Skip to content

দশম শ্রেণী ভৌত বিজ্ঞান – আলো (গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা)

light-aalo-mp-ss-cl-10
aalo_light_madhyamik_sahaj-shiksha_cl-10
YouTube player
YouTube player

মাধ্যমিক ভৌত বিজ্ঞান: আলোর একটি বিস্তারিত আলোচনা

১. ভূমিকা: আলোর প্রতিফলন (Reflection of Light)

আলোর প্রকৃতি এবং তার আচরণ বোঝা ভৌত বিজ্ঞানের একটি মৌলিক অধ্যায়। আমাদের চারপাশের জগৎকে দেখতে, বুঝতে এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন সম্ভব করতে আলোর ধর্মগুলি জানা অপরিহার্য। এই আলোচনার প্রথম ধাপে আমরা আলোর প্রতিফলন (Reflection of Light) নিয়ে কথা বলব। প্রতিফলন হলো সেই ঘটনা যার মাধ্যমে কোনো তলে বাধা পেয়ে আলোকরশ্মি পুনরায় প্রথম মাধ্যমে ফিরে আসে। এই সাধারণ নীতিটিই দর্পণ বা আয়নার কার্যকারিতার মূল ভিত্তি, যা আমাদের প্রতিবিম্ব দেখতে সাহায্য করে। প্রতিফলনের সূত্রাবলী বোঝা ছাড়া গোলীয় দর্পণের জটিল কার্যপ্রণালী এবং প্রতিবিম্ব গঠনের রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব নয়।

আলোকরশ্মি এক স্বচ্ছ মাধ্যম থেকে অন্য স্বচ্ছ মাধ্যমে যাওয়ার পথে মাধ্যম দুটির বিভেদতলে বাধা পেয়ে যদি পুনরায় প্রথম মাধ্যমে ফিরে আসে, তবে সেই ঘটনাকে আলোর প্রতিফলন বলে।

উপরের চিত্র অনুযায়ী:

  • আপতিত রশ্মি (AO): যে আলোকরশ্মি দর্পণের উপর এসে পড়ে।
  • প্রতিফলিত রশ্মি (OB): দর্পণে বাধা পেয়ে যে রশ্মি ফিরে যায়।
  • অভিলম্ব (ON): আপতন বিন্দুতে প্রতিফলক তলের উপর অঙ্কিত লম্ব।
  • আপতন কোণ (∠i): আপতিত রশ্মি ও অভিলম্বের মধ্যবর্তী কোণ।
  • প্রতিফলন কোণ (∠r): প্রতিফলিত রশ্মি ও অভিলম্বের মধ্যবর্তী কোণ।

প্রতিফলনের সূত্রাবলী

আলোর প্রতিফলন দুটি নির্দিষ্ট সূত্র মেনে চলে, যা নিম্নরূপ:

  • প্রথম সূত্র: আপতিত রশ্মি, প্রতিফলিত রশ্মি এবং আপতন বিন্দুতে প্রতিফলকের উপর অঙ্কিত অভিলম্ব সর্বদা একই সমতলে অবস্থান করে।
  • দ্বিতীয় সূত্র: আপতন কোণ (∠i) এবং প্রতিফলন কোণ (∠r) এর মান সর্বদা সমান হয়। অর্থাৎ, ∠i = ∠r

সদবিম্ব বনাম অসদবিম্ব

প্রতিফলন বা প্রতিসরণের পর আলোক রশ্মিগুলি যেভাবে মিলিত হয়, তার উপর ভিত্তি করে প্রতিবিম্বকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়: সদবিম্ব (Real Image) এবং অসদবিম্ব (Virtual Image)।

বৈশিষ্ট্য

সদবিম্ব (Real Image)

অসদবিম্ব (Virtual Image)

সংজ্ঞা

কোনো বিন্দু উৎস থেকে আগত অপসারী রশ্মিগুচ্ছ প্রতিফলিত বা প্রতিসৃত হওয়ার পর যদি প্রকৃতপক্ষে অন্য কোনো বিন্দুতে মিলিত হয়, তবে সেই বিন্দুতে সদবিম্ব গঠিত হয়।

কোনো বিন্দু উৎস থেকে আগত অপসারী রশ্মিগুচ্ছ প্রতিফলিত বা প্রতিসৃত হওয়ার পর যদি অন্য কোনো বিন্দু থেকে অপসৃত হচ্ছে বলে মনে হয়, তবে সেই বিন্দুতে অসদবিম্ব গঠিত হয়।

গঠন

আলোকরশ্মি প্রকৃতপক্ষে মিলিত হয়।

আলোকরশ্মি মিলিত হচ্ছে বলে মনে হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মিলিত হয় না।

পর্দায় গঠন

পর্দায় ফেলা যায়।

পর্দায় ফেলা যায় না।

প্রকৃতি

বস্তুর সাপেক্ষে সর্বদা অবশীর্ষ (উল্টো) হয়।

বস্তুর সাপেক্ষে সর্বদা সমশীর্ষ (সোজা) হয়।

আলোর প্রতিফলনের এই মৌলিক নীতিগুলিই পরবর্তী অংশে গোলীয় দর্পণের কার্যকারিতা এবং তার দ্বারা সৃষ্ট বিভিন্ন ধরণের প্রতিবিম্ব বোঝার ভিত্তি স্থাপন করবে।

২. গোলীয় দর্পণ এবং প্রতিবিম্ব গঠন (Spherical Mirrors and Image Formation)

গোলীয় দর্পণ হলো এমন এক ধরণের প্রতিফলক তল যা একটি গোলকের অংশবিশেষ। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে গাড়ির আয়না থেকে শুরু করে চিকিৎসাবিজ্ঞান পর্যন্ত এর ব্যাপক প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। একটি ফাঁপা গোলকের অংশ কেটে তার কোনো একটি পৃষ্ঠে ধাতুর প্রলেপ দিয়ে গোলীয় দর্পণ তৈরি করা হয়। প্রতিফলক পৃষ্ঠটি ভিতরের দিকে অবতল নাকি বাইরের দিকে উত্তল, তার উপর ভিত্তি করে দর্পণকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়।

গোলীয় দর্পণের প্রকারভেদ ও পরিভাষা

গোলীয় দর্পণ প্রধানত দুই প্রকারের:

  1. অবতল দর্পণ (Concave Mirror): গোলীয় দর্পণের ভেতরের পৃষ্ঠটি যদি প্রতিফলক তল হিসেবে কাজ করে, তবে তাকে অবতল দর্পণ বলে। এটি আলোকরশ্মিগুচ্ছকে অভিসারী (converge) করে।
  2. উত্তল দর্পণ (Convex Mirror): গোলীয় দর্পণের বাইরের পৃষ্ঠটি যদি প্রতিফলক তল হিসেবে কাজ করে, তবে তাকে উত্তল দর্পণ বলে। এটি আলোকরশ্মিগুচ্ছকে অপসারী (diverge) করে।

গোলীয় দর্পণ বোঝার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা নিচে দেওয়া হলো:

  • মেরু (Pole): গোলীয় দর্পণের প্রতিফলক তলের মধ্যবিন্দুকে মেরু (P) বলা হয়।
  • বক্রতা কেন্দ্র (Center of Curvature): গোলীয় দর্পণটি যে গোলকের অংশ, তার কেন্দ্রকে ওই দর্পণের বক্রতা কেন্দ্র (C) বলা হয়।
  • বক্রতা ব্যাসার্ধ (Radius of Curvature): দর্পণের মেরু থেকে বক্রতা কেন্দ্রের দূরত্বকে বক্রতা ব্যাসার্ধ (r) বলে।
  • প্রধান অক্ষ (Principal Axis): দর্পণের মেরু এবং বক্রতা কেন্দ্রের মধ্যে দিয়ে অঙ্কিত সরলরেখাকে প্রধান অক্ষ বলা হয়।
  • মুখ্য ফোকাস (Principal Focus): প্রধান অক্ষের সমান্তরাল আলোকরশ্মিগুচ্ছ গোলীয় দর্পণে প্রতিফলিত হওয়ার পর অবতল দর্পণের ক্ষেত্রে প্রধান অক্ষের উপর একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে মিলিত হয়, অথবা উত্তল দর্পণের ক্ষেত্রে প্রধান অক্ষের উপর একটি বিন্দু থেকে অপসৃত হচ্ছে বলে মনে হয়। সেই নির্দিষ্ট বিন্দুটিকে দর্পণের মুখ্য ফোকাস (F) বলে।
  • ফোকাস দূরত্ব (Focal Length): দর্পণের মেরু থেকে মুখ্য ফোকাসের রৈখিক দূরত্বকে ফোকাস দূরত্ব (f) বলে।

গোলীয় দর্পণের ফোকাস দূরত্ব (f) তার বক্রতা ব্যাসার্ধের (r) অর্ধেক হয়। গাণিতিকভাবে, সম্পর্কটি হলো: f = r/2

অবতল দর্পণ দ্বারা প্রতিবিম্ব গঠন

অবতল দর্পণের সামনে বস্তুর অবস্থানের পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রতিবিম্বের অবস্থান, প্রকৃতি এবং আকারের পরিবর্তন ঘটে। নিচে একটি সারণীর মাধ্যমে এটি দেখানো হলো:

বস্তুর অবস্থান

প্রতিবিম্বের অবস্থান

প্রতিবিম্বের প্রকৃতি (সদ/অসদ এবং সমশীর্ষ/অবশীর্ষ)

প্রতিবিম্বের আকার

অসীমে

ফোকাসে (F)

সদ ও অবশীর্ষ

অত্যন্ত খর্বাকার

বক্রতা কেন্দ্রের (C) বাইরে

ফোকাস (F) ও বক্রতা কেন্দ্রের (C) মধ্যে

সদ ও অবশীর্ষ

খর্বাকার

বক্রতা কেন্দ্রে (C)

বক্রতা কেন্দ্রে (C)

সদ ও অবশীর্ষ

বস্তুর সমান

বক্রতা কেন্দ্র (C) ও ফোকাসের (F) মধ্যে

বক্রতা কেন্দ্রের (C) বাইরে

সদ ও অবশীর্ষ

বিবর্ধিত

ফোকাসে (F)

অসীমে

সদ ও অবশীর্ষ

অত্যন্ত বিবর্ধিত

ফোকাস (F) ও মেরুর (P) মধ্যে

দর্পণের পিছনে

অসদ ও সমশীর্ষ

বিবর্ধিত

উত্তল দর্পণ দ্বারা প্রতিবিম্ব গঠন

উত্তল দর্পণ সর্বদা বস্তুর যেকোনো অবস্থানের জন্য দর্পণের পিছনে অসদ, সমশীর্ষ এবং খর্বাকার (ছোট) প্রতিবিম্ব গঠন করে।

  • বস্তু অসীমে থাকলে: প্রতিবিম্ব ফোকাসে গঠিত হয়, যা অত্যন্ত খর্বাকার ও অসদ।
  • বস্তু অসীম ও মেরুর মধ্যে থাকলে: প্রতিবিম্ব মেরু ও ফোকাসের মধ্যে গঠিত হয়, যা খর্বাকার ও অসদ।

গোলীয় দর্পণের ব্যবহারিক প্রয়োগ

গোলীয় দর্পণের বিভিন্ন ধর্ম কাজে লাগিয়ে আমাদের জীবনে এর বহুবিধ ব্যবহার রয়েছে।

  • উত্তল দর্পণের ব্যবহার:
    • গাড়ি, বাস বা মোটরসাইকেলের রিয়ার-ভিউ মিরর বা ভিউফাইন্ডার (Rear-view mirror or Viewfinder) হিসেবে ব্যবহৃত হয়, কারণ এটি বিস্তৃত অঞ্চলের একটি ছোট ও সোজা প্রতিবিম্ব গঠন করে।
    • রাস্তার বাতিতে (Street Lamp) প্রতিফলক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা আলোকে বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে দেয়।
  • অবতল দর্পণের ব্যবহার:
    • টর্চলাইট, সার্চলাইট এবং গাড়ির হেডলাইটে শক্তিশালী সমান্তরাল রশ্মিগুচ্ছ তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়।
    • দন্তচিকিৎসকরা দাঁতের বিবর্ধিত প্রতিবিম্ব দেখার জন্য এটি ব্যবহার করেন।
    • শেভিং বা মেকআপ আয়না হিসেবে ব্যবহৃত হয়, কারণ এটি মুখের একটি বড় এবং সোজা প্রতিবিম্ব তৈরি করে (যখন মুখ ফোকাস ও মেরুর মধ্যে থাকে)।

দর্পণের প্রতিফলনের ধারণা যেমন প্রতিবিম্ব গঠনে সাহায্য করে, তেমনই আলোর অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্ম—প্রতিসরণ—লেন্সের কার্যকারিতা এবং আমাদের দৃষ্টিশক্তির রহস্য উন্মোচন করে।

৩. আলোর প্রতিসরণ (Refraction of Light)

আলোকরশ্মি যখন একটি স্বচ্ছ মাধ্যম থেকে ভিন্ন ঘনত্বের অন্য একটি স্বচ্ছ মাধ্যমে তির্যকভাবে প্রবেশ করে, তখন মাধ্যম দুটির বিভেদতল থেকে তার গতিপথের পরিবর্তন ঘটে। আলোর গতিপথের এই পরিবর্তন বা বেঁকে যাওয়ার ঘটনাকেই আলোর প্রতিসরণ (Refraction of Light) বলা হয়। মূলত, ভিন্ন মাধ্যমে আলোর বেগের পরিবর্তনের কারণেই প্রতিসরণ ঘটে।

প্রতিসরণের গতিপথ

আলোর গতিপথের পরিবর্তন নির্ভর করে মাধ্যম দুটির ঘনত্বের উপর।

  • লঘু মাধ্যম থেকে ঘন মাধ্যমে: আলোকরশ্মি যখন লঘু মাধ্যম (যেমন: বায়ু) থেকে ঘন মাধ্যমে (যেমন: জল বা কাঁচ) প্রবেশ করে, তখন এর বেগ কমে যায় এবং রশ্মিটি অভিলম্বের দিকে বেঁকে আসে।
  • ঘন মাধ্যম থেকে লঘু মাধ্যমে: আলোকরশ্মি যখন ঘন মাধ্যম থেকে লঘু মাধ্যমে প্রবেশ করে, তখন এর বেগ বেড়ে যায় এবং রশ্মিটি অভিলম্ব থেকে দূরে সরে যায়।

প্রতিসরণের সূত্রাবলী

প্রতিফলনের মতো প্রতিসরণও দুটি নির্দিষ্ট সূত্র মেনে চলে:

  • প্রথম সূত্র: আপতিত রশ্মি, প্রতিসৃত রশ্মি এবং আপতন বিন্দুতে দুই মাধ্যমের বিভেদতলের উপর অঙ্কিত অভিলম্ব একই সমতলে থাকে।
  • স্নেলের সূত্র (দ্বিতীয় সূত্র): দুটি নির্দিষ্ট মাধ্যম এবং একটি নির্দিষ্ট বর্ণের আলোর জন্য, আপতন কোণের সাইন (sin i) এবং প্রতিসরণ কোণের সাইনের (sin r) অনুপাত সর্বদা ধ্রুবক থাকে। এই ধ্রুবকটিকে প্রথম মাধ্যমের সাপেক্ষে দ্বিতীয় মাধ্যমের প্রতিসরাঙ্ক (Refractive Index) বলা হয়।

গাণিতিকভাবে, sin i / sin r = μ (ধ্রুবক)

প্রতিসরাঙ্ক (Refractive Index)

প্রতিসরাঙ্ক হলো একটি মাধ্যমের এমন একটি ভৌত ধর্ম যা ওই মাধ্যমে আলোর বেগকে নির্ধারণ করে।

  • পরম প্রতিসরাঙ্ক (Absolute Refractive Index): শূন্য মাধ্যমে আলোর বেগ (c) এবং কোনো নির্দিষ্ট মাধ্যমে আলোর বেগের (v) অনুপাতকে ওই মাধ্যমের পরম প্রতিসরাঙ্ক (μ) বলে। μ = c/v
  • আপেক্ষিক প্রতিসরাঙ্ক (Relative Refractive Index): প্রথম মাধ্যমে আলোর বেগ (v₁) এবং দ্বিতীয় মাধ্যমে আলোর বেগের (v₂) অনুপাতকে প্রথম মাধ্যমের সাপেক্ষে দ্বিতীয় মাধ্যমের আপেক্ষিক প্রতিসরাঙ্ক (₁μ₂) বলে। ₁μ₂ = v₁/v₂

প্রিজম দ্বারা আলোর প্রতিসরণ

প্রিজম হলো একটি স্বচ্ছ প্রতিসারক মাধ্যম, যার দুটি ত্রিভুজাকার এবং তিনটি আয়তাকার তল থাকে। এর দুটি তল পরস্পরের সাথে একটি কোণে আনত থাকে, যেগুলিকে প্রতিসারক তল বলা হয়। আলোকরশ্মি প্রিজমের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় দুবার প্রতিসৃত হয়, যার ফলে রশ্মির চ্যুতি (Deviation) ঘটে।

আপতিত রশ্মি এবং নির্গত রশ্মির মধ্যবর্তী কোণকে চ্যুতি কোণ (δ) বলা হয়। এর রাশিমালাটি হলো: δ = i₁ + i₂ - A যেখানে i₁ হলো আপতন কোণ, i₂ হলো নির্গমন কোণ এবং A হলো প্রিজমের প্রতিসারক কোণ।

আলোর প্রতিসরণের এই মৌলিক নীতিগুলিই লেন্সের কার্যকারিতাকে নিয়ন্ত্রণ করে, যা ক্যামেরা থেকে শুরু করে মানুষের চোখ পর্যন্ত সর্বত্রই বিদ্যমান।

৪. লেন্স এবং তার প্রয়োগ (Lenses and Their Applications)

লেন্স হলো দুটি গোলীয় তল অথবা একটি গোলীয় ও একটি সমতল দ্বারা সীমাবদ্ধ স্বচ্ছ প্রতিসারক মাধ্যম। আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষত আলোকবিজ্ঞান এবং দৃষ্টি সংশোধনের ক্ষেত্রে লেন্সের ভূমিকা অপরিহার্য। লেন্সের মধ্য দিয়ে আলোর প্রতিসরণের ফলেই প্রতিবিম্ব গঠিত হয়, যা আমাদের ক্যামেরা, দূরবীন এবং চশমার মতো যন্ত্র তৈরিতে সাহায্য করে।

লেন্সের প্রকারভেদ ও পরিভাষা

গঠন অনুসারে লেন্স প্রধানত দুই প্রকারের:

  1. উত্তল লেন্স (Convex Lens): এই লেন্সের মধ্যভাগ মোটা এবং প্রান্তভাগ সরু হয়। এটি আলোকরশ্মিগুচ্ছকে অভিসারী করে, তাই একে অভিসারী লেন্সও বলা হয়। যেমন: উভোত্তল (Biconvex), সমতলোত্তল (Plano-convex)।
  2. অবতল লেন্স (Concave Lens): এই লেন্সের মধ্যভাগ সরু এবং প্রান্তভাগ মোটা হয়। এটি আলোকরশ্মিগুচ্ছকে অপসারী করে, তাই একে অপসারী লেন্সও বলা হয়। যেমন: উভাবতল (Bioconcave), সমতলাবতল (Plano-concave)।

লেন্স সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা:

  • আলোককেন্দ্র (Optical Centre): লেন্সের প্রধান অক্ষের উপর অবস্থিত এমন একটি বিন্দু যার মধ্যে দিয়ে কোনো আলোকরশ্মি গেলে তার কোনো চ্যুতি হয় না।
  • বক্রতা কেন্দ্র (Center of Curvature): লেন্সের গোলীয় তল দুটি যে গোলকের অংশ, তাদের কেন্দ্রকে বক্রতা কেন্দ্র বলে।
  • প্রধান অক্ষ (Principal Axis): লেন্সের দুটি বক্রতা কেন্দ্রের মধ্যে দিয়ে অঙ্কিত সরলরেখা।
  • মুখ্য ফোকাস (Principal Focus): প্রধান অক্ষের সমান্তরাল রশ্মিগুচ্ছ লেন্সে প্রতিসৃত হওয়ার পর উত্তল লেন্সের ক্ষেত্রে একটি বিন্দুতে মিলিত হয়, বা অবতল লেন্সের ক্ষেত্রে একটি বিন্দু থেকে অপসৃত হচ্ছে বলে মনে হয়। সেই বিন্দুটি হলো মুখ্য ফোকাস।

উত্তল লেন্স দ্বারা প্রতিবিম্ব গঠন

উত্তল লেন্সের সামনে বস্তুর বিভিন্ন অবস্থানের জন্য গঠিত প্রতিবিম্বের প্রকৃতি নিচে সারণিতে দেওয়া হলো:

বস্তুর অবস্থান

প্রতিবিম্বের অবস্থান

প্রতিবিম্বের প্রকৃতি

প্রতিবিম্বের আকার

অসীমে

ফোকাসে (F₂)

সদ ও অবশীর্ষ

অত্যন্ত খর্বাকার

2F₁ এর বাইরে

F₂ ও 2F₂ এর মধ্যে

সদ ও অবশীর্ষ

খর্বাকার

2F₁ তে

2F₂ তে

সদ ও অবশীর্ষ

বস্তুর সমান

F₁ ও 2F₁ এর মধ্যে

2F₂ এর বাইরে

সদ ও অবশীর্ষ

বিবর্ধিত

ফোকাসে (F₁)

অসীমে

সদ ও অবশীর্ষ

অত্যন্ত বিবর্ধিত

F₁ ও আলোককেন্দ্রের মধ্যে

বস্তুর পিছনে, একই দিকে

অসদ ও সমশীর্ষ

বিবর্ধিত

অবতল লেন্স দ্বারা প্রতিবিম্ব গঠন

অবতল লেন্স বস্তুর যেকোনো অবস্থানের জন্য সর্বদা লেন্সের একই পাশে একটি অসদ, সমশীর্ষ এবং খর্বাকার প্রতিবিম্ব গঠন করে।

রৈখিক বিবর্ধন (Linear Magnification)

প্রতিবিম্বের উচ্চতা এবং বস্তুর উচ্চতার অনুপাতকে রৈখিক বিবর্ধন (m) বলা হয়। এটি প্রতিবিম্বের আকারের সাথে বস্তুর আকারের তুলনা করে। এর গাণিতিক সূত্রটি হলো: m = প্রতিবিম্বের উচ্চতা (h₂) / বস্তুর উচ্চতা (h₁) = प्रतिবিম্ব দূরত্ব (v) / বস্তু দূরত্ব (u)

লেন্সের ব্যবহার

  • উত্তল লেন্স: বিবর্ধক কাঁচ (Magnifying Glass), ক্যামেরা, অণুবীক্ষণ ও দূরবীক্ষণ যন্ত্র এবং দীর্ঘদৃষ্টি (Hypermetropia) ত্রুটি সংশোধনে ব্যবহৃত হয়।
  • অবতল লেন্স: হ্রস্বদৃষ্টি (Myopia) ত্রুটি সংশোধনের জন্য চশমায় এবং গ্যালিলিওর দূরবীক্ষণ যন্ত্রে ব্যবহৃত হয়।

লেন্সের কার্যকারিতা এবং প্রতিবিম্ব গঠনের ধারণাটি আমাদের প্রাকৃতিক আলোকীয় যন্ত্র, অর্থাৎ মানুষের চোখের গঠন ও কার্যপ্রণালী বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৫. মানুষের চোখ এবং দৃষ্টির ত্রুটি (The Human Eye and Defects of Vision)

মানুষের চোখ একটি অত্যন্ত জটিল এবং নিখুঁত প্রাকৃতিক আলোকীয় যন্ত্র, যা একটি ক্যামেরার মতো কাজ করে। চোখের ভেতরে থাকা উত্তল লেন্সটি বাইরের বস্তু থেকে আসা আলোর প্রতিসরণ ঘটিয়ে রেটিনার উপর একটি সদ ও অবশীর্ষ প্রতিবিম্ব তৈরি করে। এই প্রতিবিম্বের সংকেত অপটিক্যাল নার্ভের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছালে আমরা বস্তুটি সোজা দেখতে পাই। তবে অনেক সময় চোখের লেন্স বা অক্ষিগোলকের গঠনে কিছু অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়, যার ফলে দৃষ্টিজনিত ত্রুটি সৃষ্টি হয়।

একটি সুস্থ স্বাভাবিক চোখ অসীম দূরত্বের বস্তু থেকে শুরু করে একটি নির্দিষ্ট নিকটতম দূরত্ব পর্যন্ত সমস্ত বস্তুকে স্পষ্টভাবে দেখতে পায়। চোখের সাপেক্ষে সবচেয়ে দূরের যে বিন্দু পর্যন্ত বস্তু স্পষ্টভাবে দেখা যায়, তাকে দূরবিন্দু (Far Point) বলে। সুস্থ চোখের দূরবিন্দু অসীমে অবস্থিত। আবার, চোখের সবচেয়ে কাছে যে বিন্দু পর্যন্ত কোনো বস্তুকে বিনা কষ্টে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, তাকে নিকটবিন্দু (Near Point) বলে। সুস্থ মানুষের জন্য এই নিকটবিন্দু চোখ থেকে প্রায় 25 সেমি দূরে অবস্থিত। দৃষ্টির ত্রুটি ঘটলে এই বিন্দু দুটির অবস্থান পরিবর্তিত হয়।

দৃষ্টির ত্রুটি এবং তার প্রতিকার

দৃষ্টির দুটি সাধারণ ত্রুটি হলো মায়োপিয়া এবং হাইপারমেট্রোপিয়া। নিচে এদের কারণ ও প্রতিকার আলোচনা করা হলো:

ত্রুটির নাম

কারণ

প্রতিকার

মায়োপিয়া বা হ্রস্বদৃষ্টি (Myopia)

১. অক্ষিগোলকের আকার স্বাভাবিকের চেয়ে বড় হয়ে গেলে।<br>২. চোখের লেন্সের ফোকাস দূরত্ব কমে গেলে।<br>এই কারণে দূরবর্তী বস্তু থেকে আসা আলোকরশ্মি রেটিনার সামনে ফোকাস হয়, ফলে দূরের জিনিস ঝাপসা দেখায়।

উপযুক্ত ফোকাস দূরত্বের অবতল লেন্স (Concave Lens) যুক্ত চশমা ব্যবহার করা হয়। এই লেন্স আলোকরশ্মিকে কিছুটা অপসারী করে দেয়, ফলে প্রতিবিম্বটি সঠিকভাবে রেটিনার উপর গঠিত হয়।

হাইপারমেট্রোপিয়া বা দীর্ঘদৃষ্টি (Hypermetropia)

১. অক্ষিগোলকের আকার স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট হয়ে গেলে।<br>২. চোখের লেন্সের ফোকাস দূরত্ব বেড়ে গেলে।<br>এই কারণে কাছের বস্তু থেকে আসা আলোকরশ্মি রেটিনার পিছনে ফোকাস হয়, ফলে কাছের জিনিস দেখতে অসুবিধা হয়।

উপযুক্ত ফোকাস দূরত্বের উত্তল লেন্স (Convex Lens) যুক্ত চশমা ব্যবহার করা হয়। এই লেন্স আলোকরশ্মিকে অভিসারী করে, যার ফলে প্রতিবিম্বটি এগিয়ে এসে রেটিনার উপর গঠিত হয়।

চোখের গঠন এবং দৃষ্টির ত্রুটি বোঝার পর আলোর আরও দুটি আকর্ষণীয় ঘটনা—বিচ্ছুরণ ও বিক্ষেপণ—বিশ্লেষণ করা যাক, যা আমাদের পৃথিবীকে রঙিন করে তুলেছে।

৬. আলোর বিচ্ছুরণ ও বিক্ষেপণ (Dispersion and Scattering of Light)

আলোর প্রতিফলন বা প্রতিসরণের পাশাপাশি আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ঘটনা হলো বিচ্ছুরণ এবং বিক্ষেপণ। রামধনু থেকে শুরু করে আকাশের নীল রঙ পর্যন্ত প্রকৃতির अनेक রঙিন দৃশ্যের পিছনে এই দুটি ঘটনাই দায়ী। এই ঘটনা দুটি ব্যাখ্যা করে কিভাবে সাদা আলো বিভিন্ন রঙে বিভক্ত হয় এবং বায়ুমণ্ডলের কণার সাথে আলোর মিথস্ক্রিয়া ঘটে।

আলোর বিচ্ছুরণ (Dispersion)

সাদা আলো বা অন্য কোনো যৌগিক আলো যখন প্রিজমের মতো কোনো প্রতিসারক মাধ্যমের মধ্যে দিয়ে যায়, তখন তা বিশ্লিষ্ট হয়ে একাধিক মূল বর্ণে বিভক্ত হয়ে যায়। আলোর এই ভেঙে যাওয়ার ঘটনাকে বিচ্ছুরণ বলে। সাদা আলো সাতটি রঙের সমষ্টি, যা বেনীআসহকলা (VIBGYOR) নামে পরিচিত: বেগুনি (Violet), নীল (Indigo), আকাশী (Blue), সবুজ (Green), হলুদ (Yellow), কমলা (Orange) এবং লাল (Red)।

বিচ্ছুরণের কারণ: কোনো স্বচ্ছ মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন রঙের আলোর বেগ ভিন্ন ভিন্ন হয়। ফলে, ওই মাধ্যমের প্রতিসরাঙ্কও প্রতিটি রঙের জন্য আলাদা হয়। যেহেতু চ্যুতি কোণ প্রতিসরাঙ্কের উপর নির্ভরশীল, তাই বিভিন্ন রঙের আলোর চ্যুতিও ভিন্ন হয়। কাঁচের মতো মাধ্যমে বেগুনি আলোর বেগ সবচেয়ে কম, তাই এর প্রতিসরাঙ্ক ও চ্যুতি সর্বাধিক। অন্যদিকে, লাল আলোর বেগ সবচেয়ে বেশি, তাই এর প্রতিসরাঙ্ক ও চ্যুতি সর্বনিম্ন।

আলোর বিক্ষেপণ (Scattering)

আলোকরশ্মি যখন বায়ুমণ্ডলের মধ্যে দিয়ে আসে, তখন ধূলিকণা বা গ্যাসের অণুর মতো ক্ষুদ্র কণার উপর আপতিত হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনাকে আলোর বিক্ষেপণ বলে। বিক্ষিপ্ত আলোর তীব্রতা আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য এবং কণার আকারের উপর নির্ভর করে।

র‍্যালের সূত্র (Rayleigh’s Law): এই সূত্র অনুযায়ী, বিক্ষিপ্ত আলোর তীব্রতা (I) তার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের (λ) চতুর্থ ঘাতের সঙ্গে ব্যস্তানুপাতিক। গাণিতিকভাবে, I ∝ 1/λ⁴

এই সূত্র থেকে বোঝা যায় যে, কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো (যেমন বেগুনি ও নীল) বেশি বিক্ষিপ্ত হয় এবং বেশি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো (যেমন লাল) কম বিক্ষিপ্ত হয়। এর ভিত্তিতে কিছু প্রাকৃতিক ঘটনা ব্যাখ্যা করা যায়:

  • আকাশের নীল রঙ: দিনের বেলায় সূর্যরশ্মি বায়ুমণ্ডলের মধ্যে দিয়ে আসার সময় কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বেগুনি ও নীল আলো সবচেয়ে বেশি বিক্ষিপ্ত হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের চোখ নীল আলোর প্রতি বেশি সংবেদনশীল হওয়ায় আমরা আকাশকে নীল দেখি।
  • সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় আকাশের লাল রঙ: সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় সূর্য দিগন্তের কাছে থাকে, ফলে সূর্যরশ্মিকে বায়ুমণ্ডলের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়। এই দীর্ঘ পথে আসার সময় নীল ও বেগুনি আলো প্রায় পুরোটাই বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। শুধুমাত্র দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের লাল ও কমলা আলো সরাসরি আমাদের চোখে এসে পৌঁছায়, তাই আকাশকে লাল দেখায়।

৭. সারসংক্ষেপ এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি

এই আলোচনায় আমরা আলোর বিভিন্ন মৌলিক ধর্ম এবং তাদের প্রয়োগ সম্পর্কে বিস্তারিত জেনেছি। আলোর প্রতিফলন ও প্রতিসরণের সূত্রাবলী থেকে শুরু করে গোলীয় দর্পণ ও লেন্স দ্বারা প্রতিবিম্ব গঠন, মানুষের চোখের কার্যকারিতা এবং দৃষ্টির ত্রুটি পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ই ভৌত বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিশেষে, আলোর বিচ্ছুরণ ও বিক্ষেপণের মতো প্রাকৃতিক ঘটনাগুলি আমাদের চারপাশের জগতের রঙিন রূপের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান করে।

মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য শিক্ষার্থীদের নিম্নলিখিত বিষয়গুলির উপর বিশেষভাবে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে:

  • সূত্রাবলী: আলোর প্রতিফলন এবং প্রতিসরণের দুটি করে সূত্র ভালোভাবে বোঝা ও মনে রাখা। স্নেলের সূত্র এবং র‍্যালের বিক্ষেপণ সূত্রটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
  • রেখাচিত্র: অবতল দর্পণ এবং উত্তল লেন্স দ্বারা প্রতিবিম্ব গঠনের ছয়টি অবস্থার রেখাচিত্র অনুশীলন করা আবশ্যক। প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিবিম্বের অবস্থান, প্রকৃতি ও আকার নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করতে হবে।
  • পার্থক্য: সদবিম্ব ও অসদবিম্ব, উত্তল ও অবতল দর্পণ/লেন্স এবং মায়োপিয়া ও হাইপারমেট্রোপিয়ার মধ্যেকার পার্থক্যগুলি সারণি আকারে প্রস্তুত করা যেতে পারে।
  • গাণিতিক সমস্যা: ফোকাস দূরত্ব ও বক্রতা ব্যাসার্ধের সম্পর্ক (f=r/2) এবং রৈখিক বিবর্ধনের সূত্র (m = v/u) ব্যবহার করে ছোট ছোট গাণিতিক সমস্যার সমাধান অনুশীলন করা উচিত।
  • ধারণাভিত্তিক প্রশ্ন: আকাশের রঙ নীল কেন, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় আকাশ লাল দেখায় কেন—এই ধরনের ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নগুলির উত্তর ভালোভাবে প্রস্তুত করতে হবে।
  • ব্যবহারিক প্রয়োগ: দৈনন্দিন জীবনে দর্পণ ও লেন্সের ব্যবহারগুলি (যেমন: গাড়ির ভিউফাইন্ডার, দন্তচিকিৎসা, চশমা) মনে রাখা প্রয়োজন।

গোলীয় দর্পণে প্রতিবিম্ব গঠন নীতিমালা: একটি অপটিক্যাল ডিজাইন হ্যান্ডবুক

এই হ্যান্ডবুকটি অপটিক্যাল ডিজাইনারদের জন্য একটি ব্যবহারিক এবং পেশাদার নির্দেশিকা হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো অবতল এবং উত্তল গোলীয় দর্পণে প্রতিবিম্ব গঠনের নীতিমালার একটি দ্রুত রেফারেন্স গাইড হিসেবে কাজ করা। এই দর্পণগুলো বহু অপটিক্যাল সিস্টেমের মৌলিক উপাদান, এবং এদের কার্যকারিতা বোঝা যেকোনো সফল ডিজাইনের জন্য অপরিহার্য।

1.0 আলোর প্রতিফলনের মৌলিক নীতি (Fundamental Principles of Light Reflection)

আলোর প্রতিফলনের মৌলিক সূত্রাবলী বোঝা যেকোনো দর্পণ-ভিত্তিক অপটিক্যাল সিস্টেমের ডিজাইন এবং বিশ্লেষণের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নীতিগুলোই হলো সেই ভিত্তি যার উপর ভিত্তি করে সমস্ত নকশা এবং গণনা তৈরি করা হয়। এই নীতিগুলি আয়ত্ত করতে ব্যর্থ হলে ডিজাইনে গুরুতর ত্রুটি দেখা দিতে পারে।

প্রতিফলনের সূত্রাবলী (Laws of Reflection)

আলোর প্রতিফলন দুটি সুনির্দিষ্ট এবং অপরিবর্তনীয় সূত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়:

  1. প্রথম সূত্র: আপতিত রশ্মি (incident ray), প্রতিফলিত রশ্মি (reflected ray) এবং আপতন বিন্দুতে প্রতিফলকের ওপর অঙ্কিত অভিলম্ব (normal) সর্বদা একই সমতলে অবস্থান করে।
  2. দ্বিতীয় সূত্র: আপতন কোণ (∠i) এবং প্রতিফলন কোণ (∠r) এর মান সর্বদা সমান হয়।

প্রতিবিম্বের প্রকারভেদ (Types of Images)

প্রতিফলনের ফলে গঠিত প্রতিবিম্বের প্রকৃতি বোঝা একটি সিস্টেমের কার্যকারিতা নির্ধারণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবিম্ব প্রধানত দুই প্রকার: সদবিম্ব এবং অসদবিম্ব। এদের মধ্যে মূল পার্থক্য নিচে তুলে ধরা হলো।

প্রতিবিম্বের প্রকার (Image Type)

গঠন প্রক্রিয়া (Formation Process)

সদবিম্ব (Real Image)

কোনো বিন্দু উৎস থেকে আগত আলোকরশ্মিগুচ্ছ প্রতিফলন বা প্রতিসরণের পর যদি প্রকৃতপক্ষে অন্য কোনো বিন্দুতে মিলিত হয়, তবে সেই বিন্দুতে একটি সদবিম্ব গঠিত হয়। গুরুত্বপূর্ণভাবে, সদবিম্ব পর্দায় ফেলা যায়, যা প্রজেক্টর এবং ক্যামেরা সেন্সরের মতো সিস্টেম ডিজাইনের জন্য অপরিহার্য।

অসদবিম্ব (Virtual Image)

কোনো বিন্দু উৎস থেকে আগত আলোকরশ্মিগুচ্ছ প্রতিফলন বা প্রতিসরণের পর যদি অন্য কোনো বিন্দু থেকে অপসৃত হচ্ছে বলে মনে হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মিলিত হয় না, তবে সেই বিন্দুতে একটি অসদবিম্ব গঠিত হয়। বিপরীতে, অসদবিম্ব পর্দায় গঠন করা যায় না এবং শুধুমাত্র কোনো অপটিক্যাল সিস্টেমের মাধ্যমে সরাসরি দেখলে অনুভূত হয়, যেমন আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখা।

এই সাধারণ নীতিগুলো সমতল দর্পণের জন্য সহজবোধ্য হলেও, গোলীয় বা বক্র দর্পণের ক্ষেত্রে এদের প্রয়োগ আরও জটিল এবং বৈচিত্র্যময় ফলাফল প্রদান করে।

2.0 গোলীয় দর্পণের গঠন ও পরিভাষা (Anatomy and Terminology of Spherical Mirrors)

অপটিক্যাল ডিজাইনে নির্ভুলতা এবং পেশাদার যোগাযোগের জন্য একটি প্রমিত পরিভাষা অপরিহার্য। এই বিভাগে গোলীয় দর্পণের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং জ্যামিতিক পরামিতিগুলো সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যা যেকোনো বিশ্লেষণ বা নকশার ভিত্তি স্থাপন করে।

  • মেরু (Pole, P): গোলীয় দর্পণের প্রতিফলক তলের মধ্যবিন্দুকে দর্পণের মেরু বলা হয়। এটি দর্পণের জ্যামিতিক কেন্দ্র এবং সকল অক্ষীয় দূরত্ব পরিমাপের মূল বিন্দু (origin) হিসেবে কাজ করে।
  • বক্রতা কেন্দ্র (Center of Curvature, C): গোলীয় দর্পণটি যে গোলকের অংশ, সেই গোলকের কেন্দ্রকে ওই দর্পণের বক্রতা কেন্দ্র বলা হয়। দর্পণের বক্রতা নির্ধারণে এই বিন্দুর অবস্থান প্রধান ভূমিকা পালন করে।
  • বক্রতা ব্যাসার্ধ (Radius of Curvature, R): গোলীয় দর্পণটি যে গোলকের অংশ, সেই গোলকের ব্যাসার্ধকে দর্পণের বক্রতা ব্যাসার্ধ বলা হয়। এই প্যারামিটারটি সরাসরি দর্পণের ফোকাস দৈর্ঘ্য এবং বিবর্ধন ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে।
  • প্রধান অক্ষ (Principal Axis): দর্পণের মেরু এবং বক্রতা কেন্দ্রের মধ্যে দিয়ে অঙ্কিত সরলরেখাকে প্রধান অক্ষ বলা হয়। ডিজাইনের ক্ষেত্রে, এটি হলো প্রধান ডেটাম বা রেফারেন্স লাইন, যার সাপেক্ষে সমস্ত অপটিক্যাল গণনা এবং রশ্মিচিত্র বিশ্লেষণ করা হয়।
  • মুখ্য ফোকাস (Principal Focus, F): এই বিন্দুর সংজ্ঞা দর্পণের ধরনের উপর নির্ভর করে:
    • অবতল দর্পণের (Concave Mirror) ক্ষেত্রে, প্রধান অক্ষের সমান্তরাল আলোকরশ্মিগুচ্ছ প্রতিফলনের পর প্রধান অক্ষের উপর যে নির্দিষ্ট বিন্দুতে মিলিত হয়, তাকে মুখ্য ফোকাস বলে।
    • উত্তল দর্পণের (Convex Mirror) ক্ষেত্রে, প্রধান অক্ষের সমান্তরাল আলোকরশ্মিগুচ্ছ প্রতিফলনের পর প্রধান অক্ষের উপর অবস্থিত একটি নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে অপসৃত হচ্ছে বলে মনে হয়, সেই বিন্দুটিকে মুখ্য ফোকাস বলে।
  • ফোকাস দৈর্ঘ্য (Focal Length, f): দর্পণের মেরু থেকে মুখ্য ফোকাস পর্যন্ত দূরত্বকে ফোকাস দৈর্ঘ্য বলা হয়। এটি একটি দর্পণের আলোক শক্তি (converging or diverging power) পরিমাপের সবচেয়ে মৌলিক প্যারামিটার।

ফোকাস দৈর্ঘ্য (f) এবং বক্রতা ব্যাসার্ধ (r) এর মধ্যে একটি মৌলিক সম্পর্ক বিদ্যমান, যা নিম্নোক্ত সূত্র দ্বারা প্রকাশ করা হয়: f = r/2

দর্পণের এই স্থির গঠন বোঝার পর, পরবর্তী ধাপে আমরা দেখব কীভাবে আলোকরশ্মি এই বক্র তলের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে, যা রশ্মিচিত্র অঙ্কনের নিয়ম দ্বারা পরিচালিত হয়।

3.0 গোলীয় দর্পণে রশ্মিচিত্র অঙ্কনের নিয়মাবলী (Rules for Ray Tracing in Spherical Mirrors)

রশ্মিচিত্র অঙ্কন বা রে ট্রেসিং একটি মৌলিক গ্রাফিক্যাল পদ্ধতি যা ডিজাইনাররা একটি প্রতিবিম্বের অবস্থান, আকার এবং প্রকৃতি ভবিষ্যদ্বাণী এবং যাচাই করার জন্য ব্যবহার করেন। এই পদ্ধতিটি কয়েকটি অপরিহার্য নিয়মের উপর ভিত্তি করে তৈরি, যা আলোকরশ্মির পথ নির্ভুলভাবে চিত্রিত করতে সহায়তা করে। এই বিভাগে অবতল এবং উত্তল উভয় দর্পণের জন্য রশ্মিচিত্র নির্মাণের নিয়মগুলি বিশদভাবে আলোচনা করা হলো।

অবতল দর্পণে প্রতিবিম্ব গঠনের জন্য নিম্নলিখিত তিনটি প্রধান নিয়ম অনুসরণ করা হয়:

  1. প্রধান অক্ষের সমান্তরাল রশ্মি: যে আলোকরশ্মি প্রধান অক্ষের সমান্তরালভাবে এসে দর্পণে আপতিত হয়, প্রতিফলনের পর সেই রশ্মি মুখ্য ফোকাসের (F) মধ্য দিয়ে যায়।
  2. মুখ্য ফোকাসের মধ্য দিয়ে যাওয়া রশ্মি: যে আলোকরশ্মি মুখ্য ফোকাসের মধ্য দিয়ে গিয়ে দর্পণে আপতিত হয়, প্রতিফলনের পর তা প্রধান অক্ষের সমান্তরাল হয়ে ফিরে আসে।
  3. বক্রতা কেন্দ্রের মধ্য দিয়ে যাওয়া রশ্মি: যে আলোকরশ্মি বক্রতা কেন্দ্রের (C) মধ্য দিয়ে গিয়ে দর্পণে আপতিত হয়, প্রতিফলনের পর তা একই পথে ফিরে আসে।

এই নিয়মগুলি আয়ত্ত করা পরবর্তী বিভাগগুলিতে আলোচিত বিস্তারিত প্রতিবিম্ব গঠন বিশ্লেষণের জন্য একটি পূর্বশর্ত।

4.0 অবতল দর্পণ দ্বারা প্রতিবিম্ব গঠন: একটি বিশদ বিশ্লেষণ (Image Formation by Concave Mirror: A Detailed Analysis)

অবতল দর্পণের বহুমুখিতা এটিকে অপটিক্যাল ডিজাইনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান করে তুলেছে। বস্তুর অবস্থানের পরিবর্তনের সাথে সাথে এটি সদ, অসদ, বিবর্ধিত এবং ক্ষুদ্র—এই সব ধরনের প্রতিবিম্ব তৈরি করতে সক্ষম। এই বৈশিষ্ট্যই অবতল দর্পণকে অসংখ্য উন্নত অপটিক্যাল সিস্টেমে একটি নমনীয় এবং শক্তিশালী উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। নিচে বস্তুর বিভিন্ন অবস্থানের জন্য প্রতিবিম্বের বৈশিষ্ট্যগুলো সারণিতে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।

বস্তুর অবস্থান (Object Position)

প্রতিবিম্বের অবস্থান (Image Position)

প্রতিবিম্বের বৈশিষ্ট্য (Nature and Size)

অসীমে (At infinity)

ফোকাসে (At the principal focus, F)

সদ ও অবশীর্ষ, অতি ক্ষুদ্র

বক্রতা কেন্দ্রের বাইরে (Beyond C)

ফোকাস ও বক্রতা কেন্দ্রের মাঝে (Between F and C)

সদ ও অবশীর্ষ, বস্তুর চেয়ে ক্ষুদ্র

বক্রতা কেন্দ্রে (At C)

বক্রতা কেন্দ্রে (At the center of curvature, C)

সদ ও অবশীর্ষ, বস্তুর সমান আকারের

বক্রতা কেন্দ্র ও ফোকাসের মাঝে (Between C and F)

বক্রতা কেন্দ্রের বাইরে (Beyond C)

সদ ও অবশীর্ষ, বিবর্ধিত

ফোকাসে (At the principal focus, F)

অসীমে (At infinity)

সদ ও অবশীর্ষ, বহু বিবর্ধিত

ফোকাস ও মেরুর মাঝে (Between F and the Pole, P)

দর্পণের পেছনে, বস্তু যেদিকে অবস্থিত

অসদ ও সমশীর্ষ, বিবর্ধিত

অবতল দর্পণের এই বৈচিত্র্যময় আউটপুটের বিপরীতে, উত্তল দর্পণ একটি সুসংগত এবং অনুমানযোগ্য প্রতিবিম্ব গঠন করে, যা পরবর্তী বিভাগে আলোচিত হয়েছে।

5.0 উত্তল দর্পণ দ্বারা প্রতিবিম্ব গঠন: একটি বিশদ বিশ্লেষণ (Image Formation by Convex Mirror: A Detailed Analysis)

উত্তল দর্পণের প্রধান কৌশলগত কাজ হলো এর প্রশস্ত দৃষ্টি ক্ষেত্র (wider field of view) প্রদান করার ক্ষমতা। এর উত্তল পৃষ্ঠ আপতিত সমান্তরাল রশ্মিগুচ্ছকে অপসারী করে, যার ফলে রশ্মিগুলো দর্পণের পেছনের মুখ্য ফোকাস (virtual focus) থেকে আসছে বলে মনে হয়। এর ফলে, বস্তুর অবস্থান নির্বিশেষে সর্বদা একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অনুমানযোগ্য বৈশিষ্ট্যযুক্ত প্রতিবিম্ব গঠিত হয়, যা এটিকে নির্দিষ্ট কিছু প্রয়োগের জন্য অপরিহার্য করে তোলে।

বস্তুর অবস্থান (Object Position)

প্রতিবিম্বের অবস্থান (Image Position)

প্রতিবিম্বের বৈশিষ্ট্য (Nature and Size)

অসীমে (At infinity)

দর্পণের পেছনে ফোকাসে (At F, behind the mirror)

অসদ ও সমশীর্ষ, অতি ক্ষুদ্র (বিন্দু সদৃশ)

দর্পণের সামনে যে কোনো দূরত্বে (At any finite distance)

দর্পণের পেছনে মেরু ও ফোকাসের মাঝে (Between P and F, behind the mirror)

অসদ ও সমশীর্ষ, ক্ষুদ্রতর

এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ থেকে আমরা দেখতে পাই যে উত্তল দর্পণ সর্বদা একটি ক্ষুদ্র, সমশীর্ষ এবং অসদবিম্ব গঠন করে। হ্যান্ডবুকের পরবর্তী অংশে এই অপটিক্যাল উপাদানগুলির বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

6.0 প্রযুক্তিগত প্রয়োগ এবং ব্যবহার (Technical Applications and Uses)

পূর্ববর্তী বিভাগগুলিতে আলোচিত অবতল এবং উত্তল দর্পণের স্বতন্ত্র অপটিক্যাল বৈশিষ্ট্যগুলি সরাসরি এদের বিভিন্ন প্রযুক্তিগত, শিল্প এবং দৈনন্দিন জীবনে ব্যাপক ব্যবহারের দিকে পরিচালিত করে। প্রতিটি দর্পণের নির্দিষ্ট প্রতিবিম্ব গঠনের ক্ষমতা নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধানে কাজে লাগে, যা আধুনিক প্রযুক্তিতে এদের অপরিহার্য করে তুলেছে।

অবতল দর্পণের ব্যবহার (Uses of Concave Mirrors)

  • টর্চ, সার্চলাইট, ও গাড়ির হেডলাইট: এই অ্যাপ্লিকেশনগুলিতে, আলোর উৎসকে দর্পণের ফোকাসে রাখা হয়। এর ফলে প্রতিফলিত রশ্মিগুলি একটি শক্তিশালী, সমান্তরাল রশ্মিগুচ্ছে পরিণত হয়, যা অনেক দূরে আলো পাঠাতে পারে।
  • দন্তচিকিৎসা: এই ক্ষেত্রে বস্তুটিকে (দাঁত) ফোকাস ও মেরুর মাঝে রাখা হয় (Case 4.0, Row 6), যার ফলে একটি বিবর্ধিত, সমশীর্ষ ও অসদবিম্ব গঠিত হয় যা সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে সহায়তা করে।
  • দাড়ি কামানোর বা মেক-আপের আয়না: এই ক্ষেত্রে বস্তুটিকে (মুখ) ফোকাস ও মেরুর মাঝে রাখা হয় (Case 4.0, Row 6), যার ফলে একটি বিবর্ধিত, সমশীর্ষ ও অসদবিম্ব গঠিত হয় যা সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে সহায়তা করে।

উত্তল দর্পণের ব্যবহার (Uses of Convex Mirrors)

  • যানবাহনে রিয়ার-ভিউ মিরর: উত্তল দর্পণ চালককে একটি প্রশস্ত দৃষ্টি ক্ষেত্র প্রদান করে, যার ফলে গাড়ির পেছনের একটি বড় এলাকা দেখা যায়। যদিও প্রতিবিম্বটি ছোট হয়, তবে এটি নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
  • স্ট্রিট ল্যাম্পের প্রতিফলক: এই দর্পণ আলোকে একটি বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে দিতে বা অপসারী করতে ব্যবহৃত হয়, যার ফলে রাস্তার μεγαλύτε অংশ আলোকিত হয়।

এই হ্যান্ডবুকের চূড়ান্ত সারসংক্ষেপ হলো, গোলীয় দর্পণের এই মৌলিক নীতিগুলির একটি শক্তিশালী উপলব্ধি আধুনিক অপটিক্যাল প্রযুক্তির কার্যকর ডিজাইন, উদ্ভাবন এবং প্রয়োগের জন্য অপরিহার্য।

অবতল এবং উত্তল দর্পণের তুলনামূলক বিশ্লেষণ: একটি সম্পূর্ণ নির্দেশিকা

ভূমিকা: গোলীয় দর্পণের জগত

দশম শ্রেণীর ভৌতবিজ্ঞানের একটি অত্যন্ত মজার অধ্যায় হলো আলো, আর সেই আলোর দুনিয়ায় গোলীয় দর্পণ এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।

যখন আলোক রশ্মি কোনো স্বচ্ছ সমসত্ত্ব মাধ্যম থেকে এসে অন্য কোনো মাধ্যমের বিভেদতলে আপতিত হয়ে দিক পরিবর্তন করে আবার প্রথম মাধ্যমেই ফিরে যায়, তখন এই ঘটনাকে আলোর প্রতিফলন (Reflection) বলা হয়। যে রশ্মিটি দর্পণে এসে পড়ে তাকে আপতিত রশ্মি, এবং দর্পণ থেকে প্রতিফলিত হয়ে যে রশ্মিটি ফিরে যায় তাকে প্রতিফলিত রশ্মি বলে। আপতন বিন্দুতে প্রতিফলক তলের ওপর অঙ্কিত লম্বকে অভিলম্ব বলা হয়।

এই প্রতিফলনের ধারণাকে ব্যবহার করে তৈরি একটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র হলো গোলীয় দর্পণ (Spherical Mirror)। এই দর্পণগুলো মূলত একটি ফাঁপা গোলকের অংশবিশেষ। গোলকের কোন অংশটি প্রতিফলক তল হিসেবে কাজ করছে, তার উপর ভিত্তি করে গোলীয় দর্পণ দুই প্রকারের হয়—অবতল দর্পণ (Concave Mirror) এবং উত্তল দর্পণ (Convex Mirror)

এই নির্দেশিকাটি আপনাকে অবতল এবং উত্তল দর্পণের মধ্যে মূল পার্থক্যগুলো সহজভাবে বুঝতে সাহায্য করবে এবং এদের বৈশিষ্ট্যগুলো মনে রেখে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করবে। চলো, এই দর্পণগুলোর চরিত্র বোঝার আগে এদের সঙ্গে জড়িত কয়েকটি জরুরি শব্দের সাথে পরিচয় করে নিই, অনেকটা নতুন বন্ধু চেনার মতো!

——————————————————————————–

১. গোলীয় দর্পণের মৌলিক পরিভাষা: একটি সাধারণ ভিত্তি

যেকোনো গোলীয় দর্পণ বোঝার জন্য কিছু মৌলিক পরিভাষা জানা আবশ্যক। এই পরিভাষাগুলো অবতল এবং উত্তল উভয় দর্পণের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যা এদের তুলনার জন্য একটি সাধারণ ভিত্তি তৈরি করে।

পরিভাষা (চিহ্ন)

সংজ্ঞা

মেরু (Pole) (P)

গোলীয় দর্পণের প্রতিফলক তলের মধ্যবিন্দুকে দর্পণের মেরু বলা হয়।

বক্রতা কেন্দ্র (Center of Curvature) (C)

গোলীয় দর্পণটি যে গোলকের অংশ, সেই গোলকের কেন্দ্রকে ওই দর্পণের বক্রতা কেন্দ্র বলে।

বক্রতা ব্যাসার্ধ (Radius of Curvature) (r)

গোলীয় দর্পণটি যে গোলকের অংশ, তার ব্যাসার্ধকে দর্পণের বক্রতা ব্যাসার্ধ বলে। এটি মেরু (P) থেকে বক্রতা কেন্দ্র (C) পর্যন্ত দূরত্ব।

প্রধান অক্ষ (Principal Axis)

গোলীয় দর্পণের বক্রতা কেন্দ্র এবং মেরুর মধ্যে দিয়ে অঙ্কিত সরলরেখাকে ওই দর্পণের প্রধান অক্ষ বলা হয়।

মুখ্য ফোকাস (Principal Focus) (F)

প্রধান অক্ষের সমান্তরাল আলোকরশ্মিগুচ্ছ গোলীয় দর্পণে প্রতিফলিত হওয়ার পর প্রধান অক্ষের উপর একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে মিলিত হয় (অবতল দর্পণে) বা একটি নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে আসছে বলে মনে হয় (উত্তল দর্পণে), সেই বিন্দুটিকে দর্পণের মুখ্য ফোকাস বলে।

ফোকাস দৈর্ঘ্য (Focal Length) (f)

দর্পণের মেরু (P) থেকে মুখ্য ফোকাস (F) পর্যন্ত দূরত্বকে ফোকাস দৈর্ঘ্য বলা হয়।

গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক: গোলীয় দর্পণের বক্রতা ব্যাসার্ধ (r) এবং ফোকাস দৈর্ঘ্যের (f) মধ্যে একটি সরল গাণিতিক সম্পর্ক বিদ্যমান: f = r/2

এই সম্পর্কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এর মাধ্যমে আমরা শুধুমাত্র দর্পণের জ্যামিতিক গঠন (অর্থাৎ, এটি কতটা বাঁকানো) জেনেই তার আলোকরশ্মিকে কেন্দ্রীভূত করার ক্ষমতা (ফোকাস দৈর্ঘ্য) নির্ভুলভাবে নির্ণয় করতে পারি।

এই সাধারণ ভিত্তিটি জানার পর, এবার আমরা দেখব কীভাবে এই দুই দর্পণ আলোকরশ্মির সাথে ভিন্ন আচরণ করে, যা তাদের মধ্যে মূল পার্থক্য তৈরি করে।

——————————————————————————–

২. মূল পার্থক্য: আলোকরশ্মির আচরণ

অবতল এবং উত্তল দর্পণের প্রধান পার্থক্য তাদের প্রতিফলক তলের আকৃতি এবং তার ফলে আলোকরশ্মির উপর তাদের ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব।

  1. অবতল দর্পণ: অভিসারী প্রকৃতি অবতল দর্পণের ভেতরের পৃষ্ঠটি প্রতিফলক তল হিসেবে কাজ করে, যা ভিতরের দিকে বাঁকানো থাকে। প্রধান অক্ষের সমান্তরাল আলোকরশ্মিগুচ্ছ এই দর্পণে আপতিত হলে, প্রতিফলনের পর রশ্মিগুলো একটি বিন্দুতে এসে মিলিত হয়। এই বিন্দুটিই হলো মুখ্য ফোকাস (F)। যেহেতু অবতল দর্পণ সমান্তরাল রশ্মিগুচ্ছকে একটি বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত বা অভিসারী (Converge) করে, তাই একে অভিসারী দর্পণ (Converging Mirror) বলা হয়।
  2. উত্তল দর্পণ: অপসারী প্রকৃতি উত্তল দর্পণের বাইরের ফোলা অংশটি প্রতিফলক তল হিসেবে কাজ করে। প্রধান অক্ষের সমান্তরাল আলোকরশ্মিগুচ্ছ এই দর্পণে আপতিত হলে, প্রতিফলনের পর রশ্মিগুলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে বা অপসারী (Diverge) হয়ে যায়। এই প্রতিফলিত রশ্মিগুলোকে পেছন দিকে বাড়ালে মনে হয় যেন রশ্মিগুলো দর্পণের পেছনে থাকা মুখ্য ফোকাস (F) থেকে আসছে বা অপসৃত হচ্ছে। এই অপসারী প্রকৃতির জন্যই উত্তল দর্পণকে অপসারী দর্পণ (Diverging Mirror) বলা হয়।

অন্তর্দৃষ্টি: দর্পণের এই অভিসারী (converging) এবং অপসারী (diverging) প্রকৃতিই হলো সবচেয়ে মৌলিক পার্থক্য, যা তাদের দ্বারা গঠিত প্রতিবিম্বের ধরন, আকার এবং অবস্থানে বিশাল ভিন্নতা নিয়ে আসে।

কিন্তু বস্তুর বিভিন্ন অবস্থানের জন্য প্রতিবিম্বের উপর এর প্রভাব কেমন হয়?

——————————————————————————–

৩. প্রতিবিম্ব গঠন: বিস্তারিত তুলনামূলক আলোচনা

দর্পণের সামনে কোনো বস্তু রাখলে তার প্রতিবিম্ব গঠিত হয়। এই প্রতিবিম্বের বৈশিষ্ট্যগুলো (অবস্থান, আকার, প্রকৃতি) বস্তুর অবস্থান এবং দর্পণের প্রকারের উপর নির্ভর করে। প্রতিবিম্ব দুই প্রকারের হতে পারে:

  • সদবিম্ব (Real Image): যখন কোনো বিন্দু থেকে আসা আলোকরশ্মি প্রতিফলনের পর 실제로 অন্য কোনো বিন্দুতে মিলিত হয়, তখন সদবিম্ব গঠিত হয়। একে পর্দায় ধরা যায়।
  • অসদবিম্ব (Virtual Image): যখন কোনো বিন্দু থেকে আসা আলোকরশ্মি প্রতিফলনের পর অন্য কোনো বিন্দু থেকে অপসৃত হচ্ছে বলে মনে হয়, তখন অসদবিম্ব গঠিত হয়। একে পর্দায় ধরা যায় না।

নিচের সারণিতে বস্তুর বিভিন্ন অবস্থানের জন্য অবতল এবং উত্তল দর্পণ দ্বারা গঠিত প্রতিবিম্বের বৈশিষ্ট্য তুলনা করা হলো:

বস্তুর অবস্থান (Position of Object)

অবতল দর্পণ দ্বারা গঠিত প্রতিবিম্ব (Image by Concave Mirror)

উত্তল দর্পণ দ্বারা গঠিত প্রতিবিম্ব (Image by Convex Mirror)

অসীমে (At Infinity)

অবস্থান: ফোকাসে (F) <br> আকার: অত্যন্ত ক্ষুদ্র (বিন্দুর মতো) <br> প্রকৃতি: সদ ও অবশীর্ষ

অবস্থান: দর্পণের পেছনে, ফোকাসে (F) <br> আকার: অত্যন্ত ক্ষুদ্র (বিন্দুর মতো) <br> প্রকৃতি: অসদ ও সমশীর্ষ

বক্রতা কেন্দ্রের বাইরে (Beyond C)

অবস্থান: ফোকাস (F) ও বক্রতা কেন্দ্র (C)-এর মধ্যে <br> আকার: ক্ষুদ্র <br> প্রকৃতি: সদ ও অবশীর্ষ

অবস্থান: দর্পণের পেছনে, মেরু (P) ও ফোকাস (F)-এর মধ্যে <br> আকার: ক্ষুদ্র <br> প্রকৃতি: অসদ ও সমশীর্ষ

বক্রতা কেন্দ্রে (At C)

অবস্থান: বক্রতা কেন্দ্রে (C) <br> আকার: বস্তুর সমান <br> প্রকৃতি: সদ ও অবশীর্ষ

অবস্থান: দর্পণের পেছনে, মেরু (P) ও ফোকাস (F)-এর মধ্যে <br> আকার: ক্ষুদ্র <br> প্রকৃতি: অসদ ও সমশীর্ষ

C এবং F-এর মধ্যে (Between C & F)

অবস্থান: বক্রতা কেন্দ্রের বাইরে <br> আকার: বিবর্ধিত <br> প্রকৃতি: সদ ও অবশীর্ষ

অবস্থান: দর্পণের পেছনে, মেরু (P) ও ফোকাস (F)-এর মধ্যে <br> আকার: ক্ষুদ্র <br> প্রকৃতি: অসদ ও সমশীর্ষ

ফোকাসে (At F)

অবস্থান: অসীমে <br> আকার: অত্যন্ত বিবর্ধিত <br> প্রকৃতি: সদ ও অবশীর্ষ

অবস্থান: দর্পণের পেছনে, মেরু (P) ও ফোকাস (F)-এর মধ্যে <br> আকার: ক্ষুদ্র <br> প্রকৃতি: অসদ ও সমশীর্ষ

F এবং P-এর মধ্যে (Between F & P)

অবস্থান: দর্পণের পেছনে <br> আকার: বিবর্ধিত <br> প্রকৃতি: অসদ ও সমশীর্ষ

অবস্থান: দর্পণের পেছনে, মেরু (P) ও ফোকাস (F)-এর মধ্যে <br> আকার: ক্ষুদ্র <br> প্রকৃতি: অসদ ও সমশীর্ষ

মূল সংশ্লেষণ

উপরের টেবিল থেকে দুটি প্রধান সিদ্ধান্তে আসা যায়:

  • অবতল দর্পণ: বস্তুর অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে এটি সদ এবং অসদ উভয় প্রকার প্রতিবিম্ব গঠন করতে পারে। প্রতিবিম্বের আকার বস্তুর চেয়ে ক্ষুদ্র, সমান বা বিবর্ধিত হতে পারে। এটি অনেক বেশি বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রতিবিম্ব তৈরি করে।
  • উত্তল দর্পণ: এটি বস্তুর অবস্থান নির্বিশেষে সর্বদা একটি অসদ, সমশীর্ষ এবং ক্ষুদ্র প্রতিবিম্ব গঠন করে।

প্রতিবিম্বের এই ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যই ঠিক করে দেয় যে বাস্তব জীবনে কোন দর্পণ কী কাজে লাগবে। চলো, এবার সেটাই দেখে নেওয়া যাক।

——————————————————————————–

৪. ব্যবহারিক প্রয়োগ: বাস্তব জীবনে দর্পণের ব্যবহার

দর্পণের এই ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যগুলো বোঝার ফলে আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এদের ব্যবহারিক প্রয়োগগুলো আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারি।

অবতল দর্পণের ব্যবহার

  • দন্তচিকিৎসা এবং শেভিং/মেকআপ: দন্তচিকিৎসকরা দাঁতের বিবর্ধিত প্রতিবিম্ব দেখার জন্য অবতল দর্পণ ব্যবহার করেন। একইভাবে, শেভিং বা মেকআপের জন্য ব্যবহৃত আয়নায় মুখমণ্ডলকে ফোকাস ও মেরুর মধ্যে রাখা হয়।
    • কারণ: যখন বস্তু ফোকাস ও মেরুর মধ্যে থাকে, তখন অবতল দর্পণ একটি বিবর্ধিত, সোজা ও অসদ প্রতিবিম্ব গঠন করে, যা সূক্ষ্ম কাজ করতে সাহায্য করে।
  • টর্চ, সার্চলাইট এবং গাড়ির হেডলাইট: এই যন্ত্রগুলিতে আলোর উৎসটিকে অবতল প্রতিফলকের ফোকাসে রাখা হয়।
    • কারণ: ফোকাসে রাখা উৎস থেকে আলোকরশ্মি প্রতিফলিত হওয়ার পর একটি শক্তিশালী ও সমান্তরাল রশ্মিগুচ্ছে পরিণত হয়, যা আলোকে অনেক দূরে পাঠাতে সাহায্য করে।

উত্তল দর্পণের ব্যবহার

  • গাড়ির রিয়ার-ভিউ মিরর (Viewfinder): মোটরগাড়ি, বাস বা মোটরসাইকেলে চালকের পাশে যে আয়না থাকে, তা সাধারণত উত্তল দর্পণ হয়।
    • কারণ: এটি সর্বদা বস্তুর একটি সোজা এবং ছোট প্রতিবিম্ব গঠন করে, ফলে চালক পেছনের যানবাহনকে সঠিকভাবে দেখতে পান। এর প্রশস্ত দৃষ্টিক্ষেত্র (Wide Field of View) থাকে, যা চালককে পেছনের একটি বৃহৎ এলাকা দেখতে সাহায্য করে।
  • স্ট্রিট ল্যাম্পের প্রতিফলক: রাস্তার বাতিগুলিতে প্রতিফলক হিসেবে উত্তল দর্পণ ব্যবহার করা হয়।
    • কারণ: এর অপসারী প্রকৃতির জন্য এটি বাতির আলোকে একটি বৃহৎ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে দিতে পারে, ফলে রাস্তার বেশি অংশ আলোকিত হয়।

এতক্ষণ আমরা যা শিখলাম, তা এক নজরে দেখে নেওয়া যাক যাতে মূল পার্থক্যগুলো সহজেই মনে থাকে।

——————————————————————————–

৫. চূড়ান্ত সারসংক্ষেপ: এক নজরে মূল পার্থক্য

শিক্ষার্থীদের দ্রুত পুনরালোচনা এবং সহজে মনে রাখার জন্য নিচে অবতল ও উত্তল দর্পণের মূল পার্থক্যগুলো একটি সংক্ষিপ্ত সারণিতে তুলে ধরা হলো:

বৈশিষ্ট্য (Feature)

অবতল দর্পণ (Concave Mirror)

উত্তল দর্পণ (Convex Mirror)

প্রতিফলক তল (Reflecting Surface)

ভিতরের দিকে বাঁকানো

বাইরের দিকে ফোলা

প্রকৃতি (Nature)

অভিসারী (Converging)

অপসারী (Diverging)

ফোকাস (Focus)

সদ (Real)

অসদ (Virtual)

প্রতিবিম্বের ধরন (Type of Image)

সদ ও অবশীর্ষ (কেবলমাত্র বস্তু F ও P-এর মধ্যে থাকলে অসদ ও সমশীর্ষ)

সর্বদা অসদ ও সমশীর্ষ

প্রতিবিম্বের আকার (Size of Image)

বিবর্ধিত, ক্ষুদ্র বা সমান আকারের হতে পারে

সর্বদা ক্ষুদ্র

প্রধান ব্যবহার (Primary Use)

বিবর্ধন, শক্তিশালী রশ্মিগুচ্ছ তৈরি

প্রশস্ত দৃশ্যপট দেখা

দশম শ্রেণীর ভৌত বিজ্ঞান: আলো (আলোর প্রতিফলন ও প্রতিসরণ)

ভৌত বিজ্ঞানের অন্যতম আকর্ষণীয় অধ্যায় হলো আলো। আমাদের চারপাশের জগৎকে দেখতে, বুঝতে এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিগত উন্নয়নে আলোর ভূমিকা অপরিসীম। এই অধ্যায়ে আমরা আলোর দুটি মৌলিক ধর্ম—প্রতিফলন ও প্রতিসরণ—নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শুরু করব, যার প্রথম পর্বে থাকছে আলোর প্রতিফলন এবং গোলীয় দর্পণ।

ভূমিকা: আলোর প্রতিফলন

যখন আলোক রশ্মি কোনো সমসত্ত্ব স্বচ্ছ মাধ্যমের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় অন্য কোনো মাধ্যমের বিভেদতলে আপতিত হয়ে দিক পরিবর্তন করে পুনরায় প্রথম মাধ্যমেই ফিরে আসে, তখন সেই ঘটনাকে আলোর প্রতিফলন বলা হয়।

প্রতিফলনের ঘটনাটি বোঝার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জেনে নেওয়া প্রয়োজন:

  • আপতিত রশ্মি (AO): যে আলোক রশ্মি প্রতিফলক তলের ওপর এসে পড়ে।
  • প্রতিফলিত রশ্মি (OB): প্রতিফলক তল থেকে দিক পরিবর্তন করে যে রশ্মি ফিরে যায়।
  • আপতন কোণ (∠i): আপতিত রশ্মি ও অভিলম্বের মধ্যবর্তী কোণ।
  • প্রতিফলন কোণ (∠r): প্রতিফলিত রশ্মি ও অভিলম্বের মধ্যবর্তী কোণ।
  • অভিলম্ব (ON): আপতন বিন্দুতে প্রতিফলক তলের ওপর অঙ্কিত লম্ব।

আলোর প্রতিফলন দুটি নির্দিষ্ট সূত্র মেনে চলে। এই সূত্র দুটি হলো:

  1. আপতিত রশ্মি, প্রতিফলিত রশ্মি এবং আপতন বিন্দুতে প্রতিফলকের ওপর অঙ্কিত অভিলম্ব সর্বদা একই সমতলে থাকে।
  2. আপতন কোণ ও প্রতিফলন কোণের মান পরস্পর সমান হয় (∠i = ∠r)।

আলো প্রতিফলিত হয়ে কীভাবে কোনো বস্তুর প্রতিবিম্ব গঠন করে, তা এবার আমরা জানব।

প্রতিবিম্ব: সদ ও অসদ

প্রতিফলন বা প্রতিসরণের পর রশ্মিগুলো যেভাবে মিলিত হয় বা মিলিত হচ্ছে বলে মনে হয়, তার ওপর ভিত্তি করে প্রতিবিম্ব দুই প্রকারের হয়—সদবিম্ব ও অসদবিম্ব।

বৈশিষ্ট্য

সদবিম্ব (Real Image)

অসদবিম্ব (Virtual Image)

সংজ্ঞা

কোনো বিন্দু উৎস থেকে আগত আলোক রশ্মিগুচ্ছ প্রতিফলিত বা প্রতিসৃত হওয়ার পর যদি সত্যি সত্যি অন্য কোনো বিন্দুতে মিলিত হয়, তবে ওই দ্বিতীয় বিন্দুতে উৎসটির সদবিম্ব গঠিত হয়।

কোনো বিন্দু উৎস থেকে আগত আলোক রশ্মিগুচ্ছ প্রতিফলিত বা প্রতিসৃত হওয়ার পর যদি অন্য কোনো বিন্দু থেকে অপসৃত হচ্ছে বলে মনে হয়, তবে ওই দ্বিতীয় বিন্দুতে উৎসটির অসদবিম্ব গঠিত হয়।

গঠন

রশ্মিগুচ্ছ প্রকৃতপক্ষে মিলিত হয়ে গঠিত হয়।

রশ্মিগুচ্ছ মিলিত হচ্ছে বলে মনে হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মিলিত হয় না।

এই প্রতিবিম্বগুলো সাধারণত দর্পণ বা লেন্সের মতো আলোকীয় যন্ত্রের মাধ্যমে গঠিত হয়। চলো, আমরা গোলীয় দর্পণ সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই।

পর্ব ১: গোলীয় দর্পণে আলোর প্রতিফলন

১. গোলীয় দর্পণের পরিচিতি

যে দর্পণের প্রতিফলক তল কোনো গোলকের অংশবিশেষ, তাকে গোলীয় দর্পণ (Spherical Mirror) বলে। গোলীয় দর্পণ প্রধানত দুই প্রকারের:

  • অবতল দর্পণ (Concave Mirror): এই দর্পণের ভেতরের অবতল বা নিচু অংশটি প্রতিফলক তল হিসেবে কাজ করে।
  • উত্তল দর্পণ (Convex Mirror): এই দর্পণের বাইরের উত্তল বা উঁচু অংশটি প্রতিফলক তল হিসেবে কাজ করে।

গোলীয় দর্পণের গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা

গোলীয় দর্পণ সংক্রান্ত আলোচনা বোঝার জন্য কয়েকটি সংজ্ঞা জানা আবশ্যক:

  • মেরু (Pole, P): গোলীয় দর্পণের প্রতিফলক তলের মধ্যবিন্দুকে মেরু বলে।
  • বক্রতা কেন্দ্র (Center of Curvature, C): গোলীয় দর্পণটি যে গোলকের অংশ, সেই গোলকের কেন্দ্রকে দর্পণের বক্রতা কেন্দ্র বলে।
  • বক্রতা ব্যাসার্ধ (Radius of Curvature, R): গোলীয় দর্পণটি যে গোলকের অংশ, সেই গোলকের ব্যাসার্ধকে বক্রতা ব্যাসার্ধ বলে। দর্পণের ক্ষেত্রে, এটি মেরু (P) এবং বক্রতা কেন্দ্রের (C) মধ্যবর্তী সরলরৈখিক দূরত্ব (অর্থাৎ, R = CP)।
  • প্রধান অক্ষ (Principal Axis): দর্পণের মেরু ও বক্রতা কেন্দ্রের মধ্যে দিয়ে অঙ্কিত সরলরেখাকে প্রধান অক্ষ বলে।
  • মুখ্য ফোকাস (Principal Focus, F):
    • অবতল দর্পণের ক্ষেত্রে: প্রধান অক্ষের সমান্তরাল রশ্মিগুচ্ছ প্রতিফলনের পর প্রধান অক্ষের ওপর একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে মিলিত হয়। এই বিন্দুটি হলো অবতল দর্পণের মুখ্য ফোকাস।
    • উত্তল দর্পণের ক্ষেত্রে: প্রধান অক্ষের সমান্তরাল রশ্মিগুচ্ছ প্রতিফলনের পর প্রধান অক্ষের ওপর অবস্থিত একটি নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে অপসৃত হচ্ছে বলে মনে হয়। এই বিন্দুটি হলো উত্তল দর্পণের মুখ্য ফোকাস।
  • ফোকাস দৈর্ঘ্য (Focal Length, f): দর্পণের মেরু থেকে মুখ্য ফোকাসের দূরত্বকে ফোকাস দৈর্ঘ্য বলে।
  • ফোকাস তল (Focal Plane): মুখ্য ফোকাসের মধ্যে দিয়ে প্রধান অক্ষের সঙ্গে লম্বভাবে অবস্থিত তলকে ফোকাস তল বলে।

বক্রতা ব্যাসার্ধ (R) এবং ফোকাস দৈর্ঘ্যের (f) মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্কটি হলো: f = R/2

উল্লেখ্য, বক্রতা ব্যাসার্ধকে অনেক সময় ‘r’ এবং ফোকাস দৈর্ঘ্যকে ‘F’ দ্বারাও প্রকাশ করা হয়।

যেহেতু অবতল দর্পণ সমান্তরাল রশ্মিগুচ্ছকে একটি বিন্দুতে মিলিত করে, তাই একে অভিসারী দর্পণ (Converging Mirror) বলা হয়। অন্যদিকে, উত্তল দর্পণ সমান্তরাল রশ্মিগুচ্ছকে অপসৃত করে, তাই একে অপসারী দর্পণ (Diverging Mirror) বলা হয়।

এই দর্পণগুলিতে প্রতিবিম্ব ঠিক কোথায় এবং কেমনভাবে গঠিত হবে তা সঠিকভাবে জানার জন্য আমাদের কয়েকটি রশ্মিচিত্র অঙ্কনের নিয়ম শিখতে হবে। এই নিয়মগুলি জানা থাকলে যেকোনো বস্তুর প্রতিবিম্ব আঁকা খুব সহজ হয়ে যায়।

২. গোলীয় দর্পণে প্রতিবিম্ব অঙ্কনের নিয়মাবলী

কোনো বস্তুর প্রতিবিম্বের অবস্থান নির্ণয়ের জন্য বস্তু থেকে আগত অন্তত দুটি প্রতিফলিত রশ্মির ছেদবিন্দু নির্ণয় করতে হয়। রশ্মিচিত্র অঙ্কনের জন্য সাধারণত তিনটি নিয়ম অনুসরণ করা হয়:

  1. প্রধান অক্ষের সমান্তরাল রশ্মি: প্রধান অক্ষের সমান্তরালভাবে আপতিত রশ্মি প্রতিফলনের পর অবতল দর্পণের ক্ষেত্রে মুখ্য ফোকাস (F) দিয়ে যায় এবং উত্তল দর্পণের ক্ষেত্রে মুখ্য ফোকাস থেকে অপসৃত হচ্ছে বলে মনে হয়।
  2. বক্রতা কেন্দ্রগামী রশ্মি: বক্রতা কেন্দ্র (C) দিয়ে গমনকারী রশ্মি দর্পণের ওপর লম্বভাবে আপতিত হয় এবং প্রতিফলনের পর একই পথে ফিরে আসে।
  3. মুখ্য ফোকাসগামী রশ্মি: মুখ্য ফোকাস (F) দিয়ে গমনকারী রশ্মি (অবতল দর্পণে) বা মুখ্য ফোকাসের দিকে আপতিত রশ্মি (উত্তল দর্পণে) প্রতিফলনের পর প্রধান অক্ষের সমান্তরাল হয়ে যায়।

৩. অবতল দর্পণে প্রতিবিম্ব গঠন

নিচের সারণিতে বস্তুর ছয়টি ভিন্ন অবস্থানের জন্য অবতল দর্পণে গঠিত প্রতিবিম্বের বৈশিষ্ট্যগুলি তুলে ধরা হলো। প্রতিটি ক্ষেত্র ভালোভাবে লক্ষ্য করো, কারণ এখান থেকে পরীক্ষায় প্রশ্ন আসে।

বস্তুর অবস্থান

প্রতিবিম্বের অবস্থান

প্রতিবিম্বের প্রকৃতি

প্রতিবিম্বের আকার

অসীমে

ফোকাসে (F)

সদ ও অবশীর্ষ

অত্যন্ত ক্ষুদ্র

বক্রতা কেন্দ্রের বাইরে

ফোকাস (F) ও বক্রতা কেন্দ্রের (C) মধ্যে

সদ ও অবশীর্ষ

ক্ষুদ্র

বক্রতা কেন্দ্রে (C)

বক্রতা কেন্দ্রে (C)

সদ ও অবশীর্ষ

বস্তুর সমান

বক্রতা কেন্দ্র (C) ও ফোকাসের (F) মধ্যে

বক্রতা কেন্দ্রের বাইরে

সদ ও অবশীর্ষ

বিবর্ধিত

ফোকাসে (F)

অসীমে

সদ ও অবশীর্ষ

অত্যন্ত বিবর্ধিত

ফোকাস (F) ও মেরুর (P) মধ্যে

দর্পণের পিছনে

অসদ ও সমশীর্ষ

বিবর্ধিত

৪. উত্তল দর্পণে প্রতিবিম্ব গঠন

অবতল দর্পণের তুলনায় উত্তল দর্পণে প্রতিবিম্ব গঠন অনেক সহজ, কারণ বস্তুর অবস্থান যাই হোক না কেন, প্রতিবিম্বের প্রকৃতি প্রায় একই থাকে।

বস্তুর অবস্থান

প্রতিবিম্বের অবস্থান

প্রতিবিম্বের প্রকৃতি

প্রতিবিম্বের আকার

অসীমে

দর্পণের পেছনে ফোকাসে (F)

অসদ ও সমশীর্ষ

অত্যন্ত ক্ষুদ্র (বিন্দু সদৃশ)

দর্পণের সামনে যেকোনো দূরত্বে

দর্পণের পেছনে মেরু (P) ও ফোকাসের (F) মধ্যে

অসদ ও সমশীর্ষ

খর্বকায়

৫. গোলীয় দর্পণের বাস্তব প্রয়োগ

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এবং প্রযুক্তিতে গোলীয় দর্পণের বহুবিধ ব্যবহার রয়েছে।

  • অবতল দর্পণের ব্যবহার:
    • টর্চ, সার্চলাইট এবং গাড়ির হেডলাইটে শক্তিশালী সমান্তরাল রশ্মিগুচ্ছ তৈরির জন্য প্রতিফলক রূপে।
    • দন্তচিকিৎসকরা দাঁতের বিবর্ধিত প্রতিবিম্ব দেখার জন্য এটি ব্যবহার করেন।
    • দাড়ি কামানোর আয়না (shaving mirror) হিসেবে মুখের বড় ও সোজা প্রতিবিম্ব পাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়।
  • উত্তল দর্পণের ব্যবহার:
    • গাড়ি, বাস বা মোটরসাইকেলের রিয়ার-ভিউ মিরর (rear-view mirror) হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কারণ এটি চালককে বিস্তৃত দৃষ্টি ক্ষেত্র (wider field of view) প্রদান করে এবং বস্তুর সোজা ও ছোট প্রতিবিম্ব গঠন করে।
    • রাস্তার মোড়ে বা দোকানে নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের জন্য এবং স্ট্রিট লাইটের প্রতিফলক হিসেবে আলোর প্রসারণের জন্য ব্যবহৃত হয়।

আলোর প্রতিফলন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার পর, আমরা পরবর্তী অংশে আলোর অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্ম—প্রতিসরণ—নিয়ে আলোচনা করব।

দশম শ্রেণী ভৌত বিজ্ঞান: আলো (Light) – পূর্ণাঙ্গ আলোচনা ও প্রস্তুতি সহায়িকা

এই সহায়িকাটি দশম শ্রেণীর ভৌত বিজ্ঞানের ‘আলো’ অধ্যায়ের একটি বিশদ বিশ্লেষণ। এখানে আলোর প্রতিফলন, প্রতিসরণ, গোলীয় দর্পণ এবং লেন্স সম্পর্কিত মূল ধারণা, সূত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে, যা পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং বিষয়বস্তু অনুধাবনে শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক হবে।

আলোর প্রতিফলন (Reflection of Light)

যখন কোনো আলোক রশ্মি একটি স্বচ্ছ সমসত্ত্ব মাধ্যম থেকে অন্য কোনো মাধ্যমের বিভেদতলে আপতিত হয় এবং দিক পরিবর্তন করে আবার প্রথম মাধ্যমেই ফিরে আসে, তখন এই ঘটনাকে আলোর প্রতিফলন বলে।

  • আপতিত রশ্মি (AO): যে রশ্মি দর্পণে এসে পড়ে।
  • প্রতিফলিত রশ্মি (OB): যে রশ্মি দর্পণ থেকে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে যায়।
  • অভিলম্ব (ON): আপতন বিন্দুতে প্রতিফলক তলের উপর অঙ্কিত লম্ব।
  • আপতন কোণ (∠i বা ∠AON): আপতিত রশ্মি ও অভিলম্বের মধ্যবর্তী কোণ।
  • প্রতিফলন কোণ (∠r বা ∠BON): প্রতিফলিত রশ্মি ও অভিলম্বের মধ্যবর্তী কোণ।

প্রতিফলনের সূত্র

১. আপতিত রশ্মি, প্রতিফলিত রশ্মি এবং আপতন বিন্দুতে প্রতিফলকের ওপর অঙ্কিত অভিলম্ব সর্বদা একই সমতলে থাকে। ২. আপতন কোণ (∠i) ও প্রতিফলন কোণ (∠r) এর মান পরস্পর সমান হয়। অর্থাৎ, ∠i = ∠r

প্রতিবিম্ব (Image)

প্রতিবিম্ব দুই প্রকারের হয়: সদবিম্ব এবং অসদবিম্ব।

বৈশিষ্ট্য

সদবিম্ব (Real Image)

অসদবিম্ব (Virtual Image)

গঠন

কোনো বিন্দু থেকে আসা আলোক রশ্মিগুচ্ছ প্রতিফলন বা প্রতিসরণের পর যদি সত্যি সত্যি অন্য কোনো নির্দিষ্ট বিন্দুতে মিলিত হয়, তবে সেই বিন্দুতে সদবিম্ব গঠিত হয়।

কোনো বিন্দু থেকে আসা আলোক রশ্মিগুচ্ছ প্রতিফলিত বা প্রতিসৃত হয়ে অন্য কোনো বিন্দু থেকে অপসৃত হচ্ছে বলে মনে হলে, দ্বিতীয় বিন্দুতে প্রথম বিন্দুর অসদবিম্ব গঠিত হয়।

উদাহরণ

অবতল দর্পণ দ্বারা গঠিত সদবিম্ব।

সমতল দর্পণ দ্বারা গঠিত প্রতিবিম্ব।

গোলীয় দর্পণে আলোর প্রতিফলন

গোলীয় দর্পণ হলো কোনো গোলকের অংশবিশেষ, যার একটি পৃষ্ঠ মসৃণ এবং প্রতিফলক হিসেবে কাজ করে। এটি দুই প্রকার: অবতল দর্পণ ও উত্তল দর্পণ।

অবতল দর্পণ (Concave Mirror)

উত্তল দর্পণ (Convex Mirror)

গোলকের ভেতরের অবতল পৃষ্ঠটি প্রতিফলক তল হিসেবে কাজ করে।

গোলকের বাইরের উত্তল পৃষ্ঠটি প্রতিফলক তল হিসেবে কাজ করে।

   

গোলীয় দর্পণ সম্পর্কিত পরিভাষা

  • মেরু (Pole, P): গোলীয় দর্পণের প্রতিফলক তলের মধ্যবিন্দুকে মেরু বলে।
  • বক্রতা কেন্দ্র (Center of Curvature, C): গোলীয় দর্পণ যে গোলকের অংশ, সেই গোলকের কেন্দ্রকে বক্রতা কেন্দ্র বলে।
  • বক্রতা ব্যাসার্ধ (Radius of Curvature, R): দর্পণের মেরু থেকে বক্রতা কেন্দ্রের দূরত্ব।
  • প্রধান অক্ষ (Principal Axis): দর্পণের বক্রতা কেন্দ্র ও মেরুর মধ্যে দিয়ে অঙ্কিত সরলরেখাকে প্রধান অক্ষ বলে।
  • মুখ্য ফোকাস (Principal Focus, F): প্রধান অক্ষের সমান্তরাল রশ্মিগুচ্ছ দর্পণে প্রতিফলিত হওয়ার পর প্রধান অক্ষের উপর যে বিন্দুতে মিলিত হয় (অবতল দর্পণে) বা যে বিন্দু থেকে অপসৃত হচ্ছে বলে মনে হয় (উত্তল দর্পণে), তাকে মুখ্য ফোকাস বলে।
  • ফোকাস দৈর্ঘ্য (Focal Length, f): মেরু থেকে মুখ্য ফোকাসের দূরত্ব। বক্রতা ব্যাসার্ধ ও ফোকাস দৈর্ঘ্যের সম্পর্ক: f = R/2
  • ফোকাস তল (Focal Plane): মুখ্য ফোকাস বিন্দুর মধ্যে দিয়ে এবং প্রধান অক্ষের সাথে লম্বভাবে যে তল কল্পনা করা হয়, তাকে ফোকাস তল বলে।

অভিসারী ও অপসারী দর্পণ

  • অবতল দর্পণ: সমান্তরাল আলোক রশ্মিগুচ্ছকে প্রতিফলনের পর একটি বিন্দুতে মিলিত করে, তাই একে অভিসারী দর্পণ বলে।
  • উত্তল দর্পণ: সমান্তরাল আলোক রশ্মিগুচ্ছকে প্রতিফলনের পর অপসৃত করে, যা একটি বিন্দু থেকে আসছে বলে মনে হয়, তাই একে অপসারী দর্পণ বলে।

গোলীয় দর্পণে প্রতিবিম্ব গঠনের নিয়মাবলী

১. প্রধান অক্ষের সমান্তরাল রশ্মি প্রতিফলনের পর মুখ্য ফোকাস দিয়ে যায় (অবতল) বা মুখ্য ফোকাস থেকে অপসৃত হচ্ছে বলে মনে হয় (উত্তল)। ২. মুখ্য ফোকাসগামী রশ্মি প্রতিফলনের পর প্রধান অক্ষের সমান্তরাল হয়ে যায়। ৩. বক্রতা কেন্দ্রগামী রশ্মি দর্পণে লম্বভাবে আপতিত হওয়ায় প্রতিফলনের পর একই পথে ফিরে আসে। ৪. মেরুতে আপতিত রশ্মির ক্ষেত্রে, আপতন কোণ ও প্রতিফলন কোণ সমান হয়।

অবতল দর্পণ দ্বারা প্রতিবিম্ব গঠন

বস্তুর অবস্থান

প্রতিবিম্বের অবস্থান

প্রতিবিম্বের প্রকৃতি ও আকার

অসীমে (u = ∞)

ফোকাসে (F)

সদ, অবশীর্ষ, অত্যন্ত ক্ষুদ্র (বিন্দু)

বক্রতা কেন্দ্রের বাইরে (∞ > u > 2f)

ফোকাস (F) ও বক্রতা কেন্দ্রের (C) মধ্যে

সদ, অবশীর্ষ, বস্তুর তুলনায় ক্ষুদ্র

বক্রতা কেন্দ্রে (u = 2f)

বক্রতা কেন্দ্রে (C)

সদ, অবশীর্ষ, বস্তুর সমান আকারের

বক্রতা কেন্দ্র (C) ও ফোকাসের (F) মধ্যে (f < u < 2f)

বক্রতা কেন্দ্রের বাইরে

সদ, অবশীর্ষ, বিবর্ধিত (বস্তুর চেয়ে বড়)

ফোকাসে (u = f)

অসীমে

সদ, অবশীর্ষ, অত্যন্ত বিবর্ধিত

ফোকাস (F) ও মেরুর (P) মধ্যে (u < f)

দর্পণের পিছনে

অসদ, সমশীর্ষ, বিবর্ধিত

উত্তল দর্পণ দ্বারা প্রতিবিম্ব গঠন

উত্তল দর্পণে বস্তুর যেকোনো অবস্থানের জন্য প্রতিবিম্ব সর্বদা দর্পণের পিছনে, মেরু (P) ও ফোকাসের (F) মধ্যে গঠিত হয়। প্রতিবিম্বটি সর্বদা অসদ, সমশীর্ষ এবং বস্তুর তুলনায় ক্ষুদ্র হয়।

গোলীয় দর্পণের ব্যবহার

  • উত্তল দর্পণ: মোটর গাড়ি, বাস, লরি ইত্যাদিতে ভিউ-ফাইন্ডার বা রিয়ার-ভিউ মিরর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। রাস্তার বাতিতে (স্ট্রিট ল্যাম্প) প্রতিফলক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
  • অবতল দর্পণ:
    • টর্চ, সার্চলাইট ও গাড়ির হেডলাইটে শক্তিশালী সমান্তরাল রশ্মিগুচ্ছ তৈরি করতে।
    • দন্ত চিকিৎসকরা দাঁত পরীক্ষার জন্য ব্যবহার করেন।
    • দাড়ি কাটার সময় বা মেক-আপের জন্য বিবর্ধিত প্রতিবিম্ব পেতে ব্যবহৃত হয়।

আলোর প্রতিসরণ (Refraction of Light)

আলোক রশ্মি যখন একটি স্বচ্ছ সমসত্ত্ব মাধ্যম থেকে ভিন্ন ঘনত্বের অন্য একটি স্বচ্ছ সমসত্ত্ব মাধ্যমে তির্যকভাবে প্রবেশ করে, তখন দুই মাধ্যমের বিভেদতল থেকে তার গতিপথের পরিবর্তন ঘটে। এই ঘটনাকে আলোর প্রতিসরণ বলে।

  • কারণ: ভিন্ন মাধ্যমে আলোর বেগ ভিন্ন হয়।
  • লঘু মাধ্যম থেকে ঘন মাধ্যমে: আলোক রশ্মি অভিলম্বের দিকে বেঁকে যায় (i > r)।
  • ঘন মাধ্যম থেকে লঘু মাধ্যমে: আলোক রশ্মি অভিলম্ব থেকে দূরে সরে যায় (r > i)।

প্রতিসরণের সূত্র

১. আপতিত রশ্মি, প্রতিসৃত রশ্মি এবং আপতন বিন্দুতে দুই মাধ্যমের বিভেদতলের উপর অঙ্কিত অভিলম্ব একই সমতলে থাকে। ২. স্নেলের সূত্র (Snell’s Law): দুটি নির্দিষ্ট মাধ্যম এবং একটি নির্দিষ্ট বর্ণের আলোর প্রতিসরণের ক্ষেত্রে, আপতন কোণের সাইন (sin i) এবং প্রতিসরণ কোণের সাইনের (sin r) অনুপাত সর্বদা ধ্রুবক থাকে। এই ধ্রুবককে প্রথম মাধ্যমের সাপেক্ষে দ্বিতীয় মাধ্যমের প্রতিসরাঙ্ক (Refractive Index, µ) বলে। sin i / sin r = ধ্রুবক (µ)

প্রতিসরাঙ্ক (Refractive Index)

  • পরম প্রতিসরাঙ্ক: শূন্য মাধ্যমে আলোর বেগ (c) এবং কোনো নির্দিষ্ট মাধ্যমে আলোর বেগের (v) অনুপাতকে ঐ মাধ্যমের পরম প্রতিসরাঙ্ক বলে। µ = c/v
  • আপেক্ষিক প্রতিসরাঙ্ক: প্রথম মাধ্যমে আলোর বেগ (v₁) এবং দ্বিতীয় মাধ্যমে আলোর বেগের (v₂) অনুপাতকে প্রথম মাধ্যমের সাপেক্ষে দ্বিতীয় মাধ্যমের আপেক্ষিক প্রতিসরাঙ্ক বলে। ₁µ₂ = v₁/v₂ = µ₂/µ₁

কাচের স্ল্যাবে আলোর প্রতিসরণ

কাচের স্ল্যাবের মধ্যে দিয়ে প্রতিসরণের পর নির্গত রশ্মি আপতিত রশ্মির সমান্তরাল হয়, কিন্তু কিছুটা পার্শ্বসরণ (Lateral Displacement) ঘটে। লম্ব আপতনের ক্ষেত্রে কোনো চ্যুতি বা পার্শ্বসরণ হয় না।

প্রিজমের মধ্যে দিয়ে আলোর প্রতিসরণ

প্রিজমের মধ্যে দিয়ে আলোকরশ্মি প্রতিসৃত হলে, রশ্মির চ্যুতি ঘটে।

  • চ্যুতি কোণ (δ): δ = i₁ + i₂ - A
    • i₁ = আপতন কোণ
    • i₂ = নির্গমন কোণ
    • A = প্রিজমের প্রতিসারক কোণ

লেন্স (Lens)

দুটি গোলীয় তল অথবা একটি গোলীয় ও একটি সমতল দ্বারা সীমাবদ্ধ স্বচ্ছ প্রতিসারক মাধ্যমকে লেন্স বলে। এটি প্রধানত দুই প্রকার: উত্তল (Convex) ও অবতল (Concave)।

লেন্স সম্পর্কিত পরিভাষা

  • বক্রতা কেন্দ্র (C₁, C₂): লেন্সের তল দুটি যে গোলকের অংশ, তাদের কেন্দ্র।
  • প্রধান অক্ষ: দুটি বক্রতা কেন্দ্রের সংযোগকারী সরলরেখা।
  • আলোককেন্দ্র (Optical Centre, O): লেন্সের প্রধান অক্ষের উপর অবস্থিত একটি বিন্দু, যার মধ্যে দিয়ে গেলে আলোক রশ্মির কোনো চ্যুতি হয় না।
  • মুখ্য ফোকাস (F): প্রধান অক্ষের সমান্তরাল রশ্মি প্রতিসরণের পর যে বিন্দুতে মিলিত হয় (উত্তল লেন্স) বা যে বিন্দু থেকে অপসৃত হচ্ছে বলে মনে হয় (অবতল লেন্স)।

উত্তল লেন্স দ্বারা প্রতিবিম্ব গঠন

বস্তুর অবস্থান

প্রতিবিম্বের অবস্থান

প্রতিবিম্বের প্রকৃতি ও আকার

অসীমে (u = ∞)

ফোকাসে (F₂)

সদ, অবশীর্ষ, অত্যন্ত ক্ষুদ্র

2F₁ এর বাইরে

F₂ ও 2F₂ এর মধ্যে

সদ, অবশীর্ষ, ক্ষুদ্র

2F₁ দূরত্বে

2F₂ দূরত্বে

সদ, অবশীর্ষ, বস্তুর সমান

F₁ ও 2F₁ এর মধ্যে

2F₂ এর বাইরে

সদ, অবশীর্ষ, বিবর্ধিত

ফোকাসে (F₁)

অসীমে

সদ, অবশীর্ষ, অত্যন্ত বিবর্ধিত

ফোকাস (F₁) ও আলোককেন্দ্রের (O) মধ্যে

বস্তুর দিকেই

অসদ, সমশীর্ষ, বিবর্ধিত

অবতল লেন্স দ্বারা প্রতিবিম্ব গঠন

অবতল লেন্সে বস্তুর যেকোনো অবস্থানের জন্য প্রতিবিম্ব সর্বদা বস্তুর দিকে, ফোকাস ও আলোককেন্দ্রের মধ্যে গঠিত হয়। প্রতিবিম্বটি সর্বদা অসদ, সমশীর্ষ এবং বস্তুর তুলনায় ক্ষুদ্র হয়।

রৈখিক বিবর্ধন (Linear Magnification, m)

প্রতিবিম্বের উচ্চতা (h₂) ও বস্তুর উচ্চতার (h₁) অনুপাতকে রৈখিক বিবর্ধন বলে। m = h₂ / h₁ = v / u (যেখানে, v = প্রতিবিম্ব দূরত্ব, u = বস্তু দূরত্ব)

মানুষের চোখ এবং দৃষ্টির ত্রুটি

  • গঠন: মানুষের চোখে একটি উত্তল লেন্স থাকে যা রেটিনার উপর বস্তুর সদ ও অবশীর্ষ প্রতিবিম্ব গঠন করে। মস্তিষ্ক এই প্রতিবিম্বকে সোজা অনুভব করতে সাহায্য করে।
  • নিকট বিন্দু: স্বাভাবিক চোখের সবচেয়ে কাছের যে বিন্দু পর্যন্ত কোনো বস্তু রাখলে স্পষ্ট দেখা যায়, তাকে নিকট বিন্দু বলে। এর দূরত্ব প্রায় 25 cm।
  • দূর বিন্দু: স্বাভাবিক চোখের সবচেয়ে দূরের যে বিন্দু পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যায়, তাকে দূর বিন্দু বলে। এর অবস্থান অসীমে।

দৃষ্টির ত্রুটি ও প্রতিকার

ত্রুটি

হ্রস্বদৃষ্টি (Myopia)

দীর্ঘদৃষ্টি (Hypermetropia)

লক্ষণ

কাছের বস্তু স্পষ্ট দেখা যায়, কিন্তু দূরের বস্তু ঝাপসা দেখায়।

দূরের বস্তু স্পষ্ট দেখা যায়, কিন্তু কাছের বস্তু ঝাপসা দেখায়।

কারণ

অক্ষিগোলকের আকার স্বাভাবিকের চেয়ে বড় হয়ে গেলে বা চোখের লেন্সের ফোকাস দৈর্ঘ্য কমে গেলে, প্রতিবিম্ব রেটিনার সামনে গঠিত হয়।

অক্ষিগোলকের আকার স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট হয়ে গেলে বা চোখের লেন্সের ফোকাস দৈর্ঘ্য বেড়ে গেলে, প্রতিবিম্ব রেটিনার পিছনে গঠিত হয়।

প্রতিকার

উপযুক্ত ফোকাস দৈর্ঘ্যের অবতল লেন্স যুক্ত চশমা ব্যবহার করা হয়।

উপযুক্ত ফোকাস দৈর্ঘ্যের উত্তল লেন্স যুক্ত চশমা ব্যবহার করা হয়।

আলোর বিচ্ছুরণ ও বিক্ষেপণ

আলোর বিচ্ছুরণ (Dispersion of Light)

সাদা আলো বা অন্য কোনো বহুবর্ণী আলো প্রিজমের মতো কোনো প্রতিসারক মাধ্যমের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় তার উপাদান বর্ণগুলিতে বিশ্লিষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে আলোর বিচ্ছুরণ বলে। সাদা আলো সাতটি বর্ণে বিশ্লিষ্ট হয়: বেগুনি (Violet), নীল (Indigo), আকাশী (Blue), সবুজ (Green), হলুদ (Yellow), কমলা (Orange), লাল (Red) (সংক্ষেপে VIBGYOR বা বেনীআসহকলা)।

  • কারণ: কোনো মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের আলোর বেগ ভিন্ন হয়। ফলে, প্রতিসরাঙ্কও ভিন্ন হয় (μ = c/v)।
  • বেগুনি আলোর বেগ সবচেয়ে কম, তাই এর প্রতিসরাঙ্ক ও চ্যুতি সবচেয়ে বেশি।
  • লাল আলোর বেগ সবচেয়ে বেশি, তাই এর প্রতিসরাঙ্ক ও চ্যুতি সবচেয়ে কম।

আলোর বিক্ষেপণ (Scattering of Light)

আলোকরশ্মি যখন বায়ুমণ্ডলের ধূলিকণা বা গ্যাসের অণুর ওপর আপতিত হয়, তখন ওই কণাগুলি আলোকরশ্মি থেকে শক্তি শোষণ করে এবং সেই শক্তিকে চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়। এই ঘটনাকে আলোর বিক্ষেপণ বলে।

  • র‍্যালের সূত্র (Rayleigh’s Law): বিক্ষিপ্ত আলোর তীব্রতা (I) আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের (λ) চতুর্থ ঘাতের সঙ্গে ব্যস্তানুপাতিক। I ∝ 1/λ⁴
  • প্রয়োগ:
    1. আকাশ নীল দেখায় কেন? বেগুনি ও নীল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য কম হওয়ায় এদের বিক্ষেপণ সবচেয়ে বেশি হয়। আমাদের চোখ নীল বর্ণের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হওয়ায় আকাশ নীল দেখায়।
    2. সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় আকাশ লাল দেখায় কেন? এই সময় সূর্যরশ্মিকে বায়ুমণ্ডলের অনেক বেশি পথ অতিক্রম করতে হয়। কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো (নীল, বেগুনি) বিক্ষিপ্ত হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং বেশি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের লাল আলো সরাসরি আমাদের চোখে এসে পৌঁছায়।

——————————————————————————–

গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)

প্রশ্ন ১: দর্পণের ফোকাস দৈর্ঘ্য ও বক্রতা ব্যাসার্ধের মধ্যে সম্পর্ক কী? উত্তর: গোলীয় দর্পণের ফোকাস দৈর্ঘ্য (f) তার বক্রতা ব্যাসার্ধের (R) অর্ধেক হয়। অর্থাৎ, f = R / 2

প্রশ্ন ২: স্নেলের সূত্রটি বিবৃত করো। উত্তর: দুটি নির্দিষ্ট মাধ্যম এবং একটি নির্দিষ্ট বর্ণের আলোর প্রতিসরণের ক্ষেত্রে, আপতন কোণের সাইন (sin i) এবং প্রতিসরণ কোণের সাইনের (sin r) অনুপাত সর্বদা ধ্রুবক থাকে। এই ধ্রুবকটি হলো প্রথম মাধ্যমের সাপেক্ষে দ্বিতীয় মাধ্যমের প্রতিসরাঙ্ক (µ)।

প্রশ্ন ৩: গাড়ির ভিউ-ফাইন্ডার হিসেবে কোন দর্পণ ব্যবহার করা হয় এবং কেন? উত্তর: গাড়ির ভিউ-ফাইন্ডার হিসেবে উত্তল দর্পণ ব্যবহার করা হয়। কারণ উত্তল দর্পণ সর্বদা একটি বিস্তৃত অঞ্চলের বস্তুর অসদ, সমশীর্ষ এবং ক্ষুদ্র প্রতিবিম্ব গঠন করে, ফলে চালক পিছনের একটি বড় এলাকা দেখতে পান।

প্রশ্ন ৪: মায়োপিয়া বা হ্রস্বদৃষ্টির ত্রুটি দূর করতে কোন ধরনের লেন্স ব্যবহার করা হয়? উত্তর: মায়োপিয়া বা হ্রস্বদৃষ্টির ত্রুটি দূর করতে উপযুক্ত ফোকাস দৈর্ঘ্যের অবতল লেন্সযুক্ত চশমা ব্যবহার করা হয়।

প্রশ্ন ৫: দিনের বেলায় আকাশ নীল দেখায় কেন? উত্তর: বায়ুমণ্ডলের ধূলিকণা ও গ্যাসীয় অণু দ্বারা সূর্যরশ্মির বিক্ষেপণ ঘটে। র‍্যালের সূত্র অনুযায়ী, কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোর বিক্ষেপণ বেশি হয়। নীল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য কম হওয়ায় এর বিক্ষেপণ বেশি হয় এবং তা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তাই আকাশ নীল দেখায়।

Loading

Leave a Reply

error: