Skip to content

দশম শ্রেণী ভৌত বিজ্ঞান – তাপের ঘটনাসমূহ (গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা)

heat-1_Sahaj shiksha
YouTube player
YouTube player

তাপের ঘটনাসমূহ: একটি বিস্তৃত আলোচনা

ভূমিকা: তাপ এবং তাপমাত্রার মৌলিক ধারণা

পদার্থবিজ্ঞানের জগতে তাপের ঘটনাসমূহ অনুধাবন করার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ‘তাপ’ (Heat) এবং ‘তাপমাত্রা’ (Temperature)—এই দুটি আপাতদৃষ্টিতে সমার্থক রাশির মধ্যে থাকা সূক্ষ্ম অথচ গভীর পার্থক্যকে উপলব্ধি করা। যদিও দৈনন্দিন ব্যবহারে এই দুটি শব্দ প্রায়শই একই অর্থে ব্যবহৃত হয়, পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এদের সংজ্ঞা, ধর্ম এবং পরিমাপ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই разделе আমরা তাপ ও তাপমাত্রার সুস্পষ্ট পার্থক্য এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করব, যা পরবর্তী বিষয়গুলো বোঝার ভিত্তি স্থাপন করবে।

তাপ (Heat)

তাপমাত্রা (Temperature)

তাপ হলো এক প্রকার শক্তি, যা গ্রহণ করলে বস্তু উত্তপ্ত হয় এবং বর্জন করলে বস্তু শীতল হয়।

তাপমাত্রা হলো বস্তুর এমন এক তাপীয় অবস্থা যা নির্ধারণ করে বস্তুটি অন্য বস্তুর সংস্পর্শে এলে তাপ দেবে না নেবে।

তাপ হলো তাপমাত্রার পরিবর্তনের কারণ

তাপমাত্রা হলো তাপের ফলাফল

SI একক: জুল (Joule)

SI একক: কেলভিন (Kelvin)

CGS একক: ক্যালোরি (Calorie)

CGS একক: ডিগ্রি সেলসিয়াস (°C)

পরিমাপক যন্ত্র: ক্যালোরিমিটার (Calorimeter)

পরিমাপক যন্ত্র: থার্মোমিটার (Thermometer)

মাত্রা: [ML²T⁻²]

মাত্রা: [θ]

সংক্ষেপে, তাপ শক্তি প্রয়োগের ফলে বস্তুর যে তাপীয় অবস্থার পরিবর্তন ঘটে, তাপমাত্রা হলো তার পরিমাপ। এই তাপ প্রয়োগের ফলেই পদার্থে বিভিন্ন লক্ষণীয় পরিবর্তন সাধিত হয়, যা আমরা পরবর্তী অধ্যায়গুলিতে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।

1.0 তাপের প্রভাবে পদার্থের পরিবর্তন

কোনো পদার্থে তাপ প্রয়োগ বা পদার্থ থেকে তাপ অপসারণ করা হলে তার ভৌত এবং রাসায়নিক উভয় প্রকার পরিবর্তন ঘটতে পারে। তাপগতিবিদ্যার আলোচনায় এই পরিবর্তনগুলি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। তাপের প্রভাবে পদার্থের মধ্যে যে প্রধান পরিবর্তনগুলি লক্ষ্য করা যায়, সেগুলি নিম্নরূপ:

  • তাপমাত্রা পরিবর্তন: কোনো বস্তুকে তাপ প্রদান করলে তার তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং বস্তু থেকে তাপ বর্জন করলে তার তাপমাত্রা হ্রাস পায়। এটি তাপের সবচেয়ে সাধারণ এবং প্রত্যক্ষ প্রভাব।
  • প্রসারণ ও সংকোচন: তাপ গ্রহণ করলে কোনো বস্তু প্রসারিত হয় এবং তাপ বর্জন করলে বস্তুটি সংকুচিত হয়।
  • রাসায়নিক পরিবর্তন: অনেক ক্ষেত্রে, তাপ প্রয়োগের ফলে পদার্থের অণুগুলির মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে এবং নতুন পদার্থ সৃষ্টি হয়।

এই পরিবর্তনগুলির মধ্যে, পদার্থের মাত্রাগত পরিবর্তন বা তাপীয় প্রসারণ একটি মৌলিক এবং সর্বত্র পর্যবেক্ষণযোগ্য ঘটনা, যার বিশদ বিশ্লেষণ অপরিহার্য।

2.0 তাপীয় প্রসারণ (Thermal Expansion)

তাপ প্রয়োগের ফলে কোনো বস্তুর আকার বা আয়তনের বৃদ্ধি ঘটার ঘটনাকে পদার্থের তাপীয় প্রসারণ বলা হয়। পদার্থের অবস্থাভেদে (কঠিন, তরল বা গ্যাসীয়) এই প্রসারণের প্রকৃতি ভিন্ন হয়। এই বিভাগে আমরা পদ্ধতিগতভাবে কঠিন, তরল এবং গ্যাসীয় পদার্থের প্রসারণ নিয়ে আলোচনা করব।

তাপীয় প্রসারণের প্রকারভেদ

  • কঠিনের প্রসারণ (Expansion of Solids)
    • দৈর্ঘ্য প্রসারণ (Linear Expansion)
    • ক্ষেত্র প্রসারণ (Superficial Expansion)
    • আয়তন প্রসারণ (Volume Expansion)
  • তরলের প্রসারণ (Expansion of Liquids)
    • আপাত প্রসারণ (Apparent Expansion)
    • প্রকৃত প্রসারণ (Real Expansion)
  • গ্যাসের প্রসারণ (Expansion of Gases)

এখন আমরা কঠিন পদার্থের বিভিন্ন প্রকার তাপীয় প্রসারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানব।

2.1 কঠিন পদার্থের প্রসারণ (Expansion of Solids)

কঠিন পদার্থের একটি নির্দিষ্ট আকার ও আয়তন থাকায় তাপ প্রয়োগে এর দৈর্ঘ্য, ক্ষেত্রফল এবং আয়তন—এই তিন ভাবেই প্রসারণ ঘটে। এই উপ-বিভাগে আমরা প্রতিটি প্রসারণের ধরণ, তাদের নিয়ন্ত্রক নীতি এবং গাণিতিক সূত্রাবলী বিশ্লেষণ করব।

2.1.1 দৈর্ঘ্য প্রসারণ এবং দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক (α)

দৈর্ঘ্য প্রসারণ (Linear Expansion): তাপ প্রয়োগের ফলে কোনো কঠিন পদার্থের একটি নির্দিষ্ট দিকে বা দৈর্ঘ্য বরাবর যে প্রসারণ ঘটে, তাকে কঠিনের দৈর্ঘ্য প্রসারণ বলে।

কোনো দণ্ডের দৈর্ঘ্য প্রসারণ মূলত তিনটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে: দণ্ডের উপাদান, দণ্ডের প্রাথমিক দৈর্ঘ্য এবং উষ্ণতা বৃদ্ধি। গাণিতিকভাবে, যদি t₁ উষ্ণতায় কোনো দণ্ডের দৈর্ঘ্য L₁ হয় এবং t₂ উষ্ণতায় দৈর্ঘ্য বেড়ে L₂ হয়, তবে দৈর্ঘ্যের বৃদ্ধি (L₂ - L₁) নিম্নলিখিত সম্পর্কগুলি মেনে চলে:

  1. দৈর্ঘ্যের বৃদ্ধি প্রাথমিক দৈর্ঘ্যের সমানুপাতিক: (L₂ - L₁) ∝ L₁
  2. দৈর্ঘ্যের বৃদ্ধি উষ্ণতা বৃদ্ধির সমানুপাতিক: (L₂ - L₁) ∝ (t₂ - t₁)

এই সম্পর্ক দুটিকে একত্রিত করে আমরা পাই: (L₂ - L₁) = α * L₁ * (t₂ - t₁) এখানে α হলো একটি সমানুপাতিক ধ্রুবক, যা দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক নামে পরিচিত।

সুতরাং, অন্তিম দৈর্ঘ্যের সূত্রটি হলো: L₂ = L₁[1 + α(t₂ - t₁)]

দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক (α): একক দৈর্ঘ্যের কোনো দণ্ডের উষ্ণতা প্রতি একক বৃদ্ধি করলে দণ্ডটির যে পরিমাণ দৈর্ঘ্য প্রসারণ হয়, তাকে ওই পদার্থের দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক (α) বলে। এর গাণিতিক রূপ: α = (L₂ - L₁) / (L₁ * (t₂ - t₁))

α-এর বৈশিষ্ট্য:

  • মাত্রা: [θ⁻¹]
  • SI একক: K⁻¹
  • CGS একক: °C⁻¹
  • স্কেল রূপান্তর: ফারেনহাইট (α_F) ও সেলসিয়াস (α_C) স্কেলে এর সম্পর্ক হলো: α_F = (5/9)α_C

2.1.2 ক্ষেত্র প্রসারণ এবং ক্ষেত্র প্রসারণ গুণাঙ্ক (β)

ক্ষেত্র প্রসারণ (Superficial Expansion): তাপ প্রয়োগের ফলে কোনো কঠিন পদার্থের পাতলা পাতের ক্ষেত্রফল বরাবর যে প্রসারণ ঘটে, তাকে ক্ষেত্র প্রসারণ বলে।

এই প্রসারণ পদার্থের উপাদান, পাতের প্রাথমিক ক্ষেত্রফল (S₁) এবং উষ্ণতা বৃদ্ধির (t₂ - t₁) উপর নির্ভরশীল। গাণিতিকভাবে, ক্ষেত্রফলের বৃদ্ধি (S₂ - S₁) নিম্নলিখিত সম্পর্কগুলি মেনে চলে: (S₂ - S₁) ∝ S₁ এবং (S₂ - S₁) ∝ (t₂ - t₁). এই সম্পর্ক দুটিকে একত্রিত করে আমরা পাই: (S₂ - S₁) = β * S₁ * (t₂ - t₁) এখানে β হলো ক্ষেত্র প্রসারণ গুণাঙ্ক

সুতরাং, অন্তিম ক্ষেত্রফলের সূত্রটি হলো: S₂ = S₁[1 + β(t₂ - t₁)]

ক্ষেত্র প্রসারণ গুণাঙ্ক (β): একক ক্ষেত্রফল বিশিষ্ট কোনো পাতের উষ্ণতা প্রতি একক বৃদ্ধি করলে পাতটির যে পরিমাণ ক্ষেত্র প্রসারণ হয়, তাকে ওই পদার্থের ক্ষেত্র প্রসারণ গুণাঙ্ক (β) বলে। এর গাণিতিক রূপ: β = (S₂ - S₁) / (S₁ * (t₂ - t₁))

β-এর বৈশিষ্ট্য:

  • মাত্রা: [θ⁻¹]
  • SI একক: K⁻¹
  • CGS একক: °C⁻¹
  • স্কেল রূপান্তর: ফারেনহাইট (β_F) ও সেলসিয়াস (β_C) স্কেলে এর সম্পর্ক হলো: β_F = (5/9)β_C

2.1.3 আয়তন প্রসারণ এবং আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক (γ)

আয়তন প্রসারণ (Volume Expansion): তাপ প্রয়োগের ফলে কোনো কঠিন বস্তুর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা অর্থাৎ আয়তনের যে প্রসারণ হয়, তাকে আয়তন প্রসারণ বলে।

এই প্রসারণ বস্তুর উপাদান, প্রাথমিক আয়তন (v₁) এবং উষ্ণতা বৃদ্ধির (t₂ - t₁) উপর নির্ভরশীল। গাণিতিকভাবে, আয়তনের বৃদ্ধি (v₂ - v₁) নিম্নলিখিত সম্পর্কগুলি মেনে চলে: (v₂ - v₁) ∝ v₁ এবং (v₂ - v₁) ∝ (t₂ - t₁). এই সম্পর্ক দুটিকে একত্রিত করে আমরা পাই: (v₂ - v₁) = γ * v₁ * (t₂ - t₁) এখানে γ হলো আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক

এখান থেকে অন্তিম আয়তনের সূত্রটি দাঁড়ায়: v₂ = v₁[1 + γ(t₂ - t₁)]

আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক (γ): একক আয়তন বিশিষ্ট কোনো বস্তুর উষ্ণতা প্রতি একক বৃদ্ধি করলে বস্তুটির যে পরিমাণ আয়তন প্রসারণ হয়, তাকে ওই পদার্থের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক (γ) বলে। এর গাণিতিক রূপ: γ = (v₂ - v₁) / (v₁ * (t₂ - t₁))

γ-এর বৈশিষ্ট্য:

  • মাত্রা: [θ⁻¹]
  • SI একক: K⁻¹
  • CGS একক: °C⁻¹
  • স্কেল রূপান্তর: ফারেনহাইট (γ_F) ও সেলসিয়াস (γ_C) স্কেলে এর সম্পর্ক হলো: γ_F = (5/9)γ_C

2.1.4 প্রসারণ গুণাঙ্কগুলির মধ্যে সম্পর্ক

কোনো একটি নির্দিষ্ট কঠিন পদার্থের জন্য দৈর্ঘ্য, ক্ষেত্র এবং আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্কগুলির মধ্যে একটি সরল গাণিতিক সম্পর্ক বিদ্যমান। এই সম্পর্কটি যৌক্তিক, কারণ ক্ষেত্র প্রসারণ দুটি দিকে (দৈর্ঘ্যের বর্গ হিসাবে) এবং আয়তন প্রসারণ তিনটি দিকে (দৈর্ঘ্যের ঘনক হিসাবে) ঘটে থাকে।

  • অনুপাত হিসেবে: α : β : γ = 1 : 2 : 3
  • সমীকরণ হিসেবে: β = 2α এবং γ = 3α

কঠিন পদার্থের প্রসারণের এই আলোচনা শেষে আমরা এখন তরল পদার্থের প্রসারণের অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলির দিকে নজর দেব।

2.2 তরল পদার্থের প্রসারণ (Expansion of Liquids)

কঠিন পদার্থের মতো তরলের নিজস্ব কোনো আকার না থাকায় এর কেবল আয়তন প্রসারণ বিবেচনা করা হয়। তবে তরলের প্রসারণ পরিমাপের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তরলকে যে পাত্রে রেখে উত্তপ্ত করা হয়, সেই পাত্রটিও তাপের প্রভাবে প্রসারিত হয়। এই কারণে তরলের প্রসারণ দুই প্রকারের হয়—আপাত প্রসারণ এবং প্রকৃত প্রসারণ।

এই ধারণাটি একটি সহজ পরীক্ষার মাধ্যমে বোঝা যায়:

  1. একটি ফ্লাস্কে রঙিন তরল নিয়ে তার প্রাথমিক স্তরকে A হিসাবে চিহ্নিত করা হলো।
  2. এবার ফ্লাস্কটিকে উত্তপ্ত করলে প্রথমে ফ্লাস্কটি নিজে প্রসারিত হয়, যার ফলে তরলের স্তর নিচে নেমে B বিন্দুতে চলে আসে।
  3. আরও তাপ প্রয়োগ করলে তরলটি প্রসারিত হতে শুরু করে এবং এর স্তর B থেকে উপরে উঠে C বিন্দুতে পৌঁছায়।

এই পরীক্ষা থেকে আমরা প্রসারণের বিভিন্ন অংশকে সংজ্ঞায়িত করতে পারি:

  • পাত্রের আয়তন প্রসারণ: V_AB (B বিন্দুতে তরলের স্তরের অবনমন)
  • তরলের আপাত প্রসারণ: V_AC (প্রাথমিক স্তর A থেকে অন্তিম স্তর C পর্যন্ত বৃদ্ধি)
  • তরলের প্রকৃত প্রসারণ: V_BC (B স্তর থেকে C স্তর পর্যন্ত মোট বৃদ্ধি)

সুতরাং, এদের মধ্যে মৌলিক সম্পর্কটি হলো: তরলের প্রকৃত প্রসারণ = তরলের আপাত প্রসারণ + পাত্রের প্রসারণ অর্থাৎ, V_BC = V_AC + V_AB

2.2.1 আপাত ও প্রকৃত প্রসারণ গুণাঙ্ক

ধরা যাক, তরলের প্রাথমিক আয়তন V এবং উষ্ণতার পরিবর্তন (t₂ - t₁)

তরলের আপাত প্রসারণ গুণাঙ্ক (γₐ): কোনো তরলের উষ্ণতা প্রতি একক বৃদ্ধি করলে, পাত্রের প্রসারণকে উপেক্ষা করে, প্রতি একক আয়তনে যে আপাত আয়তন প্রসারণ হয়, তাকে আপাত প্রসারণ গুণাঙ্ক বলে। এর সূত্র: γₐ = V_AC / (V * (t₂ - t₁))

তরলের প্রকৃত প্রসারণ গুণাঙ্ক (γᵣ): কোনো তরলের উষ্ণতা প্রতি একক বৃদ্ধি করলে, পাত্রের প্রসারণকে বিবেচনা করে, প্রতি একক আয়তনে যে প্রকৃত আয়তন প্রসারণ হয়, তাকে প্রকৃত প্রসারণ গুণাঙ্ক বলে। এর সূত্র: γᵣ = V_BC / (V * (t₂ - t₁))

যেহেতু V_BC = V_AC + V_AB, তাই গুণাঙ্কগুলির মধ্যেও একটি সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। যদি পাত্রের উপাদানের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক γ_g হয়, তবে সম্পর্কটি হলো: γᵣ = γₐ + γ_g

γₐ এবং γᵣ উভয়েরই মাত্রা [θ⁻¹] এবং এদের একক হলো SI পদ্ধতিতে K⁻¹ ও CGS পদ্ধতিতে °C⁻¹।

তরলের প্রসারণের পর এবার আমরা গ্যাসীয় পদার্থের প্রসারণের প্রকৃতি আলোচনা করব।

2.3 গ্যাসীয় পদার্থের প্রসারণ (Expansion of Gases)

গ্যাসীয় পদার্থের প্রসারণ কঠিন বা তরলের তুলনায় অনেক বেশি এবং উল্লেখযোগ্য। গ্যাসের নিজস্ব আকার বা আয়তন না থাকায় এর কেবল আয়তন প্রসারণই বিবেচনা করা হয়। এই বিভাগে আমরা স্থির চাপে গ্যাসের আয়তন প্রসারণ, এর গুণাঙ্ক এবং চার্লসের সূত্রের সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করব।

স্থির চাপে গ্যাসের তাপীয় প্রসারণ: স্থির চাপে কোনো নির্দিষ্ট ভরের গ্যাসের উষ্ণতা বৃদ্ধি করলে তার আয়তন বৃদ্ধি পায়।

গাণিতিকভাবে, যদি স্থির চাপে 0°C উষ্ণতায় কোনো গ্যাসের আয়তন V₀ হয় এবং t°C উষ্ণতায় আয়তন বেড়ে V_t হয়, তবে আয়তনের বৃদ্ধি (V_t - V₀) নিম্নলিখিত সম্পর্কগুলি মেনে চলে: (V_t - V₀) ∝ V₀ * t

এই সম্পর্ক থেকে আমরা পাই: V_t = V₀(1 + γₚ * t) এখানে γₚ হলো স্থির চাপে গ্যাসের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক

গ্যাসের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক (γₚ): স্থির চাপে নির্দিষ্ট ভরের কোনো গ্যাসের উষ্ণতা 0°C থেকে 1°C বৃদ্ধি করলে, প্রতি একক আয়তনে যে আয়তন প্রসারণ হয়, তাকে ওই গ্যাসের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক বলে।

চার্লসের সূত্র থেকে আমরা জানি: V_t = V₀(1 + t/273)

এই দুটি সমীকরণ তুলনা করে আমরা γₚ-এর মান পাই: γₚ = 1/273 °C⁻¹ ≈ 3.663 × 10⁻³ °C⁻¹

উল্লেখ্য যে, কঠিন ও তরলের প্রসারণ গুণাঙ্ক উপাদানের প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল হলেও, আদর্শ গ্যাসের ক্ষেত্রে আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্কের মান সকল গ্যাসের জন্য ধ্রুবক।

তাপীয় প্রসারণের আলোচনা শেষ করে আমরা এখন তাপের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার প্রক্রিয়া অর্থাৎ তাপ সঞ্চালন নিয়ে আলোচনা করব।

3.0 তাপ সঞ্চালন (Heat Transmission)

তাপ সঞ্চালন হলো সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে তাপ উচ্চ উষ্ণতার স্থান থেকে নিম্ন উষ্ণতার স্থানের দিকে প্রবাহিত হয়। তাপের এই প্রবাহ ততক্ষণ চলতে থাকে যতক্ষণ না উভয় স্থানের তাপমাত্রা সমান হয়। তাপ সঞ্চালনের তিনটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি রয়েছে, যা মাধ্যম এবং প্রক্রিয়ার উপর নির্ভর করে।

  • পরিবহন (Conduction): এই প্রক্রিয়া মূলত কঠিন পদার্থের মধ্যে ঘটে।
  • পরিচলন (Convection): এই প্রক্রিয়া তরল এবং গ্যাসীয় পদার্থের মধ্যে ঘটে।
  • বিকিরণ (Radiation): এই প্রক্রিয়ায় তাপ কোনো মাধ্যম ছাড়াই (যেমন শূন্য মাধ্যমে) সঞ্চালিত হতে পারে।

এখন আমরা তাপ সঞ্চালনের প্রথম পদ্ধতি, পরিবহন, নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

3.1 পরিবহন এবং তাপ পরিবাহিতাঙ্ক (Conduction and Thermal Conductivity)

পরিবহন হলো তাপ সঞ্চালনের এমন একটি পদ্ধতি যেখানে পদার্থের অণুগুলি নিজেদের স্থান পরিবর্তন না করে केवळ কম্পনের মাধ্যমে তাপশক্তি এক অণু থেকে পার্শ্ববর্তী অণুতে স্থানান্তর করে। এই প্রক্রিয়াটি মূলত কঠিন পদার্থের মধ্যে সবচেয়ে কার্যকরভাবে ঘটে।

তাপের পরিবহন (Conduction of Heat): তাপ সঞ্চালনের যে পদ্ধতিতে কোনো পদার্থের উষ্ণতর অংশ থেকে শীতলতর অংশে অণুগুলির স্থানচ্যুতি ছাড়াই केवळ কম্পনের দ্বারা তাপ সঞ্চালিত হয়, তাকে পরিবহন বলে।

তাপ পরিবাহিতা (Thermal Conductivity): কোনো পদার্থের তাপ পরিবহন করার ক্ষমতাকে তার তাপ পরিবাহিতা বলে।

কোনো কঠিন পাতের এক পৃষ্ঠ থেকে অপর পৃষ্ঠে পরিবাহিত তাপের পরিমাণ (Q) কয়েকটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে:

  • পাতটির ক্ষেত্রফল (A): Q ∝ A
  • দুই পৃষ্ঠের তাপমাত্রার পার্থক্য (θ₁ - θ₂): Q ∝ (θ₁ - θ₂)
  • সময় (t): Q ∝ t
  • পাতটির বেধ (d): Q ∝ 1/d

এই সম্পর্কগুলিকে একত্রিত করে তাপ পরিবহনের মূল সমীকরণটি পাওয়া যায়: Q = K * A * (θ₁ - θ₂) * t / d

এখানে K হলো একটি সমানুপাতিক ধ্রুবক, যা তাপ পরিবাহিতাঙ্ক (Coefficient of Thermal Conductivity) নামে পরিচিত।

তাপ পরিবাহিতাঙ্ক (K): সহজ কথায়, তাপ পরিবাহিতাঙ্ক হলো কোনো পদার্থের তাপ পরিবহনের দক্ষতার পরিমাপ। গাণিতিকভাবে, এটি একক ক্ষেত্রফল ও একক বেধের কোনো ব্লকের মধ্যে দিয়ে, প্রতি সেকেন্ডে, একক তাপমাত্রা পার্থক্যের কারণে যে পরিমাণ তাপ প্রবাহিত হয়, তার সমান। এর গাণিতিক রূপ: K = Q * d / (A * t * (θ₁ - θ₂))

K-এর বৈশিষ্ট্যসমূহ নিচে একটি সারণিতে দেওয়া হলো:

Property

Value

SI একক

J·m⁻¹·K⁻¹·s⁻¹ বা W·m⁻¹·K⁻¹

CGS একক

cal·cm⁻¹·°C⁻¹·s⁻¹

মাত্রা

[MLT⁻³θ⁻¹]

এককের রূপান্তর

1 cal·cm⁻¹·°C⁻¹·s⁻¹ = 420 W·m⁻¹·K⁻¹

তাপ পরিবাহিতার বিপরীত ধারণাটি হলো তাপীয় রোধ, যা আমরা পরবর্তী অংশে আলোচনা করব।

3.2 তাপীয় রোধ এবং রোধাঙ্ক (Thermal Resistance and Resistivity)

তাপীয় রোধ হলো পদার্থের সেই ধর্ম যা তার মধ্য দিয়ে তাপের প্রবাহকে বাধা দেয়। এটি অনেকটা তড়িৎ প্রবাহের ক্ষেত্রে তড়িৎ রোধের মতো একটি ধারণা। যে পদার্থের তাপীয় রোধ যত বেশি, তার মধ্য দিয়ে তাপ তত কম পরিবাহিত হয়।

তাপীয় রোধ (R): যে ধর্মের জন্য কোনো পরিবাহী তার মধ্য দিয়ে তাপের পরিবহনকে বাধা দেয়, তাকে ওই পরিবাহীর তাপীয় রোধ বলে। তাপ পরিবাহিতাঙ্ক (K) এর সাপেক্ষে এর সূত্রটি হলো: R = d / (K * A)

তাপীয় রোধাঙ্ক (ρ): তাপ পরিবাহিতাঙ্কের অনোন্যোকে তাপীয় রোধাঙ্ক বলে। এটি পদার্থের একটি অন্তর্নিহিত ধর্ম। ρ = 1/K

তাপীয় রোধাঙ্কের সাপেক্ষে তাপীয় রোধের সূত্রটি দাঁড়ায়: R = ρ * d / A

তাপীয় রোধের SI একক হলো J⁻¹·S·K বা K/W এবং CGS একক হলো cal⁻¹·S·°C। এদের মধ্যে সম্পর্কটি হলো 1 J⁻¹·S·K = 4.2 cal⁻¹·S·°C

এই আলোচনার শেষে আমরা বিভিন্ন শ্রেণীর পদার্থের তাপ পরিবাহিতা সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ প্রদান করব।

3.3 বিভিন্ন পদার্থের তাপ পরিবাহিতা (Thermal Conductivity of Various Materials)

বিভিন্ন পদার্থের তাপ পরিবহন করার ক্ষমতা ভিন্ন ভিন্ন হয়। এই ক্ষমতার উপর ভিত্তি করে পদার্থকে মূলত তাপের সুপরিবাহী এবং কুপরিবাহী—এই দুই ভাগে ভাগ করা যায়। নিচে বিভিন্ন পদার্থের তাপ পরিবাহিতা সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হলো:

  • সমস্ত ধাতব পদার্থই তাপের সুপরিবাহী।
  • ধাতুগুলির মধ্যে রূপা (Silver)-এর তাপ পরিবাহিতাঙ্ক সর্বোচ্চ, অর্থাৎ এটি সর্বোত্তম তাপ পরিবাহী।
  • পারদ (Mercury) একটি তরল ধাতু এবং এটিও তাপের সুপরিবাহী।
  • বেশিরভাগ অধাতু তাপের কুপরিবাহী (insulator) হয়।
  • তবে এর কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। হীরে (Diamond) এবং গ্রাফাইট (Graphite) অধাতু হওয়া সত্ত্বেও তাপের সুপরিবাহী।
  • একটি আকর্ষণীয় তথ্য হলো, হীরে তাপের সুপরিবাহী হলেও তড়িতের কুপরিবাহী, কিন্তু গ্রাফাইট তাপ এবং তড়িৎ উভয়ই সুপরিবাহী।

সার্বিকভাবে, তাপীয় প্রসারণ থেকে শুরু করে তাপ সঞ্চালনের বিভিন্ন পদ্ধতি—পরিবহন, পরিচলন এবং বিকিরণ—এই সমস্ত ঘটনাই আমাদের পারিপার্শ্বিক জগতের ভৌত প্রক্রিয়াগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই মৌলিক ধারণাগুলি কেবল দশম শ্রেণীর পাঠ্যসূচীর জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং উচ্চতর পদার্থবিদ্যা এবং প্রকৌশলের বিভিন্ন শাখার ভিত্তি স্থাপন করে।

মাধ্যমিক ভৌতবিজ্ঞান: তাপের ঘটনাসমূহ – পরীক্ষার সেরা প্রস্তুতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধারণা

ভূমিকা

আমরা প্রতিদিন তাপের নানা ঘটনা অনুভব করি—কখনো গরম চায়ের কাপে হাত দিয়ে, আবার কখনো ঠান্ডা আইসক্রিমের স্বাদ নিয়ে। এই সাধারণ অভিজ্ঞতাগুলির পিছনে ভৌতবিজ্ঞানের বেশ কিছু জরুরি নিয়ম কাজ করে। মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই নিয়মগুলি বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ব্লগ পোস্টে আমরা ‘তাপের ঘটনাসমূহ’ অধ্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলি সহজ ও স্পষ্ট ভাষায় আলোচনা করব, যা তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতিকে আরও মজবুত করতে সাহায্য করবে।

১. তাপ বনাম তাপমাত্রা: শুধু নামের পার্থক্য নয়!

ভৌতবিজ্ঞানে তাপ এবং তাপমাত্রা দুটি ভিন্ন ধারণা, যদিও আমরা কথায় কথায় দুটোকে এক করে ফেলি। পরীক্ষার জন্য এদের মূল পার্থক্যগুলি জানা আবশ্যক।

বিষয়

তাপ (Heat)

তাপমাত্রা (Temperature)

সংজ্ঞা

তাপ হল এক প্রকার শক্তি যা গ্রহণ করলে বস্তু উত্তপ্ত হয় এবং বর্জন করলে শীতল হয়।

তাপমাত্রা হল বস্তুর এমন এক তাপীয় অবস্থা যা ঠিক করে দেয় তাপ কোন বস্তু থেকে কোন বস্তুতে প্রবাহিত হবে।

কারণ ও ফলাফল

তাপ হল কারণ।

তাপমাত্রা হল তাপের ফলাফল।

SI একক

জুল (Joule)

কেলভিন (Kelvin)

CGS একক

ক্যালোরি (Calorie)

ডিগ্রি সেলসিয়াস (°C)

মাত্রা (Dimension)

[ML²T⁻²]

[θ]

পরিমাপক যন্ত্র

ক্যালোরিমিটার (Calorimeter)

থার্মোমিটার (Thermometer)

সহজ কথায়, তাপ হলো কারণ এবং তাপমাত্রা হলো তার ফল। যখন কোনো বস্তুকে তাপ দেওয়া হয় (কারণ), তখন তার তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় (ফল)। এই মৌলিক পার্থক্যটি বুঝতে পারলে তাপ সংক্রান্ত অনেক জটিল ধারণা সহজ হয়ে যায়। এই কারণ (তাপ) এবং ফলের (তাপমাত্রা) সম্পর্কটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় পদার্থের প্রসারণের ক্ষেত্রে।

২. পদার্থের প্রসারণ: তাপের প্রভাবে বস্তুর আকার বদল

তাপের একটি সাধারণ ঘটনা হলো প্রসারণ। তাপ প্রয়োগ করলে প্রায় সব পদার্থেরই আকার বা আয়তন বৃদ্ধি পায়, একে প্রসারণ বলে। আবার, তাপ অপসারণ করলে পদার্থ সংকুচিত হয়। পদার্থের অবস্থা অনুযায়ী এই প্রসারণ বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে।

  • কঠিন পদার্থ: দৈর্ঘ্য, ক্ষেত্রফল এবং আয়তন—তিন প্রকার প্রসারণই দেখা যায়।
  • তরল পদার্থ: শুধুমাত্র আয়তন প্রসারণ ঘটে, যা দুই প্রকারের—আপাত ও প্রকৃত।
  • গ্যাসীয় পদার্থ: শুধুমাত্র আয়তন প্রসারণই গুরুত্বপূর্ণ।

২.১ কঠিন পদার্থের তিন ধরনের প্রসারণ

কঠিন পদার্থের প্রসারণ তিন প্রকারের হয়:

  1. দৈর্ঘ্য প্রসারণ: তাপ প্রয়োগের ফলে কোনো কঠিন বস্তুর দৈর্ঘ্য বরাবর যে প্রসারণ হয়। এর গুণাঙ্ককে আলফা (α) দ্বারা প্রকাশ করা হয়।
  2. ক্ষেত্র প্রসারণ: তাপ প্রয়োগের ফলে বস্তুর ক্ষেত্রফল বরাবর যে প্রসারণ হয়। এর গুণাঙ্ক হলো বিটা (β)
  3. আয়তন প্রসারণ: তাপ প্রয়োগের ফলে বস্তুর আয়তন বরাবর যে প্রসারণ হয়। এর গুণাঙ্ক হলো গামা (γ)

এই তিনটি গুণাঙ্কের মধ্যে একটি সরল সম্পর্ক রয়েছে, যা অঙ্ক কষার জন্য অত্যন্ত জরুরি। α : β : γ = 1 : 2 : 3 এই সম্পর্কটি মনে রাখলে একটি গুণাঙ্কের মান জানা থাকলে বাকি দুটি সহজেই বের করা যায়।

২.২ তরলের প্রসারণ: আপাত এবং প্রকৃত-এর পার্থক্য

তরল পদার্থকে কোনো পাত্রে না রেখে গরম করা যায় না। তাই যখন তরলকে তাপ দেওয়া হয়, তখন তরলের পাশাপাশি পাত্রটিও প্রসারিত হয়। এই কারণে তরলের প্রসারণ দুই প্রকারের হয়: আপাত প্রসারণ ও প্রকৃত প্রসারণ।

বিষয়টি ধাপে ধাপে বোঝা যাক:

  1. প্রাথমিক অবস্থা: ধরো, একটি কাঁচের পাত্রে তরল A স্তর পর্যন্ত আছে।
  2. প্রথমে পাত্রের প্রসারণ: তাপ দেওয়ার সাথে সাথে প্রথমে কাঁচের পাত্রটি উত্তপ্ত হয়ে প্রসারিত হয়। ফলে পাত্রের ভিতরের আয়তন বেড়ে যায় এবং তরলের স্তর নিচে নেমে B বিন্দুতে চলে আসে। এই যে স্তর নেমে গেল (A থেকে B), এটাই হলো পাত্রের প্রসারণ।
  3. এবার তরলের প্রসারণ: এরপর তাপ তরলের মধ্যে সঞ্চালিত হয় এবং তরল নিজে প্রসারিত হতে শুরু করে। এর ফলে তরলের স্তর B বিন্দু থেকে বেড়ে চূড়ান্ত স্তর C-তে পৌঁছায়।
  4. আপাত বনাম প্রকৃত: আমরা বাইরে থেকে শুধু প্রাথমিক স্তর (A) এবং চূড়ান্ত স্তর (C) দেখতে পাই। তাই আমাদের চোখে যেটা ধরা পড়ে (A থেকে C), সেটাই হলো আপাত প্রসারণ। কিন্তু তরলটি আসলে B থেকে C পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে, যা হলো তার প্রকৃত প্রসারণ

সুতরাং, এদের মধ্যে সম্পর্কটি হলো: তরলের প্রকৃত প্রসারণ = তরলের আপাত প্রসারণ + পাত্রের প্রসারণ

একইভাবে, এদের প্রসারণ গুণাঙ্কগুলির মধ্যেও সম্পর্ক রয়েছে: γr = γa + γg (এখানে, γr = প্রকৃত প্রসারণ গুণাঙ্ক, γa = আপাত প্রসারণ গুণাঙ্ক, এবং γg = পাত্রের প্রসারণ গুণাঙ্ক)

২.৩ গ্যাসের প্রসারণ: একটি নির্দিষ্ট নিয়ম

গ্যাসের নির্দিষ্ট আকার না থাকায় এর শুধুমাত্র আয়তন প্রসারণই বিবেচনা করা হয়। গ্যাসের প্রসারণের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চার্লসের সূত্র অনুযায়ী স্থির চাপে সমস্ত গ্যাসের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্কের (γp) মান সমান এবং এটি একটি ধ্রুবক।

এর কারণ হলো, চার্লসের সূত্র বলে যে স্থির চাপে কোনো নির্দিষ্ট ভরের গ্যাসের উষ্ণতা প্রতি ১°C বৃদ্ধি বা হ্রাস করলে, গ্যাসটির আয়তন তার ০°C উষ্ণতার আয়তনের ১/২৭৩ অংশ যথাক্রমে বৃদ্ধি বা হ্রাস পায়। এই কারণেই আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্কের মান হয়: γp = 1/273 °C⁻¹

গাণিতিকভাবে একে প্রকাশ করা হয়: Vt = V₀(1 + γp * t)। এই মান ও সূত্রটি পরীক্ষার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রায়ই পরীক্ষায় এই সংক্রান্ত প্রশ্ন আসে।

৩. তাপ সঞ্চালন: কীভাবে তাপ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যায়?

উষ্ণতর স্থান থেকে শীতলতর স্থানে তাপের প্রবাহকে তাপ সঞ্চালন বলে। তাপ মূলত তিনটি পদ্ধতিতে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারে:

  • পরিবহন (Conduction): কঠিন পদার্থের মধ্যে এই পদ্ধতিতে তাপ সঞ্চালিত হয়।
  • পরিচলন (Convection): তরল ও গ্যাসীয় পদার্থের মধ্যে এই পদ্ধতিতে তাপ যায়।
  • বিকিরণ (Radiation): এই পদ্ধতিতে তাপ সঞ্চালনের জন্য কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন হয় না, অর্থাৎ শূন্য মাধ্যমেও তাপ যেতে পারে।

৩.১ তাপের পরিবহন এবং পরিবাহিতাঙ্ক

পরিবহন পদ্ধতিতে পদার্থের কণাগুলি নিজেরা স্থান পরিবর্তন করে না, কেবল নিজেদের অবস্থানে থেকে কম্পনের মাধ্যমে পাশের কণাতে তাপশক্তি স্থানান্তর করে।

কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে মোট পরিবাহিত তাপের পরিমাণ (Q) কয়েকটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে: পদার্থের দুই প্রান্তের ক্ষেত্রফল, উষ্ণতার পার্থক্য, সময় এবং বেধ।

তাপ পরিবাহিতাঙ্ক (K) হলো কোনো পদার্থের তাপ পরিবহন করার ক্ষমতা। এর মান যত বেশি, সেই পদার্থ তত সহজে তাপ পরিবহন করতে পারে। এর SI একক হলো W.m⁻¹k⁻¹ বা J.m⁻¹s⁻¹k⁻¹ (কারণ ওয়াট = জুল/সেকেন্ড)।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ:

  • রূপা হলো তাপের সর্বোত্তম পরিবাহী।
  • পারদ একটি তরল ধাতু হওয়া সত্ত্বেও তাপের সুপরিবাহী।
  • হীরে ও গ্রাফাইট অধাতু, কিন্তু এরা তাপের খুব ভালো সুপরিবাহী। তবে হীরের তড়িৎ অপরিবাহী কিন্তু গ্রাফাইট তড়িৎ সুপরিবাহী।

উপসংহার

এই পোস্টে আমরা তাপ ও তাপমাত্রার মূল পার্থক্য, কঠিন, তরল ও গ্যাসীয় পদার্থের প্রসারণের ধরণ এবং তাপ সঞ্চালনের বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করলাম। এই ধারণাগুলি ভালোভাবে বুঝতে পারলে ‘তাপের ঘটনাসমূহ’ অধ্যায়টি তোমার কাছে অনেক সহজ মনে হবে এবং পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও আত্মবিশ্বাস বাড়বে।

তাপের এই ঘটনাগুলি শুধু পরীক্ষার নম্বর তোলার জন্য নয়, আমাদের চারপাশের জগৎ কীভাবে কাজ করে তা বোঝার চাবিকাঠি। রেডিয়োমিটারের ঘূর্ণন থেকে শুরু করে রেললাইনে ফাঁক রাখা পর্যন্ত—সবকিছুর পিছনেই রয়েছে এই সুন্দর নিয়মগুলি। সবশেষে তোমার কাছে একটি প্রশ্ন: তাপের এই ঘটনাগুলির মধ্যে কোনটি তোমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বলে মনে হল এবং কেন?

YouTube player

তাপের ঘটনাসমূহ: দশম শ্রেণীর জন্য একটি রেফারেন্স ম্যানুয়াল

1.0 মৌলিক ধারণা: তাপ এবং তাপমাত্রা

পদার্থবিজ্ঞানে তাপীয় ঘটনাসমূহ বোঝার জন্য তাপ এবং তাপমাত্রা—এই দুটি মৌলিক রাশির মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাপ হলো এক প্রকার শক্তি যা কোনো বস্তুর উষ্ণতা বৃদ্ধি বা হ্রাসের কারণ, অন্যদিকে তাপমাত্রা হলো সেই শক্তির ফল বা প্রভাব, যা বস্তুর তাপীয় অবস্থা নির্দেশ করে। এই দুটি ধারণার ওপর ভিত্তি করেই তাপগতিবিদ্যার সমস্ত মূলনীতি প্রতিষ্ঠিত।

তাপ (Heat) বনাম তাপমাত্রা (Temperature)

নিচের সারণিতে তাপ এবং তাপমাত্রার মূল পার্থক্যগুলো তুলে ধরা হলো:

বৈশিষ্ট্য

তাপ (Heat)

তাপমাত্রা (Temperature)

সংজ্ঞা (Definition)

তাপ হলো এক প্রকার শক্তি, যা গ্রহণ করলে বস্তু উত্তপ্ত হয় এবং বর্জন করলে বস্তু শীতল হয়।

তাপমাত্রা হলো বস্তুর এমন এক তাপীয় অবস্থা, যা নির্ধারণ করে বস্তুটি অন্য বস্তুর সংস্পর্শে এলে তাপ দেবে না নেবে।

প্রকৃতি (Nature)

তাপ হলো তাপমাত্রার কারণ

তাপমাত্রা হলো তাপের ফলাফল

SI একক (SI Unit)

জুল (Joule)

কেলভিন (Kelvin)

CGS একক (CGS Unit)

ক্যালোরি (Calorie)

ডিগ্রি সেলসিয়াস (°C)

পরিমাপক যন্ত্র (Measuring Instrument)

ক্যালোরিমিটার (Calorimeter)

থার্মোমিটার (Thermometer)

মাত্রা (Dimension)

[ML²T⁻²]

[θ]

এই মৌলিক ধারণাগুলির উপর ভিত্তি করে, আমরা এখন দেখব কিভাবে তাপ প্রয়োগের ফলে পদার্থের ভৌত অবস্থার পরিবর্তন হয়, যার মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ হলো তাপীয় প্রসারণ।

2.0 তাপীয় প্রসারণ (Thermal Expansion)

তাপ প্রয়োগের ফলে কোনো পদার্থের আকার, ক্ষেত্রফল বা আয়তনের যে বৃদ্ধি ঘটে, তাকে ওই পদার্থের তাপীয় প্রসারণ বলা হয়। পদার্থবিজ্ঞান এবং প্রকৌশলের বিভিন্ন ক্ষেত্রে, যেমন—সেতু নির্মাণ, রেললাইন স্থাপন এবং বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরির সময় এই প্রসারণের বিষয়টি মাথায় রাখা অপরিহার্য। কঠিন, তরল এবং গ্যাসীয়—এই তিন অবস্থাতেই পদার্থের তাপীয় প্রসারণ ঘটে।

2.1 কঠিনের প্রসারণ (Expansion of Solids)

কঠিন পদার্থের প্রসারণকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়: দৈর্ঘ্য প্রসারণ, ক্ষেত্র প্রসারণ এবং আয়তন প্রসারণ।

2.1.1 দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক (α)

তাপ প্রয়োগের ফলে কোনো কঠিন পদার্থের নির্দিষ্ট দিকে বা দৈর্ঘ্য বরাবর যে প্রসারণ ঘটে, তাকে দৈর্ঘ্য প্রসারণ বলা হয়। এই প্রসারণের পরিমাণ দুটি মূল বিষয়ের উপর নির্ভর করে। ধরা যাক, t₁ উষ্ণতায় কোনো দণ্ডের প্রাথমিক দৈর্ঘ্য L₁। উষ্ণতা বৃদ্ধি করে t₂ করা হলে অন্তিম দৈর্ঘ্য L₂ হয়। এক্ষেত্রে, দৈর্ঘ্যের বৃদ্ধি (L₂ - L₁) দুটি বিষয়ের সমানুপাতিক:

  1. দণ্ডের প্রাথমিক দৈর্ঘ্য (L₁)
  2. উষ্ণতার বৃদ্ধি (t₂ - t₁)

গাণিতিকভাবে আমরা লিখতে পারি: (L₂ - L₁) ∝ L₁ (যখন উষ্ণতার বৃদ্ধি স্থির) (L₂ - L₁) ∝ (t₂ - t₁) (যখন প্রাথমিক দৈর্ঘ্য স্থির)

যৌগিক ভেদের নিয়ম অনুযায়ী এই সম্পর্ক দুটিকে একত্রিত করে পাই: (L₂ - L₁) ∝ L₁(t₂ - t₁) ⇒ (L₂ - L₁) = α ⋅ L₁(t₂ - t₁)

যেখানে, α (আলফা) একটি সমানুপাতিক ধ্রুবক, যাকে ওই দণ্ডের উপাদানের দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক বলা হয়। এই সমীকরণটিই কঠিনের দৈর্ঘ্য প্রসারণের মূল ভিত্তি।

সুতরাং, অন্তিম দৈর্ঘ্যের সূত্রটি হলো: L₂ = L₁[1 + α(t₂ - t₁)]

সংজ্ঞা: প্রতি একক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য কোনো পদার্থের প্রতি একক দৈর্ঘ্যে যে পরিমাণ দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায়, তাকে ওই পদার্থের উপাদানের দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক (α) বলে।

  • α-এর বৈশিষ্ট্য:
    • SI একক: K⁻¹
    • CGS একক: °C⁻¹
    • মাত্রা: [θ⁻¹]
    • ফারেনহাইট স্কেলে রূপান্তর: α_F = (5/9)α_C

2.1.2 ক্ষেত্র প্রসারণ গুণাঙ্ক (β)

তাপ প্রয়োগের ফলে কোনো কঠিন পাতের পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল যে পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, তাকে ক্ষেত্র প্রসারণ বলা হয়। দৈর্ঘ্য প্রসারণের মতোই, ক্ষেত্রফলের বৃদ্ধিও দুটি বিষয়ের উপর নির্ভরশীল। ধরা যাক, t₁ উষ্ণতায় পাতের প্রাথমিক ক্ষেত্রফল S₁ এবং t₂ উষ্ণতায় অন্তিম ক্ষেত্রফল S₂। এক্ষেত্রে ক্ষেত্রফলের বৃদ্ধি (S₂ - S₁) সমানুপাতিক হবে:

  1. পাতের প্রাথমিক ক্ষেত্রফল (S₁)
  2. উষ্ণতার বৃদ্ধি (t₂ - t₁)

সুতরাং, আমরা লিখতে পারি: (S₂ - S₁) ∝ S₁ (S₂ - S₁) ∝ (t₂ - t₁)

এই সম্পর্ক দুটিকে একত্রিত করে পাই: (S₂ - S₁) ∝ S₁(t₂ - t₁) ⇒ (S₂ - S₁) = β ⋅ S₁(t₂ - t₁)

যেখানে, β (বিটা) হলো একটি সমানুপাতিক ধ্রুবক, যা ক্ষেত্র প্রসারণ গুণাঙ্ক নামে পরিচিত।

এই সম্পর্ক থেকে β-এর সূত্রটি নির্ণয় করা যায়: β = (S₂ - S₁) / (S₁ ⋅ (t₂ - t₁))

সংজ্ঞা: প্রতি একক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য কোনো কঠিন পদার্থের প্রতি একক ক্ষেত্রফলে যে পরিমাণ ক্ষেত্রফল বৃদ্ধি পায়, তাকে ওই পদার্থের উপাদানের ক্ষেত্র প্রসারণ গুণাঙ্ক (β) বলে।

  • β-এর বৈশিষ্ট্য:
    • SI একক: K⁻¹
    • CGS একক: °C⁻¹
    • মাত্রা: [θ⁻¹]
    • ফারেনহাইট স্কেলে রূপান্তর: β_F = (5/9)β_C

2.1.3 আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক (γ)

তাপ প্রয়োগের ফলে কোনো কঠিন বস্তুর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা অর্থাৎ আয়তনের যে প্রসারণ ঘটে, তাকে আয়তন প্রসারণ বলা হয়। অন্য দুই প্রসারণের মতোই, আয়তনের বৃদ্ধিও বস্তুর প্রাথমিক আয়তন এবং উষ্ণতার বৃদ্ধির সমানুপাতিক। ধরা যাক, t₁ উষ্ণতায় বস্তুর প্রাথমিক আয়তন v₁ এবং t₂ উষ্ণতায় অন্তিম আয়তন v₂। এক্ষেত্রে আয়তনের বৃদ্ধি (v₂ - v₁) সমানুপাতিক হবে:

  1. বস্তুর প্রাথমিক আয়তন (v₁)
  2. উষ্ণতার বৃদ্ধি (t₂ - t₁)

সুতরাং, আমরা লিখতে পারি: (v₂ - v₁) ∝ v₁ (v₂ - v₁) ∝ (t₂ - t₁)

এই সম্পর্ক দুটিকে একত্রিত করে পাই: (v₂ - v₁) ∝ v₁(t₂ - t₁) ⇒ (v₂ - v₁) = γ ⋅ v₁(t₂ - t₁)

যেখানে, γ (গামা) হলো একটি সমানুপাতিক ধ্রুবক, যা আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক নামে পরিচিত।

সুতরাং, অন্তিম আয়তনের সূত্রটি হলো: v₂ = v₁[1 + γ(t₂ - t₁)]

সংজ্ঞা: প্রতি একক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য কোনো পদার্থের প্রতি একক আয়তনে যে পরিমাণ আয়তন বৃদ্ধি পায়, তাকে ওই পদার্থের উপাদানের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক (γ) বলে।

  • γ-এর বৈশিষ্ট্য:
    • SI একক: K⁻¹
    • CGS একক: °C⁻¹
    • মাত্রা: [θ⁻¹]
    • ফারেনহাইট স্কেলে রূপান্তর: γ_F = (5/9)γ_C

2.1.4 প্রসারণ গুণাঙ্কগুলির মধ্যে সম্পর্ক

কঠিন পদার্থের তিনটি প্রসারণ গুণাঙ্কের মধ্যে একটি সরল সম্পর্ক বিদ্যমান, যা তাদের একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত করে।

  • অনুপাত: α : β : γ = 1 : 2 : 3
  • সমীকরণ: β = 2α এবং γ = 3α

2.2 তরলের প্রসারণ (Expansion of Liquids)

তরল পদার্থকে সর্বদা কোনো পাত্রে রেখে উত্তপ্ত করতে হয়। তাপ প্রয়োগ করলে তরলের নিজের প্রসারণের সাথে সাথে পাত্রেরও প্রসারণ ঘটে। এই কারণে তরলের প্রসারণ দুই প্রকারের হয়।

2.2.1 আপাত ও প্রকৃত প্রসারণ

বিষয়টি একটি পরীক্ষার মাধ্যমে সহজে বোঝা যায়। ধরা যাক, একটি কাচের ফ্লাস্কে কিছু পরিমাণ তরল নেওয়া হলো যার প্রাথমিক স্তর A বিন্দুতে রয়েছে। এবার ফ্লাস্কটিকে উত্তপ্ত করলে প্রথমে তাপ কাচের পাত্রে পৌঁছায় এবং পাত্রটি প্রসারিত হয়। ফলে তরলের স্তর A থেকে B বিন্দুতে নেমে আসে। এরপর তাপ তরলে সঞ্চালিত হলে তরল প্রসারিত হতে শুরু করে এবং এর স্তর B থেকে প্রাথমিক স্তর A-কে ছাড়িয়ে C বিন্দুতে গিয়ে পৌঁছায়।

এখানে, A থেকে C-তে স্তরের পরিবর্তন (VAC) হলো আপাত প্রসারণ, কারণ এটি পাত্রের প্রসারণকে বিবেচনা না করে শুধুমাত্র প্রাথমিক ও অন্তিম স্তরের পার্থক্য। অন্যদিকে, B থেকে C-তে স্তরের পরিবর্তন (VBC) হলো প্রকৃত প্রসারণ, কারণ এটি তরলের নিজস্ব প্রসারণকে নির্দেশ করে। পাত্রের প্রসারণের কারণে স্তর A থেকে B-তে নেমে গিয়েছিল (VAB)।

সুতরাং, আপাত এবং প্রকৃত প্রসারণের মধ্যে সম্পর্কটি হলো: প্রকৃত প্রসারণ (VBC) = আপাত প্রসারণ (VAC) + পাত্রের প্রসারণ (VAB)

2.2.2 গুণাঙ্ক ও তাদের সম্পর্ক

উপরিউক্ত ধারণার উপর ভিত্তি করে তরলের দুটি আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক সংজ্ঞায়িত করা হয়:

  • আপাত প্রসারণ গুণাঙ্ক (γₐ): পাত্রের প্রসারণ উপেক্ষা করে তরলের যে আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক পাওয়া যায়।
  • প্রকৃত প্রসারণ গুণাঙ্ক (γᵣ): পাত্রের প্রসারণসহ তরলের প্রকৃত আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক।

এদের মধ্যে সম্পর্কটি হলো: প্রকৃত প্রসারণ = আপাত প্রসারণ + পাত্রের প্রসারণ

এবং গুণাঙ্কগুলির মধ্যে সম্পর্কটি হলো: γᵣ = γₐ + γ_পাত্র (যেখানে, γ_পাত্র হলো পাত্রের উপাদানের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক)

এই গুণাঙ্কগুলির SI একক K⁻¹ এবং CGS একক °C⁻¹।

2.3 গ্যাসের প্রসারণ (Expansion of Gases)

স্থির চাপে কোনো নির্দিষ্ট ভরের গ্যাসকে উত্তপ্ত করলে তার আয়তন বৃদ্ধি পায়। একে গ্যাসের আয়তন প্রসারণ বলা হয়।

2.3.1 সূত্র এবং গুণাঙ্ক

গ্যাসের প্রসারণের ক্ষেত্রে একটি আদর্শ সূত্র রয়েছে যা চার্লসের সূত্রের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। স্থির চাপে, 0°C উষ্ণতায় কোনো গ্যাসের আয়তন V₀ এবং t°C উষ্ণতায় আয়তন Vₜ হলে, তাদের সম্পর্কটি হলো: Vₜ = V₀(1 + γₚt)

এখানে, γₚ-কে স্থির চাপে গ্যাসের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক বলা হয়।

চার্লসের সূত্রানুসারে, সকল গ্যাসের জন্য γₚ-এর মান ধ্রুবক এবং এর মান হলো: γₚ = 1/273 °C⁻¹ ≈ 3.663 × 10⁻³ °C⁻¹

পদার্থের এই প্রসারণ ঘটে যখন তাপ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সঞ্চালিত হয়, যা আমরা পরবর্তী বিভাগে আলোচনা করব।

3.0 তাপ সঞ্চালন (Heat Transmission)

উষ্ণতর স্থান থেকে শীতলতর স্থানে তাপের প্রবাহকে তাপ সঞ্চালন বলা হয়। প্রকৃতি এবং মানবসৃষ্ট বিভিন্ন ব্যবস্থায়, যেমন—আবহাওয়ার পরিবর্তন থেকে শুরু করে ইঞ্জিন শীতল রাখা পর্যন্ত, তাপ সঞ্চালনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

তাপ সঞ্চালনের তিনটি প্রধান পদ্ধতি রয়েছে:

  • পরিবহন (Conduction): মূলত কঠিন পদার্থে ঘটে।
  • পরিচলন (Convection): তরল ও গ্যাসীয় পদার্থে ঘটে।
  • বিকিরণ (Radiation): শূন্য মাধ্যমেও ঘটতে পারে।

3.1 তাপের পরিবহন এবং পরিবাহিতাঙ্ক

যে পদ্ধতিতে কোনো পদার্থের উষ্ণতর অংশ থেকে শীতলতর অংশে কণাগুলির স্থান পরিবর্তন ছাড়াই কেবল কম্পনের মাধ্যমে তাপ সঞ্চালিত হয়, তাকে পরিবহন বলে।

3.1.1 তাপ পরিবহনের নির্ভরশীলতা এবং সূত্র গঠন

ভৌত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দেখা গেছে যে, কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে পরিবাহিত তাপের পরিমাণ (Q) চারটি মূল বিষয়ের উপর নির্ভর করে। এই নির্ভরশীলতা থেকেই তাপ পরিবহনের সূত্রটি গঠিত হয়।

  1. প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল (A): পরিবাহিত তাপের পরিমাণ প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফলের সমানুপাতিক। Q ∝ A
  2. উষ্ণতার পার্থক্য (θ₁ - θ₂): পরিবাহিত তাপ পরিবাহীর দুই প্রান্তের উষ্ণতার পার্থক্যের সমানুপাতিক। Q ∝ (θ₁ - θ₂)
  3. সময় (t): পরিবাহিত তাপ সময়ের সমানুপাতিক। Q ∝ t
  4. বেধ (d): পরিবাহিত তাপ পরিবাহীর বেধের ব্যস্তানুপাতিক। Q ∝ 1/d

যৌগিক ভেদের নিয়ম অনুসারে, এই চারটি সম্পর্ককে একত্রিত করলে আমরা পাই: Q ∝ (A(θ₁ - θ₂)t) / d

এই সমানুপাতিক সম্পর্কটিকে সমীকরণে রূপান্তরিত করার জন্য একটি ধ্রুবক ব্যবহার করা হয়, যা K নামে পরিচিত। সুতরাং, চূড়ান্ত সূত্রটি হলো: Q = (K A (θ₁ - θ₂) t) / d

3.1.2 তাপ পরিবাহিতাঙ্ক (K)

উপরের সমীকরণে K হলো একটি ধ্রুবক, যা পরিবাহীর উপাদানের তাপ পরিবাহিতাঙ্ক (Coefficient of Thermal Conductivity) নামে পরিচিত। এটি পদার্থের একটি নিজস্ব ধর্ম।

সংজ্ঞা: কোনো পদার্থের একক বেধ ও একক প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফলযুক্ত একটি পাতের দুই বিপরীত পৃষ্ঠের উষ্ণতার পার্থক্য একক হলে, পাতটির এক পৃষ্ঠ থেকে অপর পৃষ্ঠে লম্বভাবে প্রতি একক সময়ে যে পরিমাণ তাপ পরিবাহিত হয়, তাকে ওই পদার্থের উপাদানের তাপ পরিবাহিতাঙ্ক (K) বলে।

  • K-এর বৈশিষ্ট্য:
    • SI একক: J⋅m⁻¹⋅K⁻¹⋅s⁻¹ বা W⋅m⁻¹⋅K⁻¹
    • CGS একক: cal⋅cm⁻¹⋅°C⁻¹⋅s⁻¹
    • এককের রূপান্তর: 1 cal⋅cm⁻¹⋅°C⁻¹⋅s⁻¹ = 420 W⋅m⁻¹⋅K⁻¹
    • মাত্রা: [MLT⁻³θ⁻¹]

3.2 তাপীয় রোধ এবং রোধাঙ্ক

3.2.1 সংজ্ঞা ও সূত্র

  • তাপীয় রোধ (Thermal Resistance): পদার্থের যে ধর্মের জন্য এটি তার মধ্য দিয়ে তাপের প্রবাহকে বাধা দেয়, তাকে তাপীয় রোধ (R) বলে। এর সূত্রটি হলো: R = d / (K A)
  • তাপীয় রোধাঙ্ক (Thermal Resistivity): তাপ পরিবাহিতাঙ্কের (K) অনোন্যককে তাপীয় রোধাঙ্ক (ρ) বলা হয়। ρ = 1/K

তাপীয় রোধের SI একক K/W এবং CGS একক cal⁻¹⋅s⋅°C।

3.3 সুপরিবাহী ও কুপরিবাহী পদার্থ

যেসব পদার্থের মধ্য দিয়ে তাপ সহজে পরিবাহিত হতে পারে, তাদের সুপরিবাহী এবং যাদের মধ্য দিয়ে পারে না, তাদের কুপরিবাহী বা অন্তরক বলে।

  • অধিকাংশ ধাতু তাপের সুপরিবাহী।
  • রূপা (Silver)-র তাপ পরিবাহিতাঙ্ক সর্বোচ্চ।
  • পারদ (Mercury) একটি তরল ধাতু যা তাপের সুপরিবাহী।
  • হীরে (Diamond) এবং গ্রাফাইট (Graphite) অধাতু হওয়া সত্ত্বেও তাপের সুপরিবাহী।
  • একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, হীরে তড়িতের কুপরিবাহী কিন্তু গ্রাফাইট তড়িতের সুপরিবাহী।
  • অধিকাংশ অধাতু তাপের কুপরিবাহী (অন্তরক)।

তাপের ঘটনাসমূহ: একটি বিশদ বিশ্লেষণ

কার্যনির্বাহী সারাংশ

এই নথিটি দশম শ্রেণীর ভৌত বিজ্ঞানের “তাপের ঘটনাসমূহ” অধ্যায়ের একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ প্রদান করে। এখানে তাপ ও তাপমাত্রার মৌলিক পার্থক্য, পদার্থের বিভিন্ন অবস্থায় (কঠিন, তরল ও গ্যাসীয়) তাপীয় প্রসারণের ধারণা এবং তাদের প্রসারণ গুণাঙ্কের বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। কঠিন পদার্থের ক্ষেত্রে দৈর্ঘ্য, ক্ষেত্রফল ও আয়তন প্রসারণ এবং তাদের গুণাঙ্ক α, β, ও γ-এর মধ্যে সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। তরলের আপাত ও প্রকৃত প্রসারণের পার্থক্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং গ্যাসের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্কের সার্বজনীন মান উল্লেখ করা হয়েছে। সবশেষে, তাপ সঞ্চালনের তিনটি পদ্ধতি—পরিবহন, পরিচলন ও বিকিরণ—এবং বিশেষত তাপ পরিবহনের নিয়ম, পরিবাহিতাঙ্ক, ও তাপীয় রোধের গাণিতিক ধারণাগুলি বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

ভূমিকা: তাপ ও তাপমাত্রা

তাপ এবং তাপমাত্রা দুটি ভিন্ন ভৌত রাশি, যদিও এরা পরস্পর সম্পর্কিত। তাপ হলো শক্তির একটি রূপ যা কোনো বস্তু গ্রহণ করলে উত্তপ্ত হয় এবং বর্জন করলে শীতল হয়, অন্যদিকে তাপমাত্রা হলো বস্তুর তাপীয় অবস্থা যা নির্ধারণ করে তাপ কোন বস্তু থেকে কোন বস্তুতে সঞ্চালিত হবে।

বৈশিষ্ট্য

তাপ (Heat)

তাপমাত্রা (Temperature)

সংজ্ঞা

তাপ এক প্রকার শক্তি, যা গ্রহণ করলে বস্তু উত্তপ্ত হয় এবং বর্জন করলে শীতল হয়।

তাপমাত্রা হলো বস্তুর এমন এক তাপীয় অবস্থা যা নির্দেশ করে তাপ কোন বস্তু থেকে কোন বস্তুতে প্রবাহিত হবে।

কারণ ও ফল

তাপ হলো তাপমাত্রার কারণ।

তাপমাত্রা হলো তাপের ফল।

একক (SI)

জুল (Joule)

কেলভিন (Kelvin)

একক (CGS)

ক্যালোরি (Calorie)

ডিগ্রি সেলসিয়াস (°C)

পরিমাপক যন্ত্র

ক্যালোরিমিটার

থার্মোমিটার

মাত্রা

[ML²T⁻²]

[θ]

তাপীয় প্রসারণ: একটি সার্বিক ধারণা

তাপ প্রয়োগের ফলে কোনো বস্তুর আকার বা আয়তনের যে প্রসারণ হয়, তাকে পদার্থের তাপীয় প্রসারণ বলে। তাপ প্রয়োগে বস্তুর উষ্ণতা বৃদ্ধি পায় এবং তাপ বর্জন করলে উষ্ণতা হ্রাস পায়। উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে বস্তু প্রসারিত হয় এবং উষ্ণতা হ্রাসের ফলে সংকুচিত হয়। পদার্থের তিনটি অবস্থাতেই—কঠিন, তরল ও গ্যাসীয়—তাপীয় প্রসারণ ঘটে।

কঠিন পদার্থের প্রসারণ

কঠিন পদার্থের নির্দিষ্ট আকার ও আয়তন থাকায় এর তিন ধরনের প্রসারণ লক্ষ্য করা যায়: ১. দৈর্ঘ্য প্রসারণ: তাপ প্রয়োগে কোনো কঠিন দণ্ডের দৈর্ঘ্য বরাবর প্রসারণ। ২. ক্ষেত্র প্রসারণ: তাপ প্রয়োগে কোনো কঠিন পাতের ক্ষেত্রফলের প্রসারণ। ৩. আয়তন প্রসারণ: তাপ প্রয়োগে কোনো কঠিন বস্তুর আয়তনের প্রসারণ।

দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক (α)

সংজ্ঞা: একক দৈর্ঘ্যের কোনো দণ্ডের উষ্ণতা ১° বৃদ্ধি করলে দণ্ডটির যে পরিমাণ দৈর্ঘ্য প্রসারণ হয়, তাকে ওই পদার্থের দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক (α) বলে।

  • গাণিতিক রূপ: L₂ = L₁[1 + α(t₂ - t₁)]
    • এখানে, t₁ উষ্ণতায় প্রাথমিক দৈর্ঘ্য = L₁
    • t₂ উষ্ণতায় অন্তিম দৈর্ঘ্য = L₂
  • মাত্রা: [θ⁻¹]
  • SI একক: K⁻¹
  • CGS একক: °C⁻¹

ক্ষেত্র প্রসারণ গুণাঙ্ক (β)

সংজ্ঞা: একক ক্ষেত্রফল বিশিষ্ট কোনো পাতের উষ্ণতা ১° বৃদ্ধি করলে পাতটির যে পরিমাণ ক্ষেত্র প্রসারণ হয়, তাকে ওই পদার্থের ক্ষেত্র প্রসারণ গুণাঙ্ক (β) বলে।

  • গাণিতিক রূপ: S₂ - S₁ = β * S₁ * (t₂ - t₁)
    • এখানে, t₁ উষ্ণতায় প্রাথমিক ক্ষেত্রফল = S₁
    • t₂ উষ্ণতায় অন্তিম ক্ষেত্রফল = S₂
  • মাত্রা: [θ⁻¹]
  • SI একক: K⁻¹
  • CGS একক: °C⁻¹

আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক (γ)

সংজ্ঞা: একক আয়তনবিশিষ্ট কোনো পদার্থের উষ্ণতা ১° বৃদ্ধি করলে পদার্থটির যে পরিমাণ আয়তন প্রসারণ হয়, তাকে ওই পদার্থের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক (γ) বলে।

  • গাণিতিক রূপ: v₂ = v₁[1 + γ(t₂ - t₁)]
    • এখানে, t₁ উষ্ণতায় প্রাথমিক আয়তন = v₁
    • t₂ উষ্ণতায় অন্তিম আয়তন = v₂
  • মাত্রা: [θ⁻¹]
  • SI একক: K⁻¹
  • CGS একক: °C⁻¹

গুণাঙ্কগুলির মধ্যে সম্পর্ক

কঠিন পদার্থের তিনটি প্রসারণ গুণাঙ্কের মধ্যে সম্পর্কটি হলো: α : β : γ = 1 : 2 : 3 অর্থাৎ, β = 2α এবং γ = 3α

তরল পদার্থের প্রসারণ

তরলের নিজস্ব কোনো আকার না থাকায় এর কেবল আয়তন প্রসারণ বিবেচনা করা হয়। তরলকে কোনো পাত্রে রেখে উত্তপ্ত করলে পাত্র এবং তরল উভয়ই প্রসারিত হয়। এই কারণে তরলের প্রসারণ দুই প্রকার:

১. আপাত প্রসারণ (Apparent Expansion): পাত্রের প্রসারণকে উপেক্ষা করে তরলের যে প্রসারণ পরিমাপ করা হয়। ২. প্রকৃত প্রসারণ (Real Expansion): পাত্রের প্রসারণকে বিবেচনা করে তরলের যে প্রকৃত প্রসারণ হয়।

উত্তপ্ত করার সময় প্রথমে পাত্র প্রসারিত হওয়ায় তরলের স্তর নিচে নেমে আসে (A থেকে B), তারপর তরল প্রসারিত হয়ে চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছায় (B থেকে C)।

  • পাত্রের আয়তন প্রসারণ: V_AB
  • তরলের আপাত প্রসারণ: V_AC
  • তরলের প্রকৃত প্রসারণ: V_BC

এই প্রসারণগুলির মধ্যে সম্পর্কটি হলো: তরলের প্রকৃত প্রসারণ = তরলের আপাত প্রসারণ + পাত্রের প্রসারণ V_BC = V_AC + V_AB

তরলের প্রসারণ গুণাঙ্ক

  • আপাত প্রসারণ গুণাঙ্ক (γ_a): প্রতি একক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে, প্রতি একক আয়তনে তরলের যে আপাত প্রসারণ হয়।
  • প্রকৃত প্রসারণ গুণাঙ্ক (γ_r): প্রতি একক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে, প্রতি একক আয়তনে তরলের যে প্রকৃত প্রসারণ হয়।

গুণাঙ্কগুলির মধ্যে সম্পর্ক: γ_r = γ_a + γ_g (এখানে γ_g হলো পাত্রের উপাদানের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক)

গ্যাসের প্রসারণ

গ্যাসের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র আয়তন প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ। স্থির চাপে গ্যাসের আয়তন প্রসারণ তার প্রাথমিক আয়তন এবং উষ্ণতা বৃদ্ধির সমানুপাতিক।

  • গাণিতিক রূপ: V_t = V₀(1 + γ_p * t)
    • এখানে, 0°C উষ্ণতায় আয়তন = V₀
    • t°C উষ্ণতায় আয়তন = V_t
    • γ_p হলো স্থির চাপে গ্যাসের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক।

চার্লসের সূত্র (V_t = V₀(1 + t/273)) থেকে তুলনা করে পাওয়া যায়, সকল গ্যাসের জন্য আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক (γ_p)-এর মান প্রায় ধ্রুবক। γ_p = 1/273 °C⁻¹ ≈ 3.663 × 10⁻³ °C⁻¹

তাপ সঞ্চালন

উষ্ণ স্থান থেকে শীতল স্থানে তাপের প্রবাহকে তাপ সঞ্চালন বলা হয়। তাপ সঞ্চালনের তিনটি পদ্ধতি রয়েছে:

পদ্ধতি

মাধ্যম

বিবরণ

পরিবহন (Conduction)

কঠিন পদার্থ

পদার্থের অণুগুলির স্থান পরিবর্তন না ঘটিয়ে केवळ কম্পনের মাধ্যমে তাপ সঞ্চালিত হয়।

পরিচলন (Convection)

তরল ও গ্যাসীয় পদার্থ

পদার্থের অণুগুলির স্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে তাপ সঞ্চালিত হয়।

বিকিরণ (Radiation)

শূন্য মাধ্যম

কোনো মাধ্যম ছাড়াই তাপ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সঞ্চালিত হয়।

তাপের পরিবহন এবং পরিবাহিতাঙ্ক

তাপ পরিবহন (Heat Conduction): যে পদ্ধতিতে কোনো পদার্থের উষ্ণতর অংশ থেকে শীতলতর অংশে অণুগুলির কম্পনের দ্বারা তাপ সঞ্চালিত হয় কিন্তু অণুগুলির কোনো স্থানচ্যুতি ঘটে না, তাকে তাপের পরিবহন বলে।

পরিবাহিত তাপ (Q) চারটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে:

  1. ক্ষেত্রফল (A): Q ∝ A
  2. উষ্ণতার পার্থক্য (θ₁ – θ₂): Q ∝ (θ₁ - θ₂)
  3. সময় (t): Q ∝ t
  4. বেধ (d): Q ∝ 1/d

সমন্বিত রূপে সূত্রটি হলো: Q = K * A * (θ₁ - θ₂) * t / d এখানে K হলো পদার্থের তাপ পরিবাহিতাঙ্ক

তাপ পরিবাহিতাঙ্ক (K): একক বেধ ও একক প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফলযুক্ত কোনো পাতের দুই বিপরীত পৃষ্ঠের উষ্ণতার পার্থক্য একক হলে, স্থির অবস্থায় পাতের এক পৃষ্ঠ থেকে অপর পৃষ্ঠে লম্বভাবে প্রতি একক সময়ে যে পরিমাণ তাপ পরিবাহিত হয়, তাকে ওই পদার্থের তাপ পরিবাহিতাঙ্ক বলে।

  • মাত্রা: [MLT⁻³θ⁻¹]
  • SI একক: J m⁻¹ K⁻¹ s⁻¹ বা W m⁻¹ K⁻¹
  • CGS একক: cal cm⁻¹ °C⁻¹ s⁻¹
  • রূপান্তর: 1 cal cm⁻¹ °C⁻¹ s⁻¹ = 420 W m⁻¹ K⁻¹

তাপীয় রোধ এবং রোধাঙ্ক

  • তাপীয় রোধ (Thermal Resistance, R_H): যে ধর্মের জন্য কোনো পরিবাহী তার মধ্য দিয়ে তাপের পরিবহনকে বাধা দেয়, তাকে পরিবাহীর তাপীয় রোধ বলে।
    • R_H = d / (K * A)
  • তাপীয় রোধাঙ্ক (Thermal Resistivity, ρ): তাপ পরিবাহিতাঙ্কের অনোন্যককে (reciprocal) তাপীয় রোধাঙ্ক বলে।
    • ρ = 1/K
    • R_H = ρ * d / A
  • তাপীয় রোধের একক:
    • SI: J⁻¹sK বা K/W
    • CGS: cal⁻¹s°C

তাপের সুপরিবাহী ও কুপরিবাহী পদার্থ

  • সকল ধাতব পদার্থ তাপের সুপরিবাহী।
  • রূপা (Silver)-এর তাপ পরিবাহিতাঙ্ক সর্বাধিক।
  • পারদ (Mercury) একটি তরল ধাতু এবং তাপের সুপরিবাহী।
  • হীরে (Diamond)গ্রাফাইট (Graphite) অধাতু হলেও তাপের সুপরিবাহী।
    • তবে, হীরে তড়িতের কুপরিবাহী কিন্তু গ্রাফাইট তড়িতের সুপরিবাহী।
  • অধিকাংশ অধাতু তাপের কুপরিবাহী (Insulator)।

তাপের ঘটনাসমূহ: একটি বিশদ বিশ্লেষণ

কার্যনির্বাহী সারাংশ

এই নথিটি দশম শ্রেণীর ভৌত বিজ্ঞানের “তাপের ঘটনাসমূহ” অধ্যায়ের একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ প্রদান করে। এখানে তাপ ও তাপমাত্রার মৌলিক পার্থক্য, পদার্থের বিভিন্ন অবস্থায় (কঠিন, তরল ও গ্যাসীয়) তাপীয় প্রসারণের ধারণা এবং তাদের প্রসারণ গুণাঙ্কের বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। কঠিন পদার্থের ক্ষেত্রে দৈর্ঘ্য, ক্ষেত্রফল ও আয়তন প্রসারণ এবং তাদের গুণাঙ্ক α, β, ও γ-এর মধ্যে সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। তরলের আপাত ও প্রকৃত প্রসারণের পার্থক্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং গ্যাসের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্কের সার্বজনীন মান উল্লেখ করা হয়েছে। সবশেষে, তাপ সঞ্চালনের তিনটি পদ্ধতি—পরিবহন, পরিচলন ও বিকিরণ—এবং বিশেষত তাপ পরিবহনের নিয়ম, পরিবাহিতাঙ্ক, ও তাপীয় রোধের গাণিতিক ধারণাগুলি বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

ভূমিকা: তাপ ও তাপমাত্রা

তাপ এবং তাপমাত্রা দুটি ভিন্ন ভৌত রাশি, যদিও এরা পরস্পর সম্পর্কিত। তাপ হলো শক্তির একটি রূপ যা কোনো বস্তু গ্রহণ করলে উত্তপ্ত হয় এবং বর্জন করলে শীতল হয়, অন্যদিকে তাপমাত্রা হলো বস্তুর তাপীয় অবস্থা যা নির্ধারণ করে তাপ কোন বস্তু থেকে কোন বস্তুতে সঞ্চালিত হবে।

বৈশিষ্ট্য

তাপ (Heat)

তাপমাত্রা (Temperature)

সংজ্ঞা

তাপ এক প্রকার শক্তি, যা গ্রহণ করলে বস্তু উত্তপ্ত হয় এবং বর্জন করলে শীতল হয়।

তাপমাত্রা হলো বস্তুর এমন এক তাপীয় অবস্থা যা নির্দেশ করে তাপ কোন বস্তু থেকে কোন বস্তুতে প্রবাহিত হবে।

কারণ ও ফল

তাপ হলো তাপমাত্রার কারণ।

তাপমাত্রা হলো তাপের ফল।

একক (SI)

জুল (Joule)

কেলভিন (Kelvin)

একক (CGS)

ক্যালোরি (Calorie)

ডিগ্রি সেলসিয়াস (°C)

পরিমাপক যন্ত্র

ক্যালোরিমিটার

থার্মোমিটার

মাত্রা

[ML²T⁻²]

[θ]

তাপীয় প্রসারণ: একটি সার্বিক ধারণা

তাপ প্রয়োগের ফলে কোনো বস্তুর আকার বা আয়তনের যে প্রসারণ হয়, তাকে পদার্থের তাপীয় প্রসারণ বলে। তাপ প্রয়োগে বস্তুর উষ্ণতা বৃদ্ধি পায় এবং তাপ বর্জন করলে উষ্ণতা হ্রাস পায়। উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে বস্তু প্রসারিত হয় এবং উষ্ণতা হ্রাসের ফলে সংকুচিত হয়। পদার্থের তিনটি অবস্থাতেই—কঠিন, তরল ও গ্যাসীয়—তাপীয় প্রসারণ ঘটে।

কঠিন পদার্থের প্রসারণ

কঠিন পদার্থের নির্দিষ্ট আকার ও আয়তন থাকায় এর তিন ধরনের প্রসারণ লক্ষ্য করা যায়: ১. দৈর্ঘ্য প্রসারণ: তাপ প্রয়োগে কোনো কঠিন দণ্ডের দৈর্ঘ্য বরাবর প্রসারণ। ২. ক্ষেত্র প্রসারণ: তাপ প্রয়োগে কোনো কঠিন পাতের ক্ষেত্রফলের প্রসারণ। ৩. আয়তন প্রসারণ: তাপ প্রয়োগে কোনো কঠিন বস্তুর আয়তনের প্রসারণ।

দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক (α)

সংজ্ঞা: একক দৈর্ঘ্যের কোনো দণ্ডের উষ্ণতা ১° বৃদ্ধি করলে দণ্ডটির যে পরিমাণ দৈর্ঘ্য প্রসারণ হয়, তাকে ওই পদার্থের দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক (α) বলে।

  • গাণিতিক রূপ: L₂ = L₁[1 + α(t₂ - t₁)]
    • এখানে, t₁ উষ্ণতায় প্রাথমিক দৈর্ঘ্য = L₁
    • t₂ উষ্ণতায় অন্তিম দৈর্ঘ্য = L₂
  • মাত্রা: [θ⁻¹]
  • SI একক: K⁻¹
  • CGS একক: °C⁻¹

ক্ষেত্র প্রসারণ গুণাঙ্ক (β)

সংজ্ঞা: একক ক্ষেত্রফল বিশিষ্ট কোনো পাতের উষ্ণতা ১° বৃদ্ধি করলে পাতটির যে পরিমাণ ক্ষেত্র প্রসারণ হয়, তাকে ওই পদার্থের ক্ষেত্র প্রসারণ গুণাঙ্ক (β) বলে।

  • গাণিতিক রূপ: S₂ - S₁ = β * S₁ * (t₂ - t₁)
    • এখানে, t₁ উষ্ণতায় প্রাথমিক ক্ষেত্রফল = S₁
    • t₂ উষ্ণতায় অন্তিম ক্ষেত্রফল = S₂
  • মাত্রা: [θ⁻¹]
  • SI একক: K⁻¹
  • CGS একক: °C⁻¹

আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক (γ)

সংজ্ঞা: একক আয়তনবিশিষ্ট কোনো পদার্থের উষ্ণতা ১° বৃদ্ধি করলে পদার্থটির যে পরিমাণ আয়তন প্রসারণ হয়, তাকে ওই পদার্থের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক (γ) বলে।

  • গাণিতিক রূপ: v₂ = v₁[1 + γ(t₂ - t₁)]
    • এখানে, t₁ উষ্ণতায় প্রাথমিক আয়তন = v₁
    • t₂ উষ্ণতায় অন্তিম আয়তন = v₂
  • মাত্রা: [θ⁻¹]
  • SI একক: K⁻¹
  • CGS একক: °C⁻¹

গুণাঙ্কগুলির মধ্যে সম্পর্ক

কঠিন পদার্থের তিনটি প্রসারণ গুণাঙ্কের মধ্যে সম্পর্কটি হলো: α : β : γ = 1 : 2 : 3 অর্থাৎ, β = 2α এবং γ = 3α

তরল পদার্থের প্রসারণ

তরলের নিজস্ব কোনো আকার না থাকায় এর কেবল আয়তন প্রসারণ বিবেচনা করা হয়। তরলকে কোনো পাত্রে রেখে উত্তপ্ত করলে পাত্র এবং তরল উভয়ই প্রসারিত হয়। এই কারণে তরলের প্রসারণ দুই প্রকার:

১. আপাত প্রসারণ (Apparent Expansion): পাত্রের প্রসারণকে উপেক্ষা করে তরলের যে প্রসারণ পরিমাপ করা হয়। ২. প্রকৃত প্রসারণ (Real Expansion): পাত্রের প্রসারণকে বিবেচনা করে তরলের যে প্রকৃত প্রসারণ হয়।

উত্তপ্ত করার সময় প্রথমে পাত্র প্রসারিত হওয়ায় তরলের স্তর নিচে নেমে আসে (A থেকে B), তারপর তরল প্রসারিত হয়ে চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছায় (B থেকে C)।

  • পাত্রের আয়তন প্রসারণ: V_AB
  • তরলের আপাত প্রসারণ: V_AC
  • তরলের প্রকৃত প্রসারণ: V_BC

এই প্রসারণগুলির মধ্যে সম্পর্কটি হলো: তরলের প্রকৃত প্রসারণ = তরলের আপাত প্রসারণ + পাত্রের প্রসারণ V_BC = V_AC + V_AB

তরলের প্রসারণ গুণাঙ্ক

  • আপাত প্রসারণ গুণাঙ্ক (γ_a): প্রতি একক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে, প্রতি একক আয়তনে তরলের যে আপাত প্রসারণ হয়।
  • প্রকৃত প্রসারণ গুণাঙ্ক (γ_r): প্রতি একক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে, প্রতি একক আয়তনে তরলের যে প্রকৃত প্রসারণ হয়।

গুণাঙ্কগুলির মধ্যে সম্পর্ক: γ_r = γ_a + γ_g (এখানে γ_g হলো পাত্রের উপাদানের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক)

গ্যাসের প্রসারণ

গ্যাসের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র আয়তন প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ। স্থির চাপে গ্যাসের আয়তন প্রসারণ তার প্রাথমিক আয়তন এবং উষ্ণতা বৃদ্ধির সমানুপাতিক।

  • গাণিতিক রূপ: V_t = V₀(1 + γ_p * t)
    • এখানে, 0°C উষ্ণতায় আয়তন = V₀
    • t°C উষ্ণতায় আয়তন = V_t
    • γ_p হলো স্থির চাপে গ্যাসের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক।

চার্লসের সূত্র (V_t = V₀(1 + t/273)) থেকে তুলনা করে পাওয়া যায়, সকল গ্যাসের জন্য আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক (γ_p)-এর মান প্রায় ধ্রুবক। γ_p = 1/273 °C⁻¹ ≈ 3.663 × 10⁻³ °C⁻¹

তাপ সঞ্চালন

উষ্ণ স্থান থেকে শীতল স্থানে তাপের প্রবাহকে তাপ সঞ্চালন বলা হয়। তাপ সঞ্চালনের তিনটি পদ্ধতি রয়েছে:

পদ্ধতি

মাধ্যম

বিবরণ

পরিবহন (Conduction)

কঠিন পদার্থ

পদার্থের অণুগুলির স্থান পরিবর্তন না ঘটিয়ে केवळ কম্পনের মাধ্যমে তাপ সঞ্চালিত হয়।

পরিচলন (Convection)

তরল ও গ্যাসীয় পদার্থ

পদার্থের অণুগুলির স্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে তাপ সঞ্চালিত হয়।

বিকিরণ (Radiation)

শূন্য মাধ্যম

কোনো মাধ্যম ছাড়াই তাপ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সঞ্চালিত হয়।

তাপের পরিবহন এবং পরিবাহিতাঙ্ক

তাপ পরিবহন (Heat Conduction): যে পদ্ধতিতে কোনো পদার্থের উষ্ণতর অংশ থেকে শীতলতর অংশে অণুগুলির কম্পনের দ্বারা তাপ সঞ্চালিত হয় কিন্তু অণুগুলির কোনো স্থানচ্যুতি ঘটে না, তাকে তাপের পরিবহন বলে।

পরিবাহিত তাপ (Q) চারটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে:

  1. ক্ষেত্রফল (A): Q ∝ A
  2. উষ্ণতার পার্থক্য (θ₁ – θ₂): Q ∝ (θ₁ - θ₂)
  3. সময় (t): Q ∝ t
  4. বেধ (d): Q ∝ 1/d

সমন্বিত রূপে সূত্রটি হলো: Q = K * A * (θ₁ - θ₂) * t / d এখানে K হলো পদার্থের তাপ পরিবাহিতাঙ্ক

তাপ পরিবাহিতাঙ্ক (K): একক বেধ ও একক প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফলযুক্ত কোনো পাতের দুই বিপরীত পৃষ্ঠের উষ্ণতার পার্থক্য একক হলে, স্থির অবস্থায় পাতের এক পৃষ্ঠ থেকে অপর পৃষ্ঠে লম্বভাবে প্রতি একক সময়ে যে পরিমাণ তাপ পরিবাহিত হয়, তাকে ওই পদার্থের তাপ পরিবাহিতাঙ্ক বলে।

  • মাত্রা: [MLT⁻³θ⁻¹]
  • SI একক: J m⁻¹ K⁻¹ s⁻¹ বা W m⁻¹ K⁻¹
  • CGS একক: cal cm⁻¹ °C⁻¹ s⁻¹
  • রূপান্তর: 1 cal cm⁻¹ °C⁻¹ s⁻¹ = 420 W m⁻¹ K⁻¹

তাপীয় রোধ এবং রোধাঙ্ক

  • তাপীয় রোধ (Thermal Resistance, R_H): যে ধর্মের জন্য কোনো পরিবাহী তার মধ্য দিয়ে তাপের পরিবহনকে বাধা দেয়, তাকে পরিবাহীর তাপীয় রোধ বলে।
    • R_H = d / (K * A)
  • তাপীয় রোধাঙ্ক (Thermal Resistivity, ρ): তাপ পরিবাহিতাঙ্কের অনোন্যককে (reciprocal) তাপীয় রোধাঙ্ক বলে।
    • ρ = 1/K
    • R_H = ρ * d / A
  • তাপীয় রোধের একক:
    • SI: J⁻¹sK বা K/W
    • CGS: cal⁻¹s°C

তাপের সুপরিবাহী ও কুপরিবাহী পদার্থ

  • সকল ধাতব পদার্থ তাপের সুপরিবাহী।
  • রূপা (Silver)-এর তাপ পরিবাহিতাঙ্ক সর্বাধিক।
  • পারদ (Mercury) একটি তরল ধাতু এবং তাপের সুপরিবাহী।
  • হীরে (Diamond)গ্রাফাইট (Graphite) অধাতু হলেও তাপের সুপরিবাহী।
    • তবে, হীরে তড়িতের কুপরিবাহী কিন্তু গ্রাফাইট তড়িতের সুপরিবাহী।
  • অধিকাংশ অধাতু তাপের কুপরিবাহী (Insulator)।
YouTube player

তাপের ঘটনাসমূহ: দশম শ্রেণীর পাঠ সহায়িকা

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

১. তাপ ও তাপমাত্রার মধ্যে দুটি প্রধান পার্থক্য উল্লেখ করুন।

২. কঠিন পদার্থের দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক (α) বলতে কী বোঝায়? এর SI একক কী?

৩. তরলের প্রকৃত প্রসারণ ও আপাত প্রসারণের মধ্যে সম্পর্কটি কী? সমীকরণসহ ব্যাখ্যা করুন।

৪. তাপ পরিবাহিতাঙ্ক (K) কাকে বলে? কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে পরিবাহিত তাপের পরিমাণ কোন কোন বিষয়ের উপর নির্ভর করে?

৫. স্থির চাপে গ্যাসের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্কের মান কত? এই মানটি কোন সূত্র থেকে পাওয়া যায়?

৬. তাপীয় রোধ কী? এর সাথে তাপ পরিবাহিতাঙ্কের (K) সম্পর্ক কী?

৭. কঠিন পদার্থের দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক (α), ক্ষেত্র প্রসারণ গুণাঙ্ক (β), এবং আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক (γ)-এর মধ্যে সম্পর্কটি প্রতিষ্ঠা করুন।

৮. তাপ সঞ্চালনের তিনটি পদ্ধতি কী কী? প্রত্যেকটি পদ্ধতি মূলত কোন মাধ্যমে ঘটে?

৯. হীরে এবং গ্রাফাইট অধাতু হওয়া সত্ত্বেও তাদের তাপ পরিবাহিতা কেমন? এদের মধ্যে তড়িৎ পরিবাহিতার পার্থক্য কী?

১০. তরলের আপাত প্রসারণ গুণাঙ্ক (γa) ও প্রকৃত প্রসারণ গুণাঙ্ক (γr)-এর মধ্যে কোনটি বেশি এবং কেন?

——————————————————————————–

উত্তরমালা (Answer Key)

১. তাপ ও তাপমাত্রার প্রধান পার্থক্য হলো:

  • সংজ্ঞা: তাপ এক প্রকার শক্তি যা গ্রহণ করলে বস্তু উষ্ণ হয় এবং বর্জন করলে শীতল হয়। অন্যদিকে, তাপমাত্রা হলো বস্তুর এমন এক তাপীয় অবস্থা যা নির্ধারণ করে বস্তুটি অন্য বস্তুকে তাপ দেবে না অন্য বস্তু থেকে তাপ গ্রহণ করবে।
  • কারণ ও ফলাফল: তাপ হলো কারণ এবং তাপমাত্রা হলো তার ফলাফল। তাপের SI একক জুল (J), আর তাপমাত্রার SI একক কেলভিন (K)।

২. একক দৈর্ঘ্যের কোনো দণ্ডের উষ্ণতা ১ ডিগ্রী বৃদ্ধি করলে দণ্ডটির যে পরিমাণ দৈর্ঘ্য প্রসারণ হয়, তাকে ওই পদার্থের দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক (α) বলে। এর SI একক হলো কেলভিন⁻¹ (K⁻¹)।

৩. তরলের প্রকৃত প্রসারণ সর্বদা আপাত প্রসারণ ও পাত্রের প্রসারণের যোগফলের সমান হয়। অর্থাৎ, তরলের প্রকৃত প্রসারণ = তরলের আপাত প্রসারণ + পাত্রের প্রসারণ। গুণাঙ্কের ক্ষেত্রে সম্পর্কটি হলো: γr = γa + γg, যেখানে γr প্রকৃত প্রসারণ গুণাঙ্ক, γa আপাত প্রসারণ গুণাঙ্ক এবং γg পাত্রের প্রসারণ গুণাঙ্ক।

৪. কোনো পদার্থের একক বেধ ও একক প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফলযুক্ত একটি পাতের দুই বিপরীত পৃষ্ঠের উষ্ণতার পার্থক্য একক হলে, স্থিতাবস্থায় পাতের এক পৃষ্ঠ থেকে অপর পৃষ্ঠে লম্বভাবে একক সময়ে যে তাপ পরিবাহিত হয়, তাকে ওই পদার্থের তাপ পরিবাহিতাঙ্ক (K) বলে। পরিবাহিত তাপ (Q) পরিবাহীর প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল (A), দুই প্রান্তের উষ্ণতার পার্থক্য (θ₁ – θ₂), সময় (t) এবং পদার্থের বেধের (d) ব্যস্তানুপাতের উপর নির্ভরশীল।

৫. স্থির চাপে সকল গ্যাসের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্কের মান ১/২৭৩ °C⁻¹ বা ৩.৬৬৩ × ১০⁻³ °C⁻¹। এই মানটি চার্লসের সূত্র থেকে পাওয়া যায়, যেখানে বলা হয়েছে স্থির চাপে নির্দিষ্ট ভরের গ্যাসের আয়তন প্রতি ডিগ্রী সেলসিয়াস উষ্ণতা বৃদ্ধি বা হ্রাসের জন্য ০°C উষ্ণতায় ওই গ্যাসের আয়তনের ১/২৭৩ অংশ বৃদ্ধি বা হ্রাস পায়।

৬. যে ধর্মের জন্য কোনো পরিবাহী তার মধ্য দিয়ে তাপের পরিবহনকে বাধা দেয়, তাকে ওই পরিবাহীর তাপীয় রোধ বলে। তাপীয় রোধ (R) তাপ পরিবাহিতাঙ্কের (K) ব্যস্তানুপাতিক, অর্থাৎ R = d / (K * A)। সুতরাং, যে পদার্থের পরিবাহিতাঙ্ক যত বেশি, তার তাপীয় রোধ তত কম।

৭. কঠিন পদার্থের দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক (α), ক্ষেত্র প্রসারণ গুণাঙ্ক (β), এবং আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক (γ)-এর মধ্যে সম্পর্কটি হলো α : β : γ = ১ : ২ : ৩। এখান থেকে পাওয়া যায়, β = ২α এবং γ = ৩α

৮. তাপ সঞ্চালনের তিনটি পদ্ধতি হলো:

  • পরিবহন (Conduction): কঠিন মাধ্যমে ঘটে।
  • পরিচলন (Convection): তরল ও গ্যাসীয় মাধ্যমে ঘটে।
  • বিকিরণ (Radiation): শূন্য মাধ্যমেও ঘটতে পারে।

৯. হীরে এবং গ্রাফাইট উভয়ই অধাতু হলেও তাপের সুপরিবাহী। তবে এদের মধ্যে তড়িৎ পরিবাহিতার পার্থক্য রয়েছে; হীরে তড়িতের কুপরিবাহী কিন্তু গ্রাফাইট তড়িতের সুপরিবাহী।

১০. তরলের প্রকৃত প্রসারণ গুণাঙ্ক (γr) সর্বদা আপাত প্রসারণ গুণাঙ্কের (γa) চেয়ে বেশি হয়। কারণ, তরলকে উত্তপ্ত করার সময় পাত্রেরও প্রসারণ ঘটে, যার ফলে তরলের প্রসারণের একটি অংশ বোঝা যায় না। প্রকৃত প্রসারণ হলো তরলের নিজস্ব প্রসারণ এবং আপাত প্রসারণের যোগফল, তাই γr > γa।

——————————————————————————–

রচনাধর্মী প্রশ্ন (Essay Questions)

১. কঠিন পদার্থের দৈর্ঘ্য, ক্ষেত্রফল ও আয়তন প্রসারণ এবং তাদের গুণাঙ্কগুলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করুন। দেখান যে β = ২α এবং γ = ৩α

২. একটি পরীক্ষার সাহায্যে তরলের আপাত ও প্রকৃত প্রসারণের ধারণা ব্যাখ্যা করুন। তরলের প্রকৃত প্রসারণ গুণাঙ্ক, আপাত প্রসারণ গুণাঙ্ক এবং পাত্রের উপাদানের প্রসারণ গুণাঙ্কের মধ্যে সম্পর্কটি (γr = γa + γg) প্রতিষ্ঠা করুন।

৩. তাপ পরিবাহিতাঙ্ক (K) এর সংজ্ঞা দিন। কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে তাপ পরিবহনের হার কোন কোন বিষয়ের উপর নির্ভর করে? গাণিতিক রাশিমালাটি (Q = KA(θ₁ – θ₂)t / d) প্রতিষ্ঠা করুন।

৪. তাপ ও তাপমাত্রার মধ্যে ধারণা, একক, মাত্রা এবং পরিমাপক যন্ত্রের উপর ভিত্তি করে বিস্তারিত পার্থক্য আলোচনা করুন।

৫. তাপীয় রোধ এবং তাপীয় রোধাঙ্ক বলতে কী বোঝো? এদের মধ্যে সম্পর্ক কী? প্রমাণ করুন যে, তাপীয় রোধাঙ্ক (ρ) হলো তাপ পরিবাহিতাঙ্কের (K) অন্যোন্যক, অর্থাৎ ρ = ১/K

——————————————————————————–

গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা (Glossary)

পরিভাষা (Term)

সংজ্ঞা (Definition)

তাপ (Heat)

তাপ এক প্রকার শক্তি, যা গ্রহণ করলে বস্তু উষ্ণ হয় এবং বর্জন করলে বস্তু শীতল হয়।

তাপমাত্রা (Temperature)

তাপমাত্রা হলো বস্তুর এমন এক তাপীয় অবস্থা যা নির্ধারণ করে বস্তুটি অন্য বস্তুর সংস্পর্শে এলে তাপ দেবে না নেবে।

তাপীয় প্রসারণ (Thermal Expansion)

তাপ প্রয়োগের ফলে কোনো বস্তুর আকৃতি বা আয়তনের যে প্রসারণ হয়, তাকে ওই পদার্থের তাপীয় প্রসারণ বলে।

দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক (α)

একক দৈর্ঘ্যের কোনো দণ্ডের উষ্ণতা ১° বৃদ্ধি করলে দণ্ডটির যে পরিমাণ দৈর্ঘ্য প্রসারণ হয়, তাকে ওই পদার্থের দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক বলে।

ক্ষেত্র প্রসারণ গুণাঙ্ক (β)

একক ক্ষেত্রফল বিশিষ্ট কোনো পাতের উষ্ণতা ১° বৃদ্ধি করলে পাতটির যে পরিমাণ ক্ষেত্র প্রসারণ হয়, তাকে ওই পদার্থের ক্ষেত্র প্রসারণ গুণাঙ্ক বলে।

আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক (γ)

একক আয়তন বিশিষ্ট কোনো পদার্থের উষ্ণতা ১° বৃদ্ধি করলে পদার্থটির যে পরিমাণ আয়তন প্রসারণ হয়, তাকে ওই পদার্থের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক বলে।

আপাত প্রসারণ (Apparent Expansion)

পাত্রের প্রসারণকে উপেক্ষা করে তরলের যে প্রসারণকে আপাতদৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করা হয়, তাকে তরলের আপাত প্রসারণ বলে।

প্রকৃত প্রসারণ (Real Expansion)

পাত্রের প্রসারণকে গণ্য করে তরলের যে প্রকৃত আয়তন বৃদ্ধি ঘটে, তাকে তরলের প্রকৃত প্রসারণ বলে।

আপাত প্রসারণ গুণাঙ্ক (γa)

কোনো তরলের উষ্ণতা প্রতি একক বৃদ্ধিতে, প্রতি একক আয়তনে যে আপাত প্রসারণ হয়, তাকে ওই তরলের আপাত প্রসারণ গুণাঙ্ক বলে।

প্রকৃত প্রসারণ গুণাঙ্ক (γr)

কোনো তরলের উষ্ণতা প্রতি একক বৃদ্ধিতে, প্রতি একক আয়তনে যে প্রকৃত প্রসারণ হয়, তাকে ওই তরলের প্রকৃত প্রসারণ গুণাঙ্ক বলে।

গ্যাসের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক (γp)

চাপ স্থির রেখে নির্দিষ্ট ভরের কোনো গ্যাসের উষ্ণতা ০°C থেকে ১°C বৃদ্ধি করলে গ্যাসটির প্রতি একক আয়তনে যে আয়তন প্রসারণ হয়, তাকে ওই গ্যাসের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক বলে।

তাপ সঞ্চালন (Heat Transmission)

উষ্ণ স্থান থেকে শীতল স্থানের দিকে তাপের প্রবাহকে তাপ সঞ্চালন বলে।

পরিবহন (Conduction)

যে পদ্ধতিতে কোনো পদার্থের উষ্ণতর স্থান থেকে শীতলতর স্থানে কণাগুলির স্থানচ্যুতি না ঘটিয়ে শুধুমাত্র কম্পনের মাধ্যমে তাপ সঞ্চালিত হয়, তাকে পরিবহন বলে।

তাপ পরিবাহিতা (Thermal Conductivity)

পদার্থের তাপ পরিবহণ করার ক্ষমতাকে তার তাপ পরিবাহিতা বলে।

তাপ পরিবাহিতাঙ্ক (K)

কোনো পদার্থের একক বেধ ও একক প্রস্থচ্ছেদের পাতের দুই বিপরীত পৃষ্ঠের উষ্ণতার পার্থক্য একক হলে, এক পৃষ্ঠ থেকে অন্য পৃষ্ঠে লম্বভাবে একক সময়ে যে তাপ পরিবাহিত হয়, তাকে ওই পদার্থের তাপ পরিবাহিতাঙ্ক বলে।

তাপীয় রোধ (Thermal Resistance)

যে ধর্মের জন্য কোনো পরিবাহী তার মধ্য দিয়ে তাপের পরিবহনকে বাধা দেয়, তাকে পরিবাহীর তাপীয় রোধ বলে।

তাপীয় রোধাঙ্ক (ρ)

তাপীয় রোধাঙ্ক হলো তাপ পরিবাহিতাঙ্কের অন্যোন্যক (ρ = ১/K) এবং এটি পদার্থের একটি বৈশিষ্ট্যসূচক ধর্ম।

তাপের ঘটনাসমূহ: দশম শ্রেণীর ভৌত বিজ্ঞানের একটি সহজপাঠ

ভূমিকা (Introduction)

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের দশম শ্রেণীর সকল ছাত্রছাত্রীকে স্বাগত! ভৌত বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হল ‘তাপের ঘটনাসমূহ’। এই অধ্যায়ের তাপ, তাপমাত্রা এবং তাপীয় প্রসারণের ধারণাগুলো খুবই মজার এবং সহজ।

এই সহায়িকাটি তোমাদের কথা ভেবেই তৈরি করা হয়েছে। এখানে আমরা প্রতিটি বিষয়কে সহজভাবে ধাপে ধাপে বুঝব, যাতে তোমরা খুব সহজেই ধারণাগুলো আয়ত্ত করতে পারো এবং মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য আত্মবিশ্বাসের সাথে প্রস্তুতি নিতে পারো। চলো, শুরু করা যাক!

——————————————————————————–

1. মৌলিক ধারণা: তাপ এবং তাপমাত্রা (Fundamental Concepts: Heat and Temperature)

শুরুতেই আমাদের দুটি মৌলিক বিষয়—তাপ এবং তাপমাত্রা—এর মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে। যদিও আমরা কথা বলার সময় শব্দ দুটি প্রায় একসাথেই ব্যবহার করি, বিজ্ঞানে এদের অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন।

তাপ (Heat) হলো এক প্রকার শক্তি। কোনো বস্তু এই শক্তি গ্রহণ করলে গরম হয় এবং বর্জন করলে ঠান্ডা হয়। সহজ কথায়, তাপ হলো তাপমাত্রার কারণ

তাপমাত্রা (Temperature) হলো কোনো বস্তুর তাপীয় অবস্থা, যা ঠিক করে দেয় ওই বস্তু থেকে অন্য বস্তুতে তাপ যাবে, নাকি অন্য বস্তু থেকে ওই বস্তুতে তাপ আসবে। অর্থাৎ, তাপমাত্রা হলো তাপের ফল

নিচের সারণিটি এই দুটি ধারণার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করবে:

তুলনার বিষয়

তাপ (Heat)

তাপমাত্রা (Temperature)

সংজ্ঞা (Definition)

এটি এক প্রকার শক্তি এবং তাপমাত্রার কারণ

এটি বস্তুর তাপীয় অবস্থা এবং তাপের ফল

একক (Units)

SI: জুল (Joule)<br>CGS: ক্যালোরি (Calorie)

SI: কেলভিন (Kelvin)<br>CGS: ডিগ্রি সেলসিয়াস (°C)

পরিমাপক যন্ত্র

ক্যালোরিমিটার (Calorimeter)

থার্মোমিটার (Thermometer)

মাত্রা (Dimensional Formula)

[ML²T⁻²]

[θ]

এখন যেহেতু আমরা তাপ ও তাপমাত্রার মধ্যে মূল পার্থক্য বুঝতে পেরেছি, চলো দেখি তাপ প্রয়োগ করলে পদার্থের ওপর এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব—প্রসারণ—কীভাবে ঘটে।

——————————————————————————–

2. তাপীয় প্রসারণ: পদার্থের আকার বৃদ্ধি (Thermal Expansion: The Increase in Size of Matter)

খুব সহজভাবে বললে, তাপীয় প্রসারণ হলো তাপ প্রয়োগের ফলে কোনো বস্তুর আকার (দৈর্ঘ্য, ক্ষেত্রফল বা আয়তন) বেড়ে যাওয়া। এর ঠিক বিপরীত ঘটনাটি হলো সংকোচন, যা তাপ বর্জন করলে ঘটে।

পদার্থের তিনটি অবস্থাতেই—কঠিন, তরল এবং গ্যাসীয়—তাপীয় প্রসারণ দেখা যায়। আমরা একে একে প্রতিটি আলোচনা করব।

2.1. কঠিন পদার্থের প্রসারণ (Expansion in Solids)

কঠিন পদার্থের নির্দিষ্ট আকার থাকায়, তাপ প্রয়োগ করলে এদের তিন ধরনের প্রসারণ হতে পারে: দৈর্ঘ্য, ক্ষেত্রফল এবং আয়তন।

দৈর্ঘ্য প্রসারণ (Linear Expansion) তাপ প্রয়োগের ফলে কোনো কঠিন বস্তুর দৈর্ঘ্যে যে বৃদ্ধি ঘটে, তাকে দৈর্ঘ্য প্রসারণ বলা হয়। এই প্রসারণ পরিমাপ করার জন্য আমরা দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক (Coefficient of Linear Expansion, α) ব্যবহার করি।

একক দৈর্ঘ্যের কোনো দণ্ডের উষ্ণতা 1° বৃদ্ধি করলে দণ্ডটির যে পরিমাণ দৈর্ঘ্য প্রসারণ হয় তাকে ওই পদার্থের দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক (α) বলে।

এর গাণিতিক সূত্রটি হলো: L₂ = L₁[1 + α(t₂ – t₁)] এখানে, L₁ হলো প্রাথমিক দৈর্ঘ্য, L₂ হলো অন্তিম দৈর্ঘ্য, এবং (t₂ – t₁) হলো উষ্ণতার পরিবর্তন।

ক্ষেত্র প্রসারণ (Superficial/Area Expansion) তাপ প্রয়োগের ফলে কোনো কঠিন পাতের পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল বৃদ্ধি পেলে তাকে ক্ষেত্র প্রসারণ বলে। এর জন্য আমরা ক্ষেত্র প্রসারণ গুণাঙ্ক (Coefficient of Area Expansion, β) ব্যবহার করি।

একক ক্ষেত্রফল বিশিষ্ট কোনো পাতের উষ্ণতা 1° বৃদ্ধি করলে পাতটির যে পরিমাণ ক্ষেত্র প্রসারণ হয় তাকে ওই পদার্থের ক্ষেত্র প্রসারণ গুণাঙ্ক (β) বলে।

এর গাণিতিক সূত্রটি হলো: S₂ = S₁[1 + β(t₂ – t₁)]

আয়তন প্রসারণ (Volume Expansion) তাপ প্রয়োগের ফলে কোনো কঠিন বস্তুর সমগ্র আয়তনের বৃদ্ধিকে আয়তন প্রসারণ বলা হয়। এটি পরিমাপ করা হয় আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক (Coefficient of Volume Expansion, γ) দ্বারা।

একক আয়তন বিশিষ্ট কোনো বস্তুর উষ্ণতা 1° বৃদ্ধি করলে বস্তুটির যে পরিমাণ আয়তন প্রসারণ হয় তাকে ওই পদার্থের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক (γ) বলে।

এর গাণিতিক সূত্রটি হলো: V₂ = V₁[1 + γ(t₂ – t₁)]

Insightful Synthesis: α, β, এবং γ-এর মধ্যে সম্পর্ক যেকোনো একটি নির্দিষ্ট কঠিন পদার্থের ক্ষেত্রে এই তিনটি প্রসারণ গুণাঙ্ক একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। এদের মধ্যে সম্পর্কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মনে রাখা সহজ।

সম্পর্কটি হলো: α : β : γ = 1 : 2 : 3

এর মানে হলো, β = 2α এবং γ = 3α। এই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, যদি আমরা কোনো পদার্থের শুধু দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক (α) জানি, তাহলে খুব সহজেই তার ক্ষেত্র (β) এবং আয়তন (γ) প্রসারণ গুণাঙ্ক বের করতে পারব। এটি অঙ্ক সমাধানের জন্য একটি অপরিহার্য সূত্র।

কঠিন পদার্থের মতো তরল পদার্থেরও প্রসারণ ঘটে, কিন্তু এখানে একটি মজার ব্যাপার আছে যা আমাদের জানতে হবে।

2.2. তরল পদার্থের প্রসারণ (Expansion in Liquids)

কঠিন পদার্থের মতো তরলের নির্দিষ্ট আকার না থাকায়, এদের শুধুমাত্র আয়তন প্রসারণ হয়।

কিন্তু তরলের প্রসারণ পরিমাপ করার সময় একটি বিষয় মনে রাখতে হয়: তরলকে সব সময় কোনো পাত্রে রেখে গরম করা হয়। ফলে তাপ দিলে তরলের সাথে সাথে পাত্রেরও প্রসারণ ঘটে। এই কারণে আমরা তরলের দুই ধরনের প্রসারণ পাই।

  • আপাত প্রসারণ (Apparent Expansion): পাত্রের প্রসারণকে অগ্রাহ্য করে আমরা তরলের যে প্রসারণ দেখি, তাকে আপাত প্রসারণ বলে। এটি আমাদের চোখে দেখা প্রসারণ।
  • প্রকৃত প্রসারণ (Real Expansion): পাত্রের প্রসারণকে গণনার মধ্যে ধরে তরলের যে আসল বা প্রকৃত প্রসারণ হয়, তাকে প্রকৃত প্রসারণ বলে।

এই দুটি প্রসারণের মধ্যে সম্পর্কটি হলো: তরলের প্রকৃত প্রসারণ = তরলের আপাত প্রসারণ + পাত্রের প্রসারণ

এই সম্পর্ক থেকে আমরা প্রসারণ গুণাঙ্কের সম্পর্কটিও পাই। যদি প্রকৃত প্রসারণ গুণাঙ্ক γᵣ (r for Real), আপাত প্রসারণ গুণাঙ্ক γₐ (a for Apparent) এবং পাত্রের উপাদানের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক γg হয়, তবে সম্পর্কটি দাঁড়ায়: γᵣ = γₐ + γg

2.3. গ্যাসীয় পদার্থের প্রসারণ (Expansion in Gases)

কঠিন ও তরলের মতো গ্যাসীয় পদার্থেরও তাপ প্রয়োগে প্রসারণ হয়। যদি চাপ স্থির রাখা হয়, তাহলে তাপ দিলে গ্যাসের আয়তন বৃদ্ধি পায়।

এই ধারণাটি চার্লসের সূত্র (Charles’s Law)-এর সাথে সম্পর্কিত। গ্যাসের আয়তন প্রসারণের সূত্রটি হলো: Vₜ = V₀(1 + γₚt)

এখানে, V₀ হলো 0°C উষ্ণতায় গ্যাসের আয়তন, Vₜ হলো t°C উষ্ণতায় গ্যাসের আয়তন এবং γₚ হলো স্থির চাপে গ্যাসের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক।

গ্যাসীয় পদার্থের প্রসারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি হলো: সকল গ্যাসের ক্ষেত্রে আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক (γₚ)-এর মান সমান এবং তা হলো 1/273 °C⁻¹।

এটি কঠিন বা তরল পদার্থের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, কারণ কঠিন ও তরলের ক্ষেত্রে প্রসারণ গুণাঙ্কের মান তাদের উপাদানের ওপর নির্ভর করে, কিন্তু গ্যাসের ক্ষেত্রে তা করে না।

——————————————————————————–

3. উপসংহার (Conclusion)

এই আলোচনায় আমরা তাপের কিছু মৌলিক ঘটনা সম্পর্কে জানলাম। আমরা দেখলাম কীভাবে তাপ ও তাপমাত্রা একে অপরের থেকে আলাদা এবং তাপ প্রয়োগ করলে কঠিন, তরল ও গ্যাসীয় পদার্থের প্রসারণ ঘটে।

পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নিচের তিনটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখবে:

  1. তাপ হল শক্তির একটি রূপ এবং তাপমাত্রার কারণ, অন্যদিকে তাপমাত্রা হল একটি তাপীয় অবস্থা এবং তাপের ফল
  2. কঠিন পদার্থের তিন প্রকার প্রসারণ গুণাঙ্কের (α, β, γ) মধ্যে সম্পর্কটি হল α : β : γ = 1 : 2 : 3
  3. তরলের ক্ষেত্রে প্রকৃত প্রসারণআপাত প্রসারণ দুটি ভিন্ন বিষয়, এবং সকল গ্যাসের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্কের মান স্থির (1/273 °C⁻¹)।

আশা করি এই আলোচনা তোমাদের প্রস্তুতিতে সাহায্য করবে। তোমাদের পড়াশোনা এবং পরীক্ষার জন্য অনেক শুভেচ্ছা রইল!

heat-2_sahaj shiksha

তাপের অভিযান: তাপ কীভাবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যায়?

ভূমিকা: গরম চামচ থেকে গরম চায়ের কাপ

গরম চায়ে একটি ধাতব চামচ ডুবিয়ে রাখলে কিছুক্ষণ পর চামচের হাতলটি গরম হয়ে ওঠে কেন? আমার ক্লাসে প্রায়ই ছাত্রছাত্রীরা এই প্রশ্নটা করে, আর এর উত্তরটা কিন্তু খুবই মজার। এই সাধারণ ঘটনাটির পিছনে লুকিয়ে আছে পদার্থবিজ্ঞানের এক দারুণ রহস্য। এই রহস্য বুঝতে গেলে আমাদের প্রথমে দুটি বিষয় পরিষ্কারভাবে জানতে হবে: তাপ (Heat) এবং তাপমাত্রা (Temperature)। যদিও আমরা এই দুটি শব্দ প্রায়ই এক অর্থে ব্যবহার করি, বিজ্ঞানের চোখে এদের মধ্যে বেশ কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

বৈশিষ্ট্য

তাপ (Heat)

তাপমাত্রা (Temperature)

সংজ্ঞা

তাপ এক প্রকার শক্তি যা গ্রহণ করলে বস্তু উত্তপ্ত হয় এবং বর্জন করলে শীতল হয়।

তাপমাত্রা হলো বস্তুর এমন এক তাপীয় অবস্থা যা নির্ধারণ করে বস্তুটি অন্য বস্তুকে তাপ দেবে না অন্য বস্তু থেকে তাপ নেবে।

কারণ ও ফল

তাপ হলো কারণ।

তাপমাত্রা হলো তাপের ফল।

পরিমাপক যন্ত্র

ক্যালোরিমিটার যন্ত্রের সাহায্যে পরিমাপ করা হয়।

থার্মোমিটার যন্ত্রের সাহায্যে পরিমাপ করা হয়।

SI একক

জুল (Joule)।

কেলভিন (Kelvin)।

সহজ কথায়, তাপ হলো সেই শক্তি যা সবসময় বেশি তাপমাত্রার জায়গা থেকে কম তাপমাত্রার জায়গার দিকে ছুটে যায়। এই ছুটে যাওয়া বা প্রবাহকেই আমরা বলি তাপ সঞ্চালন

কিন্তু তাপ ঠিক কোন কোন পথে যাতায়াত করে? চলো, সেই রহস্যই আজ ভেদ করা যাক।

——————————————————————————–

১. তাপ সঞ্চালনের তিনটি পথ

বিজ্ঞানের ভাষায়, তাপ মূলত তিনটি পথে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারে। এই পথগুলো হলো:

  • পরিবহন (Conduction) (মূলত কঠিন পদার্থে ঘটে)
  • পরিচলন (Convection) (তরল ও গ্যাসীয় পদার্থে ঘটে)
  • বিকিরণ (Radiation) (শূন্য মাধ্যমেও ঘটতে পারে)

আজকের আলোচনায় আমরা মূলত কঠিন পদার্থের মধ্যে দিয়ে তাপের প্রবাহ, অর্থাৎ ‘পরিবহন’ পদ্ধতির উপর আলোকপাত করব।

এখন আমরা বিস্তারিতভাবে জানব কীভাবে কঠিন পদার্থের মধ্যে দিয়ে তাপ এক অণু থেকে অন্য অণুর কাছে পৌঁছে যায়, অনেকটা কানাকানি খেলার মতো।

——————————————————————————–

২. পরিবহন পদ্ধতি: অণুদের হাতবদল খেলা

তাপ পরিবহনের সংজ্ঞাটি হলো:

তাপ সঞ্চালনের যে পদ্ধতিতে কোনো পদার্থের উষ্ণতর স্থান থেকে শীতলতর স্থানে অণুগুলির কম্পনের দ্বারা তাপ সঞ্চালিত হয়, কিন্তু অণুগুলির কোনো স্থানচ্যুতি হয় না, তাকে তাপের পরিবহন বলে।

অর্থাৎ, এই পদ্ধতিতে পদার্থের অণুগুলো নিজেরা জায়গা বদল না করে, কেবল পাশের অণুকে কম্পনের মাধ্যমে তাপ শক্তিটা দিয়ে দেয়। এই তাপের প্রবাহ কয়েকটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে:

  • বস্তুর ক্ষেত্রফল (A): রাস্তা যত চওড়া হয়, গাড়ি তত সহজে যেতে পারে। ঠিক তেমনি, কোনো বস্তুর ক্ষেত্রফল যত বেশি হয়, তাপ তত সহজে প্রবাহিত হতে পারে।
  • উষ্ণতার পার্থক্য (θ1 – θ2): দুটি প্রান্তের তাপমাত্রার পার্থক্য যত বেশি হবে, তাপ প্রবাহের হারও তত দ্রুত হবে।
  • সময় (t): যত বেশি সময় ধরে তাপ দেওয়া হবে, তত বেশি পরিমাণ তাপ এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে প্রবাহিত হবে।
  • বস্তুর বেধ (d): বস্তুর বেধ বা পুরুত্ব যত বাড়বে, তাপের প্রবাহ তত বেশি বাধা পাবে এবং প্রবাহের হার কমে যাবে।

এই চারটি বিষয়ের উপর ভিত্তি করে আমরা তাপ পরিবহনের একটি গাণিতিক সম্পর্ক তৈরি করতে পারি:

Q ∝ A(θ1-θ2)t/d

এই সম্পর্কটিকে সমীকরণে পরিণত করতে একটি ধ্রুবক (K) ব্যবহার করা হয়, যা পদার্থের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে। চূড়ান্ত সমীকরণটি হলো:

Q = K * A * (θ1-θ2) * t / d

এখানে,

  • Q = প্রবাহিত তাপের পরিমাণ
  • K = পদার্থের তাপ পরিবাহিতাঙ্ক (একটি ধ্রুবক)
  • A = ক্ষেত্রফল
  • (θ1 – θ2) = দুই প্রান্তের তাপমাত্রার পার্থক্য
  • t = সময়
  • d = বেধ

এই সমীকরণে ‘K’ নামক একটি ধ্রুবক রয়েছে, যা আসলে প্রতিটি পদার্থের নিজস্ব একটি পরিচয়। চলো জেনে নিই এই ‘K’ আসলে কী।

——————————————————————————–

৩. তাপ পরিবাহিতাঙ্ক (K): পদার্থের তাপ পরিবহনের ক্ষমতা

তাপ পরিবাহিতাঙ্কের আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞাটি হলো:

কোনো পদার্থের একক বেধ ও একক প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফলযুক্ত একটি পাতের দুই বিপরীত পৃষ্ঠের উষ্ণতার পার্থক্য একক হলে স্থির অবস্থায় পাতের এক পৃষ্ঠ থেকে অপর পৃষ্ঠে লম্বভাবে একক সময়ে যে তাপ পরিবাহিত হয়, তাকে ওই পদার্থের তাপ পরিবাহিতাঙ্ক (k) বলে।

খুব সহজ ভাষায় বললে, তাপ পরিবাহিতাঙ্ক (Thermal Conductivity) হলো কোনো পদার্থের তাপ পরিবহন করার ক্ষমতার একটি পরিমাপ। যে পদার্থের ‘K’-এর মান যত বেশি, সে তত সহজে নিজের মধ্যে দিয়ে তাপ যেতে দেয়।

আগের বিভাগের সমীকরণটি (Q = K * A * (θ1 - θ2) * t / d) ব্যবহার করে আমরা ‘K’-কে আরও সহজে বুঝতে পারি। ভাবো, যদি আমরা ১ মিটার বেধ (d=1m) এবং ১ বর্গমিটার ক্ষেত্রফল (A=1m²) বিশিষ্ট একটি পদার্থের দুই প্রান্তের তাপমাত্রার পার্থক্য ১ কেলভিন (θ1-θ2=1K) রাখি, তাহলে ১ সেকেন্ডে (t=1s) যে পরিমাণ তাপ (Q) প্রবাহিত হবে, সেটিই হলো ওই পদার্থের তাপ পরিবাহিতাঙ্ক (K)।

এই ধর্মের উপর ভিত্তি করে আমরা পদার্থকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করতে পারি:

তাপের সুপরিবাহী (Good Conductors)

তাপের কুপরিবাহী (Bad Conductors)

বৈশিষ্ট্য: এদের তাপ পরিবাহিতাঙ্ক (K) অনেক বেশি।

বৈশিষ্ট্য: এদের তাপ পরিবাহিতাঙ্ক (K) খুব কম।

উদাহরণ: রূপা (সর্বোৎকৃষ্ট), পারদ (তরল ধাতু), হীরা এবং গ্রাফাইট (অধাতু): মজার ব্যাপার হলো, হীরা তাপের সুপরিবাহী হলেও বিদ্যুতের কুপরিবাহী, কিন্তু গ্রাফাইট তাপ ও বিদ্যুৎ উভয়েরই সুপরিবাহী।

উদাহরণ: বেশিরভাগ অধাতু, যেমন কাঠ, প্লাস্টিক, বায়ু ইত্যাদি।

তাপ পরিবাহিতাঙ্কের দুটি প্রচলিত একক রয়েছে:

  • SI একক: W.m⁻¹k⁻¹ (ওয়াট প্রতি মিটার প্রতি কেলভিন)
  • CGS একক: Cal.cm⁻¹°C⁻¹S⁻¹ (ক্যালোরি প্রতি সেন্টিমিটার প্রতি ডিগ্রি সেলসিয়াস প্রতি সেকেন্ড)

পদার্থের এই ভিন্ন ভিন্ন তাপ পরিবহন ক্ষমতার কারণেই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনেক ঘটনা ঘটে।

——————————————————————————–

৪. শেষ কথা: মূল শিক্ষা

আজকের আলোচনা থেকে আমরা তাপের যাত্রা সম্পর্কে কয়েকটি জরুরি বিষয় শিখলাম। চলো একনজরে দেখে নিই:

  1. তাপ হল শক্তি যা উষ্ণ স্থান থেকে শীতল স্থানে প্রবাহিত হয়। এই প্রবাহের একটি প্রধান উপায় হলো কঠিন পদার্থের মধ্যে দিয়ে পরিবহন।
  2. তাপ পরিবহন চারটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে: ক্ষেত্রফল, তাপমাত্রার পার্থক্য, সময় এবং বেধ।
  3. তাপ পরিবাহিতাঙ্ক (K) হলো পদার্থের একটি ধর্ম যা নির্ধারণ করে সেটি তাপের সুপরিবাহী না কুপরিবাহী।

পদার্থবিজ্ঞানের জগতে তাপের এই যাত্রা সত্যিই fascinating, এবং এর পরের অধ্যায়গুলোতে আমরা তাপের আরও অনেক রোমাঞ্চকর ঘটনা সম্পর্কে জানব।

দশম শ্রেণীর তাপের ঘটনাসমূহ: গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা ও তথ্য

ঘটনা বা বিষয়ের নাম
সংজ্ঞা বা বর্ণনা
গাণিতিক রূপ বা সূত্র
SI একক
CGS একক
মাত্রা
নির্ভরশীল বিষয়সমূহ
 
দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক
একক দৈর্ঘ্যের কোনো দণ্ডের উষ্ণতা ১ ডিগ্রি বৃদ্ধি করলে দণ্ডটির যে পরিমাণ দৈর্ঘ্য প্রসারণ হয় তাকে ওই পদার্থের দৈর্ঘ্য প্রসারণ গুণাঙ্ক বলে।
α = (L2 – L1) / {L1(t2 – t1)}
K⁻¹
°C⁻¹
[θ⁻¹]
উপাদান
 
ক্ষেত্র প্রসারণ গুণাঙ্ক
একক ক্ষেত্রফল বিশিষ্ট কোনো পাতের উষ্ণতা ১ ডিগ্রি বৃদ্ধি করলে পাতের যে পরিমাণ ক্ষেত্রফল প্রসারণ হয় তাকে ওই পদার্থের ক্ষেত্র প্রসারণ গুণাঙ্ক বলে।
β = (S2 – S1) / {S1(t2 – t1)}
K⁻¹
°C⁻¹
[θ⁻¹]
উপাদান
 
আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক (কঠিন)
একক আয়তন বিশিষ্ট কোনো কঠিন পদার্থের উষ্ণতা ১ ডিগ্রি বৃদ্ধি করলে পদার্থটির যে পরিমাণ আয়তন প্রসারণ হয় তাকে ওই পদার্থের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক বলে।
γ = (V2 – V1) / {V1(t2 – t1)}
K⁻¹
°C⁻¹
[θ⁻¹]
উপাদান
 
তরলের আপাত প্রসারণ গুণাঙ্ক
কোনো তরল পদার্থের প্রতি একক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে প্রতি একক আয়তনে যে আপাত প্রসারণ হয় তাকে ওই তরলের আপাত প্রসারণ গুণাঙ্ক বলে।
γa = VAC / {V(t2 – t1)}
K⁻¹
°C⁻¹
[θ⁻¹]
তরলের প্রকৃতি, পাত্রের প্রসারণ
 
তরলের প্রকৃত প্রসারণ গুণাঙ্ক
কোনো তরল পদার্থের প্রতি একক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে প্রতি একক আয়তনে যে প্রকৃত প্রসারণ হয় তাকে ওই তরলের প্রকৃত প্রসারণ গুণাঙ্ক বলে।
γr = VBC / {V(t2 – t1)}
K⁻¹
°C⁻¹
[θ⁻¹]
তরলের প্রকৃতি
 
তাপ পরিবাহিতাঙ্ক
একক বেধ ও একক প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফলযুক্ত কোনো পাতের দুই বিপরীত পৃষ্ঠের উষ্ণতার পার্থক্য একক হলে স্থির অবস্থায় পাতের এক পৃষ্ঠ থেকে অন্য পৃষ্ঠে লম্বভাবে একক সময়ে যে তাপ পরিবাহিত হয় তাকে ওই পদার্থের তাপ পরিবাহিতাঙ্ক বলে।
K = (Q × d) / {A(θ1 – θ2)t}
W.m⁻¹K⁻¹
Cal.cm⁻¹.°C⁻¹.s⁻¹
[MLT⁻³θ⁻¹]
উপাদান, উষ্ণতা
 
গ্যাসের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক
চাপ স্থির রেখে নির্দিষ্ট ভরের কোনো গ্যাসের উষ্ণতা 0°C থেকে 1°C বৃদ্ধি করলে প্রতি একক আয়তনে যে আয়তন প্রসারণ হয় তাকে ওই গ্যাসের আয়তন প্রসারণ গুণাঙ্ক বলে।
γp = (Vt – V0) / (V0 × t)
K⁻¹
°C⁻¹
Not in source
উষ্ণতা (স্থির চাপে)
 
তাপীয় রোধ
যে ধর্মের জন্য কোনো পরিবাহী তার মধ্য দিয়ে তাপের পরিবহনকে বাধা দেয় তাকে ওই পরিবাহীর তাপীয় রোধ বলে।
Rh = d / (KA)
K/W
°C.s/Cal
Not in source
বেধ, ক্ষেত্রফল, উপাদান

Loading

Leave a Reply

error: