়।
উত্তর ১০: গৃহস্থালীর বর্তনীতে লাইভ তারের বর্ণ লাল বা বাদামী হয় এবং এটি উচ্চ বিভবের সাথে যুক্ত থাকে। নিউট্রাল তারের বর্ণ কালো বা নীল হয়, এটি নিম্ন বিভবের সাথে যুক্ত থেকে তড়িৎপ্রবাহের ফেরার পথ তৈরি করে। আর্থিং তারের বর্ণ সবুজ হয় এবং এটি সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে, এর বিভব শূন্য ধরা হয়।
——————————————————————————–
রচনাধর্মী প্রশ্ন
১. কুলম্বের সূত্রটি বিবৃত ও ব্যাখ্যা করো। SI এবং CGS পদ্ধতিতে কুলম্বীয় ধ্রুবকের (k) মান কত? তড়িৎক্ষেত্র ও তড়িৎবিভব বলতে কী বোঝ?
২. রোধের শ্রেণি ও সমান্তরাল সমবায় বলতে কী বোঝ? প্রত্যেক প্রকার সমবায়ের ক্ষেত্রে তুল্য রোধের রাশিমালা নির্ণয় করো এবং বর্তনীর চিত্র অঙ্কন করে দেখাও।
৩. একটি বৈদ্যুতিক মোটরের কার্যনীতি, গঠন এবং ব্যবহার আলোচনা করো। ফ্লেমিং-এর কোন নিয়মটি এখানে প্রযোজ্য এবং কীভাবে?
৪. তড়িৎপ্রবাহের তাপীয় ফল সংক্রান্ত জুলের সূত্রগুলি লেখো। দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত হয় এমন তিনটি যন্ত্রের (বৈদ্যুতিক বাল্ব, হিটার, ফিউজ) উদাহরণ দিয়ে সূত্রটির ব্যবহারিক প্রয়োগ ব্যাখ্যা করো।
৫. একটি ডায়নামো বা জেনারেটরের মূল কার্যনীতি কী? ফ্লেমিং-এর ডানহস্ত নিয়ম এবং লেঞ্জের সূত্রের সাহায্যে আবিষ্ট তড়িৎপ্রবাহের অভিমুখ কীভাবে নির্ণয় করা হয় তা ব্যাখ্যা করো।
——————————————————————————–
পরিভাষাকোষ (Glossary)
|
পরিভাষা (Term) |
সংজ্ঞা (Definition) |
|
তড়িৎ আধান (Electric Charge) |
বস্তুর এমন এক ভৌত ধর্ম যার জন্য বস্তুটি কোনো তড়িৎগ্রস্ত বা অনাড়িত বস্তুর উপর বল প্রয়োগ করে। এর SI একক কুলম্ব (C)। |
|
কুলম্বের সূত্র (Coulomb’s Law) |
দুটি বিন্দু আধানের মধ্যে ক্রিয়াশীল আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বলের মান আধান দুটির গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক। |
|
তড়িৎবিভব (Electric Potential) |
অসীম দূরত্ব থেকে একক ধনাত্মক আধানকে তড়িৎক্ষেত্রের কোনো বিন্দুতে আনতে যে কার্য করতে হয়, তাকে ওই বিন্দুর তড়িৎবিভব বলে। এর SI একক ভোল্ট (V)। |
|
বিভবপ্রভেদ (Potential Difference) |
একটি একক ধনাত্মক আধানকে তড়িৎক্ষেত্রের এক বিন্দু থেকে অপর কোনো বিন্দুতে স্থানান্তরিত করতে প্রয়োজনীয় কৃতকার্যকে ঐ দুই বিন্দুর বিভবপ্রভেদ বলে। |
|
তড়িৎচালক বল (EMF) |
মুক্ত বর্তনীতে কোনো তড়িৎকোষের ভিতরে একক ধনাত্মক আধানকে নিম্নবিভব থেকে উচ্চবিভব প্রান্তে নিয়ে যেতে যে পরিমাণ কার্য করতে হয়, তাকে ঐ কোষের তড়িৎচালক বল বলে। |
|
তড়িৎপ্রবাহমাত্রা (Current Intensity) |
পরিবাহীর যে কোনো প্রস্থচ্ছেদের মধ্যে দিয়ে একক সময়ে যে পরিমাণ তড়িৎগ্রস্ত কণা প্রবাহিত হয়, তাকে তড়িৎপ্রবাহমাত্রা বলে। এর SI একক অ্যাম্পিয়ার (A)। |
|
ওহমের সূত্র (Ohm’s Law) |
উষ্ণতা ও অন্যান্য ভৌত অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে, পরিবাহীর মধ্যে দিয়ে প্রবাহমাত্রা পরিবাহীর দুই প্রান্তের বিভবপ্রভেদের সমানুপাতিক। (V ∝ I) |
|
রোধ (Resistance) |
যে ধর্মের জন্য কোনো পরিবাহী তার মধ্যে দিয়ে তড়িৎপ্রবাহকে বাধা দেয়, তাকে পরিবাহীর রোধ বলে। এর SI একক ওহম (Ω)। |
|
রোধাঙ্ক (Resistivity) |
নির্দিষ্ট উষ্ণতায় কোনো পদার্থ দ্বারা নির্মিত একক দৈর্ঘ্য এবং একক প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফলবিশিষ্ট একটি পরিবাহীর রোধের মানকে রোধাঙ্ক (ρ) বলে। |
|
পরিবাহিতা (Conductance) |
পরিবাহীর যে ধর্মের জন্য তার মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ যেতে সাহায্য করে, তাকে পরিবাহীর পরিবাহিতা বলে। এটি রোধের অন্যোন্যক। এর একক म्हো (mho) বা সিমেন্স (S)। |
|
শ্রেণি সমবায় (Series Combination) |
একাধিক রোধকে এমনভাবে যুক্ত করা হয় যাতে প্রতিটি রোধের মধ্যে দিয়ে একই তড়িৎপ্রবাহ যায়। তুল্য রোধ হয় রোধগুলির যোগফলের সমান (Rs = R1 + R2 + …)। |
|
সমান্তরাল সমবায় (Parallel Combination) |
একাধিক রোধের এক প্রান্তগুলিকে একটি সাধারণ বিন্দুতে এবং অপর প্রান্তগুলিকে অন্য একটি সাধারণ বিন্দুতে যুক্ত করা হয়। এতে প্রতিটি রোধের বিভবপ্রভেদ একই থাকে। |
|
নষ্ট ভোল্ট (Lost Volt) |
তড়িৎকোষের অভ্যন্তরীণ রোধের কারণে বিভবপ্রভেদের যে অংশ কোষের ভিতরেই নষ্ট হয়। এর মান Ir, যেখানে I প্রবাহমাত্রা এবং r অভ্যন্তরীণ রোধ। |
|
তড়িৎচুম্বক (Electromagnet) |
কোনো কাঁচা লোহার মতো উচ্চ চৌম্বক ভেদ্যতাসম্পন্ন পদার্থের ওপর তার জড়িয়ে তড়িৎপ্রবাহ পাঠালে সেটি একটি শক্তিশালী অস্থায়ী চুম্বকে পরিণত হয়। |
|
ফ্লেমিং-এর বামহস্ত নিয়ম (Fleming’s Left-Hand Rule) |
বামহস্তের বৃদ্ধাঙ্গুলি, তর্জনী ও মধ্যমাকে পরস্পরের সমকোণে রাখলে, যদি তর্জনী চৌম্বকক্ষেত্রের দিক ও মধ্যমা তড়িৎপ্রবাহের দিক নির্দেশ করে, তবে বৃদ্ধাঙ্গুলি পরিবাহীর গতির অভিমুখ নির্দেশ করবে। |
|
তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ (Electromagnetic Induction) |
কোনো বদ্ধ কুণ্ডলীর সাথে জড়িত চৌম্বক প্রবাহের পরিবর্তন হলে ওই কুণ্ডলীতে একটি তড়িৎচালক বল আবিষ্ট হয় এবং একটি ক্ষণস্থায়ী তড়িৎপ্রবাহের সৃষ্টি হয়। |
|
লেঞ্জের সূত্র (Lenz’s Law) |
তড়িৎচুম্বকীয় আবেশের ফলে, বর্তনীতে সৃষ্ট আবিষ্ট তড়িৎপ্রবাহের অভিমুখ এমন হয় যে এটি নিজের সৃষ্টির কারণকেই বাধা দেয়। |
|
ফ্লেমিং-এর ডানহস্ত নিয়ম (Fleming’s Right-Hand Rule) |
ডানহাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি, তর্জনী ও মধ্যমাকে পরস্পরের সমকোণে রাখলে, যদি তর্জনী চৌম্বকক্ষেত্রের দিক এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি পরিবাহীর গতির অভিমুখ নির্দেশ করে, তবে মধ্যমা আবিষ্ট তড়িৎপ্রবাহের অভিমুখ নির্দেশ করবে। |
দশম শ্রেণীর চলতড়িৎ অধ্যায়ের বিস্তারিত বিশ্লেষণ ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি
|
বিষয় বা ভৌত রাশি
|
সংজ্ঞা বা বর্ণনা
|
গাণিতিক রূপ বা সূত্র
|
SI একক ও মাত্রা
|
ব্যবহারিক প্রয়োগ বা গুরুত্ব
|
গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ বা নিয়ম
|
|
|---|---|---|---|---|---|---|
|
তড়িৎ আধান
|
বস্তুর এমন এক ভৌত ধর্ম যার জন্য বস্তুটি অন্য তড়িৎগ্রস্ত বা অনাহিত বস্তুর ওপর বল প্রয়োগ করে। এটি দুই প্রকার: ধনাত্মক ও ঋণাত্মক।
|
(যেখানে = আধান, = ইলেকট্রন সংখ্যা, = ইলেকট্রনের আধান)
|
একক: কুলম্ব (), মাত্রা:
|
তড়িৎ প্রবাহের জন্য দায়ী হলো মুক্ত ইলেকট্রনের প্রবাহ। সমধর্মী আধান পরস্পরকে বিকর্ষণ এবং বিপরীত আধান আকর্ষণ করে।
|
আধানের কোয়ান্টায়ন: কোনো বস্তুর মোট আধান ইলেকট্রনের আধানের পূর্ণ সংখ্যার সরল গুণিতক হয়।
|
|
|
বিভব প্রভেদ
|
একটি একক ধনাত্মক আধানকে তড়িৎক্ষেত্রের এক বিন্দু থেকে অপর বিন্দুতে স্থানান্তরিত করতে প্রয়োজনীয় কৃতকার্য।
|
|
একক: ভোল্ট (), মাত্রা:
|
ভোল্টমিটার যন্ত্রের সাহায্যে সমান্তরাল সমবায়ে যুক্ত করে বিভব প্রভেদ পরিমাপ করা হয়।
|
১ ভোল্ট সংজ্ঞা: ১ কুলম্ব আধান সরাতে ১ জুল কার্য করতে হলে বিভব প্রভেদ ১ ভোল্ট হয়।
|
|
|
ওহমের সূত্র
|
উষ্ণতা ও অন্যান্য ভৌত অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে পরিবাহীর প্রবাহমাত্রা পরিবাহীর দুই প্রান্তের বিভব প্রভেদের সমানুপাতিক।
|
( = রোধ)
|
রোধের একক: ওহম (), মাত্রা:
|
পরিবাহীর মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহের বাধা বা রোধ নির্ণয়ে ব্যবহৃত হয়।
|
উষ্ণতা বাড়লে পরিবাহীর রোধ বাড়ে, কিন্তু অর্ধপরিবাহীর (যেমন সিলিকন) ক্ষেত্রে উষ্ণতা বাড়লে রোধ কমে।
|
|
|
তড়িৎপ্রবাহের তাপীয় ফল (জুল সূত্র)
|
পরিবাহীর মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হলে পরিবাহীর রোধের কারণে তড়িৎ শক্তি তাপ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
|
(SI পদ্ধতিতে )
|
একক: জুল () বা ক্যালোরি ()
|
বৈদ্যুতিক ইস্ত্রি, হিটার এবং ইলেকট্রিক বাল্বের ফিলামেন্টে এই নীতি ব্যবহৃত হয়।
|
ফিউজ তার: উচ্চ রোধ ও নিম্ন গলনাঙ্ক বিশিষ্ট তার যা শ্রেণী সমবায়ে যুক্ত থেকে বর্তনীকে উচ্চ প্রবাহের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখে।
|
|
|
ফ্লেমিং-এর বামহস্ত নিয়ম
|
তড়িৎ পরিবাহীর ওপর চুম্বকের ক্রিয়া বা পরিবাহীর গতির অভিমুখ নির্ণয়ের নিয়ম।
|
প্রযোজ্য নয়
|
প্রযোজ্য নয়
|
বৈদ্যুতিক মোটরের কার্যনীতিতে এই নিয়মটি সরাসরি ব্যবহৃত হয়।
|
বামহাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি, তর্জনী ও মধ্যমাকে পরস্পরের সমকোণে রাখলে তর্জনী চৌম্বক ক্ষেত্র ও মধ্যমা প্রবাহের দিক নির্দেশ করলে বৃদ্ধাঙ্গুলি গতির দিক নির্দেশ করবে।
|
|
|
তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ
|
কোনো বদ্ধ কুণ্ডলীর মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত চৌম্বক বলরেখার সংখ্যা বা ফ্লাক্সের পরিবর্তন হলে কুণ্ডলীতে তড়িৎচালক বল আবিষ্ট হয়।
|
ফ্যারাডের সূত্র: আবিষ্ট তড়িৎচালক বল চৌম্বক প্রবাহ পরিবর্তনের হার।
|
প্রযোজ্য নয়
|
ডায়নামো বা বৈদ্যুতিক জেনারেটরে যান্ত্রিক শক্তিকে তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তরের জন্য ব্যবহৃত হয়।
|
লেঞ্জের সূত্র: আবিষ্ট তড়িৎপ্রবাহের অভিমুখ এমন হয় যে এটি সর্বদা নিজের সৃষ্টির কারণকে বাধা দেয়। এটি শক্তির সংরক্ষণ সূত্রকে সমর্থন করে।
|
![]()



